বিষয়বস্তুতে চলুন

শরৎ-সাহিত্য-সংগ্রহ (দশম সম্ভার)/ষোড়শী/প্রথম অঙ্ক/প্রথম দৃশ্য

উইকিসংকলন থেকে

প্রথম অঙ্ক

প্রথম দৃশ্য

চণ্ডীগড়: গ্রাম্যপথ

 [বেলা অপরাহ্ণপ্রায়। চণ্ডীগড়ের সঙ্কীর্ণ গ্রাম্যপথের ’পরে সন্ধ্যার ধূসর ছায়া নামিয়া আসিতেছে। অদূরে বীজগাঁ’র জমিদারী কাছারীবাটীর ফটকের কিয়দংশ দেখা যাইতেছে। জন-দুই পথিক দ্রুতপদে চলিয়া গেল; তাহাদেরই পিছনে একজন কৃষক মাঠের কর্ম্ম শেষ করিয়া গৃহে ফিরিতেছিল, তাহার বাঁ কাঁধে লাঙ্গল ডান হাতে ছড়ি, অগ্রবর্ত্তী অদৃশ্য বলদযুগলের উদ্দেশে হাঁকিয়া বলিতে বলিতে গেল, “ধলা, সিধে চ’ বাবা, সিধে চল্! কেলো, আবার আবার! আবার পরের গাছপালায় মুখ দেয়!”

 কাছারীর গোমস্তা এককড়ি নন্দী ধীরে ধীরে প্রবেশ করিল এবং উৎকণ্ঠিত শঙ্কায় পথের একদিকে যতদূর দৃষ্টি যায় গলা বাড়াইয়া কিছু একটা দেখিবার চেষ্টা করিতে লাগিল। তাহার পিছনের পথ দিয়া দ্রুতপদে বিশ্বম্ভর প্রবেশ করিল। সে কাছারীর বড় পিয়াদা, তাগাদায় গিয়াছিল, অকস্মাৎ সংবাদ পাইয়াছে বীজগাঁ’র নবীন জমিদার জীবানন্দ চৌধুরী চণ্ডীগড়ে আসিতেছেন। ক্রোশ-দুই দূরে তাঁহার পাল্‌কী নামাইয়া বাহকেরা ক্ষণকালের জন্য বিশ্রাম লইতেছিল, আসিয়া পড়িল বলিয়া।]

 বিশ্বম্ভর। নন্দীমশাই, দাঁড়িয়ে করতেছ কি? হুজুর আসচেন যে!

 এককড়ি। (চমকিয়া মুখ ফিরাইল। এ দুঃসংবাদ ঘণ্টাখানেক পূর্ব্বে তাহার কানে পৌঁছিয়াছে। উদাস-কণ্ঠে কহিল) হুঁ।

 বিশ্বম্ভর। হুঁ কি গো? স্বয়ং হুজুর আসচেন যে!

 এককড়ি। (বিকৃত-স্বরে) আসচেন ত আমি করব কি? খবর নেই, এত্তালা নেই—হুজুর আসচেন! হুজুর বলে ত আর মাথা কেটে নিতে পারবে না!

 বিশ্বম্ভর। (এই আকস্মিক উত্তেজনার অর্থ উপলব্ধি না করিতে পারিয়া একমুহূর্ত্ত মৌন থাকিয়া শুধু কহিল) আরে, তুমি কি মরিয়া হয়ে গেলে নাকি?

 এককড়ি। মরিয়া কিসের! মামার বিষয় পেয়েচে বই ত কেউ আর বাপের বিষয় বলবে না! তুই জানিস্ বিশু, কালিমোহনবাবু ওকে দূর করে দিয়েছিল, বাড়ি ঢুকতে পর্য্যন্ত দিত না। তেজ্যপুত্তুরের সমস্ত ঠিক-ঠাক্, হঠাৎ খামোকা মরে গেল বলেই ত জমিদার! নইলে থাকতেন আজ কোথায়? আমি জানিনে কি!

 বিশ্বম্ভর। কিন্তু জেনে সুবিধেটা কি হচ্চে শুনি? এ মামা নয়, ভাগ্নে। ওকথা ঘুণাগ্রে কানে গেলে ভিটেয় তোমার সন্ধ্যে দিতেও কাউকে বাকি রাখবে না। ধরবে আর দুম্ করে গুলি করে মারবে। এমন কত গণ্ডা এরই মধ্যে মেরে পুঁতে ফেলেচে জানো? ভয়ে কেউ কথাটী পর্য্যন্ত কয় না।

 এককড়ি। হাঃ—কথা কয় না মগের মুল্লুক কি-না!

 বিশ্বম্ভর। আরে মাতাল যে! তার কি হুঁশ্ পবন আছে, না, দয়া-মায়া আছে! বন্দুক পিস্তল ছুরি-ছোড়া ছাড়া এক পা কোথাও ফেলে না। মেরে ফেললে তখন! করবে কি শুনি?

 এককড়ি। তুই ত সেদিন সদরে গিয়েছিলি—দেখেচিস্ তাকে?

 বিশ্বম্ভর। না, ঠিক দেখিনি বটে, তবে সে দেখাই। ইয়া গাল-পাট্টা, ইয়া গোঁফ, ইয়া বুকের ছাতি, জবাফুলের মত চোখ ভাঁটার মত বন্ বন্ করে ঘুরছে—

 এককড়ি। বিশু, তবে পালাই চ’।

 বিশ্বম্ভর। আরে পালিয়ে ক’দিন তার কাছে বাঁচবে নন্দীমশাই? চুলের ঝুঁটি ধরে টেনে এনে খাল খুঁড়ে পুঁতে ফেলবে।

 এককড়ি। কি তবে হবে বল্? মাতালটা যদি বলে বসে শান্তিকুঞ্জেই থাকব?

 বিশ্বম্ভর। কতবার ত বলেচি নন্দীমশাই, এ কাজ ক’রো না, ক’রো না, ক’রো না। বছরের পর বছর খাতায় কেবল শান্তিকুঞ্জের মিথ্যে মেরামতি খরচই লিখে গেলে, গরীবের কথায় ত আর কান দিলে না।

 এককড়ি। তুইও ত কাছারীর বড় সর্দ্দার, তুইও তো—

 বিশ্বম্ভর। দেখ, ও-সব শয়তানি ফন্দি ক’রো না বলচি! আমার ওপর দোষ চাপিয়েচ কি—ওগো, ওই যে একটা পাল্‌কী দেখা যায়!

 [নেপথ্যে বালকদিগের কণ্ঠধ্বনি শুনা গেল। বিশ্বম্ভর পলায়নোদ্যত এককড়ির হাতটা ধরিয়া ফেলিতেই সে নিজেকে মুক্ত করিবার চেষ্টা করিতে করিতে]

 এককড়ি। ছাড়্ না হারামজাদা।

 বিশ্বম্ভর। (অনুচ্চ চাপা-কণ্ঠে) পালাচ্চো কোথায়? ধরলে গুলি করে মারবে যে!

 [এমনি সময়ে পাল্‌কী সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইতে উভয়ে স্থির হইয়া দাঁড়াইল। পাল্কীর অভ্যন্তরে জমিদার জীবানন্দ চৌধুরী বসিয়াছিলেন; তিনি ঈষৎ একটুখানি মুখ বাহির করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন]

 জীবানন্দ। ওহে, এ গ্রামে জমিদারের কাছারী বাড়িটা কোথায় তোমরা কেউ বলে দিতে পার?

 এককড়ি। (করজোড়ে) সমস্তই ত হুজুরের রাজ্য

 জীবানন্দ। রাজ্যের খবর জানতে চাইনি। কাছারীটার খবর জানো?

 এককড়ি। জানি হুজুর। ওই যে।

 জীবানন্দ। তুমি কে?

 [এককড়ি ও বিশ্বম্ভর উভয়ে হাঁটু গাড়িয়া ভূমিষ্ঠ প্রণাম করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল।]

 এককড়ি। হুজুরের নফর এককড়ি নন্দী।

 জীবানন্দ। ওহো, তুমিই এককড়ি—চণ্ডীগড়-সাম্রাজ্যের বড়কর্ত্তা? কিন্তু দেখ এককড়ি, একটা কথা বলে রাখি তোমাকে। চাটুবাক্য অপছন্দ করিনে সত্যি, কিন্তু তার একটা কাণ্ডজ্ঞান থাকাটাও পছন্দ করি। এটা ভুলো না। তোমার কাছারীর তশিল কত?

 এককড়ি। আজ্ঞে, চণ্ডীগড় তালুকের আয় প্রায় হাজার পাঁচেক টাকা।

 জীবানন্দ। হাজার পাঁচেক?—বেশ।

[ বাহকেরা পাল্কী নীচে নামাইল। জীবানন্দ অবতরণ করিলেন না, শুধু পা

দু’টা বাহির করিয়া ভূমিতলে রাখিয়া সোজা হইয়া বসিয়া কহিলেন ]

বেশ। আমি এখানে দিন পাঁচ-ছয় আছি, কিন্তু এরই মধ্যে আমার হাজার-দশেক টাকা চাই এককড়ি। তুমি সমস্ত প্রজাদের খবর দাও যেন কাল তারা এসে কাছারীতে হাজির হয়।

 এককড়ি। যে আজ্ঞে। হুজুরের আদেশে কেউ গরহাজির থাকবে না।

 জীবানন্দ। এ গায়ে দুষ্টু বজ্জাত প্রজা কেউ আছে জানো?

 এককড়ি। আজ্ঞে, না তা এমন কেউ—শুধু তারাদাস চক্কোত্তি—তা সে আবার হুজুরের প্রজা নয়।

 জীবানন্দ। তারাদাসটা কে?

 এককড়ি। গড়চণ্ডীর সেবায়েত।

 জীবানন্দ। এই লোকটাই কি বছর-দুই পূর্ব্বে একটা প্রজা-উৎখাতের মামলায় আমার বিপক্ষে সাক্ষী দিয়েছিল?

 এককড়ি। (মাথা নাড়িয়া) হুজুরের নজর থেকে কিছুই এড়ায় না। আজ্ঞে, এই সেই তারাদাস।

 জীবানন্দ। হু। সেবার অনেক টাকার ফেরে ফেলে দিয়েছিল। এ কতখানি জমি ভোগ করে?

 এককড়ি। (মনে মনে হিসাব করিয়া) ষাট-সত্তর বিঘের কম নয়।

 জীবানন্দ। একে তুমি আজই কাছারীতে ডেকে আনিয়ে জানিয়ে দাও যে, বিঘে প্রতি আমার দশ টাকা নম্বর চাই।

 এককড়ি। (সঙ্কুচিত হইয়া) আজ্ঞে, সে যে নিস্কর দেবোত্তর, হুজুর!

 জীবানন্দ। না, দেবোত্তর এ-গাঁয়ে একফোঁটা নেই। সেলামি না পেলে সমস্ত বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবে।

 এককড়ি। আজই তাকে হুকুম জানাচ্ছি।

 জীবানন্দ। শুধু হুকুম জানানো নয়, টাকা তাকে দু’দিনের মধ্যে দিতে হবে।

 এককড়ি। কিন্তু হুজুর—

 জীবানন্দ। কিন্তু থাক্ এককড়ি। এই সোজা বারুইয়ের তীরে আমার শান্তিকুঞ্জ, না?—মহাবীর, পাল্‌কী তুলতে বল।

[ বাহকেরা পাল্‌কী লইয়া প্রস্থান করিল। ]

 এককড়ি। যা ভেবেচি তাই যে ঘটল রে বিশু! এ যে গিয়ে সোজা শান্তিকুঞ্জেই ঢুকতে চায়!

 বিশ্বম্ভর। নয় ত কি তোমার কাছারীর খোঁয়াড়ে গিয়ে ঢুকতে চাইবে?

 এককড়ি। সেখানে হয়ত ঢোকবার পথ নেই। হয়ত দোর-জানলা সব চোরে চুরি করে নিয়ে গেছে, হয়ত তার ঘরে ঘরে বাঘ-ভালুকে বসবাস করে আছে—সেখানে কি যে আছে আর কি যে নেই, কিছুই যে জানিনে বিশ্বম্ভর!

 বিশ্বম্ভর। আমিই কি জানি না-কি তোমার দোর-জানলার খবর? আর বাঘভালুকের কাছে ত আমি খাজনা আদায়ে যাইনি গো!

 এককড়ি। এই রাত্তিরে কোথায় আলো, কোথায় লোকজন, কোথায় খাবারদাবার—

 বিশ্বম্ভর। রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদলে লোকজন জুটতে পারে, কিন্তু আলো আর খাবার-দাবার—

 এককড়ি। তোর কি! তুই ত বলবিই রে নচ্ছার পাজি ব্যাটা হারামজাদা—

[ প্রস্থান ]