বিষয়বস্তুতে চলুন

শরৎ-সাহিত্য-সংগ্রহ (পঞ্চম সম্ভার)/দর্প-চূর্ণ/৩

উইকিসংকলন থেকে

◄  
  ►

 দাদা!

 কে রে বিমল? আয় বোন বোস্! বলিয়া নরেন্দ্র শয্যার উপরে উঠিয়া বসিল। তাহার উভয় ওষ্ঠপ্রান্তে ব্যথার যে চিহ্নটুকু প্রকাশ পাইল, তাহা বিমলার দৃষ্টি এড়াইল না।

 অনেক দিন দেখিনি দিদি, ভাল আছিস্ ত?

 বিমলার চোখ দুটি ছল ছল করিয়া উঠিল। সে ধীরে ধীরে শয্যা প্রান্তে আসিয়া বলিল, কেন দাদা, তোমার অসুখের কথা আমাকে এতদিন জানাওনি?

 অসুখ তেমন ত কিছুই ছিল না বোন, শুধু সেই বুকের ব্যথাটা একটু—

 বিমলা হাত দিয়া এক ফোঁটা চোখের জল মুছিয়া ফেলিয়া বলিল, একটু বৈ কি! উঠে বসতে পার না—ডাক্তার কি বললে?

 ডাক্তার? ডাক্তার কি হবে রে, ও আপনি সেরে যাবে।

 এ্যাঁ! ডাক্তার পর্য্যন্ত ডাকাওনি? ক’দিন হ’ল?

 নরেন্দ্র একটুখানি হাসিয়া বলিল, ক’দিন? এই ত সেদিন রে! দিন সাতেক হবে বোধ হয়।

 সাত দিন! তা হলে বৌ সমস্ত দেখেই গেছে!

 না না, দেখে যায়নি বোধ হয়—অসুখ আমার নিশ্চয় সে বুঝতে পারেনি। আমি তার যাবার দিনও উঠে গিয়ে বাইরে বসে ছিলুম। না না, হাজার রাগ হোক, তাই কি তোরা পারিস্ বোন?

 বৌ তা হলে রাগ করে গেছে, বল?

 না, রাগ নয়, দুঃখ-কষ্ট—কত অভাব জানিস্ ত? ওদের এ-সব সহ্য করা অভ্যাস নেই, দেহটাও তার বড় খারাপ হয়েছে, নইলে অসুখ দেখলে কি তোরা রাগ করে থাকতে পারিস্?

 বিমলা অশ্রু চাপিয়া, কঠিনস্বরে বলিল, পারি বৈকি দাদা, আমাদের অসাধ্য কাজ কিছুই নেই। না হলে তোমরা বিছানায় না শোয়া পর্য্যন্ত আর আমাদের চোখে পড়ে না! ভোলা, পালকি এল রে?

 আনতে পাঠিয়েচি মা!

 এর মধ্যে যাবি দিদি? এখনো ত সন্ধ্যে হয়নি, আর একটু বোস না।

 না দাদা, সন্ধ্যে হলে হিম লাগবে। ভোলা, পালকি একেবারে ভেতরে আনিস্।

 ভেতরে কেন বিমল?

 ভেতরেই ভাল দাদা। এই ব্যথা নিয়ে তোমার বাইরে গিয়ে উঠতে কষ্ট হবে।

 আমাকে নিয়ে যাবি? এই পাগল দেখ! কি হয়েচে যে এত কাণ্ড করতে হবে? এ ত আমার প্রায়ই হয়? প্রায়ই সেরে যায়।

 তাই যাক দাদা। কিন্তু ‘ভাই’ ত আমার আর নেই যে, তোমাকে হারালে আর একটি পাব। ঐ যে পালকি—এই র‍্যাপারখানা বেশ করে গায়ে জড়িয়ে নিয়ো। ভোলা, আর একটু এগিয়ে আনতে বল্—না দাদা, এ সময় তোমাকে চোখে-চোখে না রাখতে পারলে, আমার তিলার্দ্ধ স্বস্তি থাকবে না।

 কিন্তু, নিয়ে যেতে চাইবি বুঝলে যে, তোকে আমি খবরই দিতুম না।

 বিমলা মুখ-পানে চাহিয়া থাকিয়া বলিল, তোমাদের বোঝা তোমাদেরই থাক দাদা, আমাকে আর শুনিয়ো না। আচ্ছা, কি করে মুখে আনলে বল ত? এই অবস্থায় তোমাকে একলা ফেলে রেখে যেতে পারি! সত্যি কথা বল।

 নরেন্দ্র একটা নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, তবে চল যাই।

 দাদা!

 কি রে?

 আজ রাত্রেই বৌকে একখানা টেলিগ্রাম করে দিই, কাল সকালেই চলে আসুক।

 নরেন্দ্র ব্যস্ত হইয়া উঠিল—না, না, সে দরকার নেই।

 কেন নেই? মেদিনীপুর ত বেশি দূর নয়, একবার আসুক, না হয় আবার চলে যাবে।

 না রে বিমল, না। সত্যিই তার দেহটা ভাল নেই—দুদিন জুড়োক।

 একটুখানি থামিয়া বলিল, আমি তোর কাছে থেকে ভাল না হতে পারি ত আর কিছুতেই পারব না। হাঁ রে, আমি যে যাচ্চি, গগনবাবু শুনেচেন?

 বেশ যা হোক তুমি! তিনি ত এখনো আফিস থেকেই ফেরেননি।

 তবে?

 তবে আবার কি? তোমার ভয় নেই দাদা, তাঁর বেশ বড় বড় দুটো চোখ আছে, আমরা গেলেই দেখতে পাবেন।

 নরেন্দ্র বিছানায় শুইয়া পড়িয়া কহিল, বিমল, আমার যাওয়া ত হতে পারে না।

 বিমলা অবাক্ হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, কেন?

 গগনবাবুর অমতে—

 অমন করলে মাথা খুঁড়ে মরব দাদা! একটা বাড়ির মধ্যে কি ভিন্ন ভিন্ন মত থাকে যে, আমাকে অপমান করচ?

 অপমান করচি! ঠিক জানিস্ বিমল, ভিন্ন মত থাকে না?

 বিমলা আবশ্যক বস্ত্রাদি গুছাইয়া লইতেছিল, সলজ্জে মাথা নাড়িয়া বলিল, না।

* * * *

 দাদা, আজ ব্যথাটা তত টের পাচ্চ না, না?

 একেবারে না। এ আট দিন তোমাদের কি কষ্টই না দিলুম—এখন বিদেয় কর্ দিদি।

 করব কার কাছে? আচ্ছা দাদা, এই ষোল-সতর দিনের মধ্যে বৌ একখানা চিঠি পর্য্যন্ত দিলে না?

 বা, দিয়েচেন বৈ কি। পৌঁছান-সংবাদ দিয়েছিলেন, কালও একখানা পেয়েচি—বরং, আমিই জবাব দিতে পারিনি ভাই।

 বিমলা মুখ ভার করিয়া নিঃশব্দে চাহিয়া রহিল। নরেন্দ্র লজ্জায় কুণ্ঠিত হইয়া বলিতে লাগিল, সেখানে গিয়ে পর্য্যন্ত সে ভাল নেই—সর্দ্দি-কাসি,—পরশু একটু জ্বরের মত হয়েছিল, তবু তার ওপরেই চিঠি লিখেচেন।

 আজ তাই বুঝি সেখানে টাকা পাঠিয়ে দিলে?

 নরেন্দ্র অধিকতর লজ্জিত হইয়া পড়িল। কহিল, কিছুই ত তার হাতে ছিল না—বাড়ির পাশেই একটা মেলা বসচে লিখেচেন, সেটা শেষ হয়ে গেলেই ফিরতে পারবেন—তোমাকে বুঝি চিঠিপত্র লিখতে পারেননি?

 পেরেচেন বৈ কি। কাল আমিও একখানা চারপাতা-জোড়া চিঠি পেয়েচি—

 পেয়েচিস্? পাবি বৈ কি—তার জবাবটা—

 তোমার ভয় নেই দাদা—তোমার অসুখের কথা লিখবো না। আমার নষ্ট করবার মত অত সময় নেই। বলিয়া বিমলা ঘর ছাড়িয়া চলিয়া গেল।

 সন্ধ্যার প্রাক্কালে খোলা জানালার ভিতর দিয়া লাল আকাশের পানে চাহিয়া নরেন্দ্র স্তব্ধভাবে বসিয়া ছিল, বিমলা ঘরে ঢুকিয়া বলিল, চুপ করে কি ভাবচ দাদা?

 নরেন্দ্র মুখ ফিরাইয়া লইয়া বলিল, কিছুই ভাবিনি বোন, মনে মনে তোকে আশীর্ব্বাদ করছিলুম, যেন এমনি সুখেই তোর চিরদিন কাটে।

 বিমলা কাছে আসিয়া, তাঁহার পায়ের ধূলা মাথায় লইয়া একটা চৌকির উপর বসিল।

 আচ্ছা, দুপুর-বেলা অত রাগ করে চলে গেলি কেন বল্ ত?

 আমি অন্যায় সইতে পারিনে। কেন তুমি অত—

 অত কি বল্? ইন্দুর দিক থেকে একবার চেয়ে দেখ্ দেখি? আমি ত তাকে সুখে রাখতে পারিনি?

 সুখে থাকতে পারার ক্ষমতা থাকা চাই দাদা। সে যা পেয়েচে, এত কজন পায়? কিন্তু সৌভাগ্যকে মাথায় তুলে নিতে হয়; নইলে—কথাটা শেষ করিবার পূর্ব্বেই বিমলা লজ্জায় মাথা হেঁট করিল।

 নরেন্দ্র নীরবে স্নিগ্ধ-সন্দেহ দৃষ্টিতে এই ভগিনীর সর্ব্বাঙ্গ অভিষিক্ত করিয়া দিয়া, ক্ষণকাল পরে কহিল, বিমল, লজ্জা করিসনে দিদি, সত্য বল্ ত, তুই কখনো ঝগড়া করিস্‌নে?

 উনি বলেচেন বুঝি? তা ত বলবেনই।

 নরেন্দ্র মৃদু হাসিয়া বলিল, না, গগনবাবু কিছুই বলেননি—আমি তোকেই জিজ্ঞাসা করচি।

 বিমলা আরক্ত মুখ তুলিয়া বলিল, তোমাদের সঙ্গে ঝগড়া ক’রে কে পারবে বল? শেষে হাতে-পায়ে পড়ে—ওখানে দাঁড়িয়ে কে?

 আমি, আমি—গগনবাবু। থামলে কেন—ব’লে যাও। ঝগড়া করে কার হাতে-পায়ে কাকে পড়তে হয়—কথাটা শেষ করে ফেল।

 যাও—যে সাধু-পুরুষ লুকিয়ে শোনে, তার কথার আমি জবাব দিইনে। বলিয়া, বিমলা কৃত্রিম ক্রোধের আড়ালে হাসি চাপিয়া, দ্রুতপদে প্রস্থান করিল।

 নরেন্দ্র সুদীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া মোটা তাকিয়াটায় হেলান দিয়া বসিল। গগনবাবু বলিলেন, এ-বেলায় কেমন আছ হে?

 ভাল হয়ে গেছি। এইবার বিদায় দাও ভাই।

 বিদায় দাও? ব্যস্ত হয়ো না হে—দুদিন থাক। তোমার এই বোনটির আশ্রয়ে যে কটা দিন বাস করতে পায়, তার তত বৎসর পরমায়ু বৃদ্ধি হয়, সে খবর জানো?

 জানিনে বটে, কিন্তু সম্পূর্ণ বিশ্বাস করি।

 গগনবাবু দুই চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া বলিলেন, বিশ্বাস করি কি হে, এ যে প্রমাণ করা কথা। বাস্তবিক নরেনবাবু, এমন রত্নও সংসারে পাওয়া যায়! ভাগ্য! ভাগ্যং ফলতি—কি হে কথাটা? নইলে আমার মত হতভাগ্য যে এ বস্তু পায়, এ ত স্বপ্নের অগোচর! বৌঠাক্‌রুণ—না হে না, থেকে যাও দুদিন—এমন সংসার ছেড়ে স্বর্গে গিয়েও আরাম পাবে না, তা বলে দিচ্চি ভাই।

 বিমলা বহু দূরে যায় নাই, ঠিক পর্দ্দার আড়ালেই কান পাতিয়াছিল—চোখ মুছিয়া উঁকি মারিয়া, সেই প্রায়ান্ধকারেও স্পষ্ট দেখিতে পাইল তাহার স্বামীর কথাগুলো শুনিয়া নরেনদার মুখখানা একবার জ্বলিয়া উঠিয়াই যেন ছাই হইয়া গেল।