বিষয়বস্তুতে চলুন

শরৎ-সাহিত্য-সংগ্রহ (পঞ্চম সম্ভার)/দর্প-চূর্ণ/৪

উইকিসংকলন থেকে

◄  
  ►

 দিন-পনর পরে দুপুরের গাড়িতে ইন্দু মেয়ে লইয়া মেদিনীপুর হইতে ফিরিয়া আসিল। স্ত্রী ও কন্যাকে সুস্থ সবল দেখিয়া নরেন্দ্রের শীর্ণপাণ্ডুর মুখ মুহূর্ত্তে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল। সাগ্রহে ঘুমন্ত কন্যাকে বুকে টানিয়া লইয়া প্রশ্ন করিল, কেমন আছ ইন্দু?

 বেশ আছি। কেন?

 তোমার জ্বরের মতন হয়েছিল শুনে ভারি ভাবনা হয়েছিল। সেরে গেছে?

 না হলে ডাক্তার ডাকবে নাকি?

 নরেন্দ্রের হাসি-মুখ মলিন হইল। কহিল, না, তাই জিজ্ঞাসা করচি।

 কি হবে করে? এদিকে ত পঞ্চাশটি টাকা পাঠিয়ে চিঠির ওপর চিঠি যাচ্ছিল—কেমন আছ—কেমন আছ—সাবধানে থেকো—সাবধানে থেকো। আমি কি কচি খুকি, না, পঞ্চাশটী টাকা দাদা আমাকে দিতে পারতেন না? ও টাকা পাঠিয়ে সকলের কাছে আমার মাথা হেঁট করে দেবার কি দরকার ছিল? সেদিন বাড়িতে যেন একটা হাসি পড়ে গেল।

 নরেন্দ্র ম্লান মুখ আরও ম্লান করিয়া অস্ফুটে কহিল, আর যোগাড় করতে পারলুম না।

 না পাঠিয়ে, তাই কেন লিখে দিলে না? উঃ—আবার সেই নিত্য নেই নেই—দাও দাও—বেশ ছিলুম এতদিন। বাস্তবিক বড়লোকের মেয়ে গরীবের ঘরে পড়ার মত মহাপাপ আর সংসারে নেই, বলিয়া এই পরম সত্যে স্বামীর হৃদয় পূর্ণ করিয়া ইন্দু অন্যত্র চলিয়া গেল।

 মাসাধিক পরে স্বামী-স্ত্রীর এই প্রথম সাক্ষাৎ।

 বাহিরে আসিয়া ইন্দু ইতস্ততঃ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া, নিজের শোবার ঘরে ঢুকিয়া ভারি আশ্চর্য্য হইয়া দেখিল, বাড়ির অন্যান্য স্থানের মত এখানেও সমস্ত বস্তু রীতিমত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হইতেছে।

 জিজ্ঞাসা করিল, এত ঝাড়া-মোছা হচ্ছে কেন রে?

 নূতন ঝি বলিল, আপনি আসবেন বলে।

 আমি আসব বলে?

 হাঁ মা, বাবু তাই ত বলে দিলেন। আপনি ময়লা কিছু দেখতে পারেন না—আজ তিন দিন থেকে তাই—

 ইন্দু অন্তরের মধ্যে একটা বড় রকমের গর্ব্ব অনুভব করিল। কিন্তু সহজভাবে বলিল, ময়লা কে দেখতে পারে? তবু ভাল যে—

 হাঁ মা, লোক লাগিয়ে ওপর নীচে সমস্ত সাফ করা হয়েছে।

 ঝি, রামটহলটাকে একবার ডেকে দাও ত, বাজার থেকে কিছু ফল-মূল কিনে আনুক।

 ফলটল ত সব আছে মা। বাবু আজ সকালে নিজে বাজারে গিয়ে সমস্ত খুঁটিয়ে কিনে এনেচেন।

 ডাব আছে? আঙুর—

 আছে বৈ কি। এখনি নিয়ে আসচি, বলিয়া দাসী চলিয়া গেল। ইন্দুর মুখের উপর হইতে বিরক্তির মেঘখানা সম্পূর্ণ উড়িয়া গেল। বরং অনতিপূর্ব্বে স্বামীর মলিন মুখখানা বুকের কোথায় যেন একটু খচ্ খচ্ করিতে লাগিল।

 বিশ্রাম করিয়া ঘণ্টা-দুই পরে সে প্রসন্নমুখে স্বামীর বসিবার ঘরে ঢুকিয়া দেখিল, নরেন্দ্র চশমা খুলিয়া, খুব ঝুঁকিয়া বসিয়া কি লিখিতেছে। কহিল, অত মন দিয়ে কি লেখা হচ্চে? কবিতা?

 নরেন্দ্র মুখ তুলিয়া বলিল, না।

 কি তবে?

 ও কিছু না, বলিয়া সে লেখাগুলো চাপা দিয়া রাখিল।

 ইন্দুর প্রসন্ন মুখ মেঘাবৃত হইয়া উঠিল। কহিল, তা হলে ‘কিছু-না’র উপর অত ঝুঁকে না পড়ে বরং যাতে দুঃখ-কষ্ট ঘোচে এমন কিছুতেই মন দাও। শুনলুম, দাদার হাতে নাকি গোটাকতক চাকরি খালি আছে। বলিয়া ভাল করিয়া স্বামীর মুখের পানে চাহিয়া রহিল। সে নিশ্চয় জানিত, এই চাকরি করার কথাটা তাহাকে চিরদিন আঘাত করে। আজ কিন্তু আশ্চর্য্য হইয়া দেখিল, আঘাতের কোন বেদনাই তাহার মুখে প্রকাশ পাইল না।

 নরেন্দ্র শান্তভাবে বলিল, চাকরি করবার লোকও সেখানে আছে।

 এই সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত উত্তরে ইন্দু ক্রোধে জ্বলিয়া উঠিল। ক্ষণকাল অবাক্ হইয়া থাকিয়া বলিল, তা জানি। কিন্তু সেখানে আছে, এখানে নেই নাকি? আজকাল ভাল কথা বললে যে তোমার মন্দ হয় দেখচি! ঘরের কোণে ঘাড় গুঁজে বসে কবিতা লিখতে তোমার লজ্জা করে না? বলিয়া সে চোখ-মুখ রাঙা করিয়া ঘর ছাড়িয়া গেল।

 এই দ্বিতীয় সাক্ষাৎ।

* * * *

 অ্যাঁ—এ যে বৌ! কখন এলে?

 পরশু দুপুর-বেলা।

 পরশু দুপুর-বেলা! তাই এত তাড়াতাড়ি আজ সন্ধ্যা-বেলায় দেখা দিতে এসেচ? না ভাই বৌ, টানটা একটু কম কর।

 ইন্দু ঘাড় নাড়িয়া কহিল, চিঠি লিখে জবাব পর্য্যন্ত পাইনে। আমি একা আর কত টানব ঠাকুরঝি?

 বিমলা আশ্চর্য্য হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, জবাব পাওনি?

 সে না পাওয়াই। চার পাতার জবাব চার ছত্র ত?

 বিমলা অপ্রতিভ হইয়া বলিল, তখন এতটুকু সময় ছিল না ভাই। এ-ঘরে দাদা যদি বা একটু সারলেন, ওদিকে আবার নতুন ভাড়াটে যায় যায়।

 ইন্দু কথাটার একবর্ণও বুঝিল না, হাঁ করিয়া রহিল।

 বিমলা সেদিকে মনোযোগ না করিয়া বলিতে লাগিল, সেই মঙ্গলবারটা আমার চিরকাল মনে থাকবে। সাত দিনের দিন খবর পেয়ে দাদাকে নিয়ে এলুম, তার দুদিন পরে দাদার বুকের ব্যথার যেমন বাড়াবাড়ি, অম্বিকাবাবুর অসুখটাও তেমনি বেড়ে উঠল—তোমাকে বলব কি বৌ, সেক দিতে দিতে আর ফোমেণ্ট করতে করতে বাড়িশুদ্ধ লোকের হাতের চামড়া উঠে গেল—সারা দিন-রাত কারু নাওয়া-খাওয়া পর্য্যন্ত হল না। হাঁ, সতী-সাধ্বী বলি, ওই অম্বিকাবাবুর স্ত্রীকে। ছেলেমানুষ বৌ, কিন্তু কি যত্ন, কি স্বামী-সেবা! তার পুণ্যেই এ-যাত্রা তিনি রক্ষে পেয়ে গেলেন—নইলে ডাক্তার-বদ্যির সাধ্য ছিল না।

 অম্বিকাবাবু কে?

 কি জানি, ঘাটালের কাছে কোথায় বাড়ি। চিকিৎসার জন্য এখানে এসে আমাদের ঐ পাশের বাড়িটা ভাড়া নিয়েচেন। লোকজন নেই—পয়সা-কড়িও নেই—শুধু বৌটি—

 ইন্দু মাঝখানেই প্রশ্ন করিল, তোমার দাদার বুঝি খুব বেড়েছিল?

 বিমলা ওষ্ঠাধর কুঞ্চিত করিয়া কহিল, সে রাতে আমার ত সত্যিই ভয় হয়েছিল। ঐ তাকের ওপর ওষুধের খালি শিশিগুলো চেয়ে দেখ না—তিন জন ডাক্তার—আর,—আচ্ছা বৌ, দাদা বুঝি এ-সব কথা তোমাকে চিঠিতে লেখেননি?

 ইন্দু অন্যমনস্কের মত কহিল, না।

 বিমলা জিজ্ঞাসা করিল, এখানে এসে বুঝি শুনলে?

 ইন্দু তেমনিভাবে জবাব দিল, হাঁ।

 বিমলা বলিতে লাগিল, আমি ত তোমাকে প্রথম দিনেই টেলিগ্রাম করতে চেয়েছিলুম; মাত্র দু-তিন ঘণ্টার পথ স্বচ্ছন্দে আসতে পারতে, কিন্তু দাদা কিছুতেই দিলেন না। হাসিয়া কহিল, কি যে তাঁকে তুমি করেচ তা তুমিই জান বৌ, পাছে অসুস্থ শরীরে তুমি ব্যস্ত হও, এই ভয়ে কোনমতেই খবর দিতে চাইলেন না। যাক—ঈশ্বরেচ্ছায় ভাল হয়ে গেছে—নইলে

 নইলে আর কি হত ঠাকুরঝি? অসুখ সারতেও আমাকে দরকার হয়নি, না সারলেও হয়ত দরকার হত না। বলিয়া ইন্দু উঠিয়া গিয়া, ঔষধের শূন্য এবং অর্দ্ধশূন্য শিশিগুলা নাড়িয়া চাড়িয়া লেবেলের লেখা পড়িয়া দেখিতে লাগিল।

 কিন্তু এ কি হইল? কথনও যাহা হয় নাই—আজ অকস্মাৎ তাহার দুই চোখ অশ্রুতে ঝাপ্সা হইয়া গেল। কেন, সে কি কেহ নয় যে, এত বড় একটা কাণ্ড হইয়া গেল অথচ তাহাকে জানানো পর্য্যন্ত হইল না! সে নিজের এমন কি পীড়ার কথা লিখিয়াছিল, যাহাতে সংবাদ দেওয়াটাও কেহ উচিত মনে করিলেন না!

 তিনি ভাল হইয়াও ত কতকগুলা পত্রে কত কথা লিখিলেন, শুধু নিজের কথাটাই বলিতে ভুলিলেন? বেশ, এখানে আসিয়াও ত তিন দিন হইল, তবু কি মনে পড়িল না?

 ইন্দুর তীব্র অভিমানের সুর বিমলা টের পাইয়াছিল। ফিরিয়া আসিয়া বলিল, শিশি-বোতল নাড়াচাড়া করে আর কি হবে বৌ, ওরা কখনও মিথ্যে সাক্ষী দেবে না, তা যতই জোর কর না। এস, তোমার চা দেওয়া হয়েচে।

 চল, বলিয়া ইন্দু অলক্ষ্যে চোখের জল মুছিয়া ফেলিয়া তাহার কাছে আসিয়া দাঁড়াইল।

 চা খাওয়া শেষ হইলে, বিমলা কি জানি ইচ্ছা করিয়া আঘাত দিল কি না—কহিল, সে এক হাসির কথা বৌ। এক বাড়িতে দুই রোগী, কিন্তু দুজনের কি আশ্চর্য্য ভিন্ন ব্যবস্থা! দাদা মর মর হয়েও তোমাকে খবর দিতে দিলেন না, পাছে ব্যস্ত হও—পাছে তোমার শরীর খারাপ হয়—আর অম্বিকাবাবু একদণ্ড ওঁর স্ত্রীকে সুমুখ থেকে নড়তে দিলেন না। তাঁর ভয়, সে চোখের সুমুখ থেকে গেলেই তাঁর প্রাণটা বেরিয়ে যাবে। এমন কি, সে ছাড়া তিনি কারও হাতে বিশ্বাস করে ওষুধ খেতেন না—এমন কখনও শুনেচ বৌ? আমাদের এঁকে তোমরা সবাই তামাসা কর, কিন্তু অম্বিকাবাবুরা সকলকে ডিঙিয়ে গেছেন; খেটে খেটে এই মেয়েটির ঠিক মড়ার মত আকৃতি হয়েচে।

 হুঁ, বলিয়া ইন্দু উঠিয়া দাঁড়াইল। কহিল, আর একদিন এসে তোমার সতীসাধ্বী বৌটির সঙ্গে আলাপ করে যাব—আজ গাড়ী এসেচে, চললুম।

 তা হলে কাল একবার এস। আলাপ করে বাস্তবিক সুখী হবে।

 দেখা যাবে যদি কিছু শিখতে পারি, বলিয়া ইন্দু মুখ ভার করিয়া গাড়ীতে গিয়া উঠিল। অম্বিকাবাবুর পাগলামি তাহার মনের মধ্যে আজ সমস্ত পথটা তাহার স্বামীর গভীর মঙ্গলেচ্ছায় গায়ে ধূলা ছিটাইয়া লজ্জা দিতে দিতে চলিল।