বিষয়বস্তুতে চলুন

শরৎ-সাহিত্য-সংগ্রহ (পঞ্চম সম্ভার)/দর্প-চূর্ণ/৫

উইকিসংকলন থেকে

◄  
  ►

 দিন দুই পরে কথায় কথায় ইন্দু অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া বলিয়া উঠিল, যদি সত্যি কথা শুনলে রাগ না কর, তা হলে বলি ঠাকুরঝি, বিয়ে করা তোমার দাদারও উচিত হয়নি, এই অম্বিকাবাবুরও হয়নি।

 বিমলা জিজ্ঞাসা করিল, কেন?

 কারণ, প্রতিপালন করবার ক্ষমতা না থাকলে, এটা মহাপাপ।

 উত্তর শুনিয়া বিমলা মর্ম্মাহত হইল। ইন্দুকে সে ভালবাসিত। খানিক পরে কহিল, অম্বিকাবাবুর অন্যায় হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু তাই বলে তাঁর স্ত্রী নিজের কর্ত্তব্য করবে না? তাকে ত মরণ পর্য্যন্ত স্বামী-সেবা করতে হবে?

 কেন হবে? তিনি অন্যায় করবেন, যাতে অধিকার নেই, তাই করবেন—তার ফলভোগ করব আমরা? তুমি ইংরিজি পড়নি, আর পাঁচটা সভ্যসমাজের খবর রাখ না; নইলে বুঝিয়ে দিতে পারতুম, কর্ত্তব্য শুধু একদিকে থাকে না। হয় দুদিকে থাকবে, না হয় থাকবে না। পুরুষেরা এ কথা আমাদের বুঝতে দেয় না; দেয় না বলেই আমরা অম্বিকাবাবুর স্ত্রীর মত মৃত্যুপণ করে সেবা করি।

 বিমলা মুহূর্ত্তকাল চাহিয়া থাকিয়া কহিল, না হলে করতাম না! বৌ, সেবা করাটা কি স্ত্রীর বড় দুঃখের কাজ বলে মনে কর? অম্বিকাবাবুর স্ত্রীর বাইরের ক্লেশটাই দেখতে পাও, তার ভেতরের আনন্দটা জানতে পাও কি?

 আমি জানতেও চাইনে।

 স্বামীর ভালবাসাটাও বোধ করি জানতে চাও না।

 না ঠাকুরঝি, অরুচি হয়ে গেছে। বরং ওটা কম করে নিজের কর্ত্তব্যটা করলেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচি।

 বিমলা দাঁড়াইয়াছিল, নিশ্বাস ফেলিয়া ধীরে ধীরে বসিয়া পড়িয়া বলিল, ঠিক এই কথাটা আগেও একবার বলেচ। কিন্তু তখনও বুঝতে পারিনি, এখনও বুঝতে পারলুম না; আমার দাদা তাঁর কর্ত্তব্য করেন না! কি সে, তা তুমিই জান। অনেক বই পড়েচ, অনেক দেশের খবর জান—তোমার সঙ্গে তর্ক করা সাজে না; কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস, স্বামী ন্যায়-অন্যায় যাই করুন, তাঁর ভালবাসা অগ্রাহ্য করবার স্পর্দ্ধা কোন দেশের স্ত্রীরই নেই। আমার ত মনে হয়, ও জিনিস হারানোর চেয়ে মরণ ভাল; তার পরেও বেঁচে থাকা শুধু বিড়ম্বনা।

 আমি তা মানিনে।

 মানো নিশ্চয়ই, বলিয়া বিমলা হাসিয়া ফেলিল। তাহার সহসা মনে হইল, এ সমস্তই পরিহাস। সত্যই ত পরিহাস ভিন্ন নারীর মুখে ইহা আর কি হইতে পারে! কহিল, কিন্তু তাও বলি বৌ, আমার কাছে যা মুখে আসে বলচ, কিন্তু দাদার সামনে এ-সব নিয়ে বেশি চালাকি কোরো না। কেন না, পুরুষমানুষ যতই বুদ্ধিমান হোন, অনেক সময়ে—

 কি—অনেক সময়ে?

 তামাসা, কি না, ধরতে পারে না।

 সে তাঁর কাজ। আমি তা নিয়ে দুর্ভাবনা করিনে।

 কিন্তু আমি যে, না ভেবে থাকতে পারিনে বৌ!

 ইন্দু জোর করিয়া হাসিয়া প্রশ্ন করিল, কেন বল ত?

 বিমলা একটুখানি ভাবিয়া বলিল, রাগ কোরো না বৌ; কিন্তু সেই অসুখের সময় আমার সত্যিই মনে হয়েছিল, দাদা যে তোমাকে পাবার জন্যে এক সময় পাগল হয়ে উঠেছিলেন, সেই যে কি-বলে ‘পায়ে কাঁটা ফুটলে বুক পেতে দেওয়া’—কিন্তু, সে ভাব আর বুঝি নেই।

 হঠাৎ ইন্দুর সমস্ত মুখের উপর কে যেন কালি লেপিয়া দিল; তার পরে, সে জোর করিয়া শুকনো হাসি টানিয়া আনিয়া কহিল, তোমাকে সহস্র ধন্যবাদ ঠাকুরঝি, তোমার দাদাকে বোলো, আমি ভ্রূক্ষেপও করিনে। আর তুমিও ভাল করে বুঝো, আমার নিজের ভালমন্দ নিজেই সামলাতে জানি। তা নিয়ে পরের মাথা গরম করাটাও আবশ্যক মনে করিনে।

* * * *

 ফিরিয়া আসিয়া ইন্দু স্বামীর ঘরে ঢুকিয়াই প্রশ্ন করিল, আমি মেদিনীপুরে গেলে তোমার ব্যামো হয়েছিল?

 নরেন্দ্র খাতা হইতে মুখ তুলিয়া ধীরে ধীরে বলিল, না, ব্যামো নয়—সেই ব্যথাটা।

 খরচ বাঁচাবার জন্যে, ঠাকুরঝির ওখানে গিয়ে পড়েছিলে।

 স্ত্রীর এই অত্যন্ত কটু ইঙ্গিতে নরেন্দ্র খাতাটার উপর পুনর্ব্বার ঝুঁকিয়া পড়িয়া, কয়েক মুহূর্ত্ত মৌন থাকিয়া মৃদু কণ্ঠে বলিল, বিমলা এসে নিয়ে গিয়েছিল।

 কিন্তু আমি শুনতে পেলে বলে দিতাম, অক্ষমদের জন্যই হাসপাতাল সৃষ্টি হয়েচে। পরের ঘাড়ে না চড়ে সেইখানে যাওয়াই তাদের উচিত।

 নরেন্দ্র আর মুখ তুলিল না—একটি কথাও কহিল না।

 ইন্দু টান মারিয়া পর্দ্দাটা সরাইয়া বাহির হইয়া গেল। ধাক্কা লাগিয়া একটা ক্ষুদ্র টিপাই ফুলদানি-সমেত উল্টাইয়া পড়িল; সে ফিরিয়াও চাহিল না।

 মিনিট-পাঁচেক পরে, তেমনি সজোরে পর্দ্দা সরাইয়া ফিরিয়া আসিয়া কহিল, ঠাকুরঝি খবর দিতে চেয়েছিলেন, তুমি মানা করেছিলে কি জন্যে? ভেবেছিলে বুঝি আমি এসে ওষুধের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে দেব?

 নরেন্দ্র মুখ না তুলিয়াই বলিল, না, তা ভাবিনি। তোমার শরীর ভাল ছিল না—

 ভালই ছিল। যদিও খবর পেয়েও আমি আসতুম না, সে নিশ্চয়। কিন্তু, আমি সেখানে যে রোগে মরে যাচ্ছিলাম, এ কথাও তোমাকে চিঠিতে লিখিনি। অনর্থক কতকগুলো মিথ্যে কথা বলে ঠাকুরঝিকে নিষেধ করবার হেতু ছিল না। বলিয়া সে যেমন করিয়া আসিয়াছিল, তেমনি করিয়া চলিয়া গেল। নরেন্দ্রও তেমনি করিয়া খাতাটার পানে ঝুঁকিয়া রহিল, কিন্তু সমস্ত লেখা তাঁহার লেপিরা মুছিয়া চোখের সুমুখে একাকার হইয়া রহিল।

* * * *

 ইন্দু পর্দ্দার অন্তরাল হইতে বাহির হইয়া ডাক্তারকে কহিল, আপনিই গগনবাবুর বাড়িতে আমার স্বামীর চিকিৎসা করেছিলেন?

 বুড়া ডাক্তার চোখ তুলিয়া ইন্দুর উদ্বেগ-মলিন মুখখানির পানে চাহিয়া, ঘাড় নাড়িয়া সায় দিলেন।

 ইন্দু কহিল, কিন্তু সম্পূর্ণ আরোগ্য হয়েচেন বলে আমার মনে হয় না। এই আপনার ফি-র টাকা—আজ একবার ওবেলা যদি দয়া করে বন্ধুভাবে এসে তাঁকে দেখে যান, বড় উপকার হয়।

 ডাক্তার কিছু বিস্মিত হইলেন। ইন্দু বুঝাইয়া বলিল, ওঁর স্বভাব চিকিৎসা করতে চান না। ওষুধের প্রেসক্রিপসনটা আমাকে লুকিয়ে দেবেন। তাঁকে একটু বুঝিয়ে বলবেন।

 ডাক্তার সম্মত হইয়া বিদায় লইলেন।

 রামটহল আসিয়া সংবাদ দিল, মাজী, বল্লভ স্যাকরা এসেচে।

 এসেচে? এদিকে ডেকে আন।

 ও বল্লভ, একটু কাজের জন্য তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলুম, তুমি আমাদের বিশ্বাসী লোক—এই চুড়ি ক’গাছা বিক্রি করে দিতে হবে। বড় পুরোনো ধরণের চুড়ি বাপু, আর পরা যায় না। এ দামে নতুন এক-জোড়া কিনব মনে কচ্চি।

 বেশ ত মা, বিক্রি করে দেব।

 নিক্তি এনেচ ত? ওজন করে দেখ দেখি কত আছে? দামটা কিন্তু বাপু আমাকে কাল দিতে হবে। আমার দেরি হলে চলবে না।

 তাই দেব।

 বল্লভ চুড়ি হাতে করিয়া বলিল, এ যে একেবারে টাট্‌কা জিনিস মা! বেচলেই ত কিছু লোকসান হবে।

 তা হোক বল্লভ। এ গড়নটা আমার মনে ধরে না। আর দেখ, এ-সম্বন্ধে বাবুকে কোনও কথা বোলো না।

 বাবুদের লুকাইয়া অলঙ্কার বেচা-কেনার ইতিহাস বল্লভের অবিদিত ছিল না। একটু হাসিয়া চুড়ি লইয়া গেল।