বিষয়বস্তুতে চলুন

শরৎ-সাহিত্য-সংগ্রহ (পঞ্চম সম্ভার)/দর্প-চূর্ণ/৬

উইকিসংকলন থেকে

◄  
  ►

 ডাক্তারবাবু, পাঁচ-সাত শিশি ওষুধ খেলেন, কিন্তু বুকের ব্যথাটা ত গেল না!

 গেল না? কৈ, তিনি ত কিছু বলেন না।

 জানেন ত, ঐ তাঁর স্বভাব; কিন্তু, আমি নিশ্চয় জানি, একটু ব্যথা লেগেই আছে —তা ছাড়া, শরীর ত সারচে না?

 ডাক্তার চিন্তা করিয়া কহিলেন, দেখুন আমারও সন্দেহ হয়, শুধু ওষুধে কিছু হবে না। একবার জল-হাওয়া পরিবর্ত্তন আবশ্যক।

 তাই কেন তাঁকে বলেন না?

 বলেছিলাম একদিন। তিনি কিন্তু প্রয়োজন মনে করেন না।

 ইন্দু রুষ্ট হইয়া বলিয়া ফেলিল, তিনি মনে না করলেই হবে? আপনি ডাক্তার, আপনি যা বলবেন, তাই ত হওয়া উচিত।

 বৃদ্ধ চিকিৎসক একটু হাসিলেন।

 ইন্দু নিজের উত্তেজনায় লজ্জিত হইয়া বলিল, দেখুন, আমি বড় ব্যাকুল হয়ে পড়েছি। আপনি ওঁকে খুব ভয় দেখিয়ে দিন।

 ডাক্তার মাথা নাড়িয়া ধীরে ধীরে কহিলেন, এ-সকল রোগে ভয় ত আছেই।

 ইন্দুর মুখ পাংশু হইয়া গেল, কহিল, সত্যি ভয় আছে?

 তাহার মুখের পানে চাহিয়া ডাক্তার সহসা জবাব দিতে পারিলেন না।

 ইন্দুর চোখে জল আসিয়া পড়িল; বলিল, আমি আপনার মেয়ের মত ডাক্তারবাবু, আমাকে লুকোবেন না। কি হয়েচে, আমাকে খুলে বলুন।

 ঠিক যে কি হইয়াছে, তাহা ডাক্তার নিজেও জানিতেন না। তিনি নানা রকম করিয়া যাহা কহিলেন তাহাতে ইন্দুর ভয় ঘুচিল না। সে ঘরে ফিরিয়া আসিয়া কাঁদিতে লাগিল।

 বিকাল-বেলা নরেন্দ্র হাতের কলমটা রাখিয়া দিয়া, খোলা জানালার বাহিরে চাহিয়াছিল, ইন্দু ঘরে ঢুকিয়া অদূরে একটা চৌকি টানিয়া লইয়া বসিল। নরেন্দ্র একবার মুখ ফিরাইয়া, আবার সেই দিকেই চাহিয়া রহিল।

 কিছুদিন হইতে ইন্দু টাকা চাহে নাই, আজ সে যে কি জন্য আসিয়া বসিল, তাহা নিশ্চয় অনুমান করিয়া তাহার বুকের ভিতরটা ঢিপ ঢিপ করিতে লাগিল।

 ইন্দু টাকা চাহিল না; কহিল, ডাক্তারবাবু বলেন, ব্যথাটা যখন ওষুধে যাচ্ছে না, তখন হাওয়া বদলানো দরকার। একবার কেন বেড়াতে যাও না।

 নরেন্দ্র বাস্তবিকই চমকিয়া উঠিল। বহুদিন অজ্ঞাত বড় স্নেহের ধন যেন কোথায় লুকাইয়া তাহাকে ডাক দিল। ইন্দুর এই কণ্ঠস্বর, সে ত ভুলিয়াই গিয়াছিল। তাই মুখ ফিরাইয়া হতবুদ্ধির মত চাহিয়া ক্ষণকালের জন্য কি যেন মনে মনে খুঁজিয়া ফিরিতে লাগিল।

 ইন্দু কহিল, কি বল? তা হলে কালই গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়া যাক। বেশি দূরে কাজ নেই—এই বদ্দিনাথের কাছে—আমরা দুজন, কমলা আর ঝি—রামটহল পুরোনো বিশ্বাসী লোক, বাড়িতেই থাক্। সেখানে একটা ছোট বাড়ি নিলেই হবে। তা হলে আজ থেকেই গুছোতে আরম্ভ করুক না কেন?

 কোন প্রকার খরচের কথাতেই নরেন্দ্র ভয় পাইত। এই একটা বড় রকমের ইঙ্গিতে তাহার মেজাজ একেবারে বিগড়াইয়া গেল। প্রশ্ন করিল, এই ডাক্তারটিকে আসতে বললে কে?

 ইন্দু জবাব দিবার পূর্ব্বে সে পুনরায় কহিল, বিমলাকে বোলো আমার পিছনে ডাক্তার লাগিয়ে উত্যক্ত করবার আবশ্যক নেই, আমি ভাল আছি।

 বিমলা প্রচ্ছন্ন থাকিয়া ডাক্তার পাঠাইতেছে,—বিমলাই সব! ইন্দু অন্তরে আঘাত পাইল। তবু চাপা দিয়া বলিল, কিন্তু তুমি ত সত্যই ভাল নেই। ব্যথাটা ত সারেনি।

 সেরেচে।

 তা হলেও শরীর সারেনি—বেশ দেখতে পাচ্চি। একবার ঘুরে এলে, আর যাই হোক—মন্দ কিছু ত হবে না!

 নরেন্দ্র ভিতরে-বাহিরে এমন জায়গায় উপস্থিত হইয়াছিল যেখানে সহ্য করিবার ক্ষমতা নিঃশেষ হইয়াছিল। তবুও ধাক্কা সামলাইয়া বলিল, আমার ঘুরে বেড়াবার সামর্থ্য নেই।

 ইন্দু জিদ করিয়া বলিল, সে হবে না। প্রাণটা ত বাঁচান চাই।

 এই জিদটা ইন্দুর পক্ষে এতই নূতন যে, নরেন্দ্র সম্পূর্ণ ভুল করিল। তাহার নিশ্চয়ই মনে হইল, তাহাকে ক্লেশ দিবার ইহা একটা অভিনব কৌশল মাত্র। এতদিনের ধৈর্য্যের বাঁধন তাহার নিমেষে ছিন্ন হইয়া গেল। চেঁচাইয়া উঠিল, কে বললে প্রাণ বাঁচান চাই? না, চাই না। তোমার পায়ে পড়ি ইন্দু, আমাকে রেহাই দাও, আমি নিশ্বাস ফেলে বাঁচি।

 স্বামীর কাছে কটুকথা শোনা ইন্দু কল্পনা করিতেও পারিত না। সে কেমন যেন জড়-সড় হতবুদ্ধি হইয়া গেল। কিন্তু নরেন্দ্র জানিতে পারিল না; বলিতে লাগিল, তুমি ঠিক জান, আমি কি সঙ্কটের মাঝখানে দিন কাটাচ্চি। সমস্ত জেনেশুনেও আমাকে কেবল কষ্ট দেবার জন্যেই অহর্নিশি খোঁচাচ্চ। কেন, কি করেচি তোমার? কি চাও তুমি?

 ইন্দু ভয়ে বিবর্ণ হইয়া চাহিয়া রহিল। একটা কথাও তাহার মুখ দিয়া বাহির হইল না।

 চেঁচামেচি, উত্তেজনা নরেন্দ্রের পক্ষে যে কিরূপ অস্বাভাবিক, তাহা এইবার সে নিজেই টের পাইল। কণ্ঠস্বর নত করিয়া বলিল, বেশ, স্বীকার করলুম আমার হাওয়া বদলান আবশ্যক, কিন্তু কি করে যাব? কোথায় টাকা পাব? সংসারখরচ যোগাতেই যে আমার প্রাণ বার হয়ে যাচ্চে!

 ইন্দু নিজে কোনও দিন ধৈর্য্য শিক্ষা করে নাই; অবনত হইতে তাহার মাথাকাটা যাইত। আজ কিন্তু সে ভয় পাইয়াছিল। নম্রকণ্ঠে কহিল, টাকা নেই বটে, কিন্তু অনেক টাকার গয়না ত আমাদের আছে—

 আছে; কিন্তু আমাদের নেই—তোমার আছে। তোমার বাবা দিয়েচেন—তোমাকে। আমার তাতে একবিন্দুও অধিকার নেই—এ-কথা আমার চেয়ে তুমি নিজেই ঢের বেশি জান।

 বেশ, তা না নাও—আমি নগদ টাকা দিচ্চি।

 কোথায় পেলে? সংসার খরচ থেকে বাঁচিয়েচ?

 ইহা চুড়ি-বিক্রির টাকা। ইন্দু সহজে মিথ্যা কহিতে পারিত না। ইহাতে তাহার বড় অপমান বোধ হইত। আজ কিন্তু সে মিথ্যা বলিল। নরেন্দ্রের মুখের ভাব ভয়ানক কঠিন হইল। ধীরে ধীরে বলিল, তা হলে রেখে দাও, গয়না গড়িয়ো। আমার বুকের রক্ত জল করে যা জমা হয়েচে, তা এভাবে নষ্ট হতে পারে না। ইন্দু, কখনও তোমাকে কটুকথা বলিনি, চিরদিনই শুনেই আসচি। কিন্তু তুমি না সেদিন দম্ভ করে বলেছিলে, কখনও মিথ্যে কথা বল না? ছিঃ—

 কমলা পর্দ্দা ফাঁক করিয়া ডাকিল, মা, পিসিমা এসেচেন।

 কি হচ্চে গো বৌ? বলিয়া বিমলা ভিতরে আসিয়া দাঁড়াইল। ইন্দু মেয়েকে আনিয়া, তাহার গলার হারটা দুই হাতে সজোরে ছিঁড়িয়া স্বামীর মুখের সামনে ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিয়া কহিল, মিথ্যে বলতে আমি জানতাম না—তোমার কাছেই শিখেচি। তবুও এখনও পেতলকে সোনা বলে চালাতে শিখিনি। যে স্ত্রীকে ঠকায়, নিজের মেয়েকে ঠকায়, তার আর কি বাকি থাকে। সে অপরকে মিথ্যাবাদী বলে কি করে?

 নরেন্দ্র ছিন্ন হারটা তুলিয়া প্রশ্ন করিল, কি করে জানলে পেতল? যাচাই করিয়েচ?

 তোমার বোনকে যাচাই করে দেখতে বল। বলিয়া সে দুই চোখ রাঙা করিয়া বিমলার দিকে চাহিল।

 বিমলা দু’পা পিছাইয়া গিয়া বলিল, ও কাজ আমার নয় বৌ, আমি এত ইতর নই যে, দাদার দেওয়া গয়না স্যাকরা ডেকে যাচাই করে দেখব।

 নরেন্দ্র কহিল, ইন্দু, তোমাকেও দু-একখানা গয়না দিয়েচি, সেগুলো যাচাই করে দেখেছ?

 দেখিনি, কিন্তু এবার দেখতে হবে।

 দেখো, সেগুলো পেতল নয়।

 ভগিনীর মুখের পানে চাহিয়া হারটা দেখাইয়া কহিল, এটা সোনা নয় বোন, পেতলই বটে। যে দুঃখে বাপ হয়ে ঐ একটি মেয়ের জন্মদিনে তাকে ঠকিয়েচি, সে তুই বুঝবি। তবুও, মেয়েকে ঠকাতে পেরেচি, কিন্তু নিজের স্ত্রীকে ঠকাতে সাহস করিনি।