বিষয়বস্তুতে চলুন

শরৎ-সাহিত্য-সংগ্রহ (পঞ্চম সম্ভার)/পরিণীতা/অষ্টম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

অষ্টম পরিচ্ছেদ

 মাস-তিনেক পরে একদিন গুরুচরণ ম্লান-মুখে নবীন রায়ের ঘরে ঢুকিয়া ফরাসের উপর বসিবার উপক্রম করিতেই তিনি চীৎকার করিয়া নিষেধ করিলেন, না না না, এখানে নয়—ঐ চৌকির উপর বোস গিয়ে। আমি অসময়ে আবার স্নান করতে পারব না—বলি জাত দিয়েচ না কি হে?

 গুরুচরণ দূরে একটা চৌকীর উপর বসিয়া পড়িয়া মাথা হেঁট করিয়া রহিল। দিন-চারেক পূর্ব্বে সে যথারীতি দীক্ষা গ্রহণ করিয়া ব্রাহ্ম হইয়াছিল, আজ সেই সংবাদটা নানা বর্ণে বিচিত্র হইয়া গোঁড়া হিন্দু নবীনের শ্রুতিগোচর হইয়াছে। নবীনের চোখ দিয়া অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বাহির হইতে লাগিল, কিন্তু গুরুচরণ তেমনি মৌন নত-মুখে বসিয়া রহিল। সে কাহাকেও কোন কথা জিজ্ঞাসা না করিয়া কাজটা করিয়া অবধি বাড়িতে কান্নাকাটি এবং অশান্তির পরিসীমা ছিল না।

 নবীন পুনরায় তর্জ্জন করিয়া উঠিলেন, বল না হে, সত্যি কি না?

 গুরুচরণ জলভারাক্রান্ত দুই চক্ষু তুলিয়া বলিল, আজ্ঞে, সত্যি।

 কেন এমন কাজ করলে? তোমার মাইনে ত মোটে ষাটটি টাকা, তুমি—ক্রোধে নবীন রায়ের মুখ দিয়া কথা বাহির হইল না।

 গুরুচরণ চোখ মুছিয়া, রুদ্ধ কণ্ঠ পরিষ্কার করিয়া লইয়া বলিল, জ্ঞান ছিল না দাদা। দুঃখের জ্বালায় গলাতেই দড়ি দেব, কি ব্রহ্মজ্ঞানীই হ’ব, কিছুই ঠাওরাতে পাচ্ছিলুম না। শেষে ভাবলুম আত্মঘাতী না হয়ে ব্রহ্মজ্ঞানী হই, তাই ব্রহ্মজ্ঞানীই হয়ে গেলুম।

 গুরুচরণ চোখ মুছিতে মুছিতে বাহির হইয়া গেল।

 নবীন চীৎকার করিয়া বলিলেন, বেশ করেছ। নিজের গলায় দড়ি না দিতে পেরে জাতের গলায় দড়ি টাঙিয়ে দিয়েচ—আচ্ছা যাও, আর আমাদের সামনে কালামুখ বা’র ক’রো না, এখন যাঁরা সব মন্ত্রী হয়েচেন, তাঁদের সঙ্গেই থাকগে—মেয়েদের হাড়ি-মুচির ঘরে দাওগে যাও, বলিয়া বিদায় করিয়া দিয়া তিনি মুখ ফিরাইয়া বসিলেন।

 নবীন রাগে অভিমানে কি যে করিবেন, প্রথমটা কিছুই ভাবিয়া পাইলেন না। গুরুচরণ হাতের ভিতর হইতে সম্পূর্ণ বাহির হইয়া গিয়াছে, আর শীঘ্র মুঠার মধ্যে আসিবে এ সম্ভাবনাও নাই—তাই নিষ্ফল আক্রোশে ছট্‌ফট্ করিয়া আপাততঃ জব্দ করিবার আর কোন ফন্দি খুঁজিয়া না পাইয়া সেই দিনই মিস্ত্রী ডাকিয়া ছাদের যাতায়াতের পথটা বন্ধ করিয়া একটা মস্ত প্রাচীর তুলিয়া দিলেন।

 এই সংবাদ বহুদূর-প্রবাসে বসিয়া ভুবনেশ্বরী শেখরের মুখে শুনিয়া কাঁদিয়া ফেলিলেন।—শেখর এ মতিবুদ্ধি কে দিলে তাকে?

 মতিবুদ্ধি কে দিয়েছিল শেখর তার নিশ্চয় অনুমান করিয়াছিল। সে উল্লেখ না করিয়া বলিল, কিন্তু মা, দুদিন পরে তোমরাই ত তাঁকে এক ঘরে করে রাখতে! এতগুলি মেয়ের বিয়ে তিনি কি করে দিতেন, আমি ত ভেবে পাইনে।

 ভুবনেশ্বরী ঘাড় নাড়িয়া বলিলেন, কিছুই আটকে থাকে না শেখর। আর সেজন্য আগে থেকে জাত দিতে হলে অনেককেই দিতে হয়। ভগবান যাদের সংসারে পাঠিয়েচেন তিনিই তাদের ভার নিতেন।

 শেখর চুপ করিয়া রহিল। ভুবনেশ্বরী চোখ মুছিয়া বলিলেন, আমার ললিতা মেয়েটাকে যদি সঙ্গে আনতুম, তা হলে যা হয় একটা উপায় আমাকেই করে দিতে হ’ত—দিতামও। আমি ত জানিনে গুরুচরণ এই সব মতলব করেই পাঠিয়ে দিলে না। আমি মনে করেছিলুম বুঝি সত্যিই তার বিয়ের সম্বন্ধ হচ্চে।

 শেখর মায়ের মুখের দিকে চাহিয়া একটুখানি লজ্জিতভাবে বলিল, বেশ ত মা, এখন বাড়ি গিয়ে তাই কর না কেন? সে ত আর ব্রাহ্ম হয়নি—তার মামাই হয়েচে—আর তিনিও কিছু তার যথার্থ আপনার কেউ ন’ন। ললিতার কেউ নেই বলেই তাঁর ঘরে মানুষ হচ্চে।

 ভুবনেশ্বরী ভাবিয়া বলিলেন, তা বটে, কিন্তু কর্ত্তা এক রকমের মানুষ, তিনি কিছুতেই রাজি হবেন না। হয়ত তাদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ পর্য্যন্ত করতে দেবেন না।

 শেখরের নিজের মনেও এই আশঙ্কা যথেষ্ট ছিল, সে আর কিছু না বলিয়া চলিয়া গেল।

 ইহার পরে আর এক মিনিটও তাহার বিদেশে থাকিতে ইচ্ছা রহিল না। দু-তিন দিন চিন্তিত অপ্রসন্নমুখে এদিকে ওদিকে ঘুরিয়া বেড়াইয়া একদিন সন্ধ্যার সময় আসিয়া বলিল, আর ভাল লাগচে না মা, চল বাড়ি যাই।

 ভুবনেশ্বরী তৎক্ষণাৎ সম্মত হইয়া বলিলেন, তাই চল শেখর, আমারও কিছু ভাল লাগচে না।

 বাড়ি ফিরিয়া আসিয়া মাতাপুত্র উভয়েই দেখিলেন, ছাদের সেই যাতায়াতের পথটা বন্ধ করিয়া প্রাচীর উঠিয়াছে। গুরুচরণের সহিত আর কোন সম্পর্ক রাখা, এমন কি, মুখের আলাপ রাখাও যে কর্ত্তার অভিপ্রেত নয়, তাহা কাহাকেও না জিজ্ঞাসা করিয়াই উভয়ে বুঝিলেন।

 রাত্রে শেখরের আহারের সময় মা উপস্থিত ছিলেন, দুই একটা কথার পরে বলিলেন, ওদের গিরীনবাবুর সঙ্গেই ললিতার বিয়ে দেবার কথাবার্ত্তা হচ্চে। আমি তা আগেই বুঝেছিলাম।

 শেখর মুখ না তুলিয়াই জিজ্ঞাসা করিল, কে বললে?

 ওর মামি। দুপুর-বেলা কর্ত্তা ঘুমোলে আমি নিজেই গিয়ে দেখা করে এসেচি। সেই অবধি কেঁদে কেঁদে চোখ-মুখ ফুলিয়ে ফেললে। ক্ষণকাল মৌন থাকিয়া তিনি নিজের চোখ দুটি আঁচলে মুছিয়া ফেলিয়া বলিলেন, কপাল, শেখর, কপাল। এই কপালের লেখা কেউ খণ্ডাতে পারে না—কার আর দোষ দিই বল্! যাই হোক, গিরীন ছেলেটি ভাল, সঙ্গতিও আছে, ললিতার কষ্ট হবে না, বলিয়া চুপ করিলেন।

 প্রত্যুত্তরে শেখর কোন কথাই বলিল না—মুখ নীচু করিয়া খাবারগুলা হাত দিয়া নাড়া-চাড়া করিতে লাগিল। খানিক পরে মা উঠিয়া গেলে সেও উঠিয়া গিয়া হাত-মুখ ধুইয়া বিছানায় শুইয়া পড়িল।

* * * *

 পরদিন সন্ধ্যার পর একটুখানি ঘুরিয়া আসিবার জন্য সে পথে বাহির হইয়াছিল। তখন গুরুচরণের বাহিরের ঘরে প্রাত্যহিক চা-পানের সভা বসিয়াছিল এবং যথেষ্ট উৎসাহের সহিত হাসি এবং কথাবার্ত্তা চলিতেছিল। তথাকার কোলাহল শেখরের কানে যাইবামাত্র সে একবার স্থির হইয়া কি ভাবিল, তারপর ধীরে ধীরে বাড়ি ঢুকিয়া সেই শব্দ অনুসরণ করিয়া গুরুচরণের বাহিরের ঘরে আসিয়া দাঁড়াইল। তৎক্ষণাৎ কলরব থামিল এবং তাহার মুখের দিকে চাহিয়া সকলেরই মুখের ভাব পরিবর্ত্তিত হইয়া গেল।

 শেখর ফিরিয়া আসিয়াছিল এ সংবাদ ললিতা ছাড়া আর কেহ জানিত না। আজ গিরীন এবং আরও একজন ভদ্রলোক উপস্থিত ছিলেন, তিনি বিস্মিত-মুখে শেখরের প্রতি চাহিয়া রহিলেন এবং গিরীন মুখ অত্যন্ত গম্ভীর করিয়া দেওয়ালের দিকে তাকাইয়া রহিল। সর্ব্বাপেক্ষা অধিক চেঁচাইতে ছিলেন গুরুচরণ নিজে, তাঁহার মুখ একেবারে পাণ্ডুর হইয়া গেল। তাঁহার হাতের কাছে বসিয়া ললিতা তখনও চা তৈরি করিতেছিল, একবার মুখ তুলিয়া চাহিয়া মাথা হেঁট করিল।

 শেখর সরিয়া আসিয়া তক্তপোষের উপর মাথা ঠেকাইয়া প্রণাম করিল এবং একধারে বসিয়া পড়িয়া হাসিয়া বলিল, এ কি, একেবারে সমস্ত নিবে গেল যে!

 গুরুচরণ মৃদুকণ্ঠে বোধ করি আশীর্ব্বাদ করিলেন, কিন্তু কি বলিলেন বোঝা গেল না।

 তাঁহার মনের ভাব শেখর বুঝিল, তাই সময় দিবার জন্য নিজের কথা পাড়িল। কাল সকালের গাড়ীতে ফিরিয়া আসিবার কথা, জননীর রোগ উপশম হইবার কথা, পশ্চিমের কথা, আরও কত কি সংবাদ অনর্গল বকিয়া গিয়া শেষে সেই অপরিচিত যুবকটির মুখের দিকে চাহিল।

 গুরুচরণ এতক্ষণে নিজেকে কতকটা সামলাইয়া লইয়াছিলেন; ছেলেটির পরিচয় দিয়া বলিলেন, ইনি আমাদের গিরীনের বন্ধু। এক জায়গায় বাড়ি, একত্রে লেখাপড়া শেখা, অতি সৎ ছেলে— শ্যামবাজারে থাকেন, তবুও আমার সঙ্গে আলাপ হওয়া পর্য্যন্ত প্রায়ই এসে দেখা-সাক্ষাৎ করে যান।

 শেখর ঘাড় নাড়িয়া মনে মনে বলিল, হাঁ, খুব ভাল ছেলে। কতক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল, কাকা, আর সব খবর ভাল ত?

 গুরুচরণ জবাব দিলেন না, মাথা হেঁট করিয়া রহিলেন। শেখর উঠিবার উপক্রম করিতেই হঠাৎ কাঁদ কাঁদ স্বরে বলিয়া উঠিলেন, মাঝে মাঝে এসো, বাবা, একেবারে যেন ত্যাগ করো না। সব কথা শুনেচ ত?

 শুনিচি বৈকি, বলিয়া শেখর অন্দরের দিকে চলিয়া গেল।

 তার পরেই ভিতর হইতে গৃহিণীর কান্নার শব্দ উঠিল, বাহিরে বসিয়া গুরুচরণ হেঁটমুখে কোঁচার খুট দিয়া নিজের চোখের জল মুছিতে লাগিলেন এবং গিরীন অপরাধীর মত মুখ করিয়া জানালার বাহিরে চাহিয়া চুপ করিয়া রহিল। ললিতা পূর্ব্বেই উঠিয়া গিয়াছিল।

 কিছুক্ষণ পরে শেখর রান্নাঘর হইতে বাহির হইয়া বারান্দা পার হইয়া উঠানে নামিতে গিয়া দেখিল, অন্ধকার কপাটের আড়ালে ললিতা দাঁড়াইয়া আছে। সে ভূমিষ্ট হইয়া প্রণাম করিল এবং দাঁড়াইয়া উঠিয়া বুকের একান্ত সন্নিকটে সরিয়া আসিয়া মুখ তুলিয়া মুহূর্ত্তকাল নিঃশব্দে কি যেন আশা করিয়া রহিল, তার পর পিছাইয়া গিয়া চুপি চুপি বলিল, আমার চিঠির জবাব দিলে না কেন?

 কৈ, আমি ত চিঠি পাইনি—কি লিখেছিলে?

 ললিতা বলিল, অনেক কথা। সে যাক। সব শুনেচ ত, এখন তোমার কি হুকুম, তাই বল।

 শেখর বিস্ময়ের স্বরে কহিল, আমার হুকুম! আমার হুকুমে কি হবে?

 ললিতা শঙ্কিত হইয়া মুখপানে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিল, কেন?

 তা বই কি ললিতা। আমি কার ওপর হুকুম দেব?

 আমার ওপর, আর কার ওপর দিতে পার?

 তোমার ওপরেই বা দেব কেন? আর দিলেই বা তুমি শুনবে কেন? শেখরের কণ্ঠস্বর গম্ভীর, ঈষৎ করুণ।

 এবার ললিতা মনে মনে অত্যন্ত ভয় পাইয়া, আর একবার কাছে সরিয়া আসিয়া কাঁদ কাঁদ গলায় বলিল, যাও—এখন আমার তামাসা ভাল লাগছে না। পায়ে পড়ি কি হবে বল? ভয়ে রাত্তিরে আমার ঘুম হয় না।

 ভয় কিসের?

 বেশ যা হোক। ভয় হবে না, তুমি কাছে নেই, মা কাছে নেই, মাঝে থেকে মামা কি সব কাণ্ড করে বসলেন—এখন না যদি আমাকে ঘরে নিতে না চান?

 শেখর ক্ষণকাল চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল, সে সত্যি, মা নিতে চাইবেন না। তোমার মামা অপরের কাছে অনেক টাকা নিয়েছেন, সে কথা তিনি শুনেচেন। তা ছাড়া এখন তোমরা ব্রাহ্ম আমরা হিন্দু।

 আন্নাকালী এই সময়ে রান্নাঘর হইতে ডাক দিল, সেজদি, মা ডাকচেন।

 ললিতা চেঁচাইয়া বলিল, যাচ্ছি, তার পর গলা খাট করিয়া বলিল, মা যাই হোন, তুমি যা আমিও তাই। মা তোমাকে যদি ফেলতে না পারেন, আমাকেও ফেলবেন না। আর গিরীনবাবুর কাছে টাকা নেবার কথা বলচ—তা সে আমি ফিরিয়ে দেব। আর ঋণের টাকা দুদিন আগেই হোক, পিছনেই হোক দিতেই ত হবে।

 শেখর প্রশ্ন করিল, অত টাকা পাবে কোথায়?

 ললিতা শেখরের মুখের পানে একটিবার চোখ তুলিয়া মুহূর্ত্তকাল মৌন থাকিয়া বলিল, জান না, মেয়েমানুষে কোথায় টাকা পায়? আমিও সেইখানে পাব।

 এতক্ষণ শেখর সংযত হইয়া কথা কহিতে থাকিলেও ভিতরে পুড়িতেছিল, এবার বিদ্রূপ করিয়া বলিল, কিন্তু তোমার মামা তোমাকে বিক্রি করে ফেলেচেন যে!

 ললিতা অন্ধকারে শেখরের মুখের ভাব দেখিতে পাইল না, কিন্তু কণ্ঠস্বরের পরিবর্ত্তন টের পাইল। সে দৃঢ়স্বরে জবাব দিল, ও-সব মিছে কথা। আমার মামার মত মানুষ সংসারে নেই—তাঁকে তুমি ঠাট্টা ক’রো না। তাঁর দুঃখ-কষ্ট তুমি না জানতে পার, কিন্তু পৃথিবী-সুদ্ধ লোক জানে, বলিয়া একবার ঢোক গিলিয়া, একবার ইতস্ততঃ করিয়া শেষে বলিল, তা ছাড়া তিনি টাকা নিয়েচেন, আমার বিয়ে হবার পরে, সুতরাং আমাকে বিক্রি করবার অধিকার তাঁর নেই, বিক্রিও করেননি। এ অধিকার আছে শুধু তোমারি, তুমি ইচ্ছে করলে টাকা দেবার ভয়ে আমাকে বিক্রি করে ফেলতে পার বটে! বলিয়া উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করিয়াই দ্রুতপদে চলিয়া গেল।