বিষয়বস্তুতে চলুন

শরৎ-সাহিত্য-সংগ্রহ (পঞ্চম সম্ভার)/পরিণীতা/চতুর্থ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

 এ-পাড়ার একজন অতিবৃদ্ধ ভিক্ষুক মাঝে মাঝে ভিক্ষা করিতে আসিত, তাহার উপর ললিতার বড় দয়া ছিল, আসিলেই তাহাকে একটি করিয়া টাকা দিত। টাকাটি হাতে পাইয়া সে যে সমস্ত অপূর্ব্ব এবং অসম্ভব আশীর্ব্বাদ উচ্চারণ করিতে থাকিত, সেইগুলি শুনিতে সে অতিশয় ভালবাসিত। সে বলিত, ললিতা পূর্ব্বজন্মে তাহার আপনার মা ছিল, এবং ইহা সে ললিতাকে দেখিবামাত্রই কেমন করিয়া চিনিতে পারিয়াছিল। সেই বুড়া ছেলেটি তাহার আজ সকালেই দ্বারে আসিয়া উচ্চকণ্ঠে ডাক দিল, আমার মা-জননী কোথায় গো?

 সন্তানের আহ্বানে আজ ললিতা কিছু বিব্রত হইয়া পড়িল। এখন শেখর ঘরে আছে, সে টাকা আনিতে যায় কিরূপে? এদিক সেদিক চাহিয়া মামির কাছে গেল। মামি এইমাত্র ঝির সহিত বকাবকি করিয়া বিরক্ত-মুখে রাঁধিতে বসিয়াছিলেন, তাঁহাকে কিছু না বলিতে পারিয়া সে ফিরিয়া মুখ বাড়াইয়া দেখিল, ভিক্ষুক দোরগোড়ায় লাঠিটি ঠেস দিয়া রাখিয়া বেশ চাপিয়া বসিয়াছে। ইতিপূর্ব্বে ললিতা কখনও তাহাকে নিরাশ করে নাই, আজ শুধু-হাতে ফিরাইয়া দিতে তাহার মন সরিল না।

 ভিক্ষুক আবার ডাক দিল।

 আন্নাকালী ছুটিয়া আসিয়া সংবাদ দিল, সেজদি, তোমার সেই ছেলে এসেচে।

 ললিতা বলিল, কালী, একটা কাজ কর না ভাই। আমার হাত জোড়া, তুই একটিবার ছুটে গিয়ে শেখরদার কাছ থেকে একটি টাকা নিয়ে আয়।

 কালী ছুটিয়া চলিয়া গেল, খানিক পরে তেমনি ছুটিয়া আসিয়া ললিতার হাতে একটা টাকা দিয়া বলিল, এই নাও।

 ললিতা জিজ্ঞাসা করিল, শেখরদা কি বললে রে?

 কিছু না। আমাকে বললে চাপকানের পকেট থেকে নিতে, আমি নিয়ে এলুম।

 আর কিছু বললে না?

 না, আর কিচ্ছু না, বলিয়া আন্নাকালী ঘাড় নাড়িয়া খেলা করিতে চলিয়া গেল।;

 ললিতা ভিক্ষুক বিদায় করিল; কিন্তু অন্য দিনের মত দাঁড়াইয়া থাকিয়া তাহার বাক্যচ্ছটা শুনিতে পারিল না—ভালই লাগিল না।

 এ-কয়দিন তাহাদের আড্ডা পূর্ণ-তেজে চলিতেছিল, আজ দুপুরবেলা ললিতা গেল না, মাথা ধরিয়াছে বলিয়া শুইয়া রহিল। আজ সত্য-সত্যই তাহার ভারি মন খারাপ হইয়া গিয়াছিল। বিকালবেলা কালীকে কাছে ডাকিয়া বলিল, কালী তুই পড়া বলে নিতে শেখরদার ঘরে আর যাস্‌নে?

 কালী মাথা নাড়িয়া বলিল, হাঁ যাই ত?

 আমার কথা শেখরদা জিজ্ঞেস করে না?

 না। হাঁ হাঁ, পরশু করেছিল—তুমি দুপুর-বেলা তাস খেল কি না?

 ললিতা উদ্বিগ্ন হইয়া প্রশ্ন করিল, তুই কি বললি?

 কালী বলিল, তুমি দুপুরবেলা চারুদিদিদের বাড়ি তাস খেলতে যাও, তাই বললুম। শেখরদা বললে, কে কে খেলে? আমি বললুম, তুমি আর সইমা, চারুদিদি আর তার মামা, আচ্ছা, তুমি ভাল খেলো, না চারুদিদির মামা ভাল খেলে সেজদি? সইমা বলে তুমি ভালো খেলো, না?

 ললিতা সে কথার জবাব না দিয়া হঠাৎ অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া বলিল, তুই অত কথা বলতে গেলি কেন? সব কথায় তোর কথা কওয়া চাই, আর কোন দিন তোকে আমি কিচ্ছু দেব না, বলিয়া রাগ করিয়া চলিয়া গেল।

 কালী অবাক্‌ হইয়া গেল। তাহার এই আকস্মিক ভাবপরিবর্ত্তনের হেতু সে কিছুই বুঝিল না।

 মনোরমার তাস খেলা দুদিন বন্ধ হইয়াছে—ললিতা আসে না। তাহাকে দেখিয়া অবধি গিরীন যে আকৃষ্ট হইয়াছিল, তাহা প্রথম হইতেই মনোরমা সন্দেহ করিয়াছিলেন, তাঁহার সেই সন্দেহ আজ সুদৃঢ় হইল।

 এই দুই দিন গিরীন কি এক রকম উৎসুক ও অন্যমনস্ক হইয়াছিল। অপরাহ্ণে বেড়াইতে যাইত না, যখন তখন বাড়ির ভিতরে আসিয়া এঘর-ওঘর করিত, আজ দুপুরবেলা আসিয়া বলিল, দিদি, আজও খেলা হবে না?

 মনোরমা বলিলেন, কি করে হবে গিরীন, লোক কৈ? না হয়, আয় আমরা তিনজনেই খেলি।

 গিরীন নিরুৎসাহভরে বলিল, তিনজনে খেলা হয় দিদি? ও-বাড়ির ললিতাকে একবার ডাকতে পাঠাও না।

 সে আসবে না।

 গিরীন বিমর্ষ হইয়া কহিল, কেন আসবে না, ওদের বাড়িতে মানা করে দিয়েচে বোধ হয়, না?

 মনোরমা ঘাড় নাড়িয়া বলিলেন, না, ওর মামা-মামি সে-রকম মানুষ নয়—সে নিজেই আসে না।

 গিরীন হঠাৎ খুসি হইয়া বলিল, তা হলে তুমি নিজে আর একবার গেলেই আসবে, কথাটা বলিয়া ফেলিয়া সে নিজের মনেই ভারি অপ্রতিভ হইয়া গেল।

 মনোরমা হাসিয়া ফেলিলেন—আচ্ছা তাই যাই, বলিয়া চলিয়া গেলেন এবং খানিক পরে ললিতাকে ধরিয়া আনিয়া তাস পাড়িয়া বসিলেন।

 দুদিন খেলা হয় নাই, আজ অল্প সময়ের মধ্যেই বেশ জমিয়া গেল। ললিতারা জিতিতেছিল।

 ঘণ্টা-দুই পরে সহসা কালী আসিয়া দাঁড়াইয়াই বলিল, সেজদি, শেখরদা ডাকচেন—জলদি!

 ললিতার মুখ পাণ্ডুর হইয়া গেল, তাস-দেওয়া বন্ধ করিয়া বলিল, শেখরদা আফিসে যাননি?

 কি জানি, চলে এসেচেন, বলিয়া সে ঘাড় নাড়িয়া প্রস্থান করিল।

 ললিতা তাস রাখিয়া দিয়া মনোরমার মুখপানে চাহিয়া কুণ্ঠিতভাবে বলিল, যাই সইমা।

 মনোরমা তাহার হাত ধরিয়া বলিলেন, সে কিরে, আর দুহাত দেখে যা!

 ললিতা ব্যস্ত হইয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, না সইমা, ইনি তা হলে বড় রাগ করবেন, বলিয়া দ্রুতপদে চলিয়া গেল।

 গিরীন প্রশ্ন করিল, শেখরদা আবার কে দিদি?

 মনোরমা বলিলেন, ঐ যে সুমুখের ফটকওয়ালা বাড়িটা।

 গিরীন ঘাড় নাড়িয়া বলিল, ও—ওই বাড়ির নবীনবাবু ওঁদের আত্মীয় বুঝি?

 মনোরমা মেয়ের মুখের পানে চাহিয়া একটুখানি হাসিয়া বলিলেন, আত্মীয় কেমন? ললিতাদের ঐ ভিটেটুকু পর্য্যন্ত বুড়ো আত্মসাৎ করবার ফিকিরে আছেন। গিরীন আশ্চর্য্য হইয়া চাহিয়া রহিল।

 মনোরমা তখন গল্প করিতে লাগিলেন, কেমন করিয়া গত বৎসর টাকার অভাবে গুরুচরণবাবুর সেজ মেয়ের বিবাহ হইতেছিল না, পরে অসম্ভব সুদে নবীন রায় টাকা ধার দিয়া বাড়িখানি বাঁধা রাখিয়াছেন। এ টাকা কোন দিন শোধ হইবে না এবং অবশেষে বাড়িটা নবীন রায়ই গ্রহণ করিবেন।

 মনোরমা সমস্ত কথা বলিয়া পরিশেষে মন্তব্য প্রকাশ করিলেন, বুড়ার আন্তরিক ইচ্ছা গুরুচরণবাবুর ভাঙা বাড়িটি ভাঙিয়া ফেলিয়া ঐখানে ছোট ছেলে শেখরের জন্যে একটি বড় রকমের বাড়ি তৈরি করেন—দুই ছেলের দুই আলাদা বাড়ি—মতলব মন্দ নয়।

 ইতিহাস শুনিয়া গিরীনের ক্লেশ বোধ হইতেছিল, জিজ্ঞাসা করিল, আচ্ছা দিদি, গুরুচরণবাবুর আরও ত মেয়ে আছে, তাদেরি বা বিয়ে কি করে দেবেন?

 মনোরমা বলিলেন, নিজের ত আছেই, তা ছাড়া ললিতা। ওর বাপ-মা নেই, সমস্ত ভার ঐ গরীবের ওপর। বড় হয়ে উঠেচে, এই বছরের মধ্যে বিয়ে না দিলেই নয়। ওদের সমাজে সাহায্য করতে কেউ নেই, জাত নিতে সবাই আছে—আমরা বেশ আছি গিরীন।

 গিরীন চুপ করিয়া রহিল, তিনি বলিতে লাগিলেন, সেদিন ললিতার কথা নিয়েই ওর মামি আমার কাছে কেঁদে ফেললে—কি করে যে কি হবে তার কিছুই স্থির নেই—ওর ভাবনা ভেবেই গুরুচরণবাবুর পেটে অন্ন-জল যায় না—হাঁ গিরীন, মুঙ্গেরে তোদের কোন বন্ধু-বান্ধব এমন নেই যে, শুধু মেয়ে দেখে বিয়ে করে? অমন মেয়ে কিন্তু পাওয়া শক্ত।

 গিরীন বিষণ্ণভাবে মৃদু হাসিয়া বলিল, বন্ধু-বান্ধব আর পাব কোথায় দিদি, তবে টাকা দিয়ে আমি সাহায্য করতে পারি।

 গিরীনের পিতা ডাক্তারি করিয়া অনেক টাকা এবং বিষয়-সম্পত্তি রাখিয়া গিয়াছেন, সে সমস্তরই এখন সে মালিক।

 মনোরমা বলিলেন, টাকা তুই ধার দিবি?

 ধার আর কি দেব দিদি—ইচ্ছে হয়, উনি শোধ দেবেন, না হয় নাই দেবেন।

 মনোরমা বিস্মিত হইলেন। বলিলেন, তোর টাকা দিয়ে লাভ? ওরা আমাদের আত্মীয়ও নয়, সমাজের লোকও নয়—এমনি কে কাকে টাকা দেয়?

 গিরীন তাহার বোনের মুখের পানে চাহিয়া হাসিতে লাগিল, তার পরে কহিল, সমাজের লোক নাই হলেন, বাঙ্গালী ত? ওঁর একান্ত অভাব, আর আমার বিস্তর রয়েচে—তুমি একবার বলে দেখো না দিদি, উনি যদি নিতে রাজি হন আমি দিতে পারি। ললিতা তাঁদেরও কেউ নয়, আমাদেরও কেউ নয়—তার বিয়ের সমস্ত খরচ না হয় আমিই দেব।

 তাহার কথা শুনিয়া মনোরমা বিশেষ সন্তুষ্ট হইলেন না। ইহাতে তাঁহার নিজের ক্ষতিবৃদ্ধি কিছুই নাই বটে, তথাপি এত টাকা একজন আর একজনকে দিতেছে দেখিলে অনেক স্ত্রীলোকই প্রসন্ন-চিত্তে গ্রহণ করিতে পারে না।

 চারু এতক্ষণ চুপ করিয়া শুনিতেছিল, সে মহা খুসী হইয়া লাফাইয়া উঠিল, বলিল, তাই দাও মামা, আমি সইমাকে বলে আসচি।

 তাহার মা ধমক দিয়া বলিলেন, তুই থাম্ চারু, ছেলেমানুষ এ-সব কথায় থাকিস্‌নে। বলতে হয় আমিই বলব।

 গিরীন কহিল, তাই ব’লো দিদি। পরশু রাস্তার উপর দাঁড়িয়েই গুরুচরণবাবুর সঙ্গে একটুখানি আলাপ হয়েছিল, কথায়-বার্ত্তায় মনে হ’ল—বেশ সরল লোক; তুমি কি বল?

 মনোরমা বলিলেন, আমিও তাই বলি, সবাই তাই বলে। ওঁরা স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই বড় সাদা-সিদে মানুষ! সেই জন্যই ত দুঃখ হয় গিরীন, অমন লোকটিকে হয়ত বাড়ি-ঘর ছেড়ে নিরাশ্রয় হতে হবে। তার সাক্ষী দেখলিনে গিরীন, শেখরবাবু ডাকচেন বলতেই ললিতা কি-রকম তাড়াতাড়ি উঠে পালালো; বাড়ি-সুদ্ধ লোক ওদের কাছে যেন বিক্রি হয়ে আছে। কিন্তু যত খোসামোদই করুক না কেন, নবীন রায়ের হাতে গিয়ে একবার যখন পড়েচে রেহাই পাবে এ ভরসা কেউ করে না।

 গিরীন জিজ্ঞাসা করিল, তা হলে বলবে ত দিদি?

 আচ্ছা, জিজ্ঞাসা করব। দিয়ে যদি তুই উপকার করতে পারিস্, ভালই ত। বলিয়াই একটুখানি হাসিয়া বলিলেন, আচ্ছা, তোরই বা এত চাড় কেন গিরীন?

 চাড় আর কি দিদি, দুঃখে-কষ্টে পরস্পরের সাহায্য করতেই হয়, বলিয়া সে ঈষৎ সলজ্জ-মুখে প্রস্থান করিল। দ্বারের বাহিরে গিয়াই আবার ফিরিয়া আসিয়া বসিল।

 তাহার দিদি বলিলেন, আবার বসলি যে?

 গিরীন হাসিমুখে বলিল, অত যে কাঁদুনি গাইলে দিদি, হয়ত সব সত্যি নয়।

 মনোরমা বিস্মিত হইয়া বলিলেন, কেন?

 গিরীন বলিতে লাগিল, ওদের ললিতা যে-রকম টাকা খরচ করে, সে ত দুঃখীর মত মোটেই নয় দিদি! সেদিন আমরা থিয়েটার দেখতে গেলুম, ও নিজে গেল না, তবু দশ টাকা ওর বোনকে দিয়ে পাঠিয়ে দিলে। চারুকে জিজ্ঞেস কর না, কিরকম খরচ করে; মাসে কুড়ি-পঁচিশ টাকার কম ওর নিজের খরচই চলে না যে।

 মনোরমা বিশ্বাস করিলেন না।

 চারু বলিল, সত্যি মা। ও-সব শেখরবাবুর টাকা, শুধু এখন নয়, ছেলেবেলা থেকে ও-ই শেখরদার আলমারি খুলে টাকা নিয়ে আসে—কেউ কিছু বলে না।

 মনোরমা মেয়ের দিকে চাহিয়া সন্দিগ্ধভাবে জিজ্ঞাসা করিলেন, টাকা আনে শেখরবাবু জানেন?

 চারু মাথা নাড়িয়া বলিল, জানেন, সুমুখেই চাবি খুলে নিয়ে আসে। গেল মাসে আন্নাকালীর পুতুলের বিয়েতে অত টাকা কে দিলে? সবই ত সই দিলে।

 মনোরমা ভাবিয়া বলিলেন, কি জানি। কিন্তু এ কথাও ঠিক বটে, বুড়োর মত ছেলেরা চামার নয়—ওরা সব মায়ের ধাত পেয়েচে—তাই দয়া-ধর্ম্ম আছে। তা ছাড়া, ললিতা মেয়েটি খুব ভাল, ছেলেবেলা থেকে কাছে কাছে থাকে, দাদা বলে ডাকে; তাই ওকে মায়া-মমতাও সবাই করে। হাঁ চারু, তুই ত যাওয়া-আসা করিস্, ওদের শেখরের এই মাঘ মাসে নাকি বিয়ে হবে? শুনেচি, বুড়ো অনেক টাকা পাবে।

 চারু বলিল, হাঁ মা, এই মাঘ মাসেই হবে—সব ঠিক হয়ে গেছে।