শরৎ-সাহিত্য-সংগ্রহ (পঞ্চম সম্ভার)/পরিণীতা/তৃতীয় পরিচ্ছেদ
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
চারুবালার মা মনোরমার তাস খেলার চেয়ে প্রিয় বস্তু আর কিছুই ছিল না। কিন্তু খেলার ঝোঁক যতটা ছিল দক্ষতা ততটা ছিল না। তাঁহার এই ত্রুটি শুধরাইয়া যাইত ললিতাকে পাইলে। সে খুব ভাল খেলিতে পারিত। মনোরমার মামাত ভাই গিরীন আসা পর্য্যন্ত এ কয়দিন সমস্ত দুপুর-বেলা তাঁহার ঘরে তাসের বিরাট আড্ডা বসিতেছিল। গিরীন পুরুষমানুষ, খেলে ভাল, সুতরাং তার বিপক্ষে বসিতে গেলে মনোরমার ললিতাকে চাই-ই।
থিয়েটার দেখার পরের দিন যথাসময়ে ললিতা উপস্থিত হইল না দেখিয়া মনোরমা ঝিকে পাঠাইয়া দিলেন। ললিতা তখন একটা মোটা খাতায় একখানা ইংরাজী বই হইতে বাঙ্গলা তর্জ্জমা করিতেছিল, গেল না।
তাহার সই আসিয়াও কিছু করিতে পারিল না, তখন মনোরমা নিজে আসিয়া তাহার খাতাপত্র একদিকে টান মারিয়া সরাইয়া দিয়া বলিলেন, নে, ওঠ। বড় হয়ে তোকে জজিয়তি করতে হবে না, বরং তাস খেলতেই হবে—চল্।
ললিতা মনে মনে অত্যন্ত বিপদগ্রস্ত হইয়া কাঁদ কাঁদ হইয়া জানাইল, আজ তাহার কিছুতেই যাইবার যো নাই, বরং কাল যাইবে। মনোরমা কিছুতেই শুনিলেন না, অবশেষে মামিমাকে জানাইয়া তুলিয়া লইয়া গেলেন। সুতরাং তাহাকে আজও গিয়া গিরীনের বিপক্ষে বসিয়া তাস খেলিতে হইল। কিন্তু খেলা জমিল না। এদিকে সে এতটুকু মন দিতে পারিল না। সমস্ত সময়টা আড় হইয়া রহিল এবং বেলা না পড়িতেই উঠিয়া পড়িল। যাইবার সময় গিরীন বলিল, রাত্রে আপনি টাকা পাঠিয়ে দিলেন কিন্তু গেলেন না, কাল আবার যাই চলুন।
ললিতা মাথা নাড়িয়া মৃদুকণ্ঠে বলিল, না, আমার বড় অসুখ করেছিল।
গিরীন হাসিয়া বলিল, এখন ত অসুখ সেরেচে, চলুন কাল যেতে হবে।
না না, কাল আমার সময় হবে না, বলিয়া ললিতা দ্রুতপদে প্রস্থান করিল। আজ শুধু যে শেখরের ভয়ে তাহার খেলায় মন লাগে নাই, তাহা নহে, তাহার নিজেরও ভারি লজ্জা করিতেছিল।
শেখরের বাটির মত, এই বাটিতেও সে ছেলে বেলা হইতে আসা-যাওয়া করিয়াছে এবং ঘরের লোকের মতই সকলের সুমুখে বাহির হইয়াছে। তাই চারুর মামার সুমুখেও বাহির হইতে, কথা বলিতে, প্রথম হইতেই তাহার কোনও দ্বিধা হয় নাই। কিন্তু আজ গিরীনের সুমুখে বসিয়া সমস্ত খেলার সময়টা কেমন করিয়া যেন তাহার কেবলি মনে হইতেছিল, এই কয়দিনের পরিচয়েই গিরীন তাহাকে একটু বিশেষ প্রীতির চোখে দেখিতেছে। পুরুষের প্রীতির চক্ষু যে এত বড় লজ্জার বস্তু, তাহা সে ইতিপূর্ব্বে কল্পনাও করে নাই।
বাড়িতে একবার দেখা দিয়াই সে তাড়াতাড়ি ও-বাড়িতে শেখরের ঘরে গিয়া ঢুকিল এবং একেবারে কাজে লাগিয়া গেল। ছেলে-বেলা হইতে এ-ঘরের ছোটোখাটো কাজগুলি তাহাকেই করিতে হইত। বই প্রভৃতি গুছাইয়া তুলিয়া রাখা, টেবিল সাজাইয়া দেওয়া, দোয়াত কলম ঝাড়িয়া মুছিয়া ঠিক করিয়া রাখা, এ সমস্ত না করিলে আর কেহ করিত না। ছয়-সাত দিনের অবহেলায় অনেক কাজ জমিয়া গিয়াছিল, সেই সমস্ত ত্রুটি সে শেখরের ফিরিয়া আসিবার পূর্ব্বেই নিঃশেষ করিয়া ফেলিতে কোমর বাঁধিয়া লাগিয়া গেল।
ললিতা সময় পাইলেই কাছে কাছে থাকিত এবং সে নিজে কাহাকেও পর মনে করিত না বলিয়া এ-বাড়িতে তাহাকেও কেহ পর মনে করিত না। আট বছর বয়সে মা-বাপ হারাইয়া মামার বাড়িতে প্রবেশ করিয়াছিল, তখন হইতে সে ছোট বোনটির মত শেখরের আশেপাশে ঘুরিয়া তাহার কাছে লেখাপড়া শিখিয়া মানুষ হইতেছে।
সে যে শেখরের বিশেষ স্নেহের পাত্রী তাহা সবাই জানিত, শুধু সেই স্নেহ যে এখন কোথায় উঠিয়াছে, তাহাই কেহ জানিত না, ললিতাও না। শিশুকাল হইতে শেখরের কাছে তাহাকে একইভাবে এত অপর্য্যাপ্ত আদর পাইতে সবাই দেখিয়া আসিয়াছে যে, আজ পর্য্যন্ত তাহার কোন আদরই কাহার চোখে বিসদৃশ বোধ হয় না, কিংবা কোন ব্যবহারই কাহারো দৃষ্টি আকর্ষণ করে না। করে না বলিয়াই সে যে কোনও দিন বধূরূপে এই গৃহে প্রতিষ্ঠিত হইতে পারে, সে সম্ভাবনাও কাহারও মনে উদয় হয় নাই। ললিতাদের বাড়িতেও হয় নাই, ভুবনেশ্বরীর মনেও হয় নাই।
ললিতা ভাবিয়া রাখিয়াছিল কাজ শেষ করিয়া শেখর আসিবার পূর্ব্বেই চলিয়া যাইবে, কিন্তু অন্যমনস্ক ছিল বলিয়া ঘড়ির দিকে নজর করে নাই। হঠাৎ দ্বারের বাহিরে জুতার মস্ মস্ শব্দ শুনিয়া মুখ তুলিয়াই একপাশে সরিয়া দাঁড়াইল।
শেখর ঘরে ঢুকিয়াই বলিল, এই যে! কাল তা হলে ফিরতে কত রাত হ’ল?
ললিতা জবাব দিল না।
শেখর একটা গদি-আঁটা আরাম-চৌকির উপর হেলান দিয়া শুইয়া পড়িয়া বলিল, ফেরা হ’ল কখন? দুটো? তিনটে? মুখে কথা নেই কেন?
ললিতা তেমনি চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল।
শেখর বিরক্ত হইয়া বলিল, নীচে যাও, মা ডাকচেন।
ভুবনেশ্বরী ভাঁড়ারের সুমুখে বসিয়া জলখাবার সাজাইতেছিলেন, ললিতা কাছে আসিয়া বলিল, ডাকছিলে মা?
কৈ ডাকিনি ত, বলিয়া তিনি মুখ তুলিয়া তাহার মুখের পানে চাহিয়া বলিলেন, মুখখানি এমন শুকনো কেন ললিতে? কিছু খাস্নি বুঝি এখনো?
ললিতা ঘাড় নাড়িল।
ভুবনেশ্বরী বলিলেন, আচ্ছা যা তোর দাদাকে খাবার দিয়ে আমার কাছে আয়। ললিতা খাবার হাতে করিয়া খানিক পরে উপরে আসিয়া দেখিল, তখনো শেখর তেমনিভাবে চোখ বুজিয়া পড়িয়া আছে, আফিসের পোষাকও ছাড়ে নাই, হাতমুখ ধোয় নাই। কাছে আসিয়া আস্তে আস্তে বলিল, খাবার এনেচি।
শেখর চাহিয়া দেখিল না। বলিল, কোথাও রেখে দিয়ে যাও।
ললিতা রাখিয়া দিল না, হাতে করিয়া চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল।
শেখর না চাহিয়াও বুঝিতেছিল, ললিতা যায় নাই দাঁড়াইয়া আছে, মিনিট-দুই-তিন নিঃশব্দে থাকিয়া বলিল, কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে ললিতা, আমার দেরি আছে, রেখে নীচে যাও।
ললিতা চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া মনে মনে রাগিতেছিল, মৃদু-স্বরে বলিল, থাক্ দেরি, আমারো নীচে কোন কাজ নেই।
শেখর চোখ চাহিয়া হাসিয়া বলিল, এই যে কথা বেরিয়েচে! নীচে কাজে না থাকে ও বাড়িতে আছে ত? তাও না থাকে তার পরের বাড়িতেও আছে ত? বাড়ি ত তোমার একটি নয় ললিতে!
নয়ই ত! বলিয়া রাগ করিয়া ললিতা খাবারের থালাটা দুম্ করিয়া টেবিলে রাখিয়া দিয়া হন্ হন্ করিয়া বাহির হইয়া গেল।
শেখর চেঁচাইয়া বলিল, সন্ধ্যের পরে একবার এসো।
একশবার আমি ওপর-নীচে করতে পারিনে, বলিয়া ললিতা চলিয়া গেল।
নীচে আসিবামাত্রই মা বলিলেন, দাদাকে তোর খাবার দিয়ে এলি, পান দিয়ে এলিনে রে!
আমার ক্ষিদে পেয়েচে মা, আমি আর পারিনে, আর কেউ দিয়ে আসুক, বলিয়া ললিতা বসিয়া পড়িল।
মা তাহার রুষ্ট মুখের পানে চাহিয়া একটুখানি হাসিয়া বলিলেন, আচ্ছা, তুই খেতে বোস্, ঝিকে পাঠিয়ে দিচ্চি।
ললিতা প্রত্যুত্তর না করিয়া খাইতে বসিয়া গেল।
সে থিয়েটার দেখিতে যায় নাই—তবু শেখর তাহাকে বকিয়াছিল, এই রাগে সে চার-পাঁচ দিন শেখরকে দেখা দেয় নাই, অথচ সে আফিসে চলিয়া গেলে দুপুর-বেলা গিয়া ঘরের কাজ করিয়া দিত। শেখর নিজের ভুল বুঝিতে পারিয়া তাহাকে দুদিন ডাকিয়া পাঠাইয়াছিল, তথাপি সে যায় নাই।