বিষয়বস্তুতে চলুন

শরৎ-সাহিত্য-সংগ্রহ (পঞ্চম সম্ভার)/পরিণীতা/দ্বাদশ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

দ্বাদশ পরিচ্ছেদ

 শেখর মাকে লইয়া যখন ফিরিয়া আসিল, তখনও তাহার বিবাহের দশ-বারো দিন বিলম্ব ছিল।

 দিন-তিনেক পরে, একদিন সকালে ললিতা শেখরের মায়ের কাছে বসিয়া একটা ডালায় কি কতকগুলা তুলিতেছিল। শেখর জানিত না, তাই কি একটা কাজে ‘মা’ বলিয়া ঘরে ঢুকিয়াই হঠাৎ থতমত খাইয়া দাঁড়াইল। ললিতা মুখ নীচু করিয়া কাজ করিতে লাগিল।

 মা জিজ্ঞাসা করিলেন, কি রে?

 সে যেমন আসিয়াছিল, তাহা ভুলিয়া গিয়া, না, এখন থাক্, বলিয়া তাড়াতাড়ি বাহির হইয়া গেল। ললিতার মুখ দেখিতে পায় নাই, কিন্তু তাহার হাত দুইটির উপর তাহার দৃষ্টি পড়িয়াছিল। তাহা সম্পূর্ণ নিরাভরণ না হইলেও দুগাছি করিয়া কাঁচের চুড়ি ছাড়া আর কিছু ছিল না। শেখর মনে মনে ক্রূর হাসি হাসিয়া বলিল, এ আর এক রকমের ভড়ং। গিরীন সঙ্গতিপন্ন তাহা সে জানিত, তাঁহার পত্নীর হাত এরূপ অলঙ্কারশূন্য হইবার কোন সঙ্গত হেতু সে খুঁজিয়া পাইল না।

 সেই দিনই সন্ধ্যার সময় সে দ্রুতপদে নীচে নামিয়া আসিতেছিল, ললিতাও সেই সিঁড়িতে উপরে উঠিতেছিল, অত্যন্ত সঙ্কোচের সহিত মৃদুকণ্ঠে বলিল, তোমাকে একটা কথা বলবার আছে।

 শেখর এক মুহূর্ত্ত স্থির হইয়া বিস্ময়ের স্বরে বলিল, কাকে? আমাকে?

 ললিতা তেমনি মৃদুস্বরে বলিল, হাঁ তোমাকে।

 আমার সঙ্গে আবার কি কথা! বলিয়া শেখর পূর্ব্বাপেক্ষা দ্রুতপদে নামিয়া গেল।

 ললিতা সেইখানে কিছুক্ষণ স্তব্ধভাবে দাঁড়াইয়া থাকিয়া অতি ক্ষুদ্র একটা নিশ্বাস, ফেলিয়া ধীরে ধীরে চলিয়া গেল।

 পরদিন সকালে শেখর তাহার বাহিরের ঘরে বসিয়া সেই দিনের সংবাদপত্র পড়িতেছিল, নিরতিশয় বিস্ময়ের সহিত চোখ তুলিয়া দেখিল, গিরীন প্রবেশ করিতেছে। গিরীন নমস্কার করিয়া নিকটে চৌকি টানিয়া লইয়া বসিল, শেখর প্রতি-নমস্কার করিয়া সংবাদপত্রটা একপাশে রাখিয়া দিয়া জিজ্ঞাসুমুখে চাহিয়া রহিল। উভয়ের চোখের পরিচয় ছিল বটে, কিন্তু আলাপ ছিল না এবং সে-পক্ষে আজ পর্য্যন্ত দুজনের কেহই কিছুমাত্র আগ্রহ প্রকাশ করে নাই।

 গিরীন একেবারেই কাজের কথা পাড়িল। বলিল, বিশেষ প্রয়োজনে আপনাকে একটু বিরক্ত করতে এসেচি। আমার শাশুড়ীঠাকরুণের অভিপ্রায় আপনি শুনেচেন—বাড়িটা তিনি আপনাদের কাছে বিক্রি করে ফেলতে চান। আজ আমাকে দিয়ে বলে পাঠালেন, শীঘ্র যা হোক একটা বন্দোবস্ত হয়ে গেলেই তাঁরা এই মাসেই মুঙ্গেরে ফিরে যেতে পারেন।

 গিরীনকে দেখিবামাত্রই শেখরের বুকের মধ্যে ঝড় উঠিয়াছিল, কথাগুলা তাহার কিছুমাত্র ভাল লাগিল না, অপ্রসন্ন-মুখে বলিল, সে ত ঠিক কথা, কিন্তু বাবার অবর্ত্তমানে দাদাই এখন মালিক, তাঁকে বলা আবশ্যক।

 গিরীন মৃদু হাসিয়া বলিল, সে আমরাও জানি। কিন্তু তাঁকে আপনি বললেই ত ভাল হয়।

 শেখর তেমনিভাবেই জবাব দিল, আপনি বললেও হতে পারে। ও-পক্ষের অভিভাবক এখন আপনিই।

 গিরীন কহিল, আমার বলবার আবশ্যক হলে বলতে পারি; কিন্তু কাল সেজদি বলছিলেন, আপনি একটু মনোযোগ করলে অতি সহজেই হতে পারে।

 শেখর মোটা তাকিয়াটা হেলান দিয়া বসিয়া এতক্ষণ কথা কহিতেছিল, সোজা হইয়া উঠিয়া বসিয়া বলিল, কে বললেন?

 গিরীন বলিল, সেজদি—ললিতাদিদি বলছিলেন—

 শেখর বিস্ময়ে হতবুদ্ধি হইয়া গেল। তারপর গিরীন কি যে বলিয়া গেল, তাহার একবিন্দুও তাহার কানে গেল না। খানিকক্ষণ বিহ্বল-দৃষ্টিতে তাহার মুখপানে চাহিয়া থাকিয়া বলিয়া উঠিল, আমাকে মাপ করবেন গিরীনবাবু, কিন্তু ললিতার সঙ্গে কি আপনার বিবাহ হয়নি?

 গিরীন জিভ কাটিয়া বলিল, আজ্ঞে না—ওদের সকলকেই আপনি জানেন—কালীর সঙ্গে আমার—

 কিন্তু সে-রকম ত কথা ছিল না।

 গিরীন ললিতার মুখে সব কথা শুনিয়াছিল, কহিল, না, কথা ছিল না, সে কথা সত্য। গুরুচরণবাবু মৃত্যুকালে আমাকে অনুরোধ করে গিয়েছিলেন আমি আর কোথাও যেন বিবাহ না করি। আমিও প্রতিশ্রুত হই। তাঁর মৃত্যুর পরে সেজদি আমাকে বুঝিয়ে বলেন,—অবশ্য, এসব কথা আর কেউ জানে না যে, ইতিপূর্ব্বেই তাঁর বিবাহ হয়ে গেছে এবং স্বামী জীবিত আছেন। একথা আর কেউ হয়ত বিশ্বাস করত না, কিন্তু আমি তাঁর একটি কথাও অবিশ্বাস করিনি। তা ছাড়া, স্ত্রীলোকের একবারের অধিক বিবাহ হতে পারে না—ও কি?

 শেখরের দুই চক্ষু বাষ্পাকুল হইয়া উঠিয়াছিল, এখন সেই বাষ্প অশ্রুধারায় চোখের কোণ বাহিয়া গিরীনের সম্মুখেই ঝর্ ঝর্ করিয়া ঝরিয়া পড়িল। কিন্তু সেদিকে তাহার চৈতন্য ছিল না, তাহার মনেও পড়িল না, পুরুষের সম্মুখেই পুরুষের এই দুর্ব্বলতা প্রকাশ পাওয়া অত্যন্ত লজ্জাকর।

 গিরীন নিঃশব্দে চাহিয়া রহিল। তাহার মনে মনে সন্দেহ ছিলই—আজ সে ললিতার স্বামীকে নিশ্চয় চিনিতে পারিল। শেখর চোখ মুছিয়া ভারি গলায় বলিল, কিন্তু আপনি ত ললিতাকে স্নেহ করেন?

 গিরীনের মুখের উপরে প্রচ্ছন্ন বেদনার গাঢ় ছায়া পড়িল, কিন্তু পরক্ষণেই সে মৃদু মৃদু হাসিতে লাগিল। আস্তে আস্তে বলিল, সে কথার জবাব দেওয়া অনাবশ্যক। তা ছাড়া স্নেহ যত বড়ই হোক, জেনে শুনে কেউ পরের বিবাহিত স্ত্রীকে বিবাহ করে না—যাক, গুরুজনের সম্বন্ধে ও আলোচনা আমি করতে চাইনে, বলিয়া সে আর একবার হাসিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, আজ যাই, আবার অন্য সময় দেখা হবে, বলিয়া নমস্কার করিয়া বাহির হইয়া গেল।

 গিরীনকে শেখর চিরদিনই মনে মনে বিদ্বেষ করিয়াছে, এইবার সে বিদ্বেষ নিবিড় ঘৃণায় পর্য্যবসিত হইয়াছিল, কিন্তু আজ সে চলিয়া যাইবামাত্র শেথর উঠিয়া আসিয়া ভূমিতলে বারংবার মাথা ঠেকাইয়া এই অপরিচিত ব্রাহ্ম-যুবকটির উদ্দেশে প্রণাম করিতে লাগিল। মানুষ নিঃশব্দে যে কত বড় স্বার্থত্যাগ করিতে পারে, হাসিমুখে কি কঠোর প্রতিশ্রুতি পালন করিতে পারে, তাহা আজ সে প্রথম দেখিল।


 অপরাহ্ণবেলায় ভুবনেশ্বরী নিজের ঘরে মেঝেয় বসিরা ললিতার সাহায্যে নূতন বস্ত্রের রাশি থাক দিয়া সাজাইয়া রাখিতেছেন, শেখর ঘরে ঢুকিয়া মায়ের শয্যার উপর গিয়া বসিল। আজ সে ললিতাকে দেখিয়া ব্যস্ত হইয়া পলাইল না। মা চাহিয়া দেখিয়া বলিলেন, কি রে!

 শেখর জবাব দিল না, চুপ করিয়া থাক দেওয়া দেখিতে লাগিল। খানিক পরে বলিল, ও কি হচ্চে মা?

 মা বলিলেন, নূতন কাপড় কাকে কি রকম দিতে হবে, হিসেব করে দেখচি—বোধ করি, আরও কিছু কিনতে হবে, না মা?

 ললিতা ঘাড় নাড়িয়া সায় দিল।

 শেখর হাসি-মুখে কহিল, আর যদি বিয়ে না করি মা?

 ভুবনেশ্বরী হাসিলেন। বলিলেন, তা তুমি পার, তোমার গুণে ঘাট নেই।

 শেখরও হাসিয়া বলিল, তাই বোধ করি হয়ে দাঁড়ায় মা।

 মা গম্ভীর হইয়া বলিলেন, ও কি কথা? অমন অলক্ষণে কথা মুখে আনিস্‌নে।

 শেখর বলিল, এতদিন মুখে ত আনিনি মা, কিন্তু আর না আনলে নয়—আর চুপ করে থাকলে মহাপাতক হবে মা।

 ভুবনেশ্বরী বুঝিতে না পারিয়া শঙ্কিত-মুখে চাহিয়া রহিলেন।

 শেখর বলিল, তোমার এই ছেলেটির অনেক অপরাধই তুমি ক্ষমা করে এসেচ, এটাও ক্ষমা কর মা, আমি সত্যই এ বিয়ে করতে পারব না।

 পুত্রের কথা ও মুখের ভাব দেখিয়া ভুবনেশ্বরী সত্যই উদ্বিগ্ন হইলেন, কিন্তু সে ভাব চাপা দিয়া বলিলেন, আচ্ছা, আচ্ছা, তাই হবে। এখন যা তুই এখান থেকে, আমাকে জ্বালাতন করিসনে শেখর—আমার অনেক কাজ।

 শেখর আর একবার হাসিবার ব্যর্থ প্রয়াস করিয়া শুষ্ক স্বরে বলিল, না মা, সত্যিই বলচি তোমাকে, এ বিয়ে হতে পারবে না।

 কেন, এ কি ছেলেখেলা?

 ছেলেখেলা নয় বলেই ত বলচি মা।

 ভুবনেশ্বরী এবার রীতিমত ভীত হইয়া সরোষে বলিলেন, কি হয়েচে, আমাকে বুঝিয়ে বল শেখর। ও-সব গোলমেলে কথা আমার ভাল লাগে না।

 শেখর মৃদু-কণ্ঠে বলিল, আর একদিন শুনো মা, আর একদিন বলব।

 আর একদিন বলবি! তিনি কাপড়ের গোছা একধারে ঠেলিয়া দিয়া বলিলেন, তবে আজই আমাকে কাশী পাঠিয়ে দে, এমন সংসারে আমি একটা রাতও কাটাতে চাইনে।

 শেখর অধোমুখে বসিয়া রহিল। ভুবনেশ্বরী অধিকতর অস্থির হইয়া বলিলেন, ললিতাও আমার সঙ্গে কাশী যেতে চায়, দেখি তার যদি একটা বন্দোবস্ত করতে পারি।

 এবার শেখর মুখ তুলিয়া হাসিল, তুমি নিয়ে যাবে, তার আবার বন্দোবস্ত কার সঙ্গে করবে মা? তোমার হুকুমের বড় ওর আবার কি আছে!

 ছেলের হাসিমুখ দেখিয়া তিনি মনে মনে একটু যেন আশান্বিতা হইলেন, ললিতার পানে একবার চাহিয়া দেখিয়া বলিলেন, শুনলি মা ওর কথা! ও মনে করে, আমি ইচ্ছে করলেই যেন যেখানে খুসি নিয়ে যেতে পারি! ওর মামির মত নিতে হবে না?

 ললিতা জবাব দিল না। শেখরের কথাবার্ত্তার ধরণে সে মনে মনে অত্যন্ত সঙ্কুচিত হইয়া উঠিতেছিল।

 শেখর বলিয়া ফেলিল, তাঁকে জানাতে চাও, জানাওগে, সে তোমার ইচ্ছে। কিন্তু তুমি যা বলবে তাই হবে মা, এ আমিও মনে করি, যাকে নিয়ে যেতে চাচ্চ, সেও মনে করে; ও তোমার পুত্রবধূ। বলিয়া ফেলিয়াই শেখর ঘাড় হেঁট করিয়া রহিল।

 ভুবনেশ্বরী বিস্ময়ে স্তম্ভিত হইয়া গেলেন। জননীর সম্মুখে সন্তানের মুখের এ কি পরিহাস! একদৃষ্টে তাহার দিকে চাহিয়া বলিলেন, কি বললি? ও আমার কি?

 শেখর মুখ তুলিতে পারিল না, কিন্তু জবাব দিল। আস্তে আস্তে বলিল, ঐ ত বললুম মা। আজ নয়, চার বৎসরের বেশি হ’ল, তুমি সত্যিই ওর মা। আমি আর বলতে পারিনে মা, ওকে জিজ্ঞেস কর ওই বলবে, বলিয়াই দেখিল, ললিতা গলায় আঁচল দিয়া মাকে প্রণাম করিবার উদ্যোগ করিতেছে, সেও উঠিয়া আসিয়া তাহার পাশে দাঁড়াইল, এবং উভয়ে একত্রে মায়ের পদপ্রান্তে ভূমিষ্ঠ প্রণাম করিয়া শেখর নিঃশব্দে বাহির হইয়া গেল।

 ভুবনেশ্বরীর দুই চোখ দিয়া আনন্দাশ্রু পড়িতে লাগিল। তিনি ললিতাকে সত্যই অত্যন্ত ভালবাসিতেন। সিন্দুক খুলিয়া নিজের সমস্ত অলঙ্কার বাহির করিয়া তাহাকে পরাইতে পরাইতে একটু একটু করিয়া সব কথা জানিয়া লইলেন। সমস্ত শুনিয়া বলিলেন, তাই বুঝি গিরীনের কালীর সঙ্গে বিয়ে হয়েচে?

 ললিতা বলিল, হাঁ মা তাই। গিরীনবাবুর মত মানুষ সংসারে আর আছে কি না, জানি না। আমি তাঁকে বুঝিয়ে বলতেই তিনি বিশ্বাস করলেন যে, সত্যিই আমার বিয়ে হয়ে গেছে। স্বামী আমাকে গ্রহণ করুন, না করুন, সে তাঁর ইচ্ছে, কিন্তু তিনি আছেন।

 ভুবনেশ্বরী তাহার মাথায় হাত দিয়ে বলিলেন, আছে বৈ কি মা। আশীর্ব্বাদ করি, জন্ম-জন্ম দীর্ঘজীবী হয়ে থাকুক, একটু বোস্ মা, আমি অবিনাশকে জানিয়ে আসি যে, বিয়ের কনে বদল হয়ে গেছে, বলিয়া হাসিয়া বড় ছেলের ঘরের দিকে চলিয়া গেলেন।

সমাপ্ত