বিষয়বস্তুতে চলুন

শরৎ-সাহিত্য-সংগ্রহ (পঞ্চম সম্ভার)/পরিণীতা/ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

 নবীন রায় সমস্ত সুদ আসল কড়াক্রান্তি গণিয়া লইয়া বন্ধকী কাগজখানা ফিরাইয়া দিয়া বলিলেন, বলি, টাকাটা দিলে কে হে?

 গুরুচরণ নম্রভাবে কহিলেন, সেটা জিজ্ঞেসা করবেন না দাদা, বলতে নিষেধ আছে।

 টাকাটা ফেরত পাইয়া নবীন কিছুমাত্র সন্তুষ্ট হন নাই, এটা আশাও করেন নাই, ইচ্ছাও করেন নাই। বরং বাড়িটা ভাঙিয়া ফেলিয়া কিরূপ নূতন অট্টালিকা প্রস্তুত করিবেন, তাহাই ভাবিয়া রাখিয়াছিলেন। শ্লেষ করিয়া বলিলেন, তা এখন নিষেধ ত হবেই। ভায়া, দোষ তোমার নয়, দোষ আমার। দোষ, টাকাটা ফিরে চাওয়ার, নইলে কলিকাল বলেচে কেন!

 গুরুচরণ অত্যন্ত ব্যথিত হইয়া বলিলেন, সে কি কথা দাদা। আপনার টাকার ঋণটাই শোধ করেচি, কিন্তু আপনার দয়ার ঋণ ত শোধ করতে পারিনি।

 নবীন হাসিলেন। তিনি পাকা লোক, এ-সকল কথা বিশ্বাস করিলে গুড় বেচিয়া এত টাকা করিতে পারিতেন না। বলিলেন, সে যদি সত্যিই ভাবতে ভায়া, তা হলে এমন করে শোধ করে দিতে না। না হয়, একবার টাকাটাই চেয়েছিলাম, সেও তোমারি বৌঠানের অসুখের জন্যে, আমার নিজের জন্যে কিছু নয়—বলি কত সুদে বন্ধক রাখলে বাড়িটা?

 গুরুচরণ ঘাড় নাড়িয়া কহিলেন, বন্ধক রাখিনি সুদের কথাও কিছু হয়নি।

 নবীন বিশ্বাস করিলেন না, বলিলেন, বল কি, শুধু-হাতে?

 হাঁ দাদা, এক রকম তাই বটে। ছেলেটি বড় সৎ, বড় দয়ার শরীর।

 ছেলেটি? ছেলেটি কে?

 গুরুচরণ এ প্রশ্নের আর জবাব দিলেন না, মৌন হইয়া রহিলেন। যতটা বলিয়া ফেলিয়াছিলেন এতটাও তাঁহার বলা উচিত ছিল না।

 নবীন তাঁহার মনের ভাব বুঝিয়া মৃদু হাসিয়া কহিলেন, যখন নিষেধ আছে তখন কাজ নেই, কিন্তু সংসারের অনেক জিনিসই দেখেচি বলে এইটুকু সাবধান করে দিই ভায়া, তিনি যেই হোন, এত ভাল করতে গিয়ে শেষকালে যেন ফ্যাসাদে না ফেলেন।

 গুরুচরণ সে কথার আর জবাব না দিয়া নমস্কার করিয়া কাগজখানি হাতে করিয়া বাড়ি ফিরিয়া আসিলেন।

 প্রায় প্রতি বৎসরেই ভুবনেশ্বরী এই সময়টায় কিছুদিনের জন্য পশ্চিম ঘুরিয়া আসিতেন। তাঁহার অজীর্ণ রোগ ছিল, ইহাতে উপকার হইত। রোগ বেশি নয়। নবীন গুরুচরণের কাছে সেদিন কার্য্যোদ্ধারের জন্যই বাড়াইয়া বলিয়াছিলেন। যাই হোক, যাত্রার আয়োজন হইতেছিল।

 সেদিন সকালবেলা একটা চামড়ার তোরঙ্গে শেখর তাহার আবশ্যকীয় সৌখীন জিনিসপত্র গুছাইয়া লইতেছিল।

 আন্নাকালী ঘরে ঢুকিয়া বলিল, শেখরদা, তোমরা কাল যাবে, না?

 শেখর তোরঙ্গ হইতে মুখ তুলিয়া বলিল, কালী, তোর সেজদিকে ডেকে দে, সে কি সঙ্গে নেবে-টেবে এই সময়ে দিয়ে যাক। ললিতা প্রতি বৎসর মায়ের সঙ্গে যাইত, এবারেও যাইবে তাহাই শেখর জানিত।

 কালী ঘাড় নাড়িয়া বলিল, এবার সেজদি ত যাবে না।

 কেন যাবে না?

 কালী কহিল, বাঃ কি করে যাবে। মাঘ-ফাল্গুন মাসে ওর বিয়ে হবে, বাবা বর খুঁজে বেড়াচ্চেন যে।

 শেখর নির্নিমেষ-চোখে স্তব্ধ হইয়া চাহিয়া রহিল।

 কালী বাড়ির ভিতরে যাহা শুনিয়াছিল, উৎসাহের সহিত ফিস্ ফিস্ করিয়া বলিতে লাগিল, গিরীনবাবু বলেচেন যত টাকা লাগে ভাল পাত্তর চাই। বাবা আজও অফিসে যাবেন না, খেয়ে-দেয়ে কোথায় ছেলে দেখতে যাবেন; গিরীনবাবুও সঙ্গে যাবেন।

 শেখর স্থির হইয়া শুনিতে লাগিল এবং কেন যে ললিতা আর আসিতে চাহে না তাহারও যেন কতকটা কারণ বুঝিতে পারিল।

 কালী বলিতে লাগিল, গিরীনবাবু খুব ভালমানুষ শেখরদা! মেজদির বিয়ের সময় আমাদের বাড়ি জ্যাঠামশায়ের কাছে বাঁধা ছিল ত, বাবা বলছিলেন, আর দুমাস তিনমাস পরেই আমাদের সবাইকে পথে পথে ভিক্ষে করে বেড়াতে হ’ত, তাই গিরীনবাবু টাকা দিলেন। কাল সব টাকা জ্যাঠামশায়কে বাবা ফিরিয়ে দিয়েচেন। সেজদি বলছিল, আর আমাদের কোন ভয় নেই, সত্যি না শেখরদা?

 প্রত্যুত্তরে শেখর কিছুই বলিতে পারিল না, তেমনি চাহিয়া রহিল।

 কালী জিজ্ঞাসা করিল, কি ভাবচ শেখরদা?

 এইবার শেখরের চমক ভাঙিল, তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিল, কিছু না রে। কালী, তোর সেজদিকে একবার শীগ্‌গির ডেকে দে, বল্ আমি ডাকচি, ছুটে যা।

 কালী ছুটিয়া চলিয়া গেল।

 শেখর থোলা তোরঙ্গের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া বসিয়া রহিল। কোন্ দ্রব্যে তাহার প্রয়োজন, কোন্ দ্রব্যে প্রয়োজন নাই, সমস্তই এখন তাহার চোখের সম্মুখে একাকার হইয়া গেল।

 ডাক শুনিয়া ললিতা উপরে আসিয়া প্রথমে জানালার ফাঁক দিয়া দেখিল, তাহার শেখরদা মেঝের উপরে একদৃষ্টে মাটির দিকে চাহিয়া স্থির হইয়া বসিয়া আছে। তাহার এ-রকম মুখের ভাব সে পূর্ব্বে কখনও দেখে নাই। ললিতা আশ্চর্য্য হইল, ভয় পাইল। ধীরে ধীরে কাছে আসিয়া দাঁড়াইতেই শেখর ‘এসো’ বলিয়া ব্যস্ত হইয়া উঠিয়া দাঁড়াইল।

 ললিতা আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করিল, আমাকে ডাকছিলে?

 হাঁ, বলিয়া শেখর ক্ষণকাল স্থির হইয়া থাকিয়া কহিল, কাল সকালের গাড়ীতেই আমি মাকে নিয়ে পশ্চিমে যাচ্চি, এবার ফিরতে হয়ত দেরি হবে। এই চাবি নাও, তোমার খরচের টাকা-কড়ি ওই দেরাজের মধ্যেই রইল।

 প্রতিবার ললিতাও সঙ্গে যায়। গতবারে এই উপলক্ষে সে কি আনন্দে জিনিস-পত্র গুছাইয়া লইয়াছিল, এবার সে কাজটা শেখরদা একা করিতেছে, খোলা তোরঙ্গের দিকে চাহিবামাত্রই ললিতার তাহা মনে পড়িল।

 শেখর তাহার দিক হইতে মুখ ফিরাইয়া লইয়া একবার কাশিয়া গলাটা পরিষ্কার করিয়া বলিল, সাবধানে থেকো—আর যদি কোন কিছুর বিশেষ আবশ্যক হয়, দাদার কাছে ঠিকানা জেনে নিয়ে আমাকে চিঠি লিখো।

 অতঃপর দুই জনেই চুপ করিয়া রহিল। এবার ললিতা সঙ্গে যাইবে না, শেখর তাহা জানিতে পারিয়াছে এবং তাহার কারণটাও হয়ত শুনিয়াছে মনে করিয়া ললিতা লজ্জায় সঙ্কুচিত হইতে লাগিল।

 হঠাৎ শেখর কহিল, আচ্ছা, যাও এখন, আমাকে আবার এইগুলো গুছিয়ে নিতে হবে। বেলা হ’ল, আজ একবার আফিসেও যেতে হবে।

 ললিতা তোরঙ্গের সুমুখে হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া বলিল, তুমি স্নান করগে, আমি গুছিয়ে দিচ্চি।

 তা হলে ত ভালই হয়, বলিয়া শেখর চাবির গোছাটা ললিতার কাছে ফেলিয়া দিয়া ঘরের বাহিরে আসিয়া সহসা থমকিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, আমার কি দরকার হয়, তা ভুলে যাওনি ত?

 ললিতা মাথা ঝুঁকাইয়া তোরঙ্গের জিনিস-পত্র পরীক্ষা করিতে লাগিল, সে কথার কোন জবাব দিল না।

 শেখর নীচে গিয়া মাকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিল কালীর সংবাদই সত্য। গুরুচরণ ঋণ পরিশোধ করিয়াছেন, সে কথাও সত্য। ললিতার পাত্র স্থির করিবার বিশেষ চেষ্টা হইতেছে তাহাও সত্য। সে আর কিছু জিজ্ঞাসা না করিয়া স্নান করিতে চলিয়া গেল।

 ঘণ্টা-দুই পরে স্নানাহার শেষ করিয়া আফিসের পোষাক পরিতে নিজের ঘরে ঢুকিয়া সে সত্যই অবাক্ হইয়া গেল।

 এই দুই ঘণ্টাকাল ললিতা কিছুই করে নাই, তোরঙ্গের একটা পাটির উপর মাথা রাখিয়া চুপ করিয়া বসিয়াছিল। শেখরের পদশব্দে চকিত হইয়া মুখ তুলিয়াই ঘাড় হেঁট করিয়া রহিল। তার দুই চোখ জবাফুলের মত রক্তবর্ণ হইয়াছে।

 কিন্তু শেখর তাহা দেখিয়াও দেখিল না, আফিসের পোষাক পরিতে পরিতে সহজভাবে বলিল, এখন পারবে না ললিতা, দুপুরবেলা এসে গুছিয়ে রেখো। বলিয়া প্রস্তুত হইয়া আফিসে চলিয়া গেল। সে ললিতার রাঙা চোখের হেতু ঠিক বুঝিয়াছিল, কিন্তু সব দিক বেশ করিয়া চিন্তা না করা পর্য্যন্ত আর কোন কথা বলিতে সাহস করিল না।

 সেদিন অপরাহ্ণে মামাদের চা দিতে আসিয়া ললিতা সহসা জড়-সড় হইয়া পড়িল। আজ শেখর বসিয়াছিল। সে গুরুচরণবাবুর কাছে বিদায় লইতে আসিয়াছিল।

 ললিতা ঘাড় হেঁট করিয়া দু’বাটি চা প্রস্তুত করিয়া গিরীন ও তাহার মামার সম্মুখে দিতেই গিরীন কহিল, শেখরবাবুকে চা দিলে না ললিতা?

 ললিতা মুখ না তুলিয়াই আস্তে আস্তে বলিল, শেখরদা চা খান না।

 গিরীন আর কিছু বলিল না, ললিতার নিজের কথা তাহার মনে পড়িয়া গেল। শেখর নিজে এটা খায় না, অপরে খায় তাহাও ইচ্ছা করে না।

 চায়ের বাটি হাতে তুলিয়া লইয়া গুরুচরণ পাত্রের কথা পাড়িলেন। ছেলেটি বি. এ. পড়িতেছে ইত্যাদি বিস্তর সুখ্যাতি করিয়া শেষে বলিলেন, অথচ আমাদের গিরীনের পছন্দ হয়নি। অবশ্য ছেলেটি দেখতে তেমন সুশ্রী নয় বটে, কিন্তু পুরুষমানুষের রূপ আর কোন্ কাজে লাগে, গুণ থাকলেই যথেষ্ট।

 কোনমতে বিবাহটা হইয়া গেলেই গুরুচরণ নিশ্বাস ফেলিয়া বাঁচেন।

 শেখরের সহিত গিরীনের এইমাত্র সামান্য পরিচয় হইয়াছিল। শেখর তাহার দিকে চাহিয়া একটুখানি হাসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, গিরীনবাবুর পছন্দ হ’ল না কেন? ছেলেটি লেখাপড়া কচ্চে, অবস্থাও ভাল—এই ত সুপাত্র—

 শেখর জিজ্ঞাসা করিল বটে, সে কিন্তু ঠিক বুঝিয়াছিল কেন ইহার পছন্দ হয় নাই এবং কেন ভবিষ্যতেও হইবে না। কিন্তু গিরীন সহসা এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিল না, তাহার মুখ ঈষৎ রক্তাভ হইল, শেখর তাহাও লক্ষ্য করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, কাকা, কাল মাকে নিয়ে পশ্চিমে চললুম, ঠিক সময়ে খবর দিতে যেন ভুলে যাবেন না।

 গুরুচরণ বলিলেন, সে কি বাবা, তোমারাই যে আমার সব। তা ছাড়া, ললিতার মা উপস্থিত না থাকলে ত কোন কাজই হতে পারবে না। কি বলিস্ মা ললিতা? বলিয়া হাসিমুখে ঘাড় ফিরাইয়া বলিলেন, সে উঠে গেল কখন?

 শেখর কহিল, কথা উঠতেই পালিয়েচে।

 গুরুচরণ গম্ভীর হইয়া বলিলেন, পালাবে বৈকি—হাজার হোক জ্ঞানবুদ্ধি হয়েচে ত। বলিয়া সহসা একটা ক্ষুদ্র নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিলেন, মা আমার একাধারে যেন লক্ষ্মী-সরস্বতী। এমন মেয়ে বহু ভাগ্যে মেলে শেখরনাথ। কথাটা উচ্চারণ করিতেই তাঁর শীর্ণ কৃশ মুখের উপর গভীর স্নেহের এমন একটা স্নিগ্ধ-মধুর ছায়াপাত হইল যে, গিরীন ও শেখর উভয়েই আন্তরিক শ্রদ্ধার সহিত তাঁহাকে মনে মনে নমস্কার না করিয়া থাকিতে পারিল না।