বিষয়বস্তুতে চলুন

শরৎ-সাহিত্য-সংগ্রহ (পঞ্চম সম্ভার)/পরিণীতা/সপ্তম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

সপ্তম পরিচ্ছেদ

 চায়ের মজলিস্ হইতে নিঃশব্দে পলাইয়া আসিয়া ললিতা শেখরের ঘরে ঢুকিয়া উজ্জ্বল গ্যাসের নীচে একটা তোরঙ্গ আনিয়া শেখরের গরম বস্ত্রগুলি পাট করিয়া গুছাইয়া রাখিতেছিল, শেখরকে প্রবেশ করিতে দেখিয়া মুখ তুলিয়া তাহার মুখের পানে চাহিয়া সে ভয়ে বিস্ময়ে নির্ব্বাক্ হইয়া রহিল।

 মোকর্দ্দমায় সর্ব্বস্ব হারিয়া মানুষ যে-রকম মুখ করিয়া আদালত হইতে বাহির হইয়া আসে, এবেলার মানুষকে যেন ওবেলায় সহসা আর চিনিতে পারা যায় না, এই এক ঘণ্টার মধ্যে তেমনি শেখরকে ললিতা যেন ঠিক চিনিতে পারিল না। তাহার মুখের উপর সর্ব্বস্ব হারানোর চিহ্ন যেন কে চিহ্নিত করিয়া দিয়াছে।

 শেখর শুষ্ককণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, কি হচ্চে ললিতা?

 ললিতা সে প্রশ্নের জবাব না দিয়া কাছে সরিয়া আসিয়া দুই হাতে তাহার একটা হাত লইয়া কাঁদ কাঁদ হইয়া বলিল, কি হয়েছে শেখরদা?

 কৈ কিছুই হয়নি ত, বলিয়া শেখর জোর করিয়া একটু হাসিল। ললিতার করস্পর্শে তাহার মুখে কতকটা সজীবতা ফিরিয়া আসিল। সে নিকটস্থ একটা চৌকির উপর বসিয়া পড়িয়া সেই প্রশ্নই করিল, তোমার হচ্চে কি?

 ললিতা কহিল, মোটা ওভারকোটটা সঙ্গে দিতে ভুলেছিলুম সেইটাই দিতে এসেচি। শেখর শুনিতে লাগিল। ললিতা এতক্ষণে অপেক্ষাকৃত সুস্থ হইয়া বলিতে লাগিল, গতবারে গাড়ীতে তোমার বড় কষ্ট হয়েছিল, বড় কোট ত অনেকগুলাই ছিল, কিন্তু খুব মোটা-সোটা একটাও ছিল না। তাই আমি ফিরে এসেই দোকানে মাপ দিয়ে এইটে তৈরি করিয়েছিলুম, বলিয়া সে খুব ভারি একটা ওভারকোট তুলিয়া আনিয়া শেখরের কাছে রাখিল।

 শেখর হাত দিয়া পরীক্ষা করিয়া বলিল, কৈ আমাকে বলনি ত?

 ললিতা হাসিয়া বলিল, বাবুমানুষ, তোমাকে বললে কি এত মোটা কোট তৈরি করতে দিতে? তাই বলিনি, তৈরি করিয়ে তুলে রেখেছিলুম। বলিয়া সেটা যথাস্থানে রাখিয়া দিয়া বলিল, ঠিক উপরেই রইল, তোরঙ্গ খুললেই পাবে—শীত করলে গায়ে দিতে ভুলো না যেন।

 আচ্ছা, বলিয়া শেখর নির্নিমেষ-চোখে কিছুক্ষণ চাহিয়া থাকিয়া হঠাৎ বলিয়া উঠিল, না, এমন হতেই পারে না।

 কি হতে পারে না? গায়ে দেবে না!

 শেখর তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিল, না, সে কথা নয়—ও অন্য কথা, আচ্ছা ললিতা, মার জিনিস-পত্র গোছানো হয়েছে কি না জানো?

 ললিতা কহিল, জানি, দুপুরবেলা আমিই সে সমস্ত গুছিয়ে দিয়েচি, বলিয়া সে আর একবার সমস্ত দ্রব্য ভাল করিয়া পরীক্ষা করিয়া চাবি বন্ধ করিতে লাগিল।

 শেখর ক্ষণকাল চুপ করিয়া তাহার দিকে চাহিয়া মৃদুকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, হাঁ ললিতা, আসছে বছর আমার উপায় কি হবে বলতে পার?

 ললিতা চোখ তুলিয়া বলিল, কেন?

 কেন আমিই টের পাচ্ছি ভাই, বলিয়া ফেলিয়াই নিজের কথাটা চাপা দিবার জন্য শুষ্কমুখে প্রফুল্লতা টানিয়া আনিয়া বলিল, কিন্তু পরের ঘরে যাবার আগে কোথায় কি আছে আমাকে দেখিয়ে দিয়ে যেয়ো—নইলে দরকারের সময় কিছুই খুজে পাব না।

 ললিতা রাগিয়া বলিল, যাও—

 শেখর এতক্ষণে হাসিল, বলিল, যাও জানি, কিন্তু সত্যিই উপায় হবে কি? আমার সখ ত আছে ষোল আনা, কিন্তু এক কড়ার শক্তি নেই। এ-সব কাজ চাকর দিয়েও হয় না এখন থেকে দেখচি তোমার মামার মত হতে হবে—এক কাপড় এক চাদর সম্বল করে—যা হয় তাই হবে।

 ললিতা চাবির গোছাটা মেঝের উপর ফেলিয়া দিয়া ছুটিয়া পলাইয়া গেল।

 শেখর চেঁচাইয়া বলিল, কাল সকালে একবার এসো।

 ললিতা শুনিয়াও শুনিল না, দ্রুতপদে সিঁড়ি বাহিয়া দোতলায় নামিয়া গেল। বাড়ি গিয়া দেখিল, ছাদের এক কোণে চাঁদের আলোয় বসিয়া আন্নাকালী একরাশ গাঁদা-ফুল লইয়া মালা গাঁথিতেছে। ললিতা তাহার কাছে গিয়া বসিয়া কহিল, হিমে বসে কি কচ্চিস্ কালী?

 কালী মুখ না তুলিয়াই বলিল, মালা গাঁথচি—আজ রাত্তিরে আমার মেয়ের বিয়ে।

 কই আমাকে বলিস্‌নি ত?

 ঠিক ছিল না সেজদি। এখন বাবা পাঁজি দেখে বললেন, আজ রাত্তির ছাড়া আর এ-মাসে দিন নেই। মেয়ে বড় হয়েচে, আর রাখতে পারিনে, যেমন তেমন করে বিদেয় কচ্চি। সেজদি, দুটো টাকা দাও না, জলখাবার আনাই।

 ললিতা হাসিয়া বলিল, টাকার বেলাই সেজদি। যা, আমার বালিশের নীচে আছে নিগে যা। হাঁ রে কালী, গাঁদা-ফুলে কি বিয়ে হয়?

 কালী গম্ভীরভাবে বলিল, হয়। অন্য ফুল না পেলে হয়। আমি কতগুলো মেয়ে পার করলুম সেজদি। আমি সব জানি, বলিয়া খাবার আনাইবার জন্য নীচে নামিয়া গেল।

 ললিতা সেইখানে বসিয়া মালা গাঁথিতে লাগিল।

 খানিক পরে কালী ফিরিয়া আসিয়া বলিল, আর সকলকেই বলা হয়েচে শুধু শেখরদাকে বলা হয়নি—যাই বলে আসি, নইলে তিনি দুঃখ করবেন, বলিয়া ও-বাড়ি চলিয়া গেল।

 কালী পাকা গৃহিণী, সমস্ত কাজকর্ম্মই সে সুশৃঙ্খলায় করে। শেখরদাকে সংবাদ দিয়া নামিয়া আসিয়া বলিল, তিনি একছড়া মালা চাইলেন। যাও না সেজদি, শীগ্‌গির করে দিয়ে এসো না, আমি ততক্ষণ এদিকের বন্দোবস্ত করি—লগ্ন সুরু হয়ে গেছে, আর সময় নেই।

 ললিতা মাথা নাড়িয়া বলিল, আমি পারব না কালী, তুই দিয়ে আয়।

 আচ্ছা, যাচ্চি। ওই বড় ছড়াটা দাও, বলিয়া সে হাত বাড়াইল।

 ললিতা হাতে তুলিয়া দিতে গিয়া কি ভাবিয়া বলিল, আচ্ছা, আমি দিয়ে আসচি।

 কালী গম্ভীর হইয়া বলিল, তাই যাও সেজদি, আমার অনেক কাজ—মরবার ফুরসৎ নেই।

 তার মুখের ভাব ও কথার ভঙ্গি দেখিয়া ললিতা হাসিয়া ফেলিল। একেবারে পাকা বুড়ী, বলিয়া হাসিয়া মালা লইয়া চলিয়া গেল। কবাটের কাছে আসিয়া দেখিল, শেখর এক-মনে চিঠি লিখিতেছে। দোর খুলিয়া পিছনে আসিয়া দাঁড়াইল, তাতেও শেখর টের পাইল না। তখন ক্ষণকাল চুপ করিয়া থাকিয়া তাহাকে চমকিত করিয়া দিবার অভিপ্রায়ে সে মালা-ছড়াটা সাবধানে শেখরের মাথা গলাইয়া গলায় ফেলিয়া দিয়াই চৌকির পিছনে বসিয়া পড়িল।

 শেখর প্রথমটা চমকিয়া উঠিয়া বলিল, এই কালী! পরক্ষণেই ঘাড় ফিরাইয়া দেখিয়া ভয়ানক গম্ভীর হইয়া বলিল, ও কি করলে ললিতা!

 ললিতা উঠিয়া দাঁড়াইয়া শেখরের মুখের ভাবে ঈষৎ শঙ্কিত হইয়া বলিল, কেন, কি?

 শেখর পূর্ণমাত্রায় গাম্ভীর্য্য বজায় রাখিয়া বলিল, জান না কি? কালীকে জিজ্ঞেস করে এসো, আজকের রাত্তিরে গলায় মালা পরিয়ে দিলে কি হয়।

 এখন ললিতা বুঝিল। চক্ষের নিমিষে তাহার সমস্ত মুখ লজ্জায় রাঙা হইয়া উঠিল, সে—না কক্ষন না, না, বলিতে বলিতে ছুটিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।

 শেখর ডাকিয়া বলিল, যেয়ো না ললিতা, শুনে যাও—কাজ আছে— শেখরের ডাক তাহার কানে গেল বটে, কিন্তু শুনিবে কে? কোথাও সে থামিতে পারিল না, দৌড়িয়া আসিয়া নিজের ঘরের মধ্যে ঢুকিয়া একেবারে চোখ বুজিয়া বিছানায় শুইয়া পড়িল।

 এই পাঁচ-ছয় বৎসর ধরিয়া সে শেখরের ঘনিষ্ঠ সংস্রবে মানুষ হইয়া উঠিয়াছে, কিন্তু কোনও দিন এমন কথা শোনে নাই। একে ত গম্ভীর প্রকৃতি শেখর কখনই তাহাকে পরিহাস করিত না, করিলেও এত বড় লজ্জাকর পরিহাস যে তাহার মুখ দিয়া বাহির হইতে পারে ইহা সে ত কল্পনা করিতে পারিত না। লজ্জায় সঙ্কুচিত হইয়া মিনিট-কুড়ি পড়িয়া থাকিয়া সে উঠিয়া বসিল। অথচ শেখরকে সে মনে মনে ভয় করিত, তিনি বিশেষ কাজ আছে বলিয়া ডাকিয়াছিলেন, তাই, যাইবে কিনা ইহাই ললিতা উঠিয়া বসিয়া ভাবিতেছিল। ও-বাড়ির ঝির গলা শোনা গেল, ললিতাদিদি কোথায় গা, ছোটবাবু একবার ডাকচেন—

 ললিতা বাহিরে আসিয়া মৃদুস্বরে বলিল, যাচ্চি, যাও। উপরে আসিয়া কবাট ফাঁক করিয়া দেখিল শেখর তখনও চিঠি লিখিতেছে। কতক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া আস্তে আস্তে বলিল, কেন?

 শেখর, লিখিতে লিখিতে বলিল, হঠাৎ কি একটা কাজ করে ফেললে বল ত?

 ললিতা রুষ্টভাবে বলিল, যাও—আবার!

 শেখর মুখ ফিরাইয়া বলিল, আমার দোষ কি! ভূমিই ত করে গেলে—

 কিছু করিনি—তুমি ওটা ফিরিয়ে দাও।

 শেখর কহিল, সেই জন্যেই ত ডেকে পাঠিয়েচি ললিতা। কাছে এসো, ওটা ফিরিয়ে দিচ্চি। তুমি অর্দ্ধেকটা করে গেছ, সরে এসো, আমি সেটা সম্পূর্ণ করে দি।

 ললিতা দ্বারের অন্তরালে ক্ষণকাল মৌনভাবে থাকিয়া বলিল, সত্যি বলচি তোমাকে, ওরকম ঠাট্টা করলে আর কোন দিন তোমার সামনে আসব না—বলচি, ওটা ফিরিয়ে দাও।

 শেখর টেবিলের দিকে মুখ ফিরাইয়া মালাটা তুলিয়া লইয়া বলিল, নিয়ে যাও।

 তুমি ঐখান থেকে ছুঁড়ে দাও।

 শেখর ঘাড় নাড়িয়া বলিল, কাছে না এলে পাবে না।

 তবে আমার কাজ নেই, বলিয়া ললিতা রাগ করিয়া চলিয়া গেল।

 শেখর চেঁচাইয়া বলিল, কিন্তু অর্দ্ধেকটা হয়ে থাকলো—

 থাকে থাক্, বলিয়া ললিতা যথার্থই রাগ করিয়া চলিয়া গেল।

 সে চলিয়া গেল বটে, কিন্তু নীচে গেল না। পূর্ব্বদিকে খোলা ছাদের একান্তে গিয়া রেলিঙ ধরিয়া চুপ করিয়া দাঁড়াইল। তখন সম্মুখের আকাশে চাঁদ উঠিয়াছিল এবং শীতল পাণ্ডুর জ্যোৎস্নায় চারিদিক ভাসিয়া যাইতেছিল। উপরে স্বচ্ছ নির্ম্মল নীলাকাশ। সে একবার শেখরের ঘরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া উর্দ্ধমুখে চাহিয়া রহিল। এইবার তাহার চোখ জ্বালা করিয়া লজ্জায়, অভিমানে দুই চোখ জলে ভরিয়া গেল। সে এত ছোট নহে যে, এ-সব কথার তাৎপর্য্য সম্পূর্ণ হৃদয়ঙ্গম করিতে পারে না, তবে কেন তাহাকে এমন মর্ম্মান্তিক উপহাস করা! সে যে কত তুচ্ছ, কত নীচে, এ কথা বুঝিবার তাহার যথেষ্ট বয়স হইয়াছে। সে ঠিক জানে, সে অনাথ এবং নিরুপায় বলিয়া তাহাকে সবাই আদর ও যত্ন করে—শেখরও করে, তাহার জননীও করেন। তাহার আপনার বলিতে কেহ নাই, সত্যকার দায়িত্ব তাহার কাহারও উপর নির্ভর করে না বলিয়াই গিরীন সম্পূর্ণ পর হইয়াও তাহাকে উদ্ধার করিয়া দিবার কথা তুলিতে পারিয়াছেন।

 ললিতা চোখ মুদিয়া মনে মনে বলিল, এই কলিকাতার সমাজে তাহার মামার অবস্থা ত শেখরদের কত নীচে, সে আবার সেই মামার আশ্রিত গলগ্রহ। ওদিকে সমান ঘরে শেখরের বিবাহের কথাবার্ত্তা চলিতেছে, দুদিন আগেই হৌক, পাছেই হৌক, সেই ঘরেই একদিন হইবে। এই বিবাহ উপলক্ষে নবীন রায় কত টাকা আদায় করিবেন সে-সব আলোচনাও সে শেখরের জননীর কাছে শুনিয়াছে।

 তবে, কেন তাহাকে হঠাৎ আজ এমন করিয়া শেখরদা অপমান করিয়া বসিল! এই সব কথা ললিতা সুমুখের দিকে শূন্যদৃষ্টিতে চাহিয়া নিজের মনে মগ্ন হইয়া আলোচনা করিতেছিল, সহসা চমকিয়া মুখ ফিরাইয়া দেখিল শেখর নিঃশব্দে হাসিতেছে। ইতিপূর্ব্বে যে মালাটা সে শেখরের গলায় পরাইয়া দিয়াছিল, ঠিক সেই উপায়ে সেই গাঁদা-ফুলের মালাটা তাহার নিজের গলায় ফিরিয়া আসিয়াছে। কান্নায় তাহার কণ্ঠ রুদ্ধ হইয়া আসিতে লাগিল, তবু সে জোর করিয়া বিকৃতস্বরে বলিল, কেন এমন করলে?

 তুমি করেছিলে কেন?

 আমি কিছু করিনি, বলিয়াই সে মালাটা টান মারিয়া ছিঁড়িয়া ফেলিবার জন্য হাত দিয়াই হঠাৎ শেখরের চোখের দিকে চাহিয়া থামিয়া গেল। আর ছিঁড়িয়া ফেলিতে সাহস করিল না, কিন্তু কাঁদিয়া বলিল, আমার কেউ নেই বলেই ত তুমি এমন করে আমাকে অপমান করচ!

 শেখর এতক্ষণ মৃদু মৃদু হাসিতেছিল, ললিতার কথা শুনিয়া অবাক্ হইয়া গেল। এ ত ছেলেমানুষের কথা নয়! কহিল, আমি অপমান করচি, না তুমি আমাকে অপমান করচ?

 ললিতা চোখ মুছিয়া ভয়ে ভয়ে বলিল, আমি কৈ অপমান করলুম?

 শেখর ক্ষণকাল স্থির থাকিয়া সহজভাবে বলিল, এখন একটু ভেবে দেখলেই টের পাবে। আজকাল বড় বাড়াবাড়ি কচ্ছিলে ললিতা, আমি বিদেশে যাবার আগে সেইটেই তোমার বন্ধ করে দিলুম। বলিয়া চুপ করিল।

 ললিতা আর প্রত্যুত্তর করিল না, মাথা হেঁট করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। পরিপূর্ণ জ্যোৎস্নাতলে দুজনেই স্তব্ধ হইয়া রহিল। শুধু, নীচে হইতে কালীর মেয়ের বিয়ের শাঁখের শব্দ ঘন ঘন শোনা যাইতে লাগিল।

 কিছুক্ষণ মৌন থাকিয়া শেখর কহিল, আর হিমে দাঁড়িয়ে থেকো না, নীচে যাও।

 যাচ্চি, বলিয়া ললিতা এতক্ষণ পরে তাহার পায়ের নীচে গড় হইয়া প্রণাম করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করিল, আমি কি করব বলে দিয়ে যাও।

 শেখর হাসিল, একবার একটু দ্বিধা করিল, তার পর দুই হাত বাড়াইয়া তাহাকে বুকের উপর টানিয়া আনিয়া নত হইয়া তাহার অধরে ওষ্ঠাধর স্পর্শ করিয়া বলিল, কিছুই বলে দিতে হবে না ললিতা, আজ থেকে আপনিই বুঝতে পারবে।

 ললিতার সর্ব্বশরীর রোমাঞ্চিত হইয়া কাঁপিয়া উঠিল। সে সরিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, আমি হঠাৎ তোমার গলায় মালা পরিয়ে দিয়ে ফেলেচি বলেই কি তুমি এ-রকম করলে?

 শেখর হাসিয়া মাথা নাড়িয়া বলিল, না। আমি অনেক দিন থেকেই ভাবচি, কিন্তু স্থির করে উঠতে পারিনি। আজ স্থির করেচি, কেন না, আজই ঠিক বুঝতে পেরেচি তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারব না।

 ললিতা বলিল, কিন্তু তোমার বাবা শুনলে ভয়ানক রাগ করবেন, মা শুনলে দুঃখ করবেন—এ হবে না শে—

 বাবা শুনলে রাগ করবেন সত্যি, কিন্তু মা খুব খুসী হবেন। সে যাই হোক, যা হবার হয়ে গেছে—এখন তুমিও ফেরাতে পার না, আমিও পারিনে। যাও নীচে গিয়ে মাকে প্রণাম করগে।