বিষয়বস্তুতে চলুন

শরৎ-সাহিত্য-সংগ্রহ (পঞ্চম সম্ভার)/পরেশ/১

উইকিসংকলন থেকে

পরেশ

 মজুমদার-বংশ বড় বংশ, গ্রামের মধ্যে তাঁহাদের ভারি সম্মান। বড়ভাই গুরুচরণ এই বাড়ির কর্ত্তা; শুধু বাড়ির কেন, সমস্ত গ্রামের কর্ত্তা বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। বড়লোক আরও ছিল, কিন্তু এতখানি শ্রদ্ধা ও ভক্তির পাত্র শ্রীকুঞ্জপুরে আর কেহ ছিল না। জীবনে বড় চাকুরী কখনো করেন নাই,—গ্রাম ছাড়িয়া অন্যত্র যাইতে সম্মত হইলে হয়ত তাহা দুষ্প্রাপ্য হইত না, কিন্তু প্রথম যৌবনে সেই যে একদিন অনতিদূরবর্ত্তী জেলা-ইস্কুলের মাষ্টারিতে ঢুকিয়াছিলেন, কোন লোভেই আর এই শিক্ষালয়ের মায়া কাটাইয়া অন্যত্র যাইতে সম্মত হন নাই। এখানে ত্রিশ টাকা বেতন পঞ্চাশ টাকা হইয়াছিল, এবং তাহার অর্দ্ধেক পঁচিশ টাকা পেন্সনে বছর-তিনেক হইল অবসর গ্রহণ করিয়াছেন। পৃথিবীতে আজিও হয়ত টাকাটাই একমাত্র বড় পদার্থ নয়, তা না হইলে বিবাদ মিটাইতে, নালিশ নিষ্পত্তি করিতে, দলাদলির বিচার করিয়া দিতে তাঁহার আদেশই শ্রীকুঞ্জপুরের সর্ব্বমান্য বস্তু হইয়া থাকিতে পারিত না। তাঁহার অপরিসীম স্বধর্ম্ম-নিষ্ঠা, চরিত্রের দৃঢ়তা এবং অবিচলিত সাধুতার সম্মুখে সকলেই সসম্ভ্রমে মাথা নত করিত। বয়স ষাটের কাছাকাছি—কেহ চরিত্র, সাধুতা বা ধর্ম্মের বাড়াবাড়ি করিলে, দশ-বিশখানা গ্রামের লোক তামাসা করিয়া বলিত, ইস্! এ যে একেবারে গুরুচরণ। গুরুচরণের স্ত্রী ছিল না। ছিল একমাত্র পুত্র বিমল। জগতে অদ্ভুত বলিয়া বোধ হয় সত্যকার কিছু নাই, না হইলে এত বড় সর্ব্বগুণান্বিত পিতার এত বড় সর্ব্বদোষাশ্রিত পুত্র যে কি করিয়া জন্মগ্রহণ করিল লোকে ভাবিয়া পাইত না।

 পুত্রের সহিত পিতার সাংসারিক বন্ধন ছিল না বলিলেই চলে, কিন্তু তাঁহার সকল বন্ধন গিয়া পড়িয়াছিল ভ্রাতুষ্পুত্র পরেশের উপর। হরিচরণের বড়ছেলে পরেশই যেন তাঁহার আপনার ছেলে—পরেশ এম-এ পাস করিয়া আইন পড়িতেছে—তাহাকে বর্ণ-পরিচয় হইতে আরম্ভ করিয়া আজিও সমস্ত পড়া তিনি পড়াইয়া আসিতেছেন। বিমল যে কিছু শিখিল না, এ দুঃখ তাঁহার এক পরেশ হইতে মিটিয়াছে।