শরৎ-সাহিত্য-সংগ্রহ (পঞ্চম সম্ভার)/পরেশ/২
২
ছোট ভাই হরিচরণ এত দিন বিদেশে সামান্য চাকুরিই করিতেছিল, হঠাৎ লড়ায়ের পরে কি জানি কেমন করিয়া সে বড়লোক হইয়া চাকুরি ছাড়িয়া বাড়ি চলিয়া আসিল। লোককে চড়া সুদে টাকা ধার দিতে লাগিল, স্ত্রীর নামে একটা বাগান খরিদ করিয়া ফেলিল, এবং আরও দু-একটা কি কি কাজ করিল, যাহাতে তাহার টাকার গন্ধ পাঁচ-সাতখানা গ্রামের লোকের নাকে পৌঁছিতে বিলম্ব হইল না।
একদিন হরিচরণ আসিয়া সবিনয়ে কহিল, দাদা, অনেকদিন ধরেই আপনাকে একটা কথা বলব ভাবচি—
গুরুচরণ কহিল, বেশ বল।
হরিচরণ ইতস্তত করিয়া বলিল, আপনি একলা আর কত পারবেন, বয়সও হ’ল—
গুরুচরণ কহিল, হল বই কি। ষাট চলচে।
হরিচরণ কহিল, তাই বলছিলাম আমি ত এখন বাড়িতেই রইলাম, বিষয়-আশয়গুলো সব এলোমেলো হয়ে রয়েচে, একটু চিহ্নিত করে নিয়ে যদি আমিই—
গুরুচরণ ক্ষণকাল ছোট ভাইয়ের মুখের প্রতি চাহিয়া থাকিয়া কহিল, বিষয়-আশয় আমাদের সামান্যই, আর তা এলোমেলো হয়েও নেই, কিন্তু তুমি কি পৃথক হবার প্রস্তাব করচ?
হরিচরণ লজ্জায় জিভ কাটিয়া কহিল, আজ্ঞে না না, যেমন আছে যেমন চলচে তেমনিই সব থাকবে, শুধু যা যা আমাদের আছে একটু অমনি চিহ্ন দিয়ে নেওয়া, আর রান্না-বান্নাটাও বড় ঝঞ্জাটের ব্যাপার—সমস্ত একই থাকবে—তবে ডালটা ভাতটা আলাদা করে নিলে, বুঝলেন না—
গুরুচরণ বলিলেন, বুঝেচি বই কি। বেশ, কাল থেকেই তাই হবে।
হরিচরণ জিজ্ঞাসা করিল, চিহ্নটা কিভাবে দেবেন স্থির করেচেন।
গুরুচরণ কহিলেন, স্থির করার ত এতদিন আবশ্যক হয়নি, তবে আজ যদি হয়ে থাকে, আমরা তিন ভাই তিন অংশ সমান ভাগ করে নিলেই হবে।
হরিচরণ মাথা নাড়িয়া বলিল, তিন অংশ কি রকম? মেজবৌ বিধবা, ছেলে-পুলে নেই তাঁর আবার অংশ কি? দুভাগ হবে।
গুরুচরণ মাথা নাড়িয়া বলিলেন, না, তিন ভাগ হবে। মেজবৌমা আমার শ্যামাচরণের বিধবা, যত দিন বেঁচে আছেন অংশ পাবেন বই কি!
হরিচরণ রুষ্ট হইল, কহিল, আইনে পেতে পারে না, শুধু খেতে পরতে পেতে পারে।
গুরুচরণ কহিলেন, সে ত পাবেই, কেন না বাড়ির বৌ।
হরিচরণ কহিল, ধরুন কাল যদি বিক্রি করতে কিংবা বাঁধা দিতে চায়?
গুরুচরণ বলিলেন, আইনে যদি সে অধিকার দেয়, তিনি করবেন।
হরিচরণ মুখ কালো করিয়া বলিল, হুঁ করবেন বই কি।
পরদিন হরিচরণ দড়ি লইয়া ফিতা লইয়া বাড়িময় মাপ-জোপ করিয়া বেড়াইতে লাগিল, গুরুচরণ জিজ্ঞাসাও করিলেন না, বাধাও দিলেন না। দিন দুই-তিন পরে ইঁট কাঠ বালি চূণ আসিয়া পড়িল, বাড়ির পুরানো ঝি আসিয়া খবর দিল, কাল থেকে রাজমিস্ত্রী লাগবে, ছোটবাবুর পাঁচিল পড়বে।
গুরুচরণ সহাস্যে কহিলেন, সে ত দেখতেই পাচ্চি গো, বলতে হবে কেন!
দিন পাঁচ-ছয় পরে একদিন সন্ধ্যার পরে দ্বারের বাহিরে পদশব্দ শুনিয়া গুরুচরণ মুখ বাড়াইয়া দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, পঞ্চুর মা, কি গা?
পঞ্চুর মা বহুদিনের দাসী, সে ইঙ্গিতে দেখাইয়া বলিল, মেজবৌমা দাঁড়িয়ে আছেন, বড়বাবু।
বড়বৌয়ের মৃত্যুর পর হইতে বিধবা ভ্রাতৃবধূই এ সংসারের গৃহিণী, তিনি অন্তরাল হইতে ভাশুরের সহিত কথা কহিতেন; মৃদুকণ্ঠে কহিলেন, শ্বশুরের ভিটেতে কি আমার কোন দাবি নেই যে ছোটবৌয়েরা আমাকে অহরহ গালমন্দ করচে?
গুরুচরণ কহিলেন, আছে বই কি বৌমা, যেমন তাঁদের আছে ঠিক তোমারও তেমনি আছে।
পঞ্চুর মা বলিল, কিন্তু এমনধারা করলে ত বাড়িতে আর টিকতে পারা যায় না।
গুরুচরণ সমস্তই শুনিতেছিলেন, ক্ষণকাল চুপ করিয়া থাকিয়া বলিলেন, পরেশকে আসতে চিঠি লিখে দিয়েচি পঞ্চুর মা, একবার সে এসে পড়লেই সমস্ত ঠিক হয়ে যাবে—এ কটা দিন তোমরা একটু সহ্য করে থাকো।
মেজবৌ ইতস্তত করিয়া কহিল, কিন্তু পরেশ কি—
গুরুচরণ বাধা দিয়া কহিলেন, কিন্তু নয় মেজবৌমা, আমার পরেশের সম্বন্ধে কিন্তু চলে না। হরি তার বাপ বটে কিন্তু সে আমারই ছেলে, সমস্ত পৃথিবী যদি একদিকে যায়, তবু সে আমারই। তার জ্যাঠামশাই যে কখনো অন্যায় করে না এ যদি সে না বোঝে ত বৃথাই এতদিন পরের ছেলেকে বুক দিয়ে মানুষ করে এলাম।
দাসী কহিল, সে আর বলতে? সে বছর মায়ের অনুগ্রহ হলে তুমি ছাড়া আর যমের মুখ থেকে তাকে কে কেড়ে আনতে পারতো বড়বাবু? তখন কোথায় বা ছোটবাবু আর কোথায় বা তার সৎমা। ভয়ে একবার দেখতে পর্য্যন্ত এলো না। তখন একলা জ্যাঠামশাই, কিবা দিন কিবা রাত্রি।
মেজবৌমা বলিলেন, পরেশের নিজের মা বেঁচে থাকলেও হয়ত এতখানি করতে পারতেন না।
গুরুচরণ কুণ্ঠিত হইয়া উঠিলেন, কহিলেন, থাক্ মা ও-সকল আলোচনা। তাহারা প্রস্থান করিলে বৃদ্ধের চোখের সম্মুখে যেন বিমল এবং পরেশ আসিয়া পাশাপাশি দাঁড়াইল। জানালার বাহিরে অন্ধকার আকাশের প্রতি চাহিয়া অকস্মাৎ মুখ দিয়া দীর্ঘশ্বাস পড়িল। তাহার পরে মোটা বাঁশের লাঠিটা হাতে তুলিয়া লইয়া সরকারদের বৈঠকখানায় পাশা খেলিতে চলিয়া গেলেন।
পরদিন দুপুর-বেলায় গুরুচরণ ভাত খাইতে বসিয়াছিলেন, বাটীর উত্তরদিকের বারান্দায় কতকটা অংশ ঘিরিয়া লইয়া হরিচরণের রান্নার কাজ চলিতেছিল, তথা হইতে তীক্ষ্ণ নারীকণ্ঠে কি কটু কথাই যে বাহির হইয়া আসিতেছিল তাহার সীমা নাই। তাঁহার আহারের যথেষ্ট বিঘ্ন ঘটিতেছিল, কিন্তু সহসা পুরুষের মোটা গলা আসিয়া যখন তাহাতে মিশিল, তখন ক্ষণকালের জন্যে তিনি কান খাড়া করিয়া শুনিয়া হঠাৎ উঠিয়া দাঁড়াইলেন। মেজবধূঠাকুরাণী অন্তরাল হইতে হায় হায় করিয়া উঠিলেন এবং পঞ্চুর মা ক্রোধে ক্ষোভে চীৎকার করিয়া এই দুর্ঘটনা প্রকাশ করিয়া দিল।
প্রাঙ্গণে দাঁড়াইয়া গুরুচরণ ডাকিয়া কহিলেন, হরিচরণ, মেয়েদের কথায় আমি কান দিতে চাইনে, কিন্তু তুমি পুরুষমানুষ হয়ে যদি বিধবা বড়ভাজকে এমনি করে অপমান কর, তাঁর ত তা হলে বাড়িতে থাকা চলে না।
একথার কেহ জবাব দিল না, কিন্তু বাহিরে যাইবার পথে ছোট বধূমাতার পরিচিত তীক্ষ্ণ কণ্ঠ তাঁহার কানে গেল, সে তামাসা করিয়া কহিতেছে, অমন করে অপমান করো না বলচি, মেজবৌঠাকরুণ তা হলে বাড়িতেই থাকবে না। কি হবে তখন?
হরিচরণ প্রত্যুত্তরে কহিতেছে, পৃথিবী রসাতলে যাবে আর কি! কেবা থাকবার জন্যে মাথার দিব্বি দিচ্ছে—গেলেই ত বাঁচা যায়।
গুরুচরণ থমকিয়া দাঁড়াইয়া পড়িয়াছিলেন, বক্তব্য শেষ হইলে নীরবে নিষ্ক্রান্ত হইয়া গেলেন।