বিষয়বস্তুতে চলুন

শরৎ-সাহিত্য-সংগ্রহ (পঞ্চম সম্ভার)/পরেশ/৪

উইকিসংকলন থেকে

◄  
  ►

 দ্বিধা-বিভক্ত ভদ্রাসনের এক অংশে রহিল হরিচরণ ও অপর অংশে রহিলেন গুরুচরণ ও সংসারের বহু দিনের দাসী পঞ্চুর মা। পরদিন সকালে পঞ্চুর মা আসিয়া কহিল, রান্নার সমস্ত যোগাড় করে দিয়েচি বড়বাবু।

 রান্নার যোগাড়? ও—ঠিক চল, যাচ্চি। বলিয়া গুরুচরণ উঠিবার উপক্রম করিতে দাসী কহিল, কিছু তাড়াতাড়ি নেই বড়বাবু, বেলা হৌক না—আপনি বরঞ্চ আজ গঙ্গা-স্নান করে আসুন।

 আচ্ছা তাই যাই, বলিয়া গুরুচরণ নিমেষের মধ্যে গঙ্গা স্নানে যাইবার জন্য প্রস্তুত হইয়া দাঁড়াইলেন। তাঁহার কাজ বা কথার মধ্যে অসঙ্গতি কিছুই ছিল না, তবুও পঞ্চুর মার কেমন যেন ভারি খারাপ ঠেকিল। তাহার কেবলই মনে হইতে লাগিল, এ যেন সে বড়বাবু নয়।

 পঞ্চুর মা বাড়ির ভিতরে আসিয়া চেঁচাইয়া বলিতে লাগিল, কখনো ভাল হবে না, কখনো না। শাস্তি ভগবান দেবেনই দেবেন।

 কাহার ভাল হইবে না, কাহাকে তিনি শাস্তি দেবেনই দেবেন ঠিক বুঝা গেল না, কিন্তু ছোটর তরফ হইতে এ লইয়া বিবাদ করিতে সেদিন কেহই উদ্যত হইল না।

 এমনি করিয়া দিন কাটিতে লাগিল।

 গুরুচরণের একমাত্র সন্তান বিমলচন্দ্র যে সুসন্তান নহে পিতা তাহা ভাল করিয়াই জানিতেন। মাস-কয়েক পূর্ব্বে ঘণ্টা-কয়েকের জন্য একবার সে বাড়ি আসিয়াছিল, আর তাহার দেখা নাই। সেবার একটা ব্যাগের মধ্যে সে গোপনে কি কতকগুলা রাখিয়া যায়, চলিয়া গেলে গুরুচরণ পরেশকে ডাকিয়া কহিয়াছিলেন, দেখ, ত বাবা, কি আছে ওর মধ্যে? পরেশ পরীক্ষা করিয়া দেখিয়া বলিয়াছিল, কতকগুলো কাগজপত্র, বোধ হয় দলিল-টলিল হবে। জ্যাঠামশাই, এগুলো পুড়িয়ে ফেলি।

 গুরুচরণ বলিয়াছিলেন, যদি দরকারী দলিল হয়?

 পরেশ কহিয়াছিল, দরকারী ত বটেই, কিন্তু বিমলদার পক্ষে বোধ হয় অদরকারী। বিপদ কাজ কি ঘরে রেখে?

 গুরুচরণ আপত্তি করিয়া বলিয়াছেন, না জেনে নষ্ট করা যায় না পরেশ, কারও সর্ব্বনাশ হয়ে যেতে পারে। ওগুলো তুই কোথাও লুকিয়ে রেখে দিগে বাবা, পরে যা হয় করা যাবে।

 এ ঘটনা আর তাঁর মনে ছিল না। আজ সকালে গঙ্গা স্নান করিয়া আসিয়া রাঁধিতে যাইতেছিলেন, অকস্মাৎ সেই ব্যাগ হাতে পরেশ, হরিচরণ, গ্রামের জনকয়েক ভদ্র-ব্যক্তি এবং পুলিশের দারোগা কনেষ্টবলের দল আসিয়া উপস্থিত হইল।

 ঘটনাটা সংক্ষেপে এই যে, বিমল ডাকাতির আসামী সম্প্রতি ফেরার। খবরের কাগজে খবর পাইয়া পরেশ পুলিশের গোচর করিয়াছে। ব্যাগটা এতদিন তাহার কাছেই ছিল। বিমল মন্দ ছেলে, সে মদ খায়, আনুষঙ্গিক দোষও আছে, কলিকাতায় থাকিয়া কি একটা সামান্য চাকুরি করিয়া সে এই সব করে। কিন্তু সে ডাকাতি করিতে পারে এ সংশয় পিতার মনের মধ্যে কখনো স্বপ্নেও উদয় হয় নাই। কিছুক্ষণ নির্নিমেষ দৃষ্টিতে পরেশের মুখের প্রতি গুরুচরণ চাহিয়া রহিলেন, তাহার পরে সেই নিষ্প্রভ অপলক দুই চক্ষের কোণ বহিয়া ঝর ঝর করিয়া জল গড়াইয়া পড়িল, বলিলেন, সমস্তই সত্যি, পরেশ একটা কথাও মিছে বলেনি।

 দারোগা আরও গোটা দুই-তিন কথা জিজ্ঞাসা করিয়া তাঁহাকে ছুটি দিল। যাবার সময় লোকটা হঠাৎ হেঁট হইয়া গুরুচরণের পায়ের ধূলা লইয়া বলিল, আপনি বয়সে বড়, ব্রাহ্মণ আমার অপরাধ নেবেন না। এত বড় দুঃখের কাজ আমি আর কখনো করি নি।

 আরো মাস-কয়েক পর খবর আসিল বিমলের সাত বৎসর জেল হইয়াছে।