বিষয়বস্তুতে চলুন

শরৎ-সাহিত্য-সংগ্রহ (পঞ্চম সম্ভার)/বাল্য-স্মৃতি/৩

উইকিসংকলন থেকে

◄  

 সেদিন অনেক রাত্রে আমি বেড়াইয়া আসিলাম। বাসায় আসিয়া দেখিলাম, একটা প্রকাণ্ড হৈ-চৈ কাণ্ড বাধিয়া উঠিয়াছে। গদাধরকে মাঝখানে লইয়া সকলে গোল হইয়া বসিয়াছেন। মেজদাদা অতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়াছেন। গদাধরের জেরা চলিতেছে।

 গদাধরের চক্ষু দিয়া টস্ টস্ করিয়া জল পড়িতেছে। বলিতেছে, বাবু, আমি ওটা ছুঁয়েছিলাম বটে, কিন্তু ভাঙ্গিনি, সুকুমারবাবু আমাকে দেখালেন—আমিও দেখলাম। তার পর তিনিও বেড়াতে গেলেন, আমিও রাঁধতে গেলাম।

 কেহই তাহার কথা বিশ্বাস করিল না। সাব্যস্ত হইয়া গেল, সে-ই চিননী ভাঙ্গিয়াছে। তাহার মাহিনা বাকি ছিল; সেই টাকা হইতে সাড়ে তিন টাকা দিয়া আবার নূতন চিমনী আসিল। সন্ধ্যার সময় যখন আলো জ্বলিল, তখন সকলেই বেশ প্রফুল্ল হইল, শুধু আমার চক্ষু দুটো জ্বালা করিতে লাগিল। সর্ব্বদা মনে হইতে লাগিল, তাহার সাড়ে তিন টাকা চুরি করিয়া লইয়াছি। আর থাকিতে পারিলাম না। কাঁদিয়া কোনও মতে সেজদাদার মত করিয়া বাড়ি আসিয়া উপস্থিত হইলাম। মনে করিয়াছিলাম, ঠাকুরমার নিকট হইতে টাকা আনিয়া গোপনে সাড়ে তিন টাকার পরিবর্ত্তে গদাধরকে সাত টাকা দিব। আমার নিজের কাছে তখন টাকা ছিল না। সব টাকা সেজদাদার নিকট ছিল। কাজেই টাকা আনিতে আমাকে দেশে আসিতে হইল। মনে করিয়া আসিয়াছিলাম একদিনের অধিক থাকিব না। কিন্তু তাহা ঘটিয়া উঠিল না। সাত-আট দিন দেশে কাটিয়া গেল।

 সাত-আট দিন পরে আবার কলিকাতার বাসায় ঢুকিলাম। ঢুকিয়াই ডাকিলাম, গদা! কেহ উত্তর দিল না। আবার ডাকিলাম, গদাধর ঠাকুর! কোনও উত্তর নাই! গদা! এবার রামচরণ আসিয়া বলিল, ছোটবাবু, কখন এলেন?

 এই আসচি—ঠাকুর কোথায়?

 ঠাকুর নেই

 কোথায় গেছে?

 বাবু তাকে তাড়িয়ে দিয়েচেন।

 তাড়িয়ে দিয়েছেন? কেন?

 চুরি করেছিল বলে।

 প্রথমে আমি কথাটা ভাল বুঝিতে পারি নাই, তাই কিছুক্ষণ রামার মুখ পানে চাহিয়া রহিলাম। রামা আমার মনের ভাব বুঝিতে পারিয়া একটু মুখ টিপিয়া হাসিয়া বলিল, ছোটবাবু আশ্চর্য্য হচ্ছেন, কিন্তু তাকে ত আপনারা চিনতেন না। তাই অত ভালবাসতেন। সে মিট-মিটে ডান ছিল; ভিজে বেড়ালকে আমি চিনতাম।

 কিসে সে মিট-মিটে ডাইন ছিল, কিংবা কেন যে সেই সিক্ত মার্জ্জারকে চিনিতে পারি নাই, তাহা বুঝিতে পারিলাম না। জিজ্ঞাসা করিলাম, কার টাকা চুরি করেচে?

 সেজবাবুর।

 কোথায় ছিল?

 জামার পকেটে।

 কত টাকা?

 চার টাকা।

 কে দেখেচে?

 চোখ দিয়ে কেউ দেখেনি বটে, কিন্তু সে এক রকম দেখাই।

 কেন?

 সে কথা কি আর জিজ্ঞাসা করতে হয়? আপনি বাসায় ছিলেন না; রামবাবু নিলেন না; জগন্নাথবাবু নিলেন না; আমি নিলাম না। তবে নিলে কে? কোথায় গেল?

 তুই তবে তাকে ধরেছিস্?

 রাম হাসিয়া বলিল, না হলে আর কে?

 ঠনঠনের চটি-জুতা আপনারা স্বচ্ছন্দে কিনিতে পারেন। তেমন মজবুত চটি বোধ হয় আর কোথাও প্রস্তুত হয় না।

 আমি রন্ধনশালায় গিয়া কাঁদিয়া ফেলিলাম। সেই ছোট কলি হুঁকোটিতে ধূলা পড়িয়া রহিয়াছে। আজ চারি-পাঁচ দিন তাহা কেহ স্পর্শ করে নাই; কেহ জল বদলায় নাই। দেওয়ালে এক স্থানে কয়লায় লেখা রহিয়াছে, সুকুমারবাবু, আমি চুরি করিয়াছি। এ স্থান হইতে চলিলাম। বাঁচিয়া থাকি আবার আসিব।

 আমি তখন ছেলেমানুষ ছিলাম। নিতান্ত ছেলে-বুদ্ধিতে সেই হুঁকোটিকে বুকে টিপিয়া ধরিয়া কাঁদিতে লাগিলাম। কেন যে, তাহার কারণ বুঝিতে পারি নাই।

 আমার আর সে বাসাতে মন টিকিত না। সন্ধ্যার সময় ঘুরিয়া ফিরিয়া একবার করিয়া রান্নাঘরে প্রবেশ করিতাম। আর একজন রাঁধিতেছে দেখিয়া অন্যমনে আপনার ঘরে আসিয়া বই খুলিয়া পড়িতে বসিতাম। সময় সময় আমার সেজদাদাকেও দেখিতে পাইতাম না। ভাত পর্য্যন্ত আমার তিক্ত বোধ হইত। অনেকদিন পরে একদিন রাত্রে সেজদাদাকে বলিলাম, সেজদা! কি করেচ?

 কিসের কি করেচি?

 গদা তোমার টাকা কখনও চুরি করেনি। সকলেই জানিত আমি গদা ঠাকুরকে বড় ভালবাসিতাম। সেজদাদা বলিলেন, ভাল করিনি সুকুমার। যা হবার হয়েচে, কিন্তু রামকে তুই অত মেরেছিলি কেন?

 বেশ করেছিলাম। আমাকেও কি তাড়াবে নাকি?

 দাদা আমার মুখে কখনও অমন কথা শোনেন নাই। আমি আবার জিজ্ঞাসা করিলাম, তোমার কত টাকা উসুল হয়েছে? দাদা বড় দুঃখিত হইয়া বলিলেন, ভাল করিনি। সব টাকা তার কেটে নিয়ে আড়াই টাকা উসুল করেছিলাম। আমার এতটা ইচ্ছে ছিল না।

 আমি যখন রাস্তায় ঘুরিয়া বেড়াইতাম, দূরে যদি কোনও লোক ময়লা চাদর কাঁধে ফেলিয়া ছেঁড়া চটিজুতা পায়ে চলিয়া যাইত, আমি দৌড়াইয়া গিয়া দেখিয়া আসিতাম। কি যে একটা আশা নিত্য নিত্য নিরাশায় পরিণত হইত, তাহা আর কি বলিব?

 প্রায় পাঁচ মাস পরে দাদার নামে একটা মনি-অর্ডার আসিল। দেড় টাকার মনি-অর্ডার। দাদাকে আমি সেই দিন চোখের জল মুছিতে দেখি। সে কুপনটা এখনও আমার নিকট রহিয়াছে।

 কত বৎসর কাটিয়া গিয়াছে। আজও সেই গরীব গদাধর ঠাকুর আমার বুকের আধখানা জুড়িয়া বসিয়াছে।

সমাপ্ত

পরেশ