বিষয়বস্তুতে চলুন

শরৎ-সাহিত্য-সংগ্রহ (পঞ্চম সম্ভার)/বোঝা/দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

সুশীলার ছেলের অন্নপ্রাশন

 সুশীলা সরলার বড়দিদি। তাহার ছেলের ভাত। সুতরাং কামাখ্যাবাবু দৌহিত্রের অন্নপ্রাশন-উপলক্ষে সরলাকে বাটী লইয়া যাইবার জন্য কলিকাতায় আসিলেন।

 সরলার দিদি, সরলা ও সত্যেন্দ্রকে যাইবার জন্য বিশেষ অনুরোধ করিয়া পত্র লিখিয়াছে। বিশেষ, সরলা প্রায় তিন বৎসর যাবৎ দিলজানপুরে যায় নাই। সত্যেন্দ্রও যখন যাইতে সম্মত হইল, তখন কামাখ্যাবাবু পরমানন্দে জামাতা-কন্যা লইয়া দেশে আসিলেন।

 গৃহিণী বহুদিবসের পর তাঁহাদিগকে পাইয়া অত্যন্ত আহ্লাদিতা হইলেন। যাহার ছেলের ভাত, সে আসিয়া দুইজনকেই অনেক কথা শুনাইয়া দিল, অনেক রকমে আপ্যায়িত করিল।

 শুভকর্ম্ম নির্ব্বিঘ্নে সমাধা হইয়া যাইবার পর সত্যেন্দ্র বাটী যাইতে চাহিল, কিন্তু গৃহিণী তাহাতে বিশেষ আপত্তি করিলেন, বলিলেন, এতদিন পরে এসেচ, আরও কিছুদিন থাকতে হবে।

 সরলাও ছাড়িল না, সুতরাং আরও দুই-চারি দিন থাকিতে সত্যেন্দ্র সম্মত হইল। দুই-চারি দিন কাটিয়া গেল, তবু সরলা ছাড়িতে চাহে না। কিন্তু না যাইলেও নহে, পড়াশুনার বিশেষ ক্ষতি হয়; পরীক্ষারও অধিক বিলম্ব নাই। আসিবার সময় সরলা জিজ্ঞাসা করিল, আমাকে আবার কবে নিয়ে যাবে?

 সত্যেন্দ্র কহিল, যখন যাবে তখনই।

 তা হলে আমাকে দশ-বার দিন পরেই নিয়ে যেও।

 সত্যেন্দ্র অতিশয় আহ্লাদিত হইল। সে এতটা ভাবে নাই।

 তখন অশ্রু-জলের মধ্যে সরলা স্বামীকে বিদায় দিয়া হাসিয়া বলিল, দেখো, আমার জন্য যেন ভেব না, আর রাত্রি পর্য্যন্ত পড়ে যেন অসুখ না হয়।

 রাত্রি দশটার অধিক না পড়িবার জন্য সরলা বিশেষ করিয়া মাথার দিব্য দিয়া দিল। কি একটা উদাস-পারা প্রাণ লইয়া সত্যেন্দ্র সেইদিন কলিকাতায় পৌছিল।

 সত্যেন্দ্র একখানা পুস্তক লইয়া বসিয়াছিল। পুস্তকের পৃষ্ঠার সহিত মনের একটা বিষম দ্বন্দ্ব-যুদ্ধ চলিয়াছিল।

 সত্যেন্দ্র গণিয়া দেখিল, সমস্ত দিনে মোটে ছাব্বিশ লাইন পড়া হইয়াছে। দুঃখিতভাবে সে ভাবিল, বাঃ! এই রকম পড়লেই পাশ হব! ক্রমে দুঃখ ঈষৎ ক্রোধে পরিণত হইল। সে ভাবিল, সমস্ত পোড়ামুখী সরোর দোষ। এই পাঁচদিন এসেছি, একটুকুও পড়তে পারিনি। আগে মনে হ’ত পড়ার সময় বিরক্ত করে, দশটার বেশি পড়তে গেলেই আলো নিভিয়ে দেয়, একে কোথাও পাঠিয়ে দিলে ভাল করে পড়বো। ঠিক উল্টো! কালই তাকে আনতে যাবো, না হলে লজ্জার খাতিরে কি ফেল্ হবো?

 যাহা হৌক, সত্যেন্দ্রনাথ এইরূপ একটা মতলব আঁটিতেছিল—কি করিয়া আনাই। কেমন করিয়াই বা বলি? লজ্জা করে। এত ভালই বা বাসিলাম কেমন করিয়া? দুদিন—

 একটা ভৃত্য আসিয়া একখানা টেলিগ্রাম হাতে দিল, সত্যেন্দ্র অতিশয় বিস্মিত হইল, আর ভাবিবার সময় নাই; কোথাকার টেলিগ্রাম? কভার খুলিতে সত্যর হৃৎকম্প হইল। ভিতরে যাহা লেখা ছিল, তাহাতে মাথা একেবারে ঘুরিয়া গেল। সরলা পীড়িতা।

 সেই দিনই হরদেববাবু সত্যেন্দ্রকে লইয়া দিলজানপুর যাত্রা করিলেন।

 বাটীর সম্মুখে কামাখ্যাবাবুর সহিত সাক্ষাৎ হইল। হরদেববাবু চীৎকার করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, মা কেমন?

 কামাখ্যাবাবু কহিলেন, আসুন, ভিতরে চলুন।

 হরদেববাবু ভিতরে গিয়া দেখিলেন, সরলা বিসূচিকা রোগে আক্রান্তা, একদিনে সরলাকে যেন আর চেনা যায় না। চক্ষু বসিয়া গিয়াছে, পদ্মের মত মুখখানিতে কালিমা পড়িয়াছে। বিজ্ঞ হরদেববাবু বুঝিলেন অবস্থা বড় ভাল নহে। চক্ষু মুছিয়া ডাকিলেন, মা, সরলা!

 সরলা চাহিয়া দেখিল। তখনও সরলার বেশ চৈতন্য আছে।—কেমন আছ মা?

 সরলা হাসিয়া বলিল, ভাল আছি ত!

 দুজনেই বুঝিল, এটা আপোষে মিটমাট হইয়া গেল। সকলে চলিয়া যাইলে সত্যেন্দ্র আসিয়া কাছে বসিল। দারুণ আতঙ্কে কথা বাহির হইল না। তখন জোর করিয়া নীরস ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় সত্যেন্দ্র ডাকিল, সরো! শুষ্ক ভাঙ্গা গলা! ক্ষতি কি! সেই চির-পরিচিত স্বর, সেই আদরের ডাক—সরো! একি ভুল হয়? সরলা চাহিল। সে হরদেববাবুকে দেখিয়া পূর্ব্বেই সত্যেন্দ্রর আগমন অনেকটা অনুমান করিয়াছিল। সরলা স্বামীকে তামাসা করিতে বড় ভালবাসিত, হাসিয়া বলিল, কি, নিতে এসেচ?

 কথা বসিয়া গিয়াছে। এতক্ষণ কোনমতে সত্যেন্দ্র চক্ষুর জল চাপা দিয়া রাখিয়াছিল, অবস্থা দেখিয়া সে বালির বাঁধ ভাঙ্গিয়া গেল।

 সত্যেন্দ্র জানিত, এ সময়ে কাঁদিতে নাই। কিন্তু পোড়া চোখের জলের কি সে বিবেচনা আছে? বেশ ধীরে ধীরে স্বচ্ছন্দে তাহারা একটির পর একটি করিয়া ফোঁটায় নামিতে আরম্ভ করিল। তাহারা যে সরলার অঙ্গে মিশিতেছে। এ অবকাশ তাহাদের কখনও হইয়াছে কি? কখনও হয় নাই। তোমার কিংবা সরলার খাতিরে তাঁহারা কি এ সুযোগ ছাড়িয়া দিবে? সরলা স্বামীকে কখনও কাঁদিতে দেখে নাই। সেও কাঁদিল। অনেকক্ষণ পরে চক্ষু মুছিয়া সে বলিল, ছি, কাঁদ কেন? পুরুষমানুষের কি কাঁদতে আছে?

 একি? বটে সরলা? বেশ বুঝিয়াছ। অন্তর্দ্দাহে তাহারা শুকাইয়া কাঠ হইয়া যাউক, এক ফোঁটা জল যেন না পড়ে। অশ্রু স্ত্রীলোকের জন্য। পুরুষের তাহাতে হাত দিবার অধিকার নাই। যন্ত্রণায় পুড়িয়া যাও কাঁদিতে পাইবে না। কাঁদিলে স্ত্রীলোক হইয়া যাইবে। সরলা! এ ব্যবস্থা কি তোমরাই করিয়াছ? সরলা স্বামীর হাত আপনার হাতে টিপিয়া ধরিয়া কাঁদিয়া বলিল, পরজন্ম বিশ্বাস কর কি?

 সত্যেন্দ্র কাঁদিতে কাঁদিতে বলিল, করতাম কি না জানি না, কিন্তু আজ হতে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করব।

 সরলার মুখে ঈষৎ হাসির চিহ্ন প্রকাশ পাইল। ঔষধ খাওয়াইবার সময় হইয়াছে দেখিয়া, কামাখ্যাবাবু, হরদেববাবু এবং ডাক্তারবাবু কক্ষে প্রবেশ করিলেন। ডাক্তার নাড়ী টিপিয়া বলিলেন, আশা বড় কম, তবে ঈশ্বরের ইচ্ছা।

 ঈশ্বরের ইচ্ছায় পরদিন বেলা সাতটার সময় সরলার মৃত্যু হইল।

 সন্ধ্যার সময় হরদেববাবু সত্যেন্দ্রকে লইয়া কলিকাতায় ফিরিলেন।