শরৎ-সাহিত্য-সংগ্রহ (পঞ্চম সম্ভার)/বোঝা/নবম পরিচ্ছেদ
নবম পরিচ্ছেদ
নরেন্দ্রবাবুর পত্র
যুবার অভিমান কোন বালকে দেখিয়াছ কি? সত্যেন্দ্রর ন্যায় অভিমান করিয়া এতটা অনর্থপাত করিতে কোন বালককে দেখিয়াছ কি? ছেলে-বেলায় পুস্তক লইয়া খেলা করিতাম বলিয়া পিতার নিকট শাস্তি ভোগ করিয়াছি। সত্যেন্দ্রনাথ! তুমি হৃদয় লইয়া খেলা করিয়াছ, শাস্তি পাইবে ভয় হয় কি?
তোমরা যুবা; সমস্ত সংসারটাই তোমাদের সুখের নিকেতন; কিন্তু বল দেখি, তোমাদের কাহারও কি এমন একটা সময় আসে নাই—যখন প্রাণটা বাস্তবিকই ভার বোধ হইয়াছে? যখন জীবনের প্রত্যেক গ্রন্থিগুলি শ্লথ হইয়া ক্লান্তভাবে ঢলিয়া পড়িবার উপক্রম করিয়াছে? না হইয়া থাকে একবার সত্যেন্দ্রনাথকে দেখ। ঘৃণা করিতে ইচ্ছা হয় স্বচ্ছন্দে ঘৃণা কর। ঘৃণা কর, সহানুভূতি প্রকাশ করিও না। ঘৃণা কর, কিছু বলিবে না; দয়া করিও না, মরিয়া যাইবে।
পাপী যদি মরিয়া যায়, প্রায়শ্চিত্ত ভোগ করিবে কে? সত্যেন্দ্র শ্রান্ত জীবনের প্রত্যেক দিন এক একটা দুঃসহ বোঝা লইয়া আসে। সমস্ত দিন ছটফট করিয়াও যেন সে বোঝা আর নামাইতে পারে না।
সত্যেন্দ্রর মাঝে মাঝে বোধ হয় যেন সে তাহার অতীত জীবন সমস্ত বিস্মৃত হইয়া গিয়াছে; শুধু কিছুতেই ভুলিতে পারে না তাহার সাধের নলিনী পাবনায় চরিত্রহীনা হইয়াছিল, তাই সে তাহার স্বামী-কর্ত্তৃক পরিত্যক্ত হইয়াছে।
প্রায় দুই মাস গত হইল, সত্যেন্দ্রনাথের বিবাহ হইয়াছে, আজ একখানা পত্র ও একটী ছোট পার্শ্বেল আসিয়া সত্যেন্দ্রর নিকট পৌছিল।
পত্রটি নলিনীর দাদা নরেন্দ্রবাবুর, সেখানি এই—
সত্যেন্দ্রবাবু,
অতি অনিচ্ছাসত্ত্বেও যে আপনাকে পত্র লিখিতেছি, সে কেবল আমার প্রাণাধিকা ভগিনী নলিনীর জন্য। মৃত্যুর পূর্ব্বে সে অনেক করিয়া বলিয়া গিয়াছে, যেন এই অঙ্গুরীয়টি আপনার নিকট পুনঃ প্রেরিত হয়। আপনার নামাঙ্কিত অঙ্গুরীয়টি পাঠাইলাম। ভগিনীর ইচ্ছা ছিল এইটি আপনার নূতন স্ত্রীকে পরাইয়া দেন, ভরসা করি তাহার আশা পুরিবে। আর মৃত্যুর পূর্ব্বে সে আপনাকে বিশেষ করিয়া অনুনয় করিয়া গিয়াছে, যেন তাহার ছোট ভগিনীটি ক্লেশ না পায়।
শ্রীনরেন্দ্রনাথ
নলিনীর যখন একটি ছোট পুত্র-সন্তান হইয়া মরিয়া যায়, সত্যেন্দ্রনাথ এই অঙ্গুরীয়টি তাহার হস্তে পরাইয়া দিয়াছিলেন; সে কথা মনে পড়িয়াছিল কি?
* * * *
সত্যেন্দ্রনাথ আর পাবনায় যান নাই। যে কারণেই হৌক মাতাঠাকুরাণী আর কাশীবাসী হইতে পারিলেন না। নূতন বধুর নাম ছিল বিধু। বিধু বোধ হয় পূর্ব্বজন্মে নলিনীর ভগিনী ছিল।
সমাপ্ত