বিষয়বস্তুতে চলুন

শিখগুরু

উইকিসংকলন থেকে

শিখ গুরু

শ্রীকার্ত্তিক চন্দ্র মিত্র বি-এ

সুলভ গ্রন্থমালা কার্য্যালয়

১৩ নং শঙ্কর ঘোষের লেন,

কলিকাতা

১৩২৯

মূল্য ৸৹ আনা

Published by M. P. SETH.

SULABH GRANTHAMALA KARYALAYA

13, Shanker Ghose Lane,

CALCUTTA.

ALL RIGHTS RESERVED

Printed by M. P. Seth at the

Balkrishna Press”

13, Shanker Ghose Lane,

CALCUTTA.

অনাথ-আর্ত্তের সহায়, সম্পদ, শরণ, দয়াল-দেবতা—
আচার্য্য শ্রীমৎ স্বামী সারদানন্দ মহারাজের
শ্রীকরকমলেষু—

নিবেদন

 সাহিত্যক্ষেত্রে ইহাই আমার প্রথম প্রয়াস। পাঁচ বৎসর পূর্ব্বে শ্রদ্ধেয় ব্রহ্মচারী শান্তিচৈতন্যজীর অনুপ্রেরণায় শিখগুরুদিগের উপর কয়েকটী প্রবন্ধ লিখিতে প্রবৃত্ত হই—এইগুলি তিনি ‘উদ্বোধন’ পত্রে প্রকাশ করিয়া আমাকে উৎসাহিত করেন। ধারাবাহিকভাবে মাসিক সাহিত্যে যাহা বাহির হইয়াছিল—বন্ধুর অনুরোধে তাহাই আজ পুস্তকাকার ধারণ করিল। প্রবন্ধগুলি, বর্ত্তমান উদ্দেশ্য স্মরণ রাখিয়া, পূর্ব্ববৎ প্রকাশ করাই যুক্তিযুক্ত বোধ করিলাম। স্থানে স্থানে প্রয়োজন বোধে দুই চারিটী সংশোধন করিয়াছি,―তাহাকে নূতন ছাঁচে ঢালিয়া সাজা বলা চলে না। কেবলমাত্র সূচনাটা নূতন সংযোজিত। আলোচ্য বিষয়ের সার্থকতা কোথা এবং সমগ্র ভারতেতিহাসে শিখগুরুকাহিনীর স্থান কোথায়,—তথায় অতি সংক্ষেপে ইহা নির্ণয়ের চেষ্টা হইয়াছে।

 মৌলিক গবেষণার তিলমাত্র দাবী এখানে আমার নাই। বিভিন্ন গ্রন্থ হইতে উপাদান সঙ্কলন করিয়া, বিচার বিশ্লেষণ ও চিন্তাসহায়ে ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর ব্যাখ্যা ও মর্ম্মোদ্‌ঘাটনে সচেষ্ট হইয়াছি। অতীতকে সরস ও জীবন্ত করিয়া, যতদূর সম্ভব সংক্ষেপে বিভিন্ন প্রস্তাবের সার্থকতা ও উপযোগিতা স্মরণ রাখিয়া একটা ধারাবাহিক বিবরণ-চিত্র সাধারণের চক্ষে ধরাই আমাদিগের উদ্দেশ্য। কতদূর সফল হইয়াছি জানি না। যে সকল গ্রন্থকার পরিশ্রম করিয়া আলোচ্য বিষয়ের উপর বিভিন্ন পুস্তক লিখিয়াছেন, তাঁহারা সকলেই আমাদের ধন্যবাদার্হ। এ বিষয় যাঁহারা বিশদ আলোচনা করিতে ইচ্ছুক তাঁহারা শেষে সংশ্লিষ্ট তালিকা হইতে কিঞ্চিৎ ইঙ্গিত পাইবেন।

 এখানে ধর্ম্মেতিহাসের একটা সম্যার কথা উল্লেখ করা আবশ্যক। সকল দেশের ইতিহাসেই ধর্ম্মাচার্য্যদিগের জীবনী ও তাঁহাদের কার্য্যাবলীর সহিত কতকগুলি অলৌকিক ঘটনা সংশ্লিষ্ট থাকে—যেগুলি তত্তৎযুগের মানুষ বিশ্বাস করিত এবং আচার্য্যেরা স্বয়ং আপনাপন জীবনে ঐগুলিকে পরম সত্য বলিয়া অতি উচ্চস্থান দিতেন।

 অধুনা-প্রচলিত বৈজ্ঞানিক প্রণালীর ইতিহাস-গবেষক ঐগুলি অপ্রয়োজনীয় ও অমূলক বোধে স্বয়ং বিশ্বাস না করিতে পারেন—কিন্তু তাঁহাকেও ইহা লিপিবদ্ধ করিতে হইবে, যে সে যুগের মানুষ ও সর্ব্বোপরি আচার্য্যেরা স্বয়ং সেগুলি বিশ্বাসচক্ষে দেখিতেন। বলা বাহুল্য, আমরা এখানে বৈজ্ঞানিক ইতিহাস গবেষণায় প্রবৃত্ত হই নাই—বরং বিধাতাই মানবেতিহাসের নিয়ন্তা (যাহা কোন কোন প্রথিতনামা ঐতিহাসিকেরও মত)—ইহাই বলা হইয়াছে। গুরুদিগের আধ্যাত্মিক সাধন ও অলৌকিক দর্শনের কথা শ্রদ্ধান্বিত হইয়া উপস্থাপিত করিতে প্রয়াস পাইয়াছি। কতদূর সফল হইয়াছে—সে বিচার আমাদিগের নহে।

 শিখগুরুগণের উপর বৈজ্ঞানিক গবেষণার যথেষ্ট অবকাশ রহিল,—তবে বর্ত্তমান অনুসৃত আলোচনা প্রণালীরও ধর্ম্মেতিহাসে স্থান আছে বলিয়া আমাদের মনে হয়। ভবিষ্যতে সুবিধা হইলে অন্যত্র আমরাই বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রবৃত্ত হইতে পারি। বর্ত্তমান পুস্তক পাঠে যদি কাহারও আলোচ্য বিষয়, সম্পূর্ণ বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করিয়াও আরও বিশদভাবে আলোচনার অনুসন্ধিৎসা হয়, তাহা হইলেই আমাদিগের শ্রম সার্থক।

 নবীন লেখকের দোষ-ত্রুটী, ভুল-ভ্রান্তি যথেষ্ট থাকিবার কথা—পাঠকপাঠিকারা সেগুলি চোখে পড়িলে কৃপা করিয়া আমাদের জানাইলে ভবিষ্যতে পরিবর্ত্তিত হইতে পারে।

 শেষ কথা—কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালিভাষার ও প্রাচীন ভারতের ধর্ম্মেতিহাসের অধ্যাপক ডাক্তার বেণীমাধব বড়ুয়া এম-এ, ডি-লিট্‌ (লণ্ডন) মহোদয় আমার ন্যায় নগণ্য লেখকের রচনার উপর ভূমিকা লিখিয়া দিয়া স্বীয় মহানুভবতার পরিচয় দিয়াছেন এবং চিরতরে আমাকে কৃতজ্ঞতা পাশে বাঁধিয়াছেন। এতদ্ভিন্ন মদীয় পিতৃতূল্য প্রবীণ সাহিত্যিক শ্রীযুত দেবেন্দ্রনাথ বসু মহাশয় ও কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিখ-ইতিহাসের অধ্যাপক শ্রীযুত ইন্দুভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এম-এ, মহোদয়দ্বয় পাণ্ডুলিপি শ্রবণ করিয়া ও মন্তব্য দিয়া আমাকে যথেষ্ট উৎসাহিত করিয়াছেন।

 মা’র নিকট শিখিয়াছি নবীন ঋতুর নূতন ফল আপনি গ্রহণ করিবার পূর্ব্বে প্রথমে দেবতাকে অর্পণ করিতে হয়—তাই বাণীর পুণ্যঅঙ্গনে আমার এই প্রথম প্রয়াসের ফল দেবীর পাদপদ্মে অঞ্জলি দিলাম।[] অলমিতি—

১ নং মুখার্জি লেন
১৯ শে জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৯
বাগবাজার, কলিকাতা

বিনীত—
 গ্রন্থকার

সূচীপত্র

ভূমিকা
    
৶০
    
    
১৯
    
২৭
৩৩
৪৮
৫৭
৭১
    
৮৮

ভূমিকা

 এই পুস্তকের রচয়িতা মদীয় সুহৃৎ শ্রীযুক্ত কার্ত্তিকচন্দ্র মিত্র বি-এ মহাশয়ের নাম ‘উদ্বোধন’ পত্রের পাঠক-পাঠিকার নিকট সুপরিচিত। ‘শিখগুরু’ সাহিত্যক্ষেত্রে তাঁহার প্রথম উদ্যমের ফল। ইহা পাঁচবৎসর পূর্ব্বে প্রবন্ধাকারে ‘উদ্বোধন’ পত্রে প্রকাশিত হয়। এই প্রবন্ধগুলিকে পুস্তকাকারে প্রকাশ করিবার জন্য আমার বিশেষ আগ্রহ ছিল এবং অবশেষে আমার আশা ফলবতী হইয়াছে দেখিয়া, আমি বড়ই আনন্দিত। গ্রন্থকারের সহিত পরিচয় ও বন্ধুত্ব হওয়ার পরে আমি তাঁহার লিখিত অনেকগুলি বাঙ্গলা ও ইংরাজী প্রবন্ধ পাঠ করিয়াছি। তিনি সম্প্রতি প্রাচীন ভারতের ইতিহাস এবং সভ্যতা বিষয়ে অনুরাগী হইয়াছেন। তাঁহার সমস্ত ঐতিহাসিক প্রবন্ধের মধ্যে এমন একটা অপূর্ব্ব ভাব, মাধুর্য্য, সংযম ও নিরপেক্ষতা আছে, যাহা তাঁহার চরিত্রের সহিত পরিচয় না থাকিলে কেহ সহজে অনুভব করিতে পারিবেন না। ভক্ত এবং জিজ্ঞাসুর একত্র সমাবেশ কিরূপে সম্ভবপর, তাহা বাঙ্গালী না হইলে ঠিক বুঝিতে পারা যায় না।

 তবে, আমি একথা বলিতে বাধ্য যে ‘শিখগুরু’তে গ্রন্থকার, আমার নিকট জিজ্ঞাসু অপেক্ষা, ভক্তের মূর্ত্তিতেই প্রতীয়মান। তাহা হইলেও তাঁহার রচনাকে ঐতিহাসিক গ্রন্থের কোঠায় স্থান দিতে হইবে। ভক্তের দিক হইতে লিখিত হইল বলিয়া কোন রচনা ইতিহাস-শ্রেণীতে স্থান পাইবে না, এমন কোন যুক্তি নাই। আমি যতদূর জানি, বাঙ্গলাভাষায় শিখগুরু এবং তাঁহাদের ধর্ম্মমত ও কার্য্যাবলী সম্বন্ধে অতি অল্প আলোচনাই হইয়াছে। শ্রীযুক্ত অবিনাশচন্দ্র মজুমদার জপজী হইতে গুরু নানকজীর কতকগুলি দোঁহা অনুবাদ ও সম্পাদন করিয়া বাঙ্গলা সাহিত্যের শ্রীবৃদ্ধি করিয়াছেন। শ্রীযুক্ত তিনকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখনী বাঙ্গলাভাষায় দশম গুরু গোবিন্দসিংহের বিশদ পরিচয় দিয়াছে। শ্রীশরচ্চন্দ্র রায় ‘শিখগুরু ও শিখজাতি’ পুস্তকে সমগ্র শিখ-ইতিহাসের দৃষ্টি লইয়া গুরুদের কথা অতি সংক্ষেপে আলোচনা করিয়াছেন। শিখগুরুদের সম্বন্ধে হয়ত খুঁজিয়া দেখিলে আরও দুই চারিটী ছোট ছোট প্রবন্ধমাত্র পাওয়া যাইতে পারে। এপর্য্যন্ত বাঙ্গলাভাষায় শিখগুরু কিংবা ধর্ম্মসম্বন্ধে যে কয়টা রচনা আছে তন্মধ্যে কোথাও প্রকৃত ঐতিহাসিক আলোচনা এবং ধারাবাহিক বিবরণ পাওয়া যায় না। বর্ত্তমান পুস্তকখানি, যেভাবে লিখিত,—আমার বিশ্বাস আছে, ইহা বঙ্গীয় পাঠককে ঐতিহাসিক আলোচনার পথে লইয়া যাইবে। যে পর্য্যন্ত শিখধর্ম্ম ও জাতি সন্বন্ধে গবেষণা আরম্ভ না হয়,―কি প্রবন্ধাকারে, কি পুস্তকাকারে—যেটুকু আলোই পাওয়া যায়, তাহাই কৃতজ্ঞহৃদয়ে আমাদের সকলের গ্রহণ করা কর্ত্তব্য।

 ভারতবর্ষের কিরূপ রাজনৈতিক অবস্থার মধ্যে এবং কিরূপ সমাজবেষ্টনীতে পাঞ্জাব অঞ্চলে শিখধর্ম্মের ন্যায় ভগবৎবিশ্বাসে পূর্ণ একটা নবধর্ম্মের সূচনা হইয়াছিল; গুরুর পর গুরু এবং শিষ্যের পর শিষ্য আসিয়া কিরূপে সেই ধর্ম্মের অঙ্গ পূর্ণ এবং গতি পরিবর্ত্তিত করিয়াছিলেন; কিরূপে শিখনামে এক সম্প্রদায়ের উদ্ভব হইয়া ক্রমে তাহা এক প্রবল জাতিতে পরিণত হইয়াছিল; এই ধর্ম্ম ও জাতীয় জীবন গঠনব্যাপারে গুরুদের চরিত্র ও শিক্ষা-জাঠ্ প্রভৃতি পাঞ্জাবের রণমত্ত জাতিসকলের চরিত্র এবং মুসলমান সম্রাটগণের শাসনপ্রণালীর বৈশিষ্ট্য কি পরিমাণে দৃষ্ট হয়; শিখ ধর্ম্ম, ভাষা, সাহিত্য, শিল্প এবং সমাজের ধারায় ভারতবর্ষ ও পার্শ্ববর্ত্তী দেশসমূহের জাতীয় সভ্যতার ধারা এবং প্রভাব কতটুকু পরিলক্ষিত হয়, বিশেষতঃ সমগ্র শিখ-ইতিহাস হইতে এদেশবাসীর এবং সমগ্র মানবজাতির শিক্ষণীয় বিষয় কি আছে—ইত্যাদি অনেক জটীল প্রশ্ন এবং ভাবিবার বিষয় আছে। এরূপ কতকগুলি প্রশ্নের আভাস এবং উত্তর বর্ত্তমান পুস্তকে আছে।

 আশা করি, গ্রন্থকারের নিকট হইতে আমরা ভবিষ্যতে শিখগুরু সম্বন্ধে আরও আলোচনা ও গবেষণা পাইব। তিনি সাহিত্য ও ইতিহাসসাধনার পথে নূতন যাত্রী। কিন্তু যেভাবে কাজ আরম্ভ করিয়াছেন, আমার বিশ্বাস, অদূর ভবিষ্যতে বিশেষ কৃতী হইবেন। ইতি—

কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
১৯শে জ্যৈষ্ঠ, শুক্রবার,
১৩২৯

শ্রীবেণীমাধব বড়ুয়া।

  1. এই সংস্করণের স্বত্ব-বিক্রয়লব্ধ সমুদয় অর্থ গ্রন্থকার জয়রামবাটী শ্রীশ্রীমাতৃমন্দিরে প্রদান করিয়াছেন।

এই লেখাটি বর্তমানে পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত কারণ এটির উৎসস্থল ভারত এবং ভারতীয় কপিরাইট আইন, ১৯৫৭ অনুসারে এর কপিরাইট মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। লেখকের মৃত্যুর ৬০ বছর পর (স্বনামে ও জীবদ্দশায় প্রকাশিত) বা প্রথম প্রকাশের ৬০ বছর পর (বেনামে বা ছদ্মনামে এবং মরণোত্তর প্রকাশিত) পঞ্জিকাবর্ষের সূচনা থেকে তাঁর সকল রচনার কপিরাইটের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়। অর্থাৎ ২০২৬ সালে, ১ জানুয়ারি ১৯৬৬ সালের পূর্বে প্রকাশিত (বা পূর্বে মৃত লেখকের) সকল রচনা পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত হবে।