বিষয়বস্তুতে চলুন

শিখগুরু/অঙ্গদ্‌, অমরদাস, রামদাস

উইকিসংকলন থেকে

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

 সংসারে মনের মত মানুষ মেলা সর্ব্বাপেক্ষা শক্ত সমস্যা। বিশেষতঃ, কোন বিরাট অনুষ্ঠানকে দীর্ঘকাল জীবন্ত রাখিতে হইলে উপযুক্ত ব্যক্তির সন্ধান লইয়া তাহার হস্তে ভারার্পণ না করা পর্য্যন্ত প্রাক্তন নেতার কর্ত্তব্যকর্ম্ম শেষ হয় না। আজ অনন্তের পারে দাঁড়াইয়া শুভ্রশির আচার্য্য—বাবা নানক পরকালের চিন্তায় তন্ময়-বিভোর হইয়া থাকিতে পারিলেন না। বিদায়-বেলায় পিছনের ভাবনা আসিল। ভারত জনকল্যাণের জন্য প্রাণপণ পরিশ্রম করিয়া, মাথার ঘাম পারে ফেলিয়া, স্বহস্তে যে নবসঙ্ঘ রচিয়া গেলেন—তাহাকে বর্দ্ধিত, পুষ্ট ও উন্নত করিবে কে?

 নানক স্থির জানিতেন যে স্বীয় মৃত্যুর পর তাঁহার উত্তরাধিকারিত্ব লইয়া শিষ্যমণ্ডলীমধ্যে এক বিষম আন্দোলন অবশ্যম্ভাবী। তিনি বুঝিলেন, পরবর্ত্তী গুরুপদপ্রার্থীর পথে বহু বাধাবিঘ্ন ও অন্তরায় বর্ত্তমান; তজ্জন হয়ত অসন্তোষ ও অবিচার, বৈষম্য ও অত্যাচারের পৈশাচিক তাণ্ডবনৃত্য অতি ভীষণ আকার ধারণ করিয়া শিখসঙ্ঘে বিবাদ বিসম্বাদের সৃষ্টি করিবে এবং অচিরে সকল সংহতি ও ঐক্য বিনষ্ট হইয়া শিখসমাজ ধ্বংস প্রাপ্ত হইবে। প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী নানক প্রাণে প্রাণে ইহা অনুভব করিয়া তদীয় জীবদ্দশাতেই গুরুনির্ব্বাচন পূর্ব্বক ভবিষ্যদ্বিপদের আশঙ্কা দূর করিলেন। তিনি আপনার আত্মীয়দিগের অহঙ্কার ও আত্মাভিমান, উহাদিগের উদ্ধত স্বভাব ও অসদ্ব্যবহারে অতীব অসন্তুষ্ট হইয়াছিলেন। উহারা যে গুরুপদের একান্ত অযোগ্য, তাহা স্থির জানিয়াই আপন শিষ্যমণ্ডলী মধ্যে একজন যোগ্য ব্যক্তির সন্ধানে ব্যাপৃত হন। এই নির্ব্বাচনের উপর যে শিখসমাজের ভবিষ্যৎ কল্যাণ সম্পূর্ণ নির্ভর করিতেছে, তাহা তিনি বেশ বুঝিতেন। সুতরাং ভাবিলেন, এ বিষয়ে তাঁহাকে অতীব বিচক্ষণতার সহিত স্থিরচিত্তে চিন্তা করিতে হইবে, অজ্ঞের ন্যায় কাজ করিলে চলিবে না। তিনি প্রথম হইতেই লেনার প্রতি আকৃষ্ট হইয়াছিলেন। লেনার সরল প্রকৃতি ও মিষ্টস্বভাব, উন্নত চরিত্র এবং তৎপ্রতি প্রবল অনুরাগ ও শ্রদ্ধা তাহাকে ভবিষ্যৎ গুরুপদের উপযুক্তই করিয়াছিল। উহার প্রকট পরিচয়ও তিনি একটি ঘটনা হইতে স্পষ্ট পাইলেন। এই সম্বন্ধে একটী গল্প আছে। কথিত আছে একদা বুধ ও লেনার সহিত তিনি এক অরণ্যে ভ্রমণ করিতেছিলেন। উভয়ের মধ্যে কোন্ ব্যক্তি তাঁহার প্রতি অধিক শ্রদ্ধাবান্, তাহা পরীক্ষা করিবার অভিপ্রায়েই তিনি উহাদিগকে ঐস্থানে লইয়া যান। পথিমধ্যে সহসা একটি শব দেখিতে পাইয়া নানক বুধকে উহার মাংস ভক্ষণ করিতে আদেশ দিলেন কিন্তু বুধ ঘৃণাবশতঃ উহা ভক্ষণ করিতে সম্মত হইল না। তখন তিনি লেনাকে আজ্ঞা করিলেন। গুরুর আদেশ পাইয়া তৎক্ষণাৎ লেনা অকুণ্ঠিতচিত্তে উত্তর করিল “প্রভো! বলুন, দেহের কোন অংশ হইতে ভক্ষণ আরম্ভ করিব।” নানক উত্তর করিলেন—“পা হইতে আরম্ভ কর”। লেনা সানন্দে প্রবৃত্ত হইল, কিন্তু কি আশ্চর্য্য! খাইতে প্রবৃত্ত হইবার পূর্ব্বেই মৃতদেহ অদৃশ্য হইয়া গেল! নানক বলিলেন—“ধন্য লেনা! তোমার অচলা ভক্তির পরিচয় পাইলাম—তুমিই গুরুপদের সুযোগ্য ব্যক্তি।” তিনি লেনাকে তখন হইতে ‘অঙ্গদ্’ অর্থাৎ নিজদেহ এই নামে অভিহিত করিলেন। লেনা যে শ্রীগুরুর সহিত অভেদাত্মা তাহা তখন হইতে প্রমাণ হইয়া গেল। এই ঘটনায় নানকের আত্মীয়েরা অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইল এবং ভবিষ্যতে উহার প্রতিশোধ লইবে বলিয়া প্রতিজ্ঞা করিল। সে যাহা হউক, নানকের মৃত্যুর পর তদীয় প্রিয়শিষ্য লেনা ‘অঙ্গদ’ এই আখ্যা লাভ করিয়া গুরুপদে অভিষিক্ত হইলেন।

 এখানে বুঝিবার সুবিধার জন্য আমরা একটী কথা বলিয়া রাখি। নানকের পরবর্ত্তী তিনজন গুরু তদীয় মতবাদে সম্পূর্ণ আস্থাবান ছিলেন এবং উহাদ্বারা যে শিখসঙ্ঘের সর্ব্ববিধ মঙ্গল সাধিত হইতে পারে, তাহা তাঁহাদিগের ধ্রুব বিশ্বাস ছিল। সেইজন্যই তাঁহারা অন্য কোন নূতন মত প্রচার না করিয়া নানক-প্রবর্ত্তিত ধর্ম্মতত্ত্ব মানবমণ্ডলীমধ্যে প্রচার করিয়া ক্ষান্ত হন। পঞ্চম গুরু অর্জ্জুন আদর্শ হইতে বিচ্যুত হন। কিন্তু গুরু হরগোবিন্দের সময় হইতে শিখসমাজে সবিশেষ ভাববৈষম্য লক্ষিত হয়—ঐ সময়েই সঙ্ঘনেতার ইঙ্গিতে শিখজাতি সর্ব্বপ্রথম অস্ত্রধারণ করে। এই দুই শ্রেণীর গুরুদিগের জীবন আমরা অতঃপর আলোচনা করিব।

অঙ্গদ্।

 অঙ্গদ্ গুরুপদে প্রতিষ্ঠিত হইয়াই দেখিলেন তাঁহার প্রধান শত্রু—নানক-আত্মীয়গণ। উহারা তাঁহার সকল কার্য্যে বাধা দিতে লাগিল এবং বলিল যে তাহাদিগকে ন্যায্য অধিকার হইতে বঞ্চিত করিয়া লেনা অতিশয় গর্হিত কর্ম্ম করিয়াছেন—তাঁহাকে উহার ফলভোগ করিতে হইবে। তাহারা গুরুর নামে সর্ব্বপ্রকার মিথ্যা কুৎসা রটাইয়া সম্প্রদায়স্থ স্বধর্ম্মীদিগের সহায়তা ও সমবেদনা লাভে সচেষ্ট হইল। ইহাতে বিশেষ কৃতকার্য্য না হইয়া, উহারা অবশেষে তাঁহার প্রতি বলপ্রয়োগের অভিসন্ধি করে। তাহাদিগের দুর্ব্যবহারে অঙ্গদ্ অত্যন্ত বিরক্ত এবং অবশেষে ভীত হইয়া কুদুর নামক স্থানে আশ্রয় লইলেন। চারিদিকে শত্রু-পরিবৃত হইয়া কাজ করা সম্ভব হইল না। তাহার উপর আবার তখন তিনি ব্যাধিগ্রস্ত। তাঁহার এই অসহায় অবস্থায় অমরদাস নামক জনৈক ব্যক্তি ভিন্ন অন্য কোন দ্বিতীয় সহায় ছিল। না। তিনি সর্ব্বশুদ্ধ দ্বাদশ বৎসর গুরুপদে প্রতিষ্ঠিত থাকিয়া ১৫৫২ খ্রীষ্টাব্দে ঐস্থানেই দেহত্যাগ করেন।

অমরদাস।

 অমরদাস জাতিতে ছত্রি ছিলেন। গোবিন্দওয়াল নামক গ্রামে তাঁহার আদি বাসস্থান ছিল। যখন নানক-আত্মীয়গণ কর্ত্তৃক অত্যন্ত বিপদগ্রস্ত হইয়া অঙ্গদ্ কুদূরে অবস্থান করিতেছিলেন, অমরদাস সেই সময়ে তাঁহার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তিনি গুরুর প্রতি অতীব ভক্তিসম্পন্ন ছিলেন। প্রত্যহ কুম্ভপূর্ণ জল লইয়া গিয়া গুরুর পদধৌত করিয়া দিতেন। একদা রজনীকালে যখন তিনি ঐ কার্য্যে ব্যাপৃত, তখন ভীষণ ঝড় উঠিয়া দিঙ্‌মণ্ডল তমসাচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। হঠাৎ পদস্খলিত হইয়া অমরদাস পড়িয়া গেলেন এবং উহার ফলে অত্যন্ত আঘাত পাইলেন। ঐ ঘটনায় অঙ্গদ্ বিশেষ ব্যথিত হইলেন এবং শিষ্য কিরূপ কর্ত্তব্যপরায়ণ তাহা বুঝিতে পারিয়া মুগ্ধ হন। তিনি বলিলেন—“জগতে তোমার আপনার বলিবার কেহ নাই বটে, কিন্তু তুমি স্থির জানিও আমি তোমার সহায়, তোমার কোন চিন্তা নাই।” অঙ্গদ্ মৃত্যুর পূর্ব্বে তাঁহাকেই গুরুপদে অভিষিক্ত করিয়া যান। ভবিষ্যতে অমরদাসকে শিখসমাজ সানন্দে গুরুপদে বরণ করিয়া লইল। তিনি ঐ দায়িত্বভার গ্রহণ করিয়া অতীব সুচারুরূপে কার্য্য পরিচালনা করিতে লাগিলেন; তাঁহার ন্যায় স্বধর্ম্মনিষ্ঠ, বিবেচক ও পারদর্শী গুরুর অধীনে শিখজাতি উন্নতির অত্যুচ্চশিখরে উঠিয়াছিল—এই কারণেই তাঁহার স্মৃতি আজিও সকলে সযত্নে হৃদয়ে ধারণ করিয়া থাকেন। সঙ্ঘের কাহারও কোন অভাব অভিযোগ তাঁহাকে একবার জানাইলেই তৎক্ষণাৎ তাহা দূরীভূত হইত। স্বগ্রাম গোবিন্দওয়ালেই তিনি বসবাস করিতেন। তথায় যাত্রীদিগের সুবিধার জন্য তিনি একটী পান্থনিবাস ও জলকষ্ট নিবারণার্থ একটা ‘বউলী’ বা কূপ খনন করাইয়া দেন। তাঁহার সময় শিখধর্ম্মসম্প্রদায়ে দুইটী নূতন ভাব প্রবেশ লাভ করে। প্রথম,— সুশৃঙ্খলাবদ্ধ সঙ্ঘ কর্ত্তৃক প্রচার-কার্য্য। তদীয় গুণরাজিতে মুগ্ধ হইয়া বহুসংখ্যক ব্যক্তি তাঁহার শিষ্যত্ব গ্রহণ করিয়াছিল। তিনি উহাদিগের মধ্যে দ্বাবিংশ সুযোগ্য শিষ্যকে ধর্ম্মপ্রচারের জন্য ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে প্রেরণ করেন; উহার ফলে শিখধর্ম্ম শুধু পঞ্চনদের চতুঃসীমানায় আবদ্ধ না থাকিয়া সমগ্র ভারতে প্রচারিত হুইয়াছিল। যাহাতে শিখধর্ম্ম কালে সার্ব্বজনীনধর্ম্মে পরিণত হইয়া সমগ্র মানবজাতির হৃদয়ে সত্যের বীজ বপন করে এবং তাহাদিগকে এই নূতন মৈত্রীমন্ত্রে দীক্ষিত করিয়া ফেলে, ইহাই গুরু অমরদাসের একান্ত ইচ্ছা ছিল। এই মনোভিলাষ কার্য্যে পরিণত করিবার জন্য তিনি অতি কঠিন দায়িত্বভার গ্রহণ করিয়াছিলেন। এতদ্ভিন্ন তিনি শিক্ষধর্ম্মসম্প্রদায়টীকে দুই ভাগে বিভক্ত করেন; তাঁহার সময় হইতে সন্ন্যাসী ও সাধারণ গৃহস্থ শিখ পৃথক্‌ হইয়া গেল। গুরু অমরদাস মোহন নামক একটী পুত্র ও মোহিনী নাম্নী একটা কন্যা রাখিয়া দ্বাবিংশ বৎসর সুচারুরূপে কার্য্য করিয়া ১৫৭৫ খ্রীষ্টাব্দে গোবিন্দওয়ালেই দেহত্যাগ করেন। তাঁহার দেহ ঐস্থলেই সমাধিস্থ করা হয়, কিন্তু অধুনা উহা নদী গর্ভে বিলীন হইয়া গিয়াছে।

রামদাস।

 অমরদাসের পর রামদাস গুরু-পদ পাইয়াছিলেন। তাঁহার সহিত অমরদাসের কোন বংশগত সম্বন্ধ ছিল না। তিনি সোদীবংশে জন্মগ্রহণ করেন এবং এক অচিন্তিত ঘটনাচক্রে অমরদাসের কন্যার পাণিগ্রহণে সমর্থ হন। শৈশবকালে তাঁহাকে অত্যন্ত দারিদ্র্য-যন্ত্রণা সহ্য করিতে হইয়াছিল। গোবিন্দওয়াল গ্রামে যখন অমরদাস ‘বউলী’ নির্ম্মাণ করাইতেছিলেন, সেই সময়ে তথায় উক্ত নির্ম্মাণ-কার্য্য দর্শনের নিমিত্ত বহু জনসমাগম হয় এবং অনেকগুলি শ্রমজীবী ঐকার্য্যে নিযুক্ত থাকে। লাহোর হইতে দরিদ্র রামদাসও আপন মাতাকে লইয়া ঐহানে ব্যবসার জন্য আগমন করেন। তিনি শ্রমজীবীদিগের নিত্য ব্যবহার্য্য নানাবিধ প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সরবরাহ করিতেন। ঐসকল দ্রব্য বিক্রয় করিয়া তিনি বিশেষ লাভবানও হইয়াছিলেন। একদিবস গুরু অমরদাস আপনার কন্যাকে সঙ্গে লইয়া শ্রমজীবীদিগের কার্য্য পর্য্যবেক্ষণ করিতে করিতে কন্যার অনুরোধে রামদাসের নিকট হইতে দ্রব্য ক্রয় করিবার অভিপ্রায়ে তাহাকে ডাকিলেন। বলিষ্ঠকায় ও রূপবান যুবক রামদাসকে দেখিয়া, মোহিনী তৎপ্রতি আকৃষ্ট হন এবং মোহিনীর সনির্ব্বন্ধ অনুরোধে, গুরু অমরের শিষ্যত্ব গ্রহণ করিয়া, রামদাস তাহাকে বিবাহ করেন। অমরদাসের মৃত্যুর পর তাঁহার জামাতা রামদাস গুরুর আসনে বসিলেন।

 রামদাস অতীব দক্ষতার সহিত কার্য্য করিতে লাগিলেন; তাঁহার যশঃ ও খ্যাতি সর্ব্বত্র ছড়াইয়া পড়ে। মোগল বাদশা আকবরের কর্ণেও সে সংবাদ পৌঁছিল। সকলেই জানেন, মহামতি আকবর সকল ধর্ম্মের প্রতি সমভাবেই শ্রদ্ধাসম্পন্ন ছিলেন। তিনি শিখগুরুর প্রশংসা শ্রবণে একদিন তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ ও আলাপ করিতে উৎসুক হইলেন! লাহোর হইতে যাত্রা করিয়া তিনি গুরু রামদাসের সহিত মিলিলেন। কিয়ৎকাল তাঁহার আশ্রমেই ধর্ম্ম সম্বন্ধে নানারূপ আলোচনায় কাটাইলেন। তিনি রামদাসের নির্ম্মলস্বভাব ও অদ্ভুত প্রতিভা সন্দর্শনে অতীব চমৎকত হইয়াছিলেন এবং তাঁহার প্রতি সম্মান প্রদর্শনার্থ কয়েক বিঘা জমি দান করেন; উহাই ‘চক্কর রামদাস’ নামে খ্যাত হইয়াছে। এই পরিচয়ের পর তাঁহার প্রতি আকবরের শ্রদ্ধা ও অনুরাগ দ্বিগুণ বর্দ্ধিত হয়। ঐ ঘটনার কিছুদিন পরে যখন তিনি পাঞ্জাব পরিত্যাগ করিয়া দাক্ষিণাত্যাভিমুখে গমন করিতেছিলেন, সেই সময়ে পথে রামদাসের সহিত দেখা করিবার জন্য গোবিন্দওয়াল গ্রামে বিশ্রাম করেন। এবারও তিনি গুরুকে তাঁহার ইচ্ছামত কোন দান লইতে অনুরোধ করিলেন। উহাতে গুরু রামদাস বলিলেন— “মহারাজ, আমার নিজের কিছুরই অভাব নাই, তবে আমার একটী ভিক্ষা আছে। যখন আপনি লাহোর নগরে অবস্থান করিতেছিলেন সেই সময়ে কৃষকেরা খুব শস্য বিক্রয় করিয়াছিল কিন্তু আপনি ঐ স্থান পরিত্যাগ করিবার পর আজ কয়েক মাস যাবৎ তাহাদিগের আর ক্রেতা মিলিতেছে না। সুতরাং একান্ত অর্থাভাব ঘটিয়াছে। আমার অনুরোধ, আপনি যেন এ বৎসর দরিদ্র কৃষকদিগের নিকট হইতে রাজস্ব গ্রহণ না করেন, তাহা হইলেই তাহাদিগের প্রভূত উপকার করা হইবে; ইহাই আমার একমাত্র নিবেদন।” কোন দ্বিরুক্তি না করিয়া আকবর শাহ ঐ প্রস্তাব সর্ব্বতোভাবে অনুমোদন করিলেন এবং গুরুর একটী ইচ্ছাও যে পূর্ণ করিতে পারিয়াছেন, ইহা ভাবিয়া আপনাকে কৃতকৃতার্থ বিবেচনা করিলেন। গুরু রামদাস দরিদ্র অসহায় প্রজাদিগের অবস্থার প্রতিও বিশেষ লক্ষ্য রাখেন, ইহা জানিয়া উহারা তাঁহাকে হৃদয়ের গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিল এবং যাহাতে তিনি দীর্ঘজীবন লাভ করিয়া এইভাবে অভাবগ্রস্তের অভাবমোচন ও দরিদ্রের সাহায্যকল্পে স্বীয় জীবন নিয়োগ করিতে পারেন, তজ্জন্য শ্রীভগবানের নিকট সকাতর প্রার্থনা জানাইল।

 পূর্ব্ব গুরুর ন্যায় ইঁহারও শিষ্যসংখ্যা বর্দ্ধিত হইতে লাগিল—ধনবান ভূস্বামিগণ আপনাদিগের সকল ঐশ্বর্য্য পরিত্যাগ করিয়া তদীয় ধর্ম্মে দীক্ষিত হইতে লাগিলেন।

 তাঁহার তিনটী পুত্র হইয়াছিল। প্রথম মহাদেও—ইনি ফকির হন। দ্বিতীয় পৃথ্বীদাস—ইনি বিবাহাদি করেন। এবং তৃতীয় পুত্র অর্জ্জুন—রামদাসের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র। প্রায় সপ্তবর্ষ গুরুপদে অবহিত থাকিয়া ১৫৮২ খ্রীষ্টাব্দে তিনি অমরধামে চলিয়া যান।