বিষয়বস্তুতে চলুন

শিখগুরু/উপসংহার

উইকিসংকলন থেকে

উপসংহার

 দশমগুরু শ্রীগোবিন্দসিংহের দেহাবসানের সহিত সেই যুগ যুগ স্থায়ী গুরুপদ চিরদিনের মত বিলুপ্ত হইল। প্রথম কারণ—তাঁহার বংশলোপ; দ্বিতীয় ও প্রধান কারণ—সুযোগ্য, শক্তিশালী ব্যক্তির অভাব। তৃতীয় কারণ—যে অত্যাচার-উৎপীড়ন জাতীয়শক্তিকে সংহত জাগ্রত ও উদ্যত করিয়া রাখে মোগলশক্তির সহিত সখ্য স্থাপনে তাহার অভাবে শিখ বিশৃঙ্খল ও দুর্ব্বল হইয়া পড়িল। পূর্ব্বেই বলিয়াছি অতঃপর শিখজাতি কয়েকজন ভিন্ন ভিন্ন নেতার অধীনে পরস্পর হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া গেল। ক্রমে পূর্ব্বের সেই সংহত অতুল শক্তি বিনষ্ট হইরা যায়—গৃহবিবাদ ও ভ্রাতৃবিদ্বেষ তাহাদিগের পতনের মূল কারণ। এইভাবে বহুবর্ষ যাপনের পর তাহারা আর একবার পাঞ্জাবকেশরী মহামান্য রণজিৎ সিংহের অধীনে সেই লুপ্তসৌভাগ্যের কতকটা ফিরিয়া পাইয়াছিল—কিন্তু তাহাও বহুকাল স্থায়ী হয় নাই।

 শেষ কথা—আসুন পাঠক! আমরা সভক্তিহৃদয়ে মধ্যযুগের ভারতীয় এই দশাচার্য্যের শ্রীচরণে প্রণত হই, ইঁহাদিগের অপূর্ব্ব জীবনী কতকটা ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করিতে যাইয়া আমরা বিস্ময়াপ্লুত হইয়াছি। ধর্ম্মপ্রাণ জাতি ক্রমশঃ কালের গতিতে কিরূপে সৈনিক-জীবন আলিঙ্গন করিতে বাধ্য হইয়াছিল—তাহার বিবরণ যুগে যুগে ভারতেতিহাসের একটী অত্যাশ্চর্য্য ঘটনারূপে সর্ব্বত্র পরিগণিত হইয়া আসিয়াছে। অধুনা এই বিষয়টী আলোচনা করিতে যাইয়া বিশেষ মতভেদ উপস্থিত হইয়াছে। প্রথম পন্থীরা বলিয়া থাকেন শুরু গোবিন্দসিংহ সামরিক শিক্ষার উপর অত্যধিক প্রাধান্য স্থাপন করিয়া শিখজাতির প্রবল অনিষ্টসাধন করিয়াছিলেন—তাহারই ফলে তাহাদিগের মহাপতন হইয়াছে। অপর দল বলেন—“তোমরা ভুল বুঝিতেছ। গোবিন্দ সিংহ শিখদিগকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষাও দান করিতে ত্রুটী করেন নাই, এ কথা ভুলিলে চলিবে না। তবে তোমরা যাহা বলিতেছ তাহা কতকটা সত্য। তিনি শিখজাতিকে সামরিক শিক্ষাই মুখ্যতঃ দেন, তবে এটা মানিব না যে, এতদ্বারা তিনি কোনরূপ দূষণীয় কার্য্য করিয়াছেন,—শিখজাতির পতন হয় নাই।” এ বিষয়ে কোন কথা বলিবার পূর্ব্বে একটি কথা পাঠককে স্মরণ করাইয়া দিতে ইচ্ছা করি-এ বিবাদ মিটিবার নহে। এতৎ সম্বন্ধে মতভেদ থাকা খুবই স্বাভাবিক। তবে আমরা এইটুকু বলিতে ইচ্ছা করি যে গুরু নানকের অত্যুচ্চ আধ্যাত্মিকতারূপ মাপকাটী দিয়া বিচার করিতে হইলে বলিতে হইবে—ধর্ম্মসঙ্ঘ হিসাবে শিখের ক্রমোন্নতি না হইয়া ক্রমাবনতিই হইয়াছিল। পাঠক দেখিয়াছেন গুরু অর্জ্জুনের সময়েই উহার প্রথম সূচনা হয়। তৎপরে ক্রমশঃ কিরূপ আকার ধারণ করিল, তাহাও আলোচিত হইয়াছে। ইহা বলিলে কেহ যেন না বুঝেন যে পরবর্ত্তী গুরুগণ সকলেই আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রতি একান্ত উদাসীন ছিলেন, তবে আমাদের বক্তব্য এই যে তাঁহারা কালপ্রভাবে পূর্ব্বের সেই উচ্চাদর্শ রক্ষা করিতে পারেন নাই—উহা হইতে যথেষ্ট পরিমাণে স্খলিত হইয়া পড়িয়াছিলেন। গুরু গোবিন্দ সিংহের আধ্যাত্মিক ও সামরিক—উভয় উন্নতির প্রতি লক্ষ্য রাখার কথা এ বিষয়ের প্রকৃষ্ট প্রমাণ। তবে, আবার বলি, বিধাতার নিগূঢ় উদ্দেশ্য বুঝিবে কে? গুরু নানকের উচ্চ আদর্শ হইতে পতিত হইয়া শিখসঙ্ঘের নাম পর্য্যন্ত এতদিনে বিলুপ্ত হইয়া যাইত,— যদি না ঘটনাচক্রে মোগলরাজশক্তির অত্যাচার উৎপীড়নে আত্মরক্ষার নিমিত্ত ইহা এক বিশাল ও মহান সামরিক জাতিতে পরিণত হইত। কোন ধর্ম্মসঙ্ঘ সামরিক জাতিতে পরিণত হওয়া ভাল কি মন্দ—সে বিচার আমাদের নহে। তবে দেখিতে পাই বহুবার বহুযুদ্ধে এবং বর্ত্তমানে বিংশ শতাব্দীর ভীষণ রণক্ষেত্রে এই জাতি আপনার অস্তিত্ব-গৌরব সমগ্র জগত-সমক্ষে প্রতিপাদন করিয়াছেন।

ওয়া গুরুজীকী ফতে!