বিষয়বস্তুতে চলুন

শিখগুরু/দ্বিতীয় প্রস্তাব—গোবিন্দ সিংহ

উইকিসংকলন থেকে

সপ্তম পরিচ্ছেদ

গোবিন্দসিংহ

দ্বিতীয় প্রস্তাব

 এইরূপ অলৌকিক দৈবশক্তিতে মন-প্রাণ পূর্ণ করিয়া শ্রীগুরু কর্ম্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন এবং শিখদিগকে বলেন যে তাহাদিগের মধ্যে সাহারা যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ বিসর্জ্জন করিবে তাহারাই স্বদেশ ও স্বজাতির প্রকৃষ্ট সেবার অধিকার পাইবে—তাহাদিগের প্রত্যেকের জীবন দেবী চণ্ডিকা বলিরূপে গ্রহণ করিবেন। গোবিন্দসিংহের চরিত্র সমালোচন করিতে গিয়া অনেকেই একদেশদর্শিতা দোষে দুষ্ট হইয়া থাকেন। কেহ কেহ তাঁহাকে কেবল একজন কায়িক বলশালী বা অসামান্য যোদ্ধৃপুরুষ বলিয়াই ক্ষান্ত হন—তাঁহার মধ্যে আধ্যাত্মিক ও নৈতিক ভাব কতদুর ছিল সে সম্বন্ধে তাঁহারা একেবারেই উদাসীন। তাঁহারা গোবিন্দ-চরিত্রের একটা দিক দেখিয়াই যেন সন্তুষ্ট হন, সুতরাং সুবিচারে উপনীত হওয়া তাঁহাদিগের পক্ষে অনেক সময়েই অসম্ভব হইয়া উঠে।

 যজ্ঞ শেষ হইয়া গেলে গুরু স্ত্রীর আবাসে ফিরিয়া দেখিলেন মসন্দ বলিয়া স্বেচ্ছাচারী স্বাধীন কর্ম্মচারীদল বড় অত্যাচার করিতেছে। তিনি অবিলম্বে উহাদিগকে বিদ্রোহিতার জন্য সমুচিত শাস্তি প্রদান করিয়া শত্রুকুল নির্ম্মূল করিয়া ক্ষান্ত হইলেন।

 মানবজীবনের ত্রিংশ বৎসর অতিবাহিত হইতে দেখিয়া গুরু আর কালবিলম্ব করা বিবেচনা বোধ করিলেন না। সেই জন্য চিরপোষিত সংস্কারগুলি একে একে কার্য্যে পরিণত করিতে লাগিলেন। তিনি আনন্দপুরে এক সুবৃহৎ বৈশাখী মেলা আহ্বান করেন। ঐ উপলক্ষে পাঞ্জাব প্রদেশের বিভিন্ন স্থান হইতে বহুসংখ্যক শিখভক্ত সমবেত হয়। শিখদিগের গুরুভক্তি মৌখিকমাত্র বা সত্য সত্যই আন্তরিক,—স্বদেশ ও স্বজাতির মঙ্গল সাধনের জন্য তাহারা কিরূপ উদ্‌গ্রীব ও একনিষ্ঠ, তাহার প্রকৃষ্ট নিদর্শন গ্রহণ করিবার জন্যই গুরু স্বেচ্ছায় তাহাদিগকে আহ্বান করিয়াছিলেন। শিখদিগের জাতীয় জীবনে উহা এক বিশিষ্ট দিবস—যে দিন তাহাদিগের সত্যসঙ্কল্প ও স্বজাতিনিষ্ঠা কষ্টিপাথরে সম্যক্‌রূপে পরীক্ষিত হইয়াছিল এবং কাহার কতদুর মূল্য তাহা শ্রীগুরু অনায়াসেই নিরূপণ করিয়াছিলেন।

 সকলে সমবেত হইবার পূর্ব্বদিবসেই গুরু সেই স্থানের একাংশ কাষ্ঠ ইত্যাদির সাহায্যে উত্তমরূপে বেষ্টন করিয়া রাখিয়াছিলেন—বাহির হইতে উহার ভিতরে কি হইতেছে, তাহা যেন কাহারও দৃষ্টিগোচর না হয়। তিনি তৎপরে একজন ভক্তকে পাঁচটি ছাগ ক্রয় করিয়া উহার মধ্যে রাখিতে আদেশ দিলেন।

 আজ বৈশাখী মেলার স্মরণীয় দিবস। অতি প্রত্যুষে শ্রীগুরুর নিমন্ত্রণে আহুত হইয়া চতুর্দ্দিক হইতে শত শত ভক্ত আসিয়া সমবেত হইল। তৎপরে যখন সেই বিশাল জনতা স্থিরভাব ধারণ করিল, সেই সময় শ্রীগুরু হস্তে একখানি উন্মুক্ত অসি ধারণপূর্ব্বক অপূর্ব্ব বাণী শুনাইতে লাগিলেন। তদীয় উদ্দীপ্ত মুখমণ্ডল আজ এক স্বর্গীয় শোভায় সুশোভিত। জলদগম্ভীরস্বরে শ্রীগুরু ডাকিলেন—“কয়েকজন বিশিষ্ট শিখভক্তের মস্তক আবশ্যক হইয়াছে। স্বেচ্ছায় গুরুর কার্য্যোদ্ধারের জন্য আত্মবলিদানে তোমাদের মধ্যে কয়জন প্রস্তুত আছ—আমি তাহাদিগকে সাদরে মৎসকাশে আহ্বান করিতেছি।” গুরুর মুখে এইরূপ বাক্য শ্রবণ করিয়া সকলেই ত্র্যস্ত ও চকিত হইল—আজ তাহাদের সমক্ষে জীবন-মরণের মহাসমস্যা উপস্থিত! প্রথম আবেদনে বিশেষ ফললাভ হইল না। গুরু দ্বিতীয়বার ডাকিলেন—বুঝি বা শিখ আত্মত্যাগে অনিচ্ছুক। সকলেই অপ্রতিভ হইয়া অপেক্ষা করিতেছে! তৃতীয় আবেদনের পর কয়েক মুহূর্ত্ত অতীত হইলে—উত্তর আসিল। সেই জনসমুদ্রের এক প্রান্ত হইতে একজন উন্নতমনাঃ নির্ভীক ভক্ত হৃদয়ের আবেগভরে গর্জ্জিয়া উঠিল—“ওয়া গুরুজী কী ফতে! প্রভো! এই দীনহীন অকিঞ্চনের মস্তক অর্পিত হইল।” নিস্তব্ধমণ্ডপে কোলাহল উঠিল—চতুর্দ্দিক হইতে প্রশংসাবাণী উচ্চারিত হইতে লাগিল—‘ধন্য দয়াসিং! হে লাহোর নিবাসী ক্ষত্রিয়াগ্রগণ্য! তুমি আজ আমাদের মুখোজ্জ্বল করিলে!’ ইহার পর গাঢ় আলিঙ্গন করিয়া শ্রীগুরু সেই পুরুষ প্রবরকে সানন্দে অভিবাদন করিয়া বেষ্টিত স্থানে প্রবেশ করিলেন—শিখ সেই ভীষণ অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইল। কিয়ৎকাল পরে শ্রীগুরু সবেগে রুধিরসিক্ত হস্তে সভায় ফিরিয়া আসিলেন—সকলে স্থির জানিল, দয়াসিং নিহত হইয়াছেন। উহার পর গুরু আবার আহ্বান করিলেন। প্রথমে সকলেই দ্বিধা করিতে লাগিল―কিন্তু তৎপরে হস্তিনাপুরনিবাসী ধর্ম্মসিং নামক জনৈক জাঠ শ্রীগুরুর মহাকার্য্যে আত্মবলিদান করিবার জন্য অগ্রসর হইলেন। সভাক্ষেত্রে পুনরায় কলরব উত্থিত হইল। গুরু এবারও পূর্ব্ববৎ আচরণ করিলেন। ইহার পরে একে একে অপর তিন জন সাহসী শিখ আপনাদিগকে শ্রীগুরুর হস্তে সমর্থন করিয়া ধন্য হইল—বিদর্ভপুরনিবাসী সাহেবসিং নামক নায়েন (নাপিত)—দ্বারকানিবাসী মহকম সিং নামক জনৈক ছীপা (যাহারা কাপড়ে ছাপ দেয়) এবং তৎপরে উড়িষ্যা জগন্নাথপুর নিবাসী হিম্মৎ সিং নামক জনৈক ঝিবর (কাহার)। কিয়ৎক্ষণ পরে সকলে স্তিমিতনেত্রে চাহিয়া দেখিল শ্রীগুরু উক্ত পাঁচজন শিখ পরিবেষ্টিত হইয়া বীরদর্পে সেই বেষ্টিত স্থান হইতে বহির্গত হইতেছেন। তবে কি উঁহারা কেহই নিহত হন নাই?—না! শ্রীগুরু তাঁহাদিগকে উহার ভিতর বসাইয়া রাখিয়া প্রতিবারে এক একটী ছাগ হত্যা করিয়া সর্ব্বসমক্ষে উপস্থিত হইতেছিলেন।

 তৎপরে গোবিন্দসিংহ ঐ পাঁচজন শিখকে বহুভাবে আলিঙ্গন করিয়া সর্ব্বসমক্ষে উহাদিগের অদ্ভূত বীর্য্য ও গুরুগতপ্রাণতার ভূরি ভূরি প্রশংসা করিতে লাগিলেন। উহাদিগকে বহুবিধ মূল্যবান পরিচ্ছদে ভূষিত করিয়া বলিলেন—“হে ভ্রাতৃগণ! তোমরা আজ হইতে আমার আপনার হইলে। তোমরাই ‘খালসা’ (খাঁটী) বা শিখনামের উপযুক্ত—খালসা গুরুসে আউর গুরু খালসাসে হোই এক, দুস্‌রে কো তাঁবিদায় হোই। শ্রীগুরু নানকের সময় একজনমাত্র খাঁটী লোক পাওয়া গিয়াছিল, কিন্তু আমার পরম সৌভাগ্য—আমি পাঁচজন সহৃদয় ব্যক্তি পাইয়াছি―ইহারাই আমার প্রধান সহায়।” এই বলিয়া গুরু উহাদিগকে মন্ত্রপুত করিয়া লইলেন—একটী লৌহপাত্রে কিয়ৎপরিমাণ জল আনাইয়া দেবীদত্ত করদ তরবারি ডুবাইয়া দিলেন; উহা অমৃতরূপে সকলে পান করিয়া ধন্য হইল।

 শুরু গোবিন্দের নিকট দীক্ষিত ব্যক্তির মধ্যে তখন যে কি মহাশক্তির সঞ্চার হইত তাহার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন—শিখদিগের একটী প্রচলিত দোঁহা—

“সওয়া লাখ পর্ এক্ চড়াউঁ।
যব্ গুরু গোবিন্দ্ নাম শুনাউঁ॥”

 গুরু গোবিন্দের নিকট নাম (দীক্ষা) শুনিয়া এক একজন শিখ সওয়া লক্ষ সংখ্যক শত্রুর উপর আক্রমণ করিবে![] বাস্তবিকই তদীয় অগ্নিমন্ত্রের প্রভাবে শিখ স্বপ্নকে বাস্তব করিয়াছিল!

 এই উপলক্ষে প্রায় বিংশ সহস্রের উপর শিখ তাঁহার শিষ্য হইয়াছিল। তৎপরে শ্রীগুরু ঐ পাঁচজন প্রথম দীক্ষিত শিষ্যকে বহুবিধ উপদেশ দেন। তাহার সারাংশ এই—“মীনা, মসন্দিরা, ধীরমলিয়া এবং রামরিয়া দলভুক্তদিগের সহিত এবং কন্যাহত্যাকারীদিগের সহিত মিশিবে না। বেশ্যাগমন বা দ্যূতক্রীড়া করিবে না। গুরুবাণী নিত্য পাঠ করিবে, সেবা, ভক্তি, প্রেম মন ধারণা,—অর্থাৎ মনে সেবা ভক্তি প্রেম ধারণা করিবে। জপজী (নানক কৃত প্রধান মন্ত্র), জাপজী (গোবিন্দ কৃত) আনন্দজী, রহরাস, আরতি এবং কীর্ত্তন এই ছয়টী প্রত্যহ পাঠ করিবে। কাম, ক্রোধ, মিথ্যা, কুতর্ক এবং জবাইকরা মাংস ত্যাগ করিবে। তামাক এবং যবনের হাতের মদ্য ও মাংস নিষেধ জানিবে। পাঁচ কক্ক অর্থাৎ কেশ, কৃপাণ, কাঙ্গা (চিরুণী) কচ্ছ (ছোট ঢিলে ইজের) এবং কড়া (লোহার বালা) সর্ব্বদা নিজ নিজ অঙ্গে রাখিবে। সৎপথে ব্যবসায়াদি করিবে। পরস্পর সহোদর ভ্রাতার ন্যায় প্রীতি রাখিবে। গুরু-নিন্দককে মারিয়া ফেলিবে। গুরুগ্রন্থ প্রত্যহ পাঠ করিবে এবং উহাকে গুরু স্বরূপ জানিবে। প্রতাহ শাস্ত্রাভ্যাস রাখিবে। তুর্ককে বিশ্বাস করিও না। কোন শিখকে অর্দ্ধেক নামে ডাকিবে না, মন হইতে কাতরতা ত্যাগ করিবে। যোদ্ধার বাহুবলের উপর ইহ-পরলোকের সুখ নির্ভর করে জানিবে। মত বা মনের আদর্শ উচ্চ, কিন্তু মন নম্র রাখিবে। কবরাদির পূজা করিবে না। তরবারিই প্রধান সহায় জানিবে।”[]

 অনেকে বলেন গুরুগোবিন্দ জাতিভেদ প্রথার একান্ত বিরোধী এবং হিন্দু দেবদেবীতে আস্থাহীন ছিলেন। দ্বিতীয় প্রশ্নটীর মীমাংসা আমরা ইতঃপূর্ব্বেই করিয়াছি, সুতরাং পুনরুল্লেখ নিষ্প্রয়োজন। এইবার প্রথম উক্তিটা সম্বন্ধে আলোচনা করা যাউক। গোবিন্দসিংহের কার্য্যাবলীর আলোচনা করিয়া ইহা আমরা অনায়াসেই বুঝিতে পারি যে তাঁহার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল—একটা সামরিক জাতি গঠন করা; সুতরাং ঐ কার্য্যে ব্রতী হইয়া তিনি সামাজিক জাতিভেদের কঠোরতা একটু শিথিল করিয়া দিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। পহল বা সংস্কারের সময় জাতিভেদের কোন কথাই উঠে নাই। পরবর্ত্তী একটা ঘটনা হইতে ঐ প্রশ্ন উত্থিত হয়; এক সময়ে গোবিন্দসিংহের তরবারির কোষবন্ধনের নিমিত্ত সূতার প্রয়োজন হইলে গুরু নানা অনুসন্ধানের পর উহা না পাইয়া বড় ব্যস্ত হন। তাঁহার সম্মুখে দয়াসিং দাঁড়াইয়াছিলেন; তিনি গুরুর অসুবিধা বুঝিয়া, আপন যজ্ঞসূত্র ছেদন করিয়া ঐ কার্য্যের জন্য প্রদান করেন। তৎপরে অন্য কর্ত্তৃক যজ্ঞসূত্র পুনর্ব্বার গ্রহণ করিবার জন্য অনুরুদ্ধ হইলে তিনি বলেন—যাহা শ্রীগুরুকে সমর্পণ করিয়াছি তাহা আর ফিরাইয়া লইব কিরূপে? ইহা হইতে কথঞ্চিৎ বাদানুবাদ উপস্থিত হয়। কিন্তু শ্রীগুরু দয়াসিংহের অসামান্য ভক্তি ও অনুরাগ দেখিয়া উহাতে কোনরূপ দ্বিরুক্তি করেন নাই। প্রধান কথা এই—তিনি সর্ব্বদা প্রাচীন ঋষি-প্রচারিত অধিকারীভেদ মানিয়া চলিতেন। দয়াসিংহের ন্যায় পুরুষপ্রবরের জাতিভেদ মানিয়া চলার কোনই প্রয়োজন ছিল না, কিন্তু তাই বলিয়া তিনি তাঁহার সম্প্রদায়ভুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তিকে যজ্ঞোপবীত পরিত্যাগ করিতে কখনও উপদেশ দেন নাই। এমন কি ম্যালকম প্রভৃতি ঐতিহাসিকগণের মতে শ্রীগুরুর পুত্রগণ সর্ব্বদাই যজ্ঞোপবীত ধারণ করিয়া থাকিতেন—পিতা উহাতে কোনদিনই আপত্তি তুলেন নাই। যাহা হউক, ইহা অবশ্য স্বীকার্য্য যে তিনি শিষ্যনির্ব্বাচনে জাতিবিচার মানিয়া চলিতেন না।

 ‘দশম বাদ্‌শা কী গ্রন্থ্‌’ পুস্তকে শ্রীগুরুর ধর্ম্মসম্বন্ধীয় অভিমত এবং আত্মজীবনের বিবরণ সংক্ষেপে লিপিবদ্ধ আছে। ইহা পূর্ব্ব পুস্তকের ন্যায় ছন্দে লিখিত হয়। দুই তিন রকম ভাষার সংমিশ্রণে ইহা রচিত; প্রথমাংশ হিন্দীতে, দ্বিতীয় ও তৃতীয়াংশ যথাক্রমে,―পারশী ও গুরুমুখীতে। এই গ্রন্থ সর্ব্বশুদ্ধ ষোড়শ ভাগে সম্পূর্ণ হইয়াছে। কেহ কেহ বলিয়া থাকেন এ কার্য্যে প্রবৃত্ত হইয়া গোবিন্দসিংহ বাল ও শ্যাম নামক তদীয় শিষ্যদ্বয় হইতে সাহায্য পান।

 উহাদিগের সংক্ষিপ্ত বিবরণ পাঠকগণের অবগতির জন্য প্রদত্ত হইল।

 (১) প্রথমাংশেই ‘জাপজী’—ইহা প্রাতে ভক্তগণ প্রত্যহ শ্রদ্ধাসহকারে পাঠ করেন। ইহার প্রথম শ্লোকটী এই—

জাপ শ্রীমুখ বাক্ পাদশাহী দশ। ছপে ছন্দ। তৎপ্রসাদ।
চক্র চিহ্ন অর বরণজাত আরপাত নহিন যেঃ।
রূপ রঙ্গ অররেক ভেক কোউ কহ ন শকৎ কেঃ।
অচল মুরত অসুভূত প্রকাশ অমিতোজী কহৎ যেঃ।
কোটি ইন্দ্র ইন্দ্রান সাহ্ সাহান গনিজ্জে।
ত্রিভুবন মহীপ সুর নয় অসুর নেত নেত বণতূণ কহৎ।
তব সর্ব্বনাম কখে কোন কর্ম্মনাম বর্ণাৎ সুমৎ॥[]

 (২) ‘অকালস্তুতি’ অর্থাৎ ভগবানের স্তব। প্রাতে পাঠা—

ইহার প্রথমাংশ এইরূপ—

“প্রণমো আদি এক ওঁকারা! জল স্থল মই অল কিও পসারা।
আদি পুরুখ অবগৎ অবনাশী। লোক চতুর্দ্দশ জ্যোৎপ্রকাশি॥

হস্তি কীটকে বিচ সমানা। রাও রঙ্ক যেহ একসর জানা॥
অদৈ অলখ পুরুত্থ অবগামী। সব ঘট ঘটকে অন্তরজামী॥
অলক্ষ্য রূপ অচ্ছ অনভেখা। রাগ রঙ্গ জেহ রূপ না রেখা॥
আদি পুরুখ অদৈ অবিকারা। বরণ চিহন সভহুতে নিয়ারা॥
বরণ চিহন জিহ জাত না পাতা। শত্রু মিত্র জিহ তাত ন মাতা॥
সভতে দূর সভন তে নেরা। জল থল মহি অল জাঁহে বসেরা॥
ব্রহ্ম বিষ্ণু অন্ত নহি পাএও। নেত নেত মুখ চার বতাএও।[]

 (৩য়) “বিচিত্র নাটক” (বা অদ্ভুত কথা)—ইহা চতুর্দ্দশ পরিচ্ছেদে সমাপ্ত। দুষ্ট দমনের জন্যই গুরুর আবির্ভাব―এই সঙ্গে আত্ম-পরিচয় সক্ষেপে দিয়াছেন। চতুর্থ হইতে একাদশ,—এই আট অংশে পুরাণোক্ত প্রধান কথাগুলি শ্রীগুরু সহজ, সরল গুরুমুখী ভাষায় লিখিয়া গিয়াছেন।

 (৪র্থ) “চণ্ডী চরিত্র”—ইহার দুই ভাগ। প্রথম ভাগ প্রায় মার্কণ্ডেয় চণ্ডী অনুসারেই লিখিত। ইহাতে মধুকৈটভ, ময়াক্ষুর, ধূম্রলোচন, চণ্ডমুক্ত, রক্তবীজ, নিশুম্ভ, শুম্ভ, তিতান প্রভৃতি দৈত্যবধের কথাও আছে।

 (৫ম) “চণ্ডীচরিত্র”—প্রধানতঃ প্রথম ভাগেরই কথা—কেবল ছন্দের পার্থক্য।

 (৬ষ্ঠ) “চণ্ডী কি বার”—চণ্ডীর কথার শেষ ভাগ। ইহাও ভগবতী স্তুতি।

 (৭ম) “জ্ঞান প্রবোধ”—শ্রীভগবানের স্তব।

 (চ) “চৌপাইন চৌবিব অবতারন কীয়ান্”—অন্যান্য অংশের তুলনায় ইহার কলেবর অপেক্ষাকৃত বৃহৎ বলিতে হইবে! তৎশিষ্য শ্যাম লিখিত। ইহাতে ভগবানের মৎস্য, কূর্ম্ম, বরাহ ইত্যাদি চতুর্বিংশতি অবতার-লীলা বর্ণিত আছে।

 (৯ম) ইহাতে মেহেদী মীরের কথা আছে—ইনি কল্কি অবতারের সহিত আবির্ভুত হইবেন বলিয়া বর্ণিত। কাহারও মতে আখ্যানভাগ শিয়া মুসলমানদিগের নিকট হইতে সংগৃহীত।

 (১০ম) ইহাতে ব্রহ্মার বাল্মীকি, ব্যাস, কুলদাস, ষড়ঋষি, কচ্ছপ, শূকর, বাচেস—এই সাত অবতারের এবং মনু, পৃথ্বি, সগর, বেন, মান্ধাতা, দিলীপ, রঘু এবং উজ এই আটজন প্রাচীন নৃপতিদিগের বিবরণ পাওয়া যায়।

 (১১শ) রুদ্রের দত্ত এবং পরেশনাথ এই দুই অবতারের কথা।

 (১২শ) “শস্ত্রমালা”—বিভিন্ন অস্ত্রগুলির নাম ও তাহাদিয়ের প্রত্যেকের গুণকীর্ত্তন।

 (১৩শ) “শ্রীমুখ বাক্য সওয়া বত্রিশ”—ইহা বেদ, পুরাণ ও কোরাণ সন্বন্ধে লিখিত। তিনি ইহাতে আপাত ঐ সকল ধর্ম্মপুস্তকগুলির নিন্দাবাদ করিতেছেন বলিয়া বোধ হইলেও, বস্তুতঃ অহঙ্কারীদিগেরই নিন্দা করিয়াছেন।

 (১৪) “হাজারে শব্দ”—এক সহস্র শব্দের ছন্দ। প্রধানতঃ শ্রীভগবানের ও তাঁহার অদ্ভুত সৃষ্টি-চাতুর্য্যেরই গুণ কীর্ত্তিত হইয়াছে।

 (১৫শ) “স্ত্রীচরিত্র”—৪০৪টী গল্পের সমষ্টি। স্ত্রীচরিত্র বুঝাইবার জন্যই ইহা লিখিত হয়। একটী গল্প এইরূপ—এক রাজার দুই বিবাহ হয়। প্রথম পত্নী সপত্নীপুত্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হয়েন কিন্তু তাঁহার আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ না হওয়াতে তাহার বিরুদ্ধে মিথ্যা গ্লানি ও কুৎসা প্রচার করিয়া রাজার মনোহরণ করেন। অবশেষে রাজাজ্ঞায় সেই নির্দ্দোষ যুবক নিহত হন। শিখেরা বলেন, গোবিন্দসিংহ ইহা লক্ষ্য করিয়া শিষ্যদিগকে বুঝাইয়া দেন—যে স্ত্রীলোকের বুদ্ধি ও চরিত্র বুঝিয়া উঠা ভার। তাহাদিগকে সাবধান করিয়া দেন যেন স্ত্রীশক্তির কুহকে তাহারা কখনও না পড়ে এবং বলেন স্ত্রীসঙ্গ সর্ব্বতোভাবে পরিতাজ্য।

 (১৬) শেষাংশের নাম “হিকায়ৎ”—পারসী ভাষার গুরুমুখী অক্ষরে বারটী গল্পের সমষ্টি। এগুলি সম্রাট আওরঙ্গজেবের প্রতি বিদ্রূপোক্তি।[]

 যাহা হউক, সংস্কারকার্য্য শেষ করিয়া অতঃপর শ্রীগুরু শক্তিসঞ্চয়ে মনঃসংযোগ করিলেন। তিনি একটী আদেশ প্রচার করেন যে পাঞ্জাব প্রদেশের কোন গৃহে চারিজন কর্ম্মপটু বয়ঃপ্রাপ্ত ব্যক্তি থাকিলে, অন্ততঃ দুইটীকে তদীয় সৈন্যশ্রেণীভুক্ত হইতে হইবে। এইরূপে প্রায় আশীহাজার সৈন্য সমবেত হয়। তিনি উহাদিগের সমুচিত শিক্ষা প্রদানের দায়িত্ব স্বয়ং গ্রহণ করেন—তাহাদিগের দৈহিক উন্নতিবিধান করিয়াই তিনি ক্ষান্ত হন নাই। নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষলাভের উপযুক্ত শিক্ষাও উহার সহিত প্রদান করেন। শ্রীভগবানের উপর যাহাতে তাহাদিগের প্রগাঢ় ভক্তি থাকে, যাহাতে তাহারা আপনাদিগকে তাঁহার যন্ত্র-স্বরূপ বিবেচনা করিয়া তাঁহারই কর্ম্মে প্রবৃত্ত হয়, সেই জন্য বিশেষ উপদেশ দেন। অধিকন্তু খালসার উপর যাহাতে তাহাদিগের আস্থা বলবতী থাকে তৎপ্রতি বিশেষ যত্ন লন। খালসার প্রতি তাঁহার এইরূপ উপদেশ ছিল—

খানা খাওরে ধরমকো করে সারনে মেল।
তবে খালসা জাগে সোজানে ভারত পেল॥

 অর্থাৎ ধর্ম্মপথে থাকিয়া পরিবার পোষণ করিবে এবং সারবান লোকের সহিত মিলিবে; তবে খালসার উন্নতি ভারতে প্রকাশ হইবে। এইভাবে তাঁহার সংস্কারের ফলে সমগ্র শিখজাতি এক অচ্ছেদ্য সাম্য ও মৈত্রীর সূত্রে আবদ্ধ হয়। অবিলম্বে শিখসমাজে নূতন উদ্যম ও সাহসিকতা পরিলক্ষিত হইতে লাগিল। শিখেরা চরিত্রবলে বলীয়ান হইয়া অনেক অসামান্য বীরকর্ম্ম সাধনে কৃতকার্য্য হইল। মধ্যযুগে নবোদ্ভূত ইউরোপীয় বীরসঙ্ঘের (Knights) ন্যায় ইহারাও অসহায় ও বলহীনের একমাত্র সহায় ও অবলম্বন হইয়া সর্ব্বত্র আপনাদিগের মহিমা প্রচার করিতে লাগিল।

 এইবার মোঘলদিগের সহিত সাক্ষাৎভাবে শিখগুরুর বিবাদ বাধিল। এতদিন মোগল-সম্রাট্ পার্ব্বত্য নৃপতিবৃন্দকে গোপনে যথাসাধ্য সাহায্য দান করিয়াই ক্ষান্ত ছিলেন কিন্তু অধুনা গুরুর উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি সন্দর্শনে আওরঙ্গজেবের হৃদয় ঈর্ষাভিভূত হইল—তিনি আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। প্রথমে বাদ্‌সা, সৈয়দখাঁ নামক জনৈক ব্যক্তির সেনাপত্যে একটী বিশাল বাহিণী প্রেরণ করিলেন কিন্তু ঐ ব্যক্তি সম্রাটের সহিত বিশ্বাসঘাতকের ন্যায় আচরণ করিয়া অবশেষে তাহার সাহায্যদাতাকে প্রতারিত করিল ও শিখদিগের দলভুক্ত হইয়া গেল। তদ্দর্শনে বিশেষ কুপিত হইয়া সম্রাট দ্বিতীয়বার সুদক্ষ সেনাপতি উজীর খাঁকে আনন্দপুর অধিকার এবং গুরুকে পরাজিত করিতে প্রেরণ করেন। উক্ত আদেশ মত উজীর খাঁর সৈন্য আসিয়া অবিলম্বে আনন্দপুর অবরোধ করিল। গোবিন্দসিংহ বুঝিয়াছিলেন পার্ব্বত্যরাজগণ এইবার মোগলদিগের সহিত যোগ দিবে। এই ভাবিয়া তিনি অবিলম্বে আপন সৈন্যসমাবেশ করিলেন। অবরোধ কার্য্য বহুদিন চলিল—উভয় পক্ষই সবিশেষ বীরত্ব ও সহিষ্ণুতা দেখাইল—শেষে কাহারা জয়ী হইবে, তাহা প্রথমে কেহই নিরূপণ করিতে পারে নাই। মোগলেরা বিপুলবাহিনী প্রভূত অস্ত্রশস্ত্র ও রসদ লইয়া দ্বিগুণ উৎসাহে যুদ্ধ আরম্ভ করিয়া দিল। একপক্ষে সমগ্র ভারত-সাম্রাজ্যের সমবেত-শক্তি এবং অপর পক্ষে সামান্য একটী প্রদেশের ক্ষুদ্র শক্তি—উভয়ের তুলনা করিলে বহু পার্থক্য মিলিবে। অল্পসংখ্যক শিখসৈন্য অধিকক্ষণ স্থির থাকিতে না পারিয়া অবশেষে শত্রু কর্ত্তৃক নিগৃহীত হইয়া আনন্দপুর পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হইল। গোবিন্দসিংহ আর কি করিবেন? অনুচরদিগের সহিত কীর্ত্তিপুর ছাড়াইয়া দক্ষিণাভিমুখে অগ্রসর হইলেন। তদীয় জননী ও অবশিষ্ট সন্তানদ্বয় একাকী পরিত্যক্ত হইয়া সরহিন্দ সহরেই এক ব্রাহ্মণের গৃহে আশ্রয় লন। কিন্তু তাঁহারা বুঝেন নাই যে বিপদ-সঙ্কুল সর্পগৃহে আশ্রয় লইয়া তাঁহাদিগকে প্রাণ হারাইতে হইবে; ঐ নীচস্বভাব ব্যক্তি তাঁহাদিগের সহিত যাহা কিছু অর্থাদি ছিল তাহা আত্মসাৎ করিয়া অধিকন্তু মোগলের হস্তে তাঁহাদিগকে সমর্পণ করিয়া দিল। তৎপরে যাহা হইবার—মুসলমানদিগের হস্তে যুবকদ্বয়ের অপমৃত্যুর বিবরণ সকলেই বিদিত আছেন,—কিরূপে মুসলমানগণ বালকদিগকে মৃত্যুভয় দেখাইয়া স্বধর্ম্মত্যাগ করিতে বলিল এবং তাহারা কিরূপ সাহসভরে ঘোর অসম্মতি প্রকাশ করিল এবং পিতার খ্যাতি অকলঙ্ক রাখিয়া সহাস্যবদনে মৃত্যুকে সাদরে আলিঙ্গন করিয়া লইল!

 সরহিন্দের এই লোমহর্ষক সংবাদ শ্রবণে গুরুর হৃদয় জ্বলিয়া উঠিল। তিনি তথন জাঠপুর নামক গ্রামে বসবাস করিতেছিলেন; তৎপরে ঐ স্থান পরিত্যাগ করিয়া দিনা নামক গ্রামে যান। তথায় বহুদিবস যাপন করেন। এইখানেই তিনি সম্রাট আওরঙ্গজেবের লিখিত ‘পরওয়ানা’ প্রাপ্ত হন—তাহার অনুবাদ স্থানে স্থানে উদ্ধৃত করিতেছি।―‘কোরাণের দিব্য লইয়া বলিতেছি, এই পরওয়ানা দেখিয়া সত্বর আসিয়া আমার সহিত মিলিত হইবে। নতুবা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইবে। আমি সজোরে তোমায় ধরিয়া জয়ডঙ্কা বাজাইব। যখন ধরিব তখন জিজিয়া দ্বিগুণ করিয়া বসাইব। তখন হিন্দুধর্ম্ম ছাড়িয়া আমার ধর্ম্ম ধরিবে এবং ইহলোকের মধ্যে কলমা পরিবে। যে কোরাণ পড়িবে আমি তাহাকে ছাড়িয়া দিব। তাহার সাক্ষী দেখ, কাশ্মীরের পণ্ডিতগণের কি না করিয়াছি। আমি এমন এক বাজপক্ষী পাঠাইব যে তুমি তাহার নিকট চড়াই পক্ষী হইয়া যাইবে।”

 ঐ অবজ্ঞা জ্ঞাপক পত্রের কিরূপ উপযুক্ত উত্তর গোবিন্দসিংহ দিয়াছিলেন তাহা পাঠ করিলে বাস্তবিকই বিস্ময়ের অবধি থাকে না। শ্রীগুরু লিখিতেছেন—

 “সৎগুরু সচ্‌বাদসা গুরুগোবিন্দসিং উক্ত পরওয়ানা পাঠ করিয়া যথাযথ উত্তর লিখিয়া পাঠাইলেন, যথা—তুমি যাহা লিখিয়াছ, তাহা বুঝিয়াছি। তুমি যে শঠতা করিবার মানসে দিব্য গালিয়াছ, তোমার সে মনও জানিতে পারিয়াছি। তুমি অহঙ্কার-বশতঃ যে সকল বৃথা কথা বলিয়াছ,―সে বিষয়ে জানিও, যদি ভগবান কীটকে বল দেন, তবে সে হাতীকেও খাইতে পারে। আমি একমাত্র অকাল পুরুষের আশ্রয় লইয়াছি—আর কিছু জানি না। যখন অকাল পুরুষের হুকুমে আসিয়াছি, তখন যুদ্ধের তাগা হাতে বাঁধিয়াই বসিয়া আছি। (তুমি যেমন ইহপরকালের মধ্যে কলমা পরাইতে চাও তেমনই) আমি ইহপরকালের জন্য খালসা পন্থ্ চালাইয়াছি। ঈশ্বরের আজ্ঞানুসারে বৈরীদিগকে দণ্ড দিব। তখন আপন-পরের মধ্যে সমস্ত দেশে একটা ধূম পড়িয়া যাইবে। তখন বারুদ না গাদিতেই গোলা চলিয়া মোগল-পাঠান মারিবে। তখন উহারা (মোগল পাঠানেরা) অকাল পুরুষের দোহাই দিবে। আমি তোমার সুন্নত কোরাণের ধর্ম্ম মারিয়া দূর করিব। তখন চড়াই বাজকে আপন ভক্ষ্য জানিয়া মারিবে।”

 এই পত্রপাঠ করিলেই আমরা গোবিন্দসিংহের তেজস্বী চরিত্রের অনেকটা আভাস পাইতে পারি। তাহার অসীম সাহসিকতা, আত্মবল ও অনন্য ঈশ্বরনির্ভরতার—ইহাই প্রকট নিদর্শন। যাহা হউক, ঐ পত্র প্রেরণের পর বেশীদিন আর গুরু ঐ স্থানে সুস্থির থাকিতে পারেন নাই। মোগল সৈন্য তাঁহার পশ্চাদ্ধাবন করিতে লাগিল। উহা দেখিয়া তিনি আরও পূর্ব্বাভিমুখে সরিয়া যাইলেন। বাঘুর নামক স্থানে পৌঁছিবামাত্র তিনি শুনিলেন, সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যু হইয়াছে। উহার পর তিনি কিয়ৎকাল নিশ্চিন্ত হইলেন। এদিকে সম্রাটের মৃত্যুর পর চিরপ্রথামত পুত্রগণ সিংহাসন লাভের আশায় আবার তাঁহারই ন্যায় ভ্রাতৃ-বিবাদে প্রবৃত্ত হইল! অবশেষে জ্যেষ্ঠপুত্র বাহাদুর শাহই ভারত সম্রাট বলিয়া ঘোষিত হইলেন। হিন্দু মুসলমানে এতদিন যাবৎ যে বিবাদ বিসম্বাদ চলিয়া আসিতেছিল তাহা আওরঙ্গজেবের মৃত্যুতে এবং বাহাদুরের সিংহাসন প্রাপ্তিতে অনেক পরিমাণে হ্রাস হইয়া আসিতে লাগিল। নূতন নবাব দেখিলেন তিনি পিতৃ-পন্থা অনুসরণ করিলে বিপদগ্রস্ত হইবেন,—সুতরাং উহা সর্ব্বতোভাবে পরিত্যজ্য।

 বাহাদুরশাহ শিখগুরুর সহিত সখ্যস্থাপন করিয়া তাঁহার সাহায্য প্রার্থনা করিলেন। প্রথমে উহাতে গোবিন্দসিংহ কোন প্রকার দ্বিধাবোধ না করিয়া সম্মতিদান করেন—কারণ বাহাদুরশাহ কিরূপ প্রকৃতির লোক ছিলেন, তাহা তিনি জানিতেন। উহার পর বাদ্‌শা দাক্ষিণাত্যে শত্রু দমনার্থ প্রায় পঞ্চসহস্র অশ্বসৈন্যসহ গোবিন্দসিংহকে সেনাপত্যে বরণ করিয়া লইয়া যান। তৎপরে গোদাবরী তীরস্থ নান্দোর গ্রামে পৌঁছিলে একজন পাঠান দস্যুকর্ত্তৃক গুরু সাঙ্ঘাতিক আঘাত প্রাপ্ত হন।

 এইভাবে ভীষণ আঘাত পাইয়া জীবনের সকল আশা-ভরসা পরিত্যাগকরতঃ শ্রীগুরু সবিশেষ মনক্ষোভে কালাতিপাত করিতে লাগিলেন। তাঁহার বংশীয়দিগের মধ্যে সকলেই ইতঃপূর্ব্বে মৃত্যুমুখে পতিত হয়—তিনিই কেবলমাত্র দীপাধারের শেষশিখার ন্যায় নির্ব্বাণোন্মুখ হইয়া বিরাজ করিতেছিলেন। তদীয় মৃত্যুর পর কে আবার শিখদিগের অতীত গৌরব পুনরুদ্ধার করিবে, ‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন’রূপ মহামন্ত্র সাধনের সুযোগ্য ব্যক্তি কোথা হইতে মিলিবে, এই সকল চিন্তায় তিনি একান্ত অধীর হইয়া পড়িলেন। যাহা হউক, অবশেষে মাধবদাস বা বৈরাগী বান্দা নামক এক ব্যক্তি ঐ কার্য্যভার লইয়া তাঁহার নিরাশমনে কতকটা আশার সঞ্চার করিল। এই বান্দার প্রকৃত জীবনেতিহাস সম্বন্ধীয় সকল তথ্য অবগত হওয়া যায় না; প্রায় সকলেই ইঁহার জীবনের সহিত কতকগুলি অলৌকিক ঘটনাবলী সংশ্লিষ্ট করিয়া থাকেন। কেহ কেহ বলেন, ইনি পূর্ব্বে আচার্য্য শ্রীরামানুজের সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন,—যাহা হউক উহার সত্যতা সম্বন্ধে আমরা নিশ্চিত নহি। তবে, ইহা স্বীকার্য্য যে বান্দা একজন যোদ্ধৃনিপুণ প্রকৃত বীর্য্যবান ব্যক্তি ছিলেন। শ্রীগুরুর অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হইয়া তিনি আপনার জীবন সার্থক জ্ঞান করিলেন কিন্তু গোবিন্দসিংহের ন্যায় অসীম প্রভুত্বশক্তি না থাকাতে তিনি শিখজাতির পূর্ব্বতন ঐক্যতা রক্ষা করিতে পারিলেন না—সেই জন্যই তাঁহার সময়ে শিখজাতি কয়েকটা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হইয়া যায় এবং উহাদিগের পরস্পরের মধ্যে সাম্য ও মৈত্রীর একান্ত অভাব হইয়া উঠে। যাহা হউক, শ্রীগুরুর জীবদ্দশায় তিনি প্রথম প্রথম মোগলদিগের বহু গ্রাম ও নগর লুণ্ঠন করিয়া এবং অন্যান্য উপায়ে উহাদিগকে নানাভাবে নির্য্যাতন করিলেন। সধৌরা, সরহিন্দ প্রভৃতি স্থানে তাঁহার অত্যাচারে সকলেই বিপর্য্যস্ত হইল। সকলে মিলিয়া সম্রাট বাহাদুরশাহের নিকট ঐ বিষয় উত্থাপন করিলে তিনি স্বয়ং উহাতে হস্তক্ষেপ না করিয়া গুরুর নিকট তাহাদিগকে প্রেরণ করিলেন। যাহা তউক, এ বিষয়ে যখন আন্দোলন চলিতেছিল তখন শ্রীগুরুর জীবনীশক্তি দিন দিন ক্ষীণ হইতে ক্ষীণতর হইয়া আসিল। তিনি মৃত্যুশয্যায় শিষ্যদিগকে যে সকল অমূল্য উপদেশাবলী দান করেন তাহা শিখ ধর্ম্মগ্রন্থাবলীতে লিখিত আছে।

 আজ ১৭০৮ খৃষ্টাব্দের কার্ত্তিক মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথি। বোধ হইল যেন চারিদিক ঘোর তমসাবৃত,—সকলই নিরর্থক, নিরানন্দম! শ্রীগুরুর জ্বালা-যন্ত্রণা ক্রমশঃ বাড়িতে দেখিয়া শিষ্যগণ বুঝিল—তাঁহার মৃত্যু আসন্ন। তজ্জন্য তাহারা একান্ত শোকাভিভূত হইয়া উচ্চৈঃস্বরে বিলাপ করিতে লাগিল—শিশু যেমন মা’কে মরিতে দেখিলে আপনাকে হতভাগ্য ভাবিয়া অনুক্ষণ ক্রন্দন করিতে থাকে—তাহার শোকাবেগ কিছুতেই উপশমিত হয় না, শিখভক্তগণও তদবস্থ প্রাপ্ত হইল। শ্রীগুরু ধরাধাম হইতে চলিয়া যাইতেছেন—তাহাদিগের ভাগ্যে কি হইবে? কাহার অমিয়-মাখা সান্ত্বনাবাক্যে তাহারা আশ্বস্ত হইবে? কে তাহাদিগকে বিপদে প্রফুল্লতা, কর্ত্তব্যে একাগ্রতা এবং দৈন্যে আত্মবিশ্বাস শিক্ষা দিবে? শ্রীগুরু বলিলেন—

শ্রীগুরু গোবিন্দসিং উপরে। শুন খালসা তুম মম প্যারে।
নেত রচি পরমেশর যৈ সে। ভূত ভবিখ্য মিটে সো কৈসে।

 —শুন খালসা! তোমরা আমার অতি প্রিয়; পরমেশ্বর যেরূপ নীতি রচিয়া ভূত ভবিষ্যৎ চালাইতেছেন—সেইরূপ চলিবে।

 যাহা হউক, মধ্যরাত্রে চিতাগ্নি প্রজ্বলিত হইলে—শ্রীগুরু চিতারোহণ করিলেন; অবিলম্বে তদীয় স্থূলদেহ ভস্মাবশেষে পরিণত হইল। ভক্তগণ সমস্বরে—“ওয়া গুরুজীকা খালসা।”

 “ওয়া গুরু জীকী ফতে”—ধ্বনিতে নভস্তল বিদীর্ণ করিতে লাগিলেন। ভারতজননীর প্রিয়-সন্তান ধরাধাম পরিত্যাগ করিলেন। কিন্তু মাতা সন্তানকে ভুলেন নাই—তাই তাঁহার গৌরব-স্মৃতি আজিও আপন বক্ষভূযণ করিয়া রাখিয়াছেন।


  1. অধ্যাপক যদুনাথের অনুবাদ।
  2. শ্রীতিনকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় কৃত “গুরুগোবিন্দ”
  3. “দশম গুরু শ্রীমুখ-নিঃসৃত জাপ। ইহার ছন্দ ছপে। (হে ভগবান) তব কৃপা। যাহাতে চক্র চিহ্ন বর্ণ জাতি অথবা শ্রেণী নাই, রূপ রং নির্দ্দিষ্ট রেখা ও শ্রেণী যাহার কেহ বলিতে পারে না, (যাঁহার মুর্ত্তি) নির্ব্বিকার, (যিনি) অনুভব দ্বারা প্রকাশ, (যাঁহার) বল পরিমাণ করা যায় না, কোটী ইন্দ্রের ইন্দ্র, সম্রাটের-সম্রাট যাঁহার গুণগান করে, ত্রিভুবনের ঈশ্বর দেব, মানব, অসুর, বন, তৃণ (অর্থাৎ স্থাবর জঙ্গম) যাঁহার গুণ-গান করিতেছে,—আর বলিতেছে কিছুই জানি না—তোমার কি কর্ম্ম কি বর্ণ বলিবার ক্ষমতা নাই।”
  4. “আদিতে আমি সেই এক ওঁকাররূপী ব্রহ্মকে নমস্কার করি,—যিনি জল স্থল ত্রিভুবন ব্যাপিয়া আছেন, চতুর্দ্দশ লোকে যাঁহার জ্যোতিঃ প্রকাশ করিতেছে। সেই অনাদি পুরুষ যাঁহার গতি বুঝা যায় না। হস্তী কীটমধ্যে যিনি একরূপে বিরাজমান আছেন, এবং প্রতি জীবের অন্তরের ভাব যাঁহার অবিদিত নাই। যাঁহার রূপ দৃষ্টিগোচর হয় না, কেবল অনুভব দ্বারা কল্পনা করা যায়। যিনি বর্ণ চিহ্ন জাতি বা শ্রেণী রহিত এবং যাঁহার কেহ মাতা পিতা নাই, যিনি সকলের অতি দূরবর্ত্তী—আবার নিকটেরও নিকট, জল স্থল স্থাবর জঙ্গম সর্ব্বব্যাপী হইয়া রহিয়াছেন; ব্রহ্মা বিষ্ণু যাঁহার অন্ত পান না, চতুর্মুখে ব্রহ্মা নানাপ্রকারে বর্ণনা করিয়াছেন” ইত্যাদি।
     “শিখেরা বলেন ইহাতে প্রতীয়মান হয় তিনি নামের মহিমা দ্বারাই এই কলিযুগে জীবের উদ্ধার-কর্ত্তা বলিয়া নিজ শিষ্যগণকে প্রেমভক্তিযুক্ত মনে পরব্রহ্মের উপাসনা শিক্ষা দিয়াছেন।”
  5. শ্রীতিনকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুস্তক হইতে সঙ্কলিত।