বিষয়বস্তুতে চলুন

শিখগুরু/প্রথম প্রস্তাব—গোবিন্দসিংহ

উইকিসংকলন থেকে

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

গোবিন্দ সিংহ

প্রথম প্রস্তাব

 বাস্তবজগতে আামরা এরূপ বহুসংখ্যক ব্যক্তি দেখিয়া থাকি, যাহারা আপনাপন দৈনন্দিন জীবনধারণোপযোগী জীবিকা অর্জ্জনমানসে প্রাণপাত পরিশ্রম করিয়াও উদরপূর্ত্তির উপযুক্ত আহার সংগ্রহ করিতে সক্ষম হয় না—যাহারা এই বিশাল প্রকৃতিরাজ্যে আপন বৈশিষ্ট্য রক্ষা করিতে যাইয়া পদে পদে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়, যাহাদিগের মানবজন্মের সকল উদ্দেশ্য ব্যর্থ ও বিফল করিবার জন্য শত্রু সর্ব্বদা লোলজিহ্বা বিস্তার করিয়া প্রাণে আতঙ্ক ও বিভীষিকার সৃষ্টি করে, যাহারা জীবনে সাফল্য ও সিদ্ধি-লাভোদ্দেশ্যে প্রবৃত্ত হইয়া বহুবিধ বিপজ্জালে সমাচ্ছন্ন হইয়া পড়ে, যাহাদিগের জগতে আপন বলিবার কেহ নাই, শোকে সান্ত্বনা নৈরাজে প্রবোধ দিবার কোন সুহৃৎ কোন সহায়ক নাই—কিন্তু একান্ত অভাবে এরূপ শোচনীয় ভাবে জীবনযাপন করিলেও—ঐ নিঃসহায়-নিপীড়িত জনগণের প্রত্যেকের জীবনে এমন এক শুভ মুহূর্ত্ত আইসে যখন বিধাতার আশীষ-বারি অবিচ্ছিন্নভাবে তাহাদিগের মস্তকে বর্ষিত হয়। তাঁহার অপার করুণা ও অনুগ্রহ তাহাদিগকে অবশ্যম্ভাবী পতন হইতে রক্ষা করে, কোন্ এক অজ্ঞেয় স্থান হইতে সহায় ও সাহায্য তাহাদিগের সম্মুখে উপস্থিত হয়—তখন আবার তাহাদিগের নিরাশ প্রাণে নব-আশার সঞ্চার হইতে থাকে, শেষে অভীপ্সিতলাভে তাহারা মানবজীবন ধন্য জ্ঞান করে। জাতীয় জীবনে ইহার দৃষ্টান্ত অনুসন্ধান করিতে যাইয়া আমরা দেখি, বিশ্বেতিহাসের প্রতি পৃষ্ঠায় উহা লিখিত রহিয়াছে। যখন কোন দুর্ব্বলজাতি অত্যাচার—অবিচারে উত্যক্ত হইয়া চতুর্দ্দিকে শত্রু সমাবৃতভাবে আতঙ্কময় জীবন অতিবাহিত করিতে থাকে, আত্মবিশ্বাস, সাহসিকতা ও বীর্য্য হারাইয়া প্রতিক্ষণেই আপনাদিগের অস্তিত্বলোপভয়ে ভীত হয়, সেই সময়েই তাহাদিগের রক্ষাকল্পে শ্রীভগবান উপযুক্ত সহায়ক ও রক্ষক প্রেরণ করিয়া থাকেন—যিনি ঐশী শক্তিতে বলীয়ান হইয়া জাতীয় মহাতরণীর কর্ণধাররূপে বিরাজ করিতে থাকেন এবং সর্ব্বপ্রকার ঘূর্ণী ঝঞ্ঝাবাতের ভিতর দিয়া তরী পার করাইয়া দেন,—উহার ফলে ধ্বংসোন্মুখ জাতি আবার আপন বৈশিষ্ট্য ফিরিয়া পায়।

 পঞ্চদশ শতাব্দীর পূর্ব্বভাগে ফরাসীদিগের অসহায় অবস্থার কথা স্মরণ করুন; ঐ সময়ে গৃহবিবাদ, বিপ্লব প্রভৃতিতে সমগ্র ফরাসী-রাজ্য পরিপূর্ণ—উহার ফলে জাতীয় ঐক্য ও সংহতিশক্তি বিনষ্ট হইয়া গেল। দুর্ব্বল ও অসহায় নৃপতি সপ্তম চার্লস কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ়ভাবে পুত্তলিকাবৎ ফরাসীসিংহাসনে বিরাজ করিতে লাগিলেন—স্বজাতির সকল অস্তিত্ব বুঝি বা লোপ পায়, কিন্তু তাঁহার কোন যোগ্যতা নাই! এদিকে বহিঃশত্রু ইংলণ্ড আসিয়া রাজ্যাধিকারে প্রবৃত্ত হইল এবং অবিলম্বে অরলিয়াঁ প্রভৃতি কয়েকটি বিখ্যাত নগরী অধিকার করিয়া বসিল। এইরূপে ফরাসীজাতি যখন আন্তর্জাতিক কলহে মরণোন্মুখ, যখন বহিশত্রুঃ আসিয়া উহার স্বাধীনতা-হরণে উদ্যত—সেই নৈরাশ্যের মুহূর্ত্তে সাহায্য আসিয়া উপস্থিত হইল—ভগবানের দয়ায় ফরাসী আবার আত্মশক্তি ফিরাইয়া পাইল। কোন এক সুদূর, অপরিচিত, নির্জ্জন নিরালা পল্লী হইতে অলৌকিক শক্তিসম্পন্না, বীরাঙ্গনা জোয়ান (Jeanned’ Arc) আসিয়া স্বদেশ ও স্বজাতির স্বাধীনতা রক্ষা করিলেন—ফরাসী-জাতি মৃত্যুমুখ হইতে নবজীবন ধারণ করিয়া উঠিল। জগতের ইতিহাসে ফরাসীর অতুলকীর্ত্তি স্থাপন করিয়া জোয়ান চলিয়া গেলেন। ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে ইউরোপখণ্ডে আবার ইহারই পুনরভিনয় দেখিতে পাই। ধর্ম্মপ্রাণ ইউরোপীয়গণ যখন যথেচ্ছাচারী, লম্পট পোপদিগের অমানুষিক অত্যাচারে বিধ্বস্ত হইতেছিল, যখন ইউরোপের আকাশ উহাদিগের অনুশোচনা ও হাহাকারধ্বনিতে বিদীর্ণ হইতেছিল, সেই সময়ে মহামতি লুথারের (Martin Luther) ন্যায় একজন অসামান্য পুরুষের আবির্ভাব হইল; সকলে তাঁহাকে ভগবানের শ্রেষ্ঠদান বলিয়া সাদরে নেতৃত্বে বরণ করিয়া লইলেন। জগতে স্বাধীনতা আবার ফিরিয়া আসিল।

 শিখদিগের জাতীয় জীবনে এই নিত্যসত্যের কোন প্রকার ব্যতিক্রম হয় নাই। পাঠক দেখিয়াছেন, হরগোবিন্দের পরবর্ত্তী গুরুত্রয়ের সময়ে নানারূপ দুর্ব্বলতা আসিয়া জাতীয় জীবনে ব্যর্থতা আনিবার চেষ্টা করিতেছিল। পূর্ব্বের তেজস্বিতা ও পরাক্রম হারাইয়া উপযুক্ত নেতার অভাবে শিখগণ নানাভাবে বিপর্য্যস্ত হইতেছিল, তাহাদিগের প্রাণে আশঙ্কা হইল, বুঝি বা মোগলের ভীষণ অত্যাচারের বিরুদ্ধে আবার যুদ্ধঘোষণা করিতে সক্ষম না হইয়া তাহাদিগের অস্তিত্ব একেবারে লোপ পাইবে। এইরূপে জীবন-মরণের মহাসমস্যা আসিয়া শিখদিগের প্রাণে প্রবল অস্থৈর্য্যের সৃষ্টি করিল। বিশেষতঃ কিরূপভাবে সামান্য একজন মুসলমানপ্রহরী আসিয়া তেগ্‌বাহাদুরকে তাহার অনুগামী হইতে দৃঢ়-আজ্ঞা করিয়াছিল, তৎপরে গুরু কিরূপ দ্বিরুক্তি না করিয়া সশস্ত্র রাজানুচরের আজ্ঞা পালন করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন, রাজদরবারে সভাসদ্-পরিবেষ্টিত হইয়া আওরঙ্গজেব তৎপ্রতি কিরূপ নীচতাজ্ঞাপক কটূক্তি ও বিদ্রূপ প্রয়োগ করিয়াছিলেন এবং তাহার পর তাঁহার অপমৃত্যু! সে কি ভীষণ দৃশ্য! সেই সকল ঘটনা শিখদিগের চিত্ত সর্ব্বদা বিক্ষুদ্ধ করিতেছিল এবং আপনাদিগকে একান্ত অসহায় ভাবিয়া তাহারা উন্নতির সকল আশা-ভরসা জলাঞ্জলি দিল। তাহাদিগের সেই ঘুমঘোর বিনষ্ট করিয়া গোবিন্দসিংহ আবির্ভূত হইলেন—শিখ লুপ্ত-সৌভাগ্য আবার ফিরিয়া পাইল!

 মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের হৃদয়ে দৃঢ়ধারণা হইয়াছিল যে শিক্ষসঙ্ঘ জীবিত থাকিলে মোগলশক্তি অক্ষুণ্ণ রহিবে না—আর এই আসন্ন ও অবশ্যম্ভাবী বিপদ হইতে রক্ষা পাইতে হইলে বলপ্রয়োগ ভিন্ন অপর কোন উপায় নাই। তাঁহার এই ভ্রান্ত ধারণাই ভারতে আবার যুদ্ধবিগ্রহের সৃষ্টি করিল। মৃত্যুকালে পিতা তাঁহাকে যে উপদেশ দিয়াছিলেন তাহা তিনি বিস্মৃত হইলেন—

“হিন্দু ধরম্‌কো নহি বিগাড়ো।
একে দুনহো কো প্রতিপালো॥”


 শিখ পূর্ব্বে স্বেচ্ছায় মোগলের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিগ্রহ করিতে যায় নাই, কিন্তু মোগল নৃপতিদিগের অমানুষিক অত্যাচার, অত্যধিক সঙ্কীর্ণতা ও অবিচারে তাহারা আর ধৈর্য্যধারণে সক্ষম হইল না—তাই অপর কোন উপায় না দেখিরা অবশেষে অস্ত্রধারণ করিয়াছিল। এই প্রসঙ্গে একটি কথা মনে উঠে। মহাভারতের সভাপর্ব্বে দেবর্ষি নারদ প্রশ্নচ্ছলে নৃপোত্তম যুধিষ্ঠিরকে জিজ্ঞাসা করেন—‘মহারাজ! দুর্ব্বল শত্রুকে ত’ বলপূর্ব্বক পীড়িত করেন না?’ এই সামান্য নারদীয় উপদেশের মধ্যে রাজ্যপালনের মূলমন্ত্রটী নিহিত রহিয়াছে এবং দেখিতে পাই উহার প্রতি অমান্য প্রকাশ করিয়া অনেক শাসনকর্ত্তা উপযুক্ত ফলভোগ করিয়াছেন। এই দোষেই স্পেনের দ্বিতীয় ফিলিপ হলাণ্ডদেশ হইতে বহিষ্কৃত হইয়াছিলেন।

 খৃষ্টাব্দের ১৬৬৬ বর্ষে পাটনায় গোবিন্দ সিংহের জন্ম হয়। তদীয় পিতা ধূর্ত্ত রামরাওয়ের অত্যাচার হইতে রক্ষা পাইবার আশায় ঐস্থানে আশ্রয় লন। বাল্যকাল হইতেই গোবিন্দ শারীরিক ব্যায়াম ও নানাপ্রকার দুঃসাধ্য ক্রীড়ায় রত থাকিত এবং কতকগুলি সহচর-সমভিব্যাহারে অতি দূরবর্ত্তী নির্জ্জনকানন প্রদেশে শীকার করিয়া বেড়াইত। শৈশবে গোবিন্দ কিরূপ অদ্ভূত সাহসিকতা ও তেজস্বিতার পরিচয় দিয়াছিল তাহার বিবরণ ‘সূর্য্যপ্রকাশ’ নামক গ্রন্থে লিখিত আছে। কথিত আছে, একদা গোবিন্দ কয়েকজন সঙ্গী লইয়া পথের উপর নানারূপ ক্রীড়ায় রত ছিল। বাদশার অধীনস্থ জনৈক শাসনকর্ত্তা সুসজ্জিত হস্তীপৃষ্ঠে আরোহণ করিয়া নানা আড়ম্বরে সেই পথ দিয়া যাইতেছিলেন। হঠাৎ কতিপয় বালক গতিরোধ করায় তাঁহার অনুচরবর্গ উহাদিগকে তিরস্কার করিয়া শেষে সসম্ভ্রমে প্রণাম করিয়া পথ ছাড়িয়া দিতে আজ্ঞা দিল। গোবিন্দ দলের নেতা—সকলে তাহার মতামত জিজ্ঞাসা করিল। সেও আপনাদিগের আনন্দোল্লাসে অকস্মাৎ এরূপ বাধাবিঘ্ন উপস্থিত দেখিয়া বড়ই বিরক্ত। অবশেষে সকলকে ডাকিয়া গোবিন্দ বলিল—‘আয় ভাই! আমরা খুব হাসিতে থাকি।’ এইরূপে অবজ্ঞাত হইয়া শাসনকর্ত্তার আত্মসম্মান অক্ষুণ্ণ রহিল না―তিনি অতীব ক্রুদ্ধ হইয়া বলিয়া উঠিলেন— “বাঁদরের মত মুখ করিয়া তোমরা কি কহিতেছ?” সাহসী গোবিন্দ তৎক্ষণাৎ উপযুক্ত উত্তরদানে সকলকে চমকিত করিল—

বদন বিলোচন!
সমান জিন বাদরকে॥
ল্যায় হেঁ রাজ সোই ভয়ো।
হৃদয় তব থামেও॥
যয়হে তেজ ঠারো।
কোই হোয় নারাখ বারো॥

তব হয়রো হোঁয়ে ভারো!
বনে সম বিধ বামে য়ো॥

 অর্থাৎ—“মুখ দেখ, বাঁদরের মত নহে। এই—তোমার রাজ্য লইবে; তোমার হৃদয় কাঁচা হইবে, তোমার এ তেজ চলিয়া যাইবে। রক্ষণ করিবার কেহ থাকিবে না। এখন যে হালকা আছে, তখন সে ভারি হইবে। সে সময়ে বিধি বাম হইবে।” সামান্য একটা বালকের মুখ হইতে এরূপ উত্তর শ্রবণে শাসনকর্ত্তা স্তম্ভিত হইয়া গেলেন। তাঁহার আর কিছু করিবার ক্ষমতা রহিল না। বাল্যজীবনের এই সামান্য ঘটনা তাঁহার ভবিষ্য-উন্নতির পূর্ব্বাভাস প্রদান করিল। এ উক্তির সত্যতা তিনি নিজ জীবনে প্রদর্শন করিয়াছিলেন।

 কিয়ৎকাল ঐ স্থানে কাটাইবার পর গোবিন্দ আনন্দপুর নামক স্থানে পিতার নিকট গমন করেন। যাহাতে পুত্র ভবিষ্যতে উন্নতি লাভ করিতে সক্ষম হয়, তেগ্‌বাহাদুর তৎপ্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখিতেন। তিনি কোনরূপ উচ্ছৃঙ্খলতার প্রশ্রয় কোন দিন দেন নাই। সবিশেষ কঠোর শাসনের মধ্যে থাকিয়া গোবিন্দসিংহের শরীর-মন উভয়ই সমভাবে স্ফূর্ত্তি প্রাপ্ত হইয়াছিল। আমরা নিঃসন্দেহে বলিতে পারি যে প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী জনকের এইরূপ সুশিক্ষার প্রভাবেই তিনি স্বদেশ ও স্বজাতির রক্ষাকর্ত্তা ও মুখোজ্জ্বলকারী হইতে সক্ষম হন। যাহা হউক, তৎপরে মানব-জীবনের কর্ম্ম-কোলাহল ও বিচিত্র ঘটনাবলীর মধ্যে দিন দিন গোবিন্দ নানাবিধ প্রয়োজনীয় এবং অত্যাবশ্যক অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানসঞ্চয় করিতে লাগিলেন তিনি বাল্য হইতেই শিখদিগের অতীত ও বর্ত্তমান সম্বন্ধীয় সকল প্রকার তথ্য সঞ্চয় করেন এবং সবিশেষ ঔৎসুক্যের সহিত ঐ সকলের পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনায় ব্যাপৃত থাকেন। ভবিষ্যতে জাতীয় জীবন সঠিকভাবে নিয়ন্তূত করিতে প্রবৃত্ত হইয়া দেখিয়াছিলেন পূর্ব্বসঞ্চিত জ্ঞানরাশি তাঁহার পথপ্রদর্শকরূপে কার্য্যকরী হইয়াছিল এবং তজ্জন্যই তাঁহার সময়ে শিক্ষকগণ সাফল্য-উন্নতির চরমসীমায় উপনীত হইতে সক্ষম হয়। যাহা হউক, গোবিন্দের সমক্ষেই মোগল সৈনিক আসিয়া নির্দ্দোষ ও নিরভিমান তেগ্‌বাহাদুরকে দরবারে বন্দী করিয়া লইয়া গেল। উহাদিগের নৃশংসতা ও অমানুষিক অত্যাচার সন্দর্শনে যুবা-হৃদয় ক্রোধ ও প্রতিহিংসায় পূর্ণ হইল কিন্তু কি করিবে—উহার যে কোন ক্ষমতা নাই!

 ঐ ঘটনার পর কিয়ৎকাল অতীত হইল। দিল্লীর কোন সংবাদাদি না পাইয়া গোবিন্দের প্রাণে আতঙ্কের সঞ্চার হইল—তিনি পিতার জীবন সম্বন্ধে সন্দীহান হইলেন। এদিকে যতই দিন যায় তেগ্‌বাহাদুর ততই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করিবার জন্য প্রস্তুত হন। তদানীন্তন প্রথানুসারে অগত্যা তিনি নারিকেল ও তাম্রমুদ্রা দিয়া একজন শিখকে গোবিন্দের নিকট প্রেরণ করিলেন। ঐ ব্যক্তি তথায় উপস্থিত হইয়া সমুচিত সম্ভ্রমের সহিত গোবিন্দসিংহের পাদবন্দনা করিয়া বলিল—“আপনার নিকট মহাত্মা তেগ্‌বাহাদুরের ইহাই শেষ-অনুরোধ—

বিনা দের তুরকণ্ প্রহারো সেবকন্ রচ্ছো বলঠান্।”

 অর্থাৎ অবিলম্বে তুর্ক-সংহার করিবে এবং সেবকগণের বলরক্ষা করিবে। এই ঘটনার অব্যবহিতকাল পরে পিতার অপমৃত্যুর বার্ত্তা তাঁহার নিকট পৌঁছিল। উহা শ্রবণ করিয়া সমগ্র শিখসমাজ ক্ষোভে ও অনুতাপে একান্ত চঞ্চল হইয়া আপনাদিগকে অসহায় জ্ঞান করিয়া শোকাভিভূত হইল। যাহা হউক, কিয়ৎকালের জন্য উহারা আপনাদিগকে সংযত রাখিয়া তেগ্‌বাহাদুরের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সমাধানে ব্যাপৃত রহিল। মোগলের হস্ত হইতে গুরুর ছিন্নমুণ্ড উদ্ধার করা যে কিরূপ দুরূহকর্ম্ম তাহা শিখেরা উত্তমরূপেই বুঝিত। সেইজন্য গোবিন্দ সিংহ সেবকগণকে একত্র আহ্বান করিয়া উক্ত কঠিন কার্য্যের ভার উপযুক্ত ব্যক্তিকে লইতে বলিলেন। জনৈক নির্ভীক তেজস্বী শিখ উহার দায়িত্ব লইতে স্বীকৃত হইয়া রাজধানী অভিমুখে যাত্রা করে। রাজপ্রহরীদিগকে উৎকোচ প্রদান করিয়া হউক, বা অপর কোন উপায়ে হউক, ঐ ব্যক্তি তেগ্‌বাহাদুরের ছিন্নমুণ্ড অবিলম্বে গোবিন্দসিংহের নিকট পৌঁছছিয়া দিয়া সমগ্রজাতির সহানুভূতি ও শুভেচ্ছা লাভ করিয়াছিল। শিখেরা একত্র সমবেত হইয়া মুণ্ডটী কিরাতপুরে প্রথিত করিয়া তদুপরি উপযুক্ত সমাধিমন্দির নির্ম্মাণ করিল। তৎপরে নতজানু হইয়া সকলে একবাকো তৎসমক্ষে শপথ লইল—এই একান্ত অন্যায় ও অত্যাচারের সমুচিত প্রতিশোধ লইতে হইবে, সর্ব্বপ্রকার স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়া উহার জন্য প্রাণপাত করিতে হয়, সেও স্বীকার!

 অতঃপর তেগ্‌বাহাদুরের উপযুক্ত পুত্র গোবিন্দসিংহকে গুরুপদে বরণ করিয়া লইবার জন্য সকলে মিলিয়া আয়োজন করিতে লাগিল। নানাপ্রকার সৌখীন দ্রব্যসম্ভার লইয়া চারিদিক হইতে ভক্তগণ সমবেত হইতে লাগিলেন। কথিত আছে গোবিন্দের নিকট যখন কেহ কোন প্রকার উপঢৌকনাদি লইয়া যাইত, তিনি উহার মধ্যে অস্ত্র ও ঘোটক পাইলে অতীব সন্তুষ্ট হ‍ইয়া বলিতেন—“আয়ুধ ঘোড়া যে লেয়াহেঁ সে শিখ খুসী গুরুকী লেইহঁ। মন বাঁছত সকল ফল পাইহেঁ।” যে শিখ আয়ূধ ও ঘোড়া আনিবে, সে গুরুর আশীর্ব্বাদ লইবে এবং মনোবাঞ্ছিত ফল পাইবে। অভিষেকের সময় সকলকে নানারূপ দ্রব্য লইয়া যাইতে দেখিয়া লাহোরনিবাসী হরযশ নামক সভিখী বংশোদ্ভব জনৈক ক্ষত্রিয় শিবখ ভক্তিভরে গুরুপদে প্রণত হইয়া করযোড়ে বলিল—“আমি অতি সামান্য ব্যক্তি। কিন্তু হীনজনের মান, সহায়, সম্পদ সকলই গুরুর নিকট। আমার প্রার্থনা এই, যে আমার কন্যাকে বিবাহ করিয়া দাসীরূপে গ্রহণ করুন—তাহার জীবন ধন্য হইবে।” এ ব্যক্তির সহৃদয় প্রার্থনায় গোবিন্দ কর্ণপাত করিলেন এবং ঐ প্রস্তাবে সম্মত হওয়াতে নানা আড়ম্বরে ঐ শুভ উপলক্ষেই ‘মাতা জিতোজীর’ সহিত তাঁহার বিবাহ হইয়া গেল।

 ইহার কিছুকাল পরেই গোবিন্দের দ্বিতীয় বিবাহ হয়। পুনর্ব্বার দারপরিগ্রহ করিবার ইচ্ছা তাঁহার ছিল না, কিন্তু মাতার বিশেষ অনুরোধে তাঁহাকে সম্মত হইতে হইয়াছিল। জনৈক শিখ ভক্তির নিদর্শন স্বরূপ গুরুকে আপন কন্যাদান করিল—ইঁহার নাম সুন্দরী। গোবিন্দের চারিটা পুত্রলাভ হয়—জিতোজী হইতে জোরায়র সিং এবং জুঝার সিং, সুন্দরী হইতে অজিৎসিং ও কলাট সিং। ইহাদিগের মধ্যে প্রথম দুইজন যুদ্ধে নিহত হয় এবং অপর দুইজন সরহিন্দে শত্রুকর্ত্তৃক আক্রান্ত হইয়া প্রাণ হারায়।

 যুবক গোবিন্দসিংহ নিজ অনুচরবর্গের সহিত শক্তিসঞ্চয়ের সকল প্রকার আয়োজন করিতে লাগিলেন। উহা দেখিয়া তদীয় প্রতিবেশী—পার্ব্বত্য নৃপতিবৃন্দ ঈর্ষান্বিত হইয়া উঠিল এবং উহাতে যে তাহাদের বিপদ অবশ্যম্ভাবী তাহা স্থির বুঝিতে পারিল। কিন্তু আমিষের অভাবে আপাততঃ তাহারা যুদ্ধে অগ্রসর হইতে পারিল না। কিছুদিন পরে কুলহরের রাজা ভীমচাঁদের সহিত গুরুর সামান্য একটি হস্তী উপলক্ষ্য করিয়া বিবাদ বাধে। উহার একটা স্বতন্ত্র ইতিহাস আছে। গোবিন্দসিংহ গুরুপদে প্রতিঠিত হইলে নানাস্থান হইতে ভক্তগণ বহুমূল্য দ্রব্যসম্ভার লইয়া আসিত। কামরূপের রাজাও নানা উপহার-দ্রব্যের সহিত একটা কর্ম্মপটু সুন্দরকায় হস্তী প্রদান করেন। গুরু উহার পৃষ্ঠে সমারূঢ় হইয়া বহুপ্রদেশে মৃগয়া করিতে যাইতেন। একদা তাঁহার হস্তী ভীমচাঁদের এলাকাস্থ ভূমিতে যাইয়া কিয়ৎপরিমাণ ক্ষতি করিল। ঐ ব্যপদেশে দুইদলে মনোমালিন্যের সুত্রপাত হয়। শেষে যুদ্ধ ঘোষিত হইলে ভাঙ্গানির ক্ষেত্রে উভয়পক্ষ সৈন্যসমাবেশ করিয়া সমবেত হইল। এই ভীষণ বিগ্রহে শিখসৈন্য অদ্ভুত পরাক্রমের সহিত বিপক্ষীয়গণকে সংহার করিয়াছিল এবং অবশেষে সংগ্রামে জয়লাভ করিয়া আপনাদিগের গৌরব অক্ষুণ্ণ রাখিতে সক্ষম হয়। তখন চতুর্দ্দিক হইতে ‘ওয়া গুরু জী কী ফতে’রব উত্থিত হইতে লাগিল। ইহার পর শিখগণ যে মোগলশক্তির শত্রু, তাহা সর্ব্বসমক্ষে প্রচারিত হইয়াছিল। তখন হইতে ভারতসাম্রাজ্যের বিভিন্নাংশে শিখ ও মোগলের, হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে বিদ্বেষ-বহ্নি বহুবর্ষের জন্য প্রজ্বলিত হইল। শ্রীগুরু তদ্দর্শনে আত্মরক্ষার্থ প্রস্তুত হইতে লাগিলেন—কিসে তিনি আবার জীবন-ব্রত উদ্‌যাপনে সমর্থ হইবেন, অনুক্ষণ তাহাই ধ্যানমগ্ন হইয়া চিন্তা করিতেন।

 গোবিন্দসিংহ নিজে অসামান্য শক্তিশালী পুরুষ হইলেও আপন অভীপ্সিতলাভের পথে যে কত বাধাবিঘ্ন ও অন্তরায় বর্ত্তমান তাহা সম্যক্‌ অবধান করিয়াছিলেন—তিনি ইহাও বুঝিয়াছিলেন যে ঐ ব্রত সুসিদ্ধ করা মানবশক্তির সাধ্যাতীত, দৈবশক্তির সহায় না লইলে তিনি কখনও কৃতকার্য্য হইতে পারিবেন না। দেবতা ও মানব—উভয়ের শক্তি একত্র সমবেত করিতে হইবে। তাই সঙ্ঘের মধ্যে কেবলমাত্র অস্ত্রশিক্ষার বিশেষ প্রচার করিয়া তিনি ক্ষান্ত হন নাই—বিজয়লক্ষ্মীর আশীর্ব্বাদ ভিক্ষা করিয়া তাঁহার অনুপ্রেরণাতেই জাতীয়-জীবন উদ্বুদ্ধ করিয়াছিলেন। যাহাতে শিখসৈন্যগণের মনে সাহস ও বীর্য্য জাগরূক হয় তজ্জন্য তিনি বিভিন্ন স্থান হইতে কতিপয় স্বধর্ম্মনিষ্ঠ ও তপস্বী ব্রাহ্মণকে সমাদৃত করিয়া হিন্দুর মহাকাব্য মহাভারত ও রামায়ণ প্রভৃতির অংশবিশেষ গুরুমুখীতে অনূদিত করাইয়া শিষ্যমণ্ডলীমধ্যে প্রাতাহিক আবৃত্তির ব্যবস্থা করেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরামচন্দ্রের দেবচরিত্রের এক একটা ঘটনার বিবরণ আবৃত্তি করিতে করিতে উহাদিগের মনপ্রাণে অপূর্ব্ব ভাবের সঞ্চার হইত। যখন তাহারা শুনিত,—

“ক্লৈব্যং মাস্ম গমঃ পার্থ! নৈত্বৎ ত্বয্যুপপদ্যতে।
ক্ষুদ্রং হৃদয়দৌর্ব্বল্যং ত্যক্তোত্তিষ্ঠ পরন্তপ!”

 —তখন তাহাদিগের হৃদয়ে নূতন উদ্যমের উন্মেষ হইত। পার্থসারথি আবার জীবন্ত হইয়া উঠিতেন।

 গুরু চণ্ডিকাদেবীর আরাধনা করিতে মনস্থির করিয়া উক্ত ব্রাহ্মণগণের পরামর্শ গ্রহণ করিলেন এবং তাঁহাদিগের মধ্যে কোন্ ব্যক্তি যজ্ঞে পৌরহিত্যের উপযুক্ত, তাহাও জিজ্ঞাসা করিলেন। উঁহারা বারাণসীনিবাসী ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ কেশবদাসকে ঐ কার্য্যের জন্য আহ্বান করিতে অনুরোধ করেন। গুরু সংবাদ লইয়া জ্ঞাত হন যে, কেশবদাস ঐ সময়ে জ্বালামুখী নামক স্থানে তীর্থদর্শন-মানসে অবস্থান করিতেছেন—তাঁহার শিষ্যেরা তথায় সত্বর উপস্থিত হইয়া উঁহাকে সাদরে শ্রীগুরু সকাশে লইয়া গেল।

 আনন্দপুর হইতে সপ্তক্রোশ উত্তরে চণ্ডিকা নয়নাদেবীর মন্দির অবস্থিত—উহা পুণ্যতীর্থ ও পুণ্যপীঠরূপে সর্ব্বত্র পরিগণিত। কেশবদাসের সহিত গোবিন্দসিংহ যজ্ঞ করিবার জন্য ঐহানে আসিয়া পৌঁছিলেন। প্রায় চারিমাস এই নির্জ্জন প্রদেশে গুরু নিয়মিতভাবে দেবীর পূজা, ধ্যান ও আরাধনায় মনপ্রাণ সমর্পণ করেন। আত্মীয়-স্বজনদিগের সকল কথা বিস্মৃত হইয়া সেই একনিষ্ঠ সাধক আরাধ্যদেবীর করুণা ভিক্ষা করিতে লাগিলেন—যেন তাঁহার জীবনের মহাব্রত উদ্‌যাপন করিতে তিনি সক্ষম হন, যেন শিখজাতি আবার বিজয়োন্নতির অত্যুচ্চ শিখরে আরোহণ করে! এই দীর্ঘ সময়ে তিনি দেবীর উদ্দেশ্যে যে সকল স্তবস্তুতি রচনা করেন তাহার বিশেষ বিবরণ ‘সূর্য প্রকাশে’ লিপিবদ্ধ আছে। আমরা এস্থলে পাঠকের কৌতূহল নিবৃত্তির জন্য একটিমাত্র উপহার দিব। দেবী অষ্টভূজার সমক্ষে শ্রীগুরু তদ্‌গতপ্রাণ হইয়া আবেগভরে বলিতে লাগিলেন—

পদ্যানুবাদ।

 (সৎগুরু প্রসাদে প্রাপ্ত একমাত্র ওঁকার মঙ্গলাচরণরূপে ব্যবহৃত। শ্রীভগবতী দেবী সহায়। দশমগুরু-লিখিত দেবী সম্বন্ধীয় এই ছন্দ।)

প্রণমি উগ্রবৃত্তি দেবি! তুমি অনন্তেশ্বরী
প্রণমি মা যোগমায়া যোগেশ্বরী।
প্রণমি কেশরীবাহনী, শত্রুসংহারিণী,
হে দেবি, সারদে, ব্রহ্মবিদ্যাবিধায়িনী।
প্রণমি মা, সিদ্ধি-ঋদ্ধি-বুদ্ধি-দায়িনী
হে কালিকে! কালরূপা কাল-বিনাশিনী।
প্রণমি মা ভূত-ভাবি অস্তি ত্রিকালদর্শিনী
চরণে প্রণাম মাগো, ত্রিলোকব্যাপিনী।
প্রণমি মা, জ্যোতি-প্রকাশিনী বেদ-প্রশংসিতা
সুরাসুর-ঋষিশ্বর যিনি সবারই অজ্ঞাতা।
আপনার বাহুবলে তুমি মা গো, অসুর-দলনী,
যোগিনী, খড়্গপ্রহরিণী, খপ্রধারিণী মা, পরম পাবনী।
রক্তবীজ প্রাণশোষিণী, জল-স্থল-গিরি-নিবাসিনী
সর্ব্বঘটন মাঝে তুমি গো মা আত্মপ্রকাশিনী।
দুষ্টদমনী শিষ্টপালনী বৃক্ষ তুমি পুষ্প তুমি তুমিই মালিনী
বিশ্বভরণী, জগতমাঝে শক্তি-প্রকটিনী।
অলক্ষররণী তুমি, দ্যৌ তুমি, তুমি পৃথ্বী
প্রণমি মা দুর্গে, ভবানী, ত্রিলোক-নবখণ্ডে তুমি মা প্রধানী।
জননী অটল-ছত্রধরণী, আদি দেবী
মুনি-ঋষিগণ প্রসবিনী।

কালাকাল জ্যোতি সুশোভিনী
অনুক্ষণ বিজয়মাঝে চিরবিরাজিনী।
দাসের মিনতি, কর মা পুরতি
পাই যেন গো ব্রহ্ম-ভক্তি-ভাতি।
জগত জননী তুমি মা গো তমোনাশিনী
ধরামাঝে অনুপম ভ্রমণকারিণী।
দাসেরও দাস আমি গো মা, অভি মূঢ়জন
তরাও গো মা করি ভবদুখ মোচন।
এম্‌নি কৃপা কর্ মা তারা, বাজে যেন বিজয়-ডঙ্কা
এই নিবেদন শুন গো মা, দূর কর মোর সব শঙ্কা।
আজ্ঞা দেহ, কর্‌বো আমি দুষ্টেরই দমন
তুর্ক হিন্দুর সঞ্চিত সব বিবাদ-বিভঞ্জন।
উঠুক্ আবার যোদ্ধৃসিংহ নূতন বীরের দল
যাদের হাতে নব তুর্ক যাবে রসাতল।
জগত মাঝে বিরাজে যেন খাল্‌সা পন্থ্
হিন্দুধর্ম্ম আবার জাগুক্, ঘুচুক্‌ তুর্ক মত।
জ‍প ভাই দিবারাত্র বিভুর সেই হরিনাম
বিশ্ববাসি, তৃপ্তি ল’ভে হও আপ্তকাম।
শুন মা, ভবানি, মিনতি করি আমি
বিতর মা কৃপাকণা, তোরে সদা প্রণমি।
ভগবতী দোহরা (‘ভগবতী’ শব্দ মঙ্গলার্থ—
দোহরা—ছন্দবিশেষ।)
দ্বারে দাঁড়ায়ে দাস, দাও না মোরে বর
জগত মাঝে ‘পন্থ্’ চালাই, তুমি দুষ্টনাশি তুষ্টি দাও সবার।

 কিম্বদন্তী আছে ভক্তের সনির্ব্বন্ধ প্রার্থনায় দেবী আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। অতঃপর গোবিন্দের সম্মুখে সশরীরে উপস্থিত হইয়া জানাইলেন যে তিনি তাঁহার সাধনায় অতীব সন্তুষ্ট হইয়াছেন—তাঁহার ঈপ্সিত কর্ম্ম সুসিদ্ধ হইবে। এই বলিয়া দেবী ‘করদ’ নামক অসি প্রদান করিলেন এবং অবিলম্বে খালসা গঠনে আজ্ঞা দিলেন। কথিত আছে গোবিন্দ তন্ময়মনে মুদ্রিতনয়নে চিন্তারত থাকাতে দেবীর প্রথম আহ্বানে নয়ন উন্মীলন করেন নাই। সেইজন্য দেবী বলেন—“যেহেতু তুমি প্রথমেই চক্ষু মুদ্রিত করিলে তখন তোমার জীবদ্দশায় খালসাগণ বিশেষ জয়লাভ করিতে পারিবে না, পরে হইবে।” তৎপরে গোবিন্দ আপন অঙ্গুষ্ঠ কর্ত্তন করিয়া বলি প্রদান করেন। উহাতে সম্যক্‌ সন্তুষ্ট না হইয়া তিনি স্থির করিয়াছিলেন আপনার চারিটি পুত্রের মধ্যে একটি উৎসর্গ করিয়া ধন্য হইবেন। কিন্তু মাতৃহৃদয়ের সকরুণ মমতা দেবী-ভক্তের এই অভূতপূর্ব্ব-অভিলাষ চরিতার্থ করিতে দেয় নাই। অনেকে বলিয়া থাকেন এই সময় শ্রীরামচন্দ্রসেবক মহাবীরস্বামী তাঁহাকে দেখা দেন এবং আপনার ‘কাছ’ (ছোট পাজামা) প্রদান করিয়া বলেন উহা পরিধান করিলে তিনি সংগ্রামে অজেয় হইবেন। শিষ্যদিগকেও ঐরূপ পরিচ্ছদ ব্যবহার করিতে পরামর্শ দেন।[]

  1. আধুনিক কোন কোন গুরুমুখী পণ্ডিত গুরুগোবিন্দ কর্ত্তৃক চণ্ডিকা নয়নাদেবীর আরাধনার বিবরণটী একেবারে উড়াইয়া দিতে প্রয়াস পাইয়াছেন। গুরুগোবিন্দ পৌত্তলিক ছিলেন—একথা স্বীকার করিতে তাঁহারা একান্ত নারাজ। কিন্তু তাঁহাদের এই মত অকাট্য যুক্তি সহায়ে এখনও স্থাপিত হয় নাই—গবেষণার ফলে ভবিষ্যতে যদি সমস্ত বিবরণটী মিথ্যা বলিয়া প্রমাণিত হয় আমরা উহা সাদরে স্বীকার করিয়া লইব। তবে বক্তব্য এই—গুরু গোবিন্দ যে কঠোর শক্তিসাধক ছিলেন একথা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। আর তদ্ভিন্ন, ধর্ম্মমতের দিক দিয়া দেখিলে, নানক-প্রচারিত পৌত্তলিকতা-বর্জ্জিত শিখধর্ম্মের সহিত গুরুগোবিন্দের মতামতের মূলগত পার্থক্য যে থাকিবে—তাহাতে আশ্চর্য্যের কি আছে?