শিশুর শিক্ষা/খেলাধূলা
খেলাধূলা
“Up, up my friend, and quit your book,
For surely you will grow double.
Up, up! my friend and clear your look
Why all these toil and trouble.”
শৈশব জীবনের একটা প্রধান কথা হচ্ছে খেলাধূলা। কি মানুষের, কি ইতরপ্রাণীর শিশুমাত্রই শুধু যে খেলাধূলা ভালবাসে তা’ নয়, এই জিনিষটা তাদের জীবনে একটা বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে’ আছে এবং চিরদিন থাকবে। আশ্চর্য্যের বিষয় এই অপরিহার্য্য বিষয়টির প্রয়োজনীয়তা মানুষ উপলব্ধি করতে পেরেছে বড় বিলম্বে। ক্রীড়াকৌতুকের মধ্য দিয়ে শিশুকে শিক্ষা দেওয়া যে কত সহজ এবং আনন্দজনক একথাটা ঊনবিংশ শতাব্দীর আবিষ্কার। ফ্রোবেল, মণ্টেসরী প্রভৃতি মনীষী নূতন নূতন পদ্ধতি প্রবর্ত্তন করে’ শিশুশিক্ষার ইতিহাসে এক অভিনব যুগান্তর আনয়ন করেন। তা’হলেও সাধারণ মানুষের মন এখনো পর্য্যন্ত তাঁদের এই সহজ সত্যোপলব্ধিকে স্বচ্ছন্দে গ্রহণ করতে পারে নি, একথা অস্বীকার করবার উপায় নেই।
বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ছেলেমেয়েকে পদে পদে নানা রীতিনীতির বাঁধনে ফেলে মনুষ্য-সমাজের উপযোগী করে’ তোলার দিকে পিতা-মাতার দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে। কিন্তু সেই সঙ্গে যদি স্বাভাবিক ক্রীড়াকৌতুকপূর্ণ আনন্দচঞ্চল জীবন থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করা হয়, তাহলে সে হয় তাকে বায়ু ও জল থেকে বঞ্চিত করার মতই নিষ্ঠুর ও ভয়াবহ। বাস্তবিকই মনের স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ এবং খেলাধূলার মধ্য দিয়ে তার অবাধ প্রকাশ যেন শৈশবজীবনে মানুষের প্রাণবায়ু। মনে রাখবেন: ছেলেই হোক আর মেয়েই হোক, অবাধ ক্রীড়াকৌতুক তাদের জন্মগত অধিকার; অন্য কোন রকম আনুষঙ্গিক উপকারের কথা বাদ দিলেও কেবলমাত্র দেহ ও মনের স্বাভাবিক বিকাশের জন্যেই খেলাধুলার প্রয়োজন।
যে খেলায় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও মাংসপেশীর স্বচ্ছন্দ চালনা হয়, দেখা যায়, ছেলেমেয়েরা তাই বেশী ভালবাসে। সিঁড়ি, গাছের ডাল বা অন্য কোন উঁচু স্থান বেয়ে ওঠা এবং লম্ফঝম্ফ ইত্যাদিতে তাদের আনন্দ অফুরন্ত।
খেলাধূলার মনস্তত্ত্বে আরও একটা সাধারণ কথা লক্ষযোগ্য। মানুষের বা ইতরপ্রাণীর শিশুমাত্রই খেলার মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তোলে তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের ছবি। বেড়াল ছানাদের খেলা অনেক সময় বেড়ালের ইঁদুর ধরারই অনুরূপ। মানব-শিশুদেরও তাই; নিজেদের খেলাঘরে তারা বড়োদের কার্য্যকলাপই অনুকরণ করে। বয়ঃপ্রাপ্ত হলে সংসার-রঙ্গমঞ্চে তাদেরকে যে অংশ অভিনয় করতে হবে, শৈশবে যেন তারই রিহার্সেল চলে।
খেলাধূলার গোড়ায় কাজ করে কোন্ কোন্ মনোবৃত্তি, সে সম্বন্ধে মনস্তত্ত্ববিদদের মধ্যে মতভেদ আছে। রাসেল বলেন: শক্তি ও ক্ষমতা অর্জ্জনের আগ্রহই (will to power) তার মধ্যে প্রধান। খেলাধূলার মধ্যে শক্তি অর্জনের ইচ্ছা দুটি বিভিন্ন রূপে প্রকাশ পেতে পারে। প্রথমতঃ বয়োজ্যেষ্ঠদের অনুকরণে কোন কঠিন কাজ সম্পন্ন করবার চেষ্টা। বড়দের তুলনায় নিজের দুর্ব্বলতা সম্বন্ধে তারা খুবই সজাগ। পিতামাতা এককালে তাদেরই মতন শিশু ছিলেন, আবার এমনও দিন আসবে যখন তারা নিজেরা তাঁদের মতন বিপুল শক্তি অর্জন করবে, এই চিন্তায় তারা যথেষ্ট আশা, আনন্দ ও কৌতুক অনুভব করে; আর তারই প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায় তাদের খেলার মধ্যে। দ্বিতীয়তঃ কল্পনায় নিজেকে অসীম শক্তিশালী বলে মনে করা। সাধারণতঃ ছেলেপিলেরা বাঘ, সিংহ প্রভৃতি ভয়ঙ্কর জানোয়ার অথবা রাক্ষসের মত কল্পিত ভয়াবহ জীব সেজে অন্যদের ভয় দেখাতে খুবই ভালবাসে। এরও মূলে রয়েছে শৈশবের অক্ষমতা কাটিয়ে শক্তিমান হবার অন্তর্নিহিত প্রবল বাসনা।
অবশ্য এছাড়া যে অন্য কোন মনোবৃত্তি খেলাধূলার মধ্যে নেই তা, বলা যায় না। কেউ কেউ বলেন—শিশুমনের অনন্ত কৌতূহলও এর মধ্যে কিছু পরিমাণ আছে। বোধ হয় বাঘ, ভালুক, রেলগাড়ী বা উড়োজাহাজ সেজে তারা মনে করে বুঝি ওসব জিনিষ সম্পর্কে নিজের ধারণা অনেকটা পরিষ্কার হয়ে এল।
আবার ওরা এ-ও ভাল করে’ জানে যে খেলা শুধু খেলাই। বিপদের আশঙ্কা নেই বলেই ওরা খেলাচ্ছলে রাক্ষস, বাঘ, ভালুক, এরোপ্লেন-দুর্ঘটনা বা হিমালয় অভিযান প্রভৃতি নানা ভয়াবহ বিষয়ের অবতারণা করতে এবং সেই অভিনয়কে সর্বান্তঃকরণে উপভোগও করতে পারে।
এই ধরণের ক্রীড়াকৌতুকের গোড়ায় আরও রয়েছে অভিনয়ের অফুরন্ত আনন্দ। বয়োজ্যেষ্ঠরা উপন্যাস পড়ে, থিয়েটার বায়োস্কোপ দেখে আনন্দ পান, যদিও তাঁরা জানেন চরিত্রগুলি সবই কল্পনার সৃষ্টি। তেমনি শৈশবের খেলায় অভিনয় যে শুধু অভিনয় মাত্র একথাটা পুরোপুরি জানলেও নিছক আনন্দের প্রেরণাই ছেলেপিলেদের খেলায় মত্ত করে। মোটের উপর শিশুমনের প্রধান বৃত্তি সব-গুলিরই ছায়াপাত হয় তাদের খেলাধূলার মধ্যে।
এই শ্রেণীর খেলাধূলা আবার কেউ কেউ আদৌ অনুমোদন করেন না। অকর্ম্মণ্য অলস যুবকের অলীক দিবাস্বপ্ন যেমন প্রশংসনীয় নয়, এঁদের মতে শৈশবের খেলায় মিথ্যা অভিনয়ও তেমনি অর্থশূন্য এবং পরিত্যাজ্য। অন্য বিশেষজ্ঞরা আবার অকাট্য যুক্তি দিয়ে এঁদের মত ভ্রান্ত প্রতিপন্ন করেছেন। মণ্টেসরী প্রথায় শিশুদের শিক্ষার জন্য যে যন্ত্র (apparatus) ব্যবহৃত হয়, তাকেই রেলে বা ষ্টিমারে পরিণত করে খেলা করবার লোভ সময় সময় শিশুদের মনে প্রবল হয়। একথা সত্য যে, শিক্ষক কখনো তার প্রশ্রয় দেন না। এই ধরণের খেলা তাঁদের মতে মনোজগতে শুধু বিশৃঙ্খলাই আনয়ন করে। কিন্তু তাহলেও এঁদের পদ্ধতিকে নিন্দে করা যায় না। কারণ যা নিয়ে তাঁদের কারবার তা বাস্তবিক পক্ষে খেলা নয়; মূল উদ্দেশ্য শিক্ষা, খেলা উপলক্ষ মাত্র। কিন্তু খেলা যেখানে নিছক খেলাই, কেবলমাত্র উপলক্ষ নয়—সেখানে শিশুদের বাস্তব সত্যের বাঁধনের মধ্যে রাখবার চেষ্টা করা ভুল। তাদের কল্পনার গতি সেখানে অবাধ হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
ভূতপরীর কাহিনী এবং আলাউদ্দীনের আশ্চর্য প্রদীপ প্রভৃতি আজগুবী গল্প সম্পর্কেও এই কথাই খাটে। ছেলেপিলেদের গল্প বলার সময় কোন ভয়াবহ কাহিনী হলেও ভয়টাকে প্রাধান্য না দিয়ে আমোদের দিকেই বেশী নজর রাখতে হবে; কল্পনা যেন এখানেও বাধা না পায়। বাস্তব সত্যের চেয়ে কল্পনা কিছু কম দরকারী নয়। কল্পনার জগতে বিচরণ করে মানুষমাত্রই যে আনন্দ পায় তার তুলনা নেই। শিশুদেরও এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। অপদার্থ যুবকের কল্পনার বিলাসলীলার সঙ্গে এর তুলনা করা ভুল। কারণ বিস্তীর্ণ কর্ম্মক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে যদি কেউ স্বপ্নের নেশায় মশগুল হয়ে দিন কাটায় তবে তা নিন্দনীয় হতে পারে, কিন্তু শিশুদের কর্ম্মক্ষেত্র তখনো পর্য্যন্ত দূরে। খেলাধূলার মধ্য দিয়ে কল্পনার তারা যদি রঙীন স্বপ্ন রচনা করবার সুযোগ পায়, ভবিষ্যৎ জীবনে তাকেই কার্য্যে পরিণত করবার প্রেরণা জাগতে পারে। কাজেই তাদের চিন্তাশক্তিকে বাস্তব সত্যের পিঞ্জরে বন্দী করে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা কোন মতেই ঠিক নয়।
অবশ্য এও বলা যায় যে দৈত্যদানব প্রভৃতি ভয়াবহ জীবের কল্পনায় ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের কি সুবিধা হতে পারে? টপাটপ মানুষ গিলে খাওয়া প্রভৃতি বিকট কল্পনার প্রশ্রয় দেওয়াই বা বিংশ শতাব্দীর সভ্য মানব কি করে অনুমোদন করতে পারে? এরও উত্তর মনস্তত্ত্ববিদরা দিয়েছেন।
শিশুদের মনে শক্তি অর্জনের যে প্রবল ইচ্ছা থাকে, প্রথম অবস্থায় তার থাকে অস্ফুট, অমার্জিত রূপ, যেমন ছিল মানুষের আদি পূর্ব্বপুরুষদের। নিজেকে শক্তিশালী কল্পনা করতে গিয়ে বীভৎস হত্যাব্যাপারে শিশুদের বিতৃষ্ণা নেই, নিজেকে রাক্ষস বলে ভাবতেও গভীর আনন্দ। এই যে অমার্জ্জিত মনোবৃত্তি তাকে মার্জ্জিত ও কল্যাণের পথে নিয়োজিত করতে হলে একান্ত প্রয়োজন যে জিনিষ, সে হল যথোচিত শিক্ষা। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে একই মনোবৃত্তির বিকাশ ও প্রকাশ বিভিন্নমুখী হতে পারে। শিক্ষার সার্থকতা এইখানেই। উপযুক্ত শিক্ষ্য মানুষের অস্ফুট মনোবৃত্তিকে পরিণত রূপ দেয়—বিপথ গমন থেকে রক্ষা করে সত্য ও মঙ্গলের পথে উদ্বুদ্ধ করে। এই যে শিশুমনের শক্তিলাভের তীব্র কামনা নানা অস্বাভাবিক পথে চরিতার্থতা খুঁজে বেড়ায়, যথোচিত শিক্ষা পেলে পরিণত বয়সে শিশুসুলভ অমার্জিত রুচি ছাড়িয়ে উঠবার পরে তাই হয়ত বয়স অনুযায়ী বৈজ্ঞানিক গবেষণা বা তেমনি অন্য কোন কল্যাণকর সাধনার মধ্যে বিকাশলাভ করতে পারে।
শৈশবে খেলাধূলার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করবার সঙ্গে সঙ্গে খেলার প্রকারভেদ নিয়ে সমস্যা উপস্থিত হয়। বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন রকমের ক্রীড়া ছেলেপিলেদের আনন্দ দেয়। বয়স অনুযায়ী খেলা ও খেলার সরঞ্জামের যথোপযুক্ত নির্ব্বাচনের উপর অনেকটা নির্ভর করে তার ফলাফল।
জীবনের প্রথম বৎসরে শিশু খেলার সাথীর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না। এই সময়ে হালকা, রঙীন সেলুলয়েড বা সেই জাতীয় অন্য জিনিষের তৈরী পুতুল ও জীবজন্তু সবচেয়ে বেশী উপযোগী। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমে দিতে হবে এমন উপকরণ যাতে অঙ্গচালনা হয়, যেমন বিভিন্ন আকারের বল। আবার যাতে বুদ্ধিবৃত্তির চালনা হয় সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। মাটির সাহায্যে নানারকম জিনিষ প্রস্তুত করতে দিলে নৈপুণ্য জন্মাবে, ঐ সব জিনিষের আকৃতি ও গড়ন সম্পর্কে জ্ঞান বাড়বে, সেই সঙ্গে শিশু আমোদও পাবে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দিক দিয়ে দেখতে গেলে মাটী না দিয়ে কিছুটা ময়দা ও লবণ সামান্য জলে মেখে শক্ত আটা প্রস্তুত করে দেওয়া যেতে পারে। তাতে আবার নানারকম রং করে দিলে শিশুদের চিত্তগ্রাহী হবে। ড্রয়িং পেণ্টিংএর সরঞ্জাম এবং কাটবার জন্যে কাগজ ও কাঁচি ৩/৪ বছর বয়স থেকেই দেওয়া যায় কিন্তু মনে রাখতে হবে আমরা এখানে শুধু খেলাধূলার কথাই বলছি এবং এসব জিনিষ খেলার সরঞ্জাম হিসাবেই দিতে হবে। উপরোক্ত উপকরণগুলো নিয়ে ইউরোপীয়ান পদ্ধতির স্কুলগুলোতে কাজ করতে দেওয়া হয়। বাড়ীতে ঐ জিনিষগুলোই শিশু খেলার সময় নিজের ইচ্ছামত ব্যবহার করতে পারে। চালচলন ও আচার-ব্যবহারে যথাযথ শিক্ষা গোড়া থেকে পেয়ে থাকলে সে কখনো হাতে পেয়ে জিনিষগুলোর অপব্যবহার করে সংসারে বিশৃঙ্খলা বাড়াবে না। বরং এই ধরণের কাজে নিজের বয়সোচিত অস্ফুট নৈপুণ্যের পরিচয় দেবার সুযোগ পেয়ে খুশীই হবে।
ছুতারের যন্ত্রপাতির অনুরূপ খেলনাতে একসঙ্গে প্রয়োজনীয় কাজ শিখবার সহায়তা এবং আমোদ দুই-ই হতে পারে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমেই কোন সম্পূর্ণ জিনিষ না দিয়ে যাতে নিজের শক্তি বা নৈপুণ্য খাটাবার সুযোগ থাকে ঐ ধরণের সরঞ্জামই দেওয়া ভাল। শুধু চাবি দিলেই যে খেলনা চলে তার চেয়ে ভালো যেগুলোতে কতগুলো বিভিন্ন অংশ জোড়া দিয়ে নিজ হাতে তৈরী করে নিতে হয় বাড়ী ঘর বা তেমনি ধরণের কোন সম্পূর্ণ জিনিষ।
ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নাচ জিনিষটা একাধিক কারণে ভালো। এতে শুধু অঙ্গচালনাই হয় না; গান বা বাজনার সঙ্গে সঙ্গে নাচতে শেখালে অতি সহজ সুর ও তাল-জ্ঞান জন্মায়।
ছেলেপিলেদের কখনো কখনো খেলতে দিতে হবে একেবারে স্বাধীনভাবে; পিতামাতা তখন হবেন দর্শক মাত্র। আবার কখনো বা তাঁদেরকে সন্তানের খেলার সাথী হয়ে তাদের সঙ্গে সমান উৎসাহে ক্রীড়াকৌতুকে যোগদান করতে হবে। সময় সময় প্রচুর স্বাধীনতা দেবার ফলে খেলাকে ইচ্ছামত সরস ও কৌতুকপ্রদ করে তুলবার জন্যে ছেলেরা নিজের বুদ্ধিবৃত্তিকে চালনা করবার অবসর পায়। আবার মাঝে মাঝে তাদের খেলার অংশ গ্রহণ করলে শুধু যে খেলার দোষ ত্রুটি সংশোধন করা যায় তা নয়,—ছেলেমেয়েরা তাতে উৎসাহিতও হয়।
থিয়েটার, বায়োস্কোপ প্রভৃতি অনেকে পছন্দ করেন। কিন্তু ছেলেপিলেদের বিষয়ে একটু সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কোন কোন ছায়াচিত্র আছে যা থেকে তারা বহু শিক্ষা আহরণ করতে পারে। কিন্তু এমনও অনেক দেখা যায় যা অপরিণত বয়স্ক বালকবালিকার জন্যে সম্পূর্ণ অনুপযোগী এবং ক্ষতিকর।
খেলাধূলার কথা বলতে গেলে এসে পড়ে খেলার সাথীর কথা। খেলাধূলার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেই স্বীকার করা হয় উপযুক্ত সঙ্গীর প্রয়োজনীয়তা। কারণ জীবনের প্রথম বৎসর অতীত হবার সঙ্গে সঙ্গেই শিশু চায় অন্য বালকবালিকার সাহচার্য্য; ক্রমেই খেলাধূলার মধ্যে ঢোকে প্রতিযোগিতার ভাব এবং এই প্রতিযোগিতার ভাব এবং এই প্রতিযোগিতাই দেয় বেশী আনন্দ। এদের শৈশবের শিক্ষাদাতা যে শুধু বয়োজ্যেষ্ঠরাই তা নয়, এরা বহুল পরিমাণে শিক্ষা আহরণ করে যাদের কাছে থেকে, তারা এদেরই মত অন্য বালক বালিকা। শিক্ষা বইয়ের নীতিকথা মুখস্থ করে’ নয়, গুরুজনের উপদেশের ভিতরেও নয়—এই হ’ল “তাদের নিজস্ব আনন্দময় জগতে খেলাধূলার মধ্য দিয়ে অসীম তৃপ্তিপূর্ণ শিক্ষা।
সঙ্গী হিসাবে শিশুদের জীবনে সামান্য বয়োজ্যেষ্ঠ, বয়োকনিষ্ঠ বা একেবারে সমবয়স্ক—সকল প্রকার বালক বালিকারই বিশিষ্ট স্থান আছে। বড়দের ক্ষমতা ও বুদ্ধি শিশুদের আকাঙ্ক্ষার বস্তু। কিন্তু তাহলেও এদের দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে পূর্ণবয়স্কদের উপর যতটা নয়, তার চেয়ে বেশী তাদেরই শ্রেণীর বালক-বালিকার গতিবিধির উপর। পূর্ণবয়স্কদের শক্তি শিশুদের বিস্ময় উদ্রেক করে, কিন্তু তাদের প্রত্যেকটী কার্য্যকলাপ পূর্ণাঙ্গ ও নিখুঁত বলে তাদের অনুকরণে নিজেদের চালচলন গড়ে তোলা অনেকটা ক্ষমতার ' অতীত বলে মনে হয়। এখানেই প্রয়োজন সামান্য বয়োজ্যেষ্ঠদের সংসর্গ। আচার-ব্যবহারে তারা শিশুদের চেয়ে অগ্রসর, কিন্তু পূর্ণ বয়স্কদের মত একেবারে নিখুঁত নয়। এই কারণে এদের অনুকরণ অনেকটা অনায়াসসাধ্য। সময় সময় পিতা বা মাতার শিশুদের খেলাধূলায় অংশ গ্রহণ করা প্রয়োজন বটে, কিন্তু উভয় পক্ষের মধ্যে ব্যবধান অপরিমিত। তাঁরা খেলায় যোগ দেবেন শিশুর মনস্তুষ্টির জন্য, নিজের স্বতঃ উচ্ছ্বসিত আনন্দের প্রেরণায় নয়। খেলাধূলায় তাঁদের মধ্যে থাকে যেটুকু আন্তরিকতার অভাব, অন্য বালকরা বয়সে বড় হ’লেও তাদের মধ্যে তা থাকবার হেতু নেই। এদেরকে নিজেদের মধ্যে নিঃসঙ্কোচে গ্রহণ করতে এবং সমশ্রেণীর বলে মনে করতে শিশুদের বাধা হয় না। এসব কারণে সাধারণতঃ ছেলেরা নিজেরাই সামান্য বয়োজ্যেষ্ঠদের সাহচর্য্য ভালবাসে। অপেক্ষাকৃত বড় ছেলেদের সাহচর্য্য শিশুর মনে আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলবার পক্ষে বাস্তবিকই অনুকূল। অনুভব করে বটে। বড় ছেলেদের সঙ্গে খেলতে তারা গৌরবও অনুভব করে বটে।
কিন্তু এখানে একটা মজা হচ্ছে এই যে, সকল ছেলেই নিজেদের চেয়ে বয়সে বড় বন্ধু চায় ব’লে বিভিন্ন বয়সের ছেলেদের মধ্যে বন্ধুত্ব বা খেলা অনেক সময় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। বয়োকনিষ্ঠদের পক্ষে যেঅগ্রবর্তীদের সঙ্গ লোভনীয় ও শিক্ষাপ্রদ তাদেরই দৃষ্টি আবার নিবন্ধ থাকে আরো সম্মুখের দিকে। এই কারণে বিদ্যালয়ে বা অন্যত্র যেখানে বিভিন্ন বয়সের প্রচুর ছেলে মেয়ের মধ্যে সঙ্গী নির্ব্বাচন করবার সুযোগ পাওয়া যায়, সেখানে একেবারে সমবয়স্কদের মধ্যেই প্রায় বন্ধুত্ব সীমাবদ্ধ থাকে। কাজেই বয়োজ্যেষ্ঠ বাণক বালিকার সঙ্গলাভের সুবিধা একমাত্র নিজ গৃহেই সম্ভব হয়ে থাকে, তাও বৃহৎ পরিবার না হলে সম্ভব নয়। এতেও আবার একটা অসুবিধা দেখা যায়। পরিবারের মধ্যে সর্ব্বজ্যেষ্ঠ যে বালক বা বালিকা, এই পদ্ধতির সুবিধা থেকে তাকে সকল অবস্থাতেই বঞ্চিত হতে হবে। সাধারণতঃ দেখা যায় যে পরিবারের প্রথম সন্তান হাঁটা, কথা বলা ইত্যাদি শিখতে অনুবর্ত্তীদের চেয়ে একটু বেশী সময় নেয়। অপেক্ষাকৃত বড় ছেলেদের সংসর্গ যেমন শিশুর জীবন গঠনে সহায়তা করে অন্যদিকে তেমনি অপেক্ষাকৃত ছোট ছেলেদের দ্বারাও চরিত্রের কতকগুলি প্রধান গুণ বিকাশের সহায়তা হয়, বিশেষ ক’রে তিন বছর থেকে ছয় বয়সের মধ্যে। দুর্ব্বলের সঙ্গে সবলের আচরণে যে কোমলতা ও মমতাবোধ থাকা বাঞ্ছনীয়, ছোট শিশুর সঙ্গে ব্যবহারে হাতে কলমে সে শিক্ষা সম্ভব হয়—মৌখিক উপদেশের চেয়ে, যা অনেক বেশী পরিমাণে কার্যকরী হতে পারে। ছোটদের আরামের জন্যে নিজে একটু কষ্ট স্বীকার করা, নিজের খেলনা বা পোষাক পরিচ্ছদ প্রয়োজন মত তাদের ব্যবহার করতে দেওয়া তাদের ত্রুটির দরুণ নিজের কোন জিনিষ নষ্ট হলেও ক্ষমা করা বা নিজের অসাবধানতায় তাদের কোথাও লাগলে সমবেদনা অনুভব করা ইত্যাদি ব্যাপারে মাতা একটু একটু ক’রে সহিষ্ণুতা সহৃদয়তা ও নিঃস্বার্থপরতার বীজ বপন করতে পারেন।
সমবয়স্ক ছেলেদের সাহায্যের প্রয়োজনও নেহাৎ কম নয়। একই বয়সের ছেলেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় প্রত্যেকেই মর্য্যাদ। বা অমর্য্যাদা পায় নিজেরই যোগ্যতা অনুসারে; কারণ তাদের মধ্যে যোগ্যতার ছাড়া বয়সের বা অন্য কিছুর তারতম্য বিশেষ নেই। অবশ্য এখানে দেখতে হবে খেলার সাথীদের সঙ্গে নিজের আর্থিক অবস্থা বা সামাজিক পদমর্যাদার তারতম্য যেন শিশুর মনে কোন রেখাপাত করতে না পারে। তার চেয়ে অপেক্ষাকৃত উচ্চ ও নীচ সকল শ্রেণীর বালককে যেন সে সমান চোখে দেখতে পারে যথাসম্ভব সেই অনুযায়ী শিক্ষা দিতে হবে। তাহলে প্রতিযোগিতায় জয়-পরাজয়ের উপরই শুধু নির্ভর করবে নিজের মর্য্যাদা ও গৌরব, ফলে আপনা থেকেই জাগবে একটা উন্নতির প্রয়াস।
উপরে সবই বলা হয়েছে স্বাভাবিক সুস্থ বালক-বালিকার বিষয়। কচিৎ এমনও অস্বাভাবিক চরিত্রের বালক বালিকা দেখা যেতে পারে, যারা অন্য ছেলেপিলেদের সঙ্গ মোটেই সহ্য করতে পারে না। হয়ত তাদের মধ্যে এমন কোন বিশেষ প্রতিভা আছে যার বিকাশের জন্যে প্রয়োজন অপেক্ষাকৃত নির্জ্জনতার অবকাশ। এসব ক্ষেত্রে সাবধানে পর্য্যবেক্ষণ করবার পর বিশেষ ব্যবস্থা অবলম্বন করা উচিত। কিন্তু এই ধরণের ব্যতিক্রম খুব কমই দেখা যায়। সাধারণ নিয়মে ছেলেপিলের দেহে মনে জীবনীশক্তি সঞ্চারিত হয়, খেলাধূলার মধ্য দিয়েই।
অনেক সময় দেখা যায় লেখাপড়ার তাম্বির দিকে অতিরিক্ত ঝোঁকের বশে পিতামাতা সন্তানের স্বাভাবিক সজীবতার উৎসমুখে একেবারে পাথর চাপা দিয়ে দেন। একটী সাত আট বছরের ছেলের কথা বলি। সে স্কুলে পড়ে। তার দৈনিক কাজের রুটিন দেখুন: সকাল বেলা থেকে রাত্রে শুতে যাওয়া পর্য্যন্ত খাওয়া দাওয়া ইত্যাদি নেহাৎ প্রয়োজনীয় ব্যাপার ছাড়া লেখা আর পড়া, পড়া আর লেখা থেকে অন্য কোন উপলক্ষে তার ছুটি নেই; তা সত্ত্বেও বন্ধুবান্ধবের কাছে তার পিতাকে সর্ব্বদা আফসোস করতে শোনা যায় যে ছেলেটাকে কিছুতেই মানুষ করা যাচ্ছে না, কারণ চারটের সময় স্কুল থেকে এসে খেয়ে দেয়ে যে কয়েকটা অঙ্ক কষে রাখবে—তা সে কিছুতেই করতে চাইবে না। কিন্তু তিনি ভেবে দেখেন না যে এরকম দিন-রাত কুইনিন গেলানোর মতো চেষ্টা করার ফলে কয়েকটা বই মুখস্থ হয়তো করানো যাবে, কিন্তু বিনিময়ে যে অমূল্য জিনিষ থেকে সে বঞ্চিত হবে তার ক্ষতিপূরণ কোনো কালেই হবে না। দিনের পর দিন শক্তির উপর অতিরিক্ত চাপ দেওয়ার ফলে ধীরে ধীরে দেহ ও মন উভয়ই হবে নির্জীব, অবসাদগ্রস্ত-চিন্তাশক্তি হয়ে পড়বে ভোঁতা এবং অকারণ ভয়, উদ্বেগ প্রভৃতি মানসিক দুর্ব্বলতায় জীবন হবে দুর্ভর; দুর্ল্লভ মানব-জীবনের প্রভাতেই পারিপার্শ্বিক জগতের রূপ, রস, গন্ধকে দেহে-মনে উপভোগ করবার ক্ষমতা একেবারেই লোপ পাবে।
আমাদের দেশে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা এই ব্যাপারে আরো বেশী দুর্ভাগ্য। তাদের লেখাপড়ার বালাই হয়তো অতটা নেই, কিন্তু দুদিন বাদে পরের ঘরে যেতে হবে—এইটেই হচ্ছে তাদের শৈশব-জীবনের সবচেয়ে বড় কথা; একটু বড় হতে না হতেই তাদের চলা, বলা, সব কিছুকে সেই অনুযায়ী গড়ে তোলার দিকে থাকে সকলের দৃষ্টি। আজকাল লেখাপড়ার দিকেও অবশ্য কিছুটা নজর পড়েছে। মেয়ে লেখাপড়া শিখুক বা কঠিন পারিবারিক দায়িত্ব বহনের জন্যে প্রস্তুত হোক, ভাল কথা। কিন্তু জীবনের সোনার ঊষায় সেইটে যেন তার পক্ষে অভিশাপ হয়ে না দাঁড়ায়। ভবিষ্যৎ জীবনের জন্যে তার স্বাস্থ্য ও সজীবতাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে দিতে হবে নির্দ্দোষ আমোদ-প্রমোদ ও ক্রীড়া-কৌতুকের জন্যে যথেষ্ট সুযোগ এবং অবসর। তা না হলে তার কাছ থেকে সবল ও সুস্থ সন্তানের জন্মদান আশা করা একেবারে ভুল। শুধু তাই নয়; সংসার ক্ষেত্রে প্রতি পদক্ষেপে মানুষকে যে-সব ক্ষুদ্র বৃহৎ ঘাত প্রতিঘাতের সম্মুখীন হতে হয়, তার জন্যে দরকার সতেজ মন—যে buoyancy of spirit প্রারম্ভেই যদি তা সমূলে বিনষ্ট হয় তাহলে যে কোন রকমের শিক্ষাই হবে একেবারে নিরর্থক।