শেষের কবিতা/ধূমকেতু

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

শেষের কবিতা

এতদিন পরে অমিত একটা কথা আবিষ্কার করেছে যে, লাবণ্যের সঙ্গে তার সম্বন্ধটা শিলঙসুদ্ধ বাঙালি জানে। গর্ভনমেন্টের অফিসের কেরানিদের প্রধান আলোচ্য বিষয় তাদের জীবিকা ভাগ্যগগনে ‘ কোন গ্রহ রাজার হৈল কেবা মন্ত্রিবর।’ এমন সময় তাদের চোখে পড়ল মানবজীবরেন জ্যোতির্মন্ডলে এক যুগ্মতারার আবর্তন, একেবারে ফাস্ট ম্যাগ্নিট্যুডের আলো। পর্যবেক্ষকদের প্রকৃতি অনুসারে এই দুটি নবদীপ্যমান জ্যোতিস্কের আগ্নেয় নাট্যের নানা প্রকার ব্যাখ্যা চলছে। পাহাড়ে হাওয়া খেতে এসে এই ব্যাখ্যার মধ্যে পড়েছিল কুমার মুকুজ্জে-অ্যাটর্নি। সঙক্ষেপের কেউ তাকে বলে কুমার মুখো, কেউ বলে মার মুখো। সিসিদের মিত্রাগোষ্ঠীর অন-শ্চর নয় সে, কিন’ জ্ঞাতি, অর্থাৎ জানাশোনার দলে। অমিত তাকে ধুমকেতু মুখো না দিয়েছিল। তার একটা কারণ, সে এদে দলের বাইরে, তবু সে মাঝে মাঝে এদর কক্ষপথে পুচ্ছ বুলিয়ে যায়। সকলেই আন্দাজ করে, যে গ্রহটি তাকে বিশেষ করে টান মারছে তার নাম লিসি। এই নিয়ে সকলেই কৌতুক অনুভব করে, কিন’, সিসি স্বয়ং এতে ক্রুদ্ধ ও লজ্জিত। তাই লিসি প্রায়ই প্রবলবেগে এর পচ্ছমর্দন করে চলে যায়, কিন’ দেখতে পাই, তাতে ধূমকেতুর লেজার বা মুড়োর কোনোই লোকসান হয় না। অমিত শিলঙের রাস-ায় ঘাটে মাঝে মাঝে কুমার মুখোকে দুর থেকে দেখেছে। তাকে না দেখতে পাওয়া শক্ত। বিলেতে আজো যায় নি বলে তার বিলিতি কায়দা খুব উৎকট ভাবে প্রকাশমান। তার মুখে নিরবচ্ছিন্ন একটা দীর্ঘ মোটা চুরুট থাকে, এইটেই তার ধুমকেতু মুখো নামের প্রধান কারণ। অমিত তাকে দূরে থেকেই এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেছে এবং নিজেকে ভুলিয়েছে যে ধুমকেতু বুঝি সেটা বঝতে পারে নি। কিন’ দেখেও দেখতে না পাওয়াটা টকেট বড়ো বিদ্যের অন-র্গত। চুরিবিদ্যের মতোই, তার সার্থকতার প্রমাণ হয় যদি না পড়ে ধরা। তাতে প্রত্যক্ষ দৃশ্যটাকে সম্পূর্ণ পার করে খেবার পারদর্শিতা চাই। কুমার মুখো শিলঙের বাঙালি সমাজ থেকে এমন অনেক কথা সংগ্রহ করেছে যাকে মোটা অক্ষরে শিরোনামা দেওয়া যেতে পারে ‘ অমিত রায়ের অমিতাচার’। মুখে সব চেয়ে নিন্দে করেছে যারা, মনে সব চেয়ে রসভোগ করেছে তারাই। যকৃতের বিকৃতিশোধনের জন্য কুমার কিছুদিন এখানে থাকবে বলেই সি’র ছিল, কিন’ জনশ্রুতিবিস-ারের উগ্র উৎসাহে তাকে পাঁচ দিনের মধ্যে কোলকাতায় ফেরালে। সেখানে গিয়ে অমিত সম্বন্ধে তার চুরুট-ধুমাকৃত অত্যুক্তি-উদ্গারে সিসি- লিসি মহলে কৌতুকে কৌতুহলে জড়িত বিভীষিকা উৎপাদর করলে। অভিজ্ঞ পাঠকমাত্রেই এতক্ষনে অনুমান করে থাকবেন যে, সিসি দেবতার বাহন হচ্ছে কেটি মিত্তিরের দাদা নরেন। তার অনেক দিনের একনিষ্ঠ বাহন দশা এবার বৈবাহনের দশম দশায় উত্তীর্ণ হবে, এমন কথা উঠেছে। সিসি মনে মনে রাজি। কিন’ যেন রাজি নয় ভাব দেখিয়ে একটা প্রদোষান্ধকার ঘনিয়ে রেখেছে। অমিতর সম্পতিসহায়ে নরেন এই সংশয়টুকু পার হতে পারবে বলে ঠিক করেছিল কিন’ অমিত হাম্বাগটা না ফেরে কোলকাতায়, না দেয় চিঠির জবাব। ইংরেজী যতগুলো গর্হিত শব্দভেদী বাক্য তার জানা ছিল সবগুলিই প্রকাশ্যে ও স্বগত উক্তিকে নিরুদ্দেশ অমিতর প্রতি নিক্ষেপ করেছে। এমন কি, তারযোগে অত্যন- বেতার বাক্য শিলঙে পাঠাতে ছাড়ে নি, কিন’ উদাসীন নক্ষত্রকে লক্ষ্য করে উদ্ধত হাউইয়ের মতো কোথাও তার দাহরেখা রইল না অবশেষে সর্ব সম্মতিক্রমে সি’র হল, অবস’াটার সরেজমিন তদন- হওয়া দরকার। সর্বনাশের স্রোতে অমিতর ঝুটির ডগাটাও যদি কোথাও একটু দেখা যায়, টেনে ডাঙায় তোলা আশু দরকার। এ সম্বন্ধে তার আপন বোন সিসির চেয়ে পরের বোন কেটির উৎসাহ অনেক বেশি। ভারতের ধন বিদেশে লুপ্ত হচ্ছে বলে আমাদের পলিটিক্সের যে আক্ষেপ কেটি মিটারের ভাবখানা সেই জাতের। নরেন মিটার দীর্ঘকাল য়ুরোপে ছিল। জমিদারের ছেলে, আয়ের জন্য ভাবনা নেই, ব্যয়ের জন্যেও; বিদ্যার্জনের ভাবনাও সেই পরিমাণেই লঘু। বিদেশে ব্যয়ের প্রতিই অধিক মনোযোগ করেছিল-অর্থ এবং সময় দুই দিকে থেকে। নিজেকে আর্টিষ্ট বল পরিচয় দিতে পারলে একই কালে দায়মুক্ত স্বাধীনতা ও অহেতুক আত্মসম্মান লাভ করা যায়। এইজন্যে আর্ট সরস্বতীর অনুসরণে য়ুরোপের অনেক বড়ো বড়ো শহরের বোহিমীয় পাড়ায় সে বাস করেছে। কিছুদিন চেষ্টার পর স্পষ্টবক্তা হিতৈষীদের কঠোর অনুরোধে আঁকা ছবি আঁকা ছেড়ে দিতে হল, এখন সে ছবির সমজদারিতে পরিপক্ক বলেই নিজের প্রমাণনিরপেক্ষ পরিচয় দেয়। চিত্রকলা সে ফলাতে পারে না, কিন’ দুই হাতে সেটাকে চটকাতে পারে। ফরাসি ছাঁচে সে তার গোঁফের দুই প্রত্যন-দেশকে সযত্নে কন্টকিত করেছে, এদিকে মাথায় ঝাঁকড়া চুলের প্রতি তার সযত্ন অবহেলা। চেহারাখানা তার ভালোই, কিন’ আরো ভালো করবার মহার্ঘ সাধনায় তার আয়নার টেবিল প্যারিসীয় বিলাসবৈচিত্র্যে ভারাক্রান-। তার মুখ ধোবার টেবিলের উপকরণ দশাননের পক্ষেও বাহুল্য হত। দামি হাভানা দু-চার টান টেনেই আনায়াসেই সেটাকে অবজ্ঞা করা এবং মাসে মাসে গাত্রবস্ত্র পার্সেল পোষ্টে ফরাসি ধোবার বাড়িতে ধুইয়ে আনানো, এ-সব দেখে ওর আভিজাত্য সম্বন্ধে দ্বিরুক্তি করতে সাহস হয় না। য়ুরোপের শ্রেষ্ঠ দর্জিশালার রেজিষ্ট্রি বহিতে ওর গায়ের মাপ ও নম্বর লেখা এমন সব কোঠায় যেখানে খুঁজলে পাতিয়ালা- কর্পুরতলার নাম পাওয়া যেতে পারে। ওর স্ন্যাঙ-বিকীর্ণ ইংরেজী ভাষার উচ্চারণটা বিজড়িত, বিলম্বিত, অমীলিত চক্ষুর অলস কটাক্ষ-সহযোগে অনতিব্যক্ত; যারা অভিজ্ঞ তাদের কাছে শোনা যায়, ইংল্যান্ডের অনেক নীলরক্তবান আমীরদের কন্ঠস্বরে এইরকম গদ্গদ জড়িমা। এর উপরে ঘোড়দৌড়ীয় অপভাষা এবং বিলিত শপথের দুর্বাক্যসম্পদে সে তার দলের লোকের আদর্শ পুরুষ। কেটি মিটারের আসল নাম কেতকী। চালচলন ওর দাদারই কায়দা-কারখানার বকযন্ত্রপরস্পরায় শোধিত তৃতীয় ক্রমের চোলাই-করা, বিলিতি কৌলীন্যের ঝাঁঝালো এসেনস। সাধারণ বাঙালি মেয়ের দীর্ঘকেশগৌরবের গর্বের প্রতি গর্বসহকারেই কোটি দিয়েছে কাঁচি চালিয়ে, খোঁপাটা ব্যাঙাচির লেজের মতো বিলুপ্তি হয়ে অনুকরণের উল্লম্ফশীল পরিণত অবস’া প্রতিপন্ন করছে। মুখের স্বাভাবিক গৌরিমা বর্ণপ্রলেপের দ্বারা এনামেল করা। জীবনের আদ্যলীলায় কেটির কালো চোখের ভাবটি ছিল স্নিগ্ধ, এখন মনে হয় সে যেন যাকে-তাকে দেখতেই পায় না। যদি বা দেখে তো লক্ষ্যই করে না, যদি বা লক্ষ্য করে তাতে যেন আধ খোলা একটা ছুরির ঝলক থাকে। প্রথম বয়সে ঠোঁটদুটিতে সরল মাধুর্য ছিল, এখন বার বার বেঁকে বেঁকে তার মধ্যে বাঁকা অঙ্কুশের মতো ভাব স’ায়ী হয়ে গেছে। মেয়েদের বেশের বর্ণনায় আমি আনাড়ি, তার পরিভাষা জানি নে। মোটের উপর চোখে পড়ে, উপরে একটা পাতলা সাপের খোলসের মতো ফুরফুরে আবরণ, আন্দরের কাপড় থেকে অন্য একটা রঙের আভাস আসছে। বুকের অনেকখানিই অনাবৃত; আর অনাবৃত বাহুদুটিকে কখনো কখনো টেবিলে, কখনো চৌকির হাতায়, কখনো পরস্পরকে জড়িত করে যত্নের ভঙ্গিতে আলগোছের রাখবার সাধনা সুসস্পূর্ন। আর যখন সুমার্জিতনখররমনীয় দুই আঙুলে চেপে সিগারেট খায় সেটা যতটা অলংকরণের অঙ্গ রূপে ততটা ধুমপানের উদ্দেশ্যে নয়। সব চেয়ে যেটা মনে দুশ্চিন-া উদ্রেক করে সেটা ওর সমুচ্চ- খুরওয়ালা জুতোজোড়ার কুটিল ভঙ্গিমায়; যেন ছাগলজাতীয় জীবের আদর্শ বিস্মৃত হয়ে মানুষের পায়ের গড়ন দেবার বেলায় সৃষ্টিকর্তা ভুল করেছিলেন, যেন মুচির দত্ত পদোন্নতির কিম্ভুত বক্রতায় ধরণীকে পীড়ন করে চলার দ্বারা এভোল্যুশনের ক্রটি সংশোধন করা হয়। সিসি এখনো আছে মাঝামাঝি জায়গায়। শেষের ডিগ্রি এখনো পায় নি, কিন’ ডবল প্রোমোশন পেয়ে চলেছে। উচ্চ হাসিতে, অজস্র খুশিতে, অনর্গন আলাপে ওর মধ্যে সর্বদা একটা চলন বলন টগবগ করছে-উপাসকমন্ডলীর কাছে সেটার খুব আদর। রাধিকার বয়ৎসন্ধির বর্ণনায় দেখতে পাওয়া যায় কোথাও তার ভাবখানা পাকা, কোথাও কাঁচা; এরও তাই। খুরওয়ালা জুতোয় যুগান-রের জয়তোরণ, কিন’ অনবচ্ছিন্ন খোপাটাতে রয়ে গেছে অতীত যুগ। পায়ের দিকে শাড়ির বহর ইঞ্চি দুই-তিন খাটো, কিন’ উত্তরচ্ছদে অসমবতির সীমানা এখনো আলজ্জতার অভিমুখে, অকারণ দস-ানা পরা অভ্যস- অথচ এখনো এক হাতের পরিবর্তে দুই হাতেই বালা; সিগারেট টানতে আর মাথা ঘোরে না, কিন’ পান খাবার আসক্তি এখনো প্রবল। বিস্কুটের টিনে ঢেকে আচার-আমসত্ত্ব পাঠিয়ে দিলে সে আপত্তি করে না; ক্রিস্ট্‌েমাসের প্লাম পুডিং এবং পৌষপার্বনের পিঠে এই দুইয়ের মধ্যে শেষটার প্রতিই তার লোলুপতা কিছু বেশি। ফিরিঙ্গি নাচওয়ালীর কাছে সে নাচ শিখেছে, কিন’ নাচের সভায় জুড়ি মিলিয়ে ঘূর্ণিনাচ নাচতে সামান্য একটু সংকোট বোধ করে। অমিত সম্বন্ধে জনরব শুনে এরা বিশেষ উদ্‌বিগ্ন হয়ে চলে এসেছে। বিশেষত, এদের পরিভাষাগত শ্রেণীবিভাগে লাবন্য গর্ভনেস। ওদের শ্রেণীর পুরুষের জাত মারবার জন্যেই তার স্পেশাল ক্রিয়েশন। মনে সন্দেহ নেই, টাকার লোভে মানের লোভেই সে অমিতকে কষে আঁকড়ে ধরেছে। ছাড়াতে গেলে সেই কাজটাতে মেয়েদেরই সম্মার্জনপটু হস-ক্ষেপ করতে হবে। চতুরমুখ তার চোর জোড়া চক্ষে মেয়েদের দিকে কটাক্ষপাত ও পক্ষপাত একসঙ্গেই করে থাকবেন, সেইজন্যে মেয়েদের সম্বন্ধে বিচারবুদ্ধিতে পুরুষদের গড়েছেন নিটে নির্বোধ করে। তাই স্বজাতিমোহমুক্ত আত্মীয় মেয়েদের সাহায্য না পেলে অনাত্মীয় মেয়েদের মোহজাল থেকে পুরুষদের উদ্ধার পাওয়া এত দুঃসাধ্য। আপাতত এই উদ্ধারের প্রণালীটা কিরকম হাওয়া চাই তাই নিয়ে দুই নারী নিজেদের মধ্যে একটা পরামর্শ ঠিক করেছে। এটা নিশ্চিত, গোড়ায় অমিতকে কিছুই জানতে দেওয়া হবে না। তার আগেই শত্রুপক্ষকে আর রণক্ষেত্রটাকে দেখে আসা চাই। তার পর দেখা যাবে মায়াবিনীর কত শক্তি। প্রথমে এসেই চোখে পড়ল অমিতর উপর ঘর এক পোঁচ গ্রাম্য রঙ। এর আগেও ওর দলের সঙ্গে অমিতর ভাবের মিল ছিল না। তবু সে তখন ছিল প্রখর নাগরিক চাঁচা, মাজা, ঝকঝকে। এখন কেবল যে খোলা হাওয়ায় রঙটা কিছু ময়লা হয়েছে তা নয়, সবসুদ্ধ ওর উপরে যেন গাছপালার আমেজ দিয়েছে। ও যেন কাঁচা হয়ে গেছে এবং ওদের মতে কিছু যেন বোকা। ব্যবহারটা প্রায় যেন সাধারন মানুষের মতো। আগে জীবনের সমস- বিষয়কে হাসির অস্ত্র নিয়ে তাড়া করে বেড়াত, এখন ওর সে শখ সেই বললেই হয়; এইটেকেই ওরা মনে করেছে নিদেন কালের লক্ষণ। সিসি একদিন ওকে স্পষ্টই বললে, ‘দুর থেকে আমরা মনে করেছিলুম তুমি বুঝি খাসিয়া হবার দিকে নামছ। এখন দেখছি তুমি হয়ে উঠছ যাতে বলে গ্রীন, এখানকার পাইনগাছের মতো, হয়তো আগেকার চেয়ে স্বাস’্যকর, কিন’ আগেকার মতো ইনটারেসটিঙনয়। অমিত ওঅর্ডসওঅর্থের কবিতা থেকে নজির পেড়ে বললে, ‘ প্রকৃতির সংসর্গে থাকতে থাকতে নির্বাক নিশ্চেতন পদার্থের ছাপ লেগে যায় দেহ মনে প্রাণে,যাকে কবি বলেছেন সঁঃব রহংবহংধঃব ঃযরহমং’ শুনে সিসি ভাবলে, নির্বাক নিশ্চেতন পদার্থকে নিয়ে আমাদের কোনো নালিশ নেই; যারা অত্যন- বেশি সচেতন আর যারা কথা কইবার মধুর প্রগলভতায় সুপটু তাদের নিয়েই আমাদের ভাবনা। ওরা আশা করেছিল, লাবণ্য সম্বন্ধে অমিত নিজেই কথা তুলবে। একদিন দুদিন তিনদিন যায়, সে একেবারে চুপ। কেবল একটা কথা আন্দাজে বোঝা গেল, অমিতর সাধের তরণী সমপ্রতি কিছু বেশিরকম ঢেউ খাচ্ছে। ওরা বিছানা থেকে উঠে তৈরি হবার আগেই অমিত কোথা থেকে ঘুরে আসে তার পর মুখ দেখে মনে হয়, ঝোড়া হাওয়ায় যে কলাগাছের পাতাগুলো ফালি ফালি হয়ে ঝুলছে তারই মতো শতদীর্ণ ভাবখানা। আরো ভাবনার কথাটা এই যে, রবি ঠাকুরের বই কেউ কেউ ওর বিছানায় দেখেছে। ভিতরের পাতায় লাবণ্যর নাম থেকে গোড়ার অক্ষরটা লাল কালি দিয়ে কাটা। বোধ হয় নামের পরশপাথরেই জিনিসটার দাম বাড়িয়েছে। অমিত ক্ষনে ক্ষনে বেরিয়ে যায়। বলে, ‘খিদে সংগ্রহ করতে চলেছি।’ খিদের জোগানটা কোথায়, আর খিদেটা খুবই যে প্রবল, তা অন্যদের আগোচর ছিল না। কিন’ তারা এমনি অবুঝের মতো ভাব করত যেন হাওয়ায় ক্ষুধাকরতা ছাড়া শিলঙে আর কিছু আছে এ কথা কেউ ভাবতে পারে না। সিসি মনে মনে হাসে কেটি মনে মনে জ্বলে। নিজের সমস্যাটাই অমিতর কাছে এত একান- যে, বাইরের কোনো চাঞ্চল্য লক্ষ্য করার শক্তিই তার নেই। তাই সে নিঃসংকোচে সখীযুগলের কাছে বলে, ‘ চলেছি এক জলপ্রপাতের সন্ধানে।’ কিন’ প্রপাতটা কোন্‌ শ্রেণীর, আর তার গতিটা কোন্‌ অভিমুখী তা নিয়ে অন্যদের মনে যে কিছু ধোঁকা আছে তা সে বুঝতেই পারে না। আজ বলে গেল, এক জায়গায় কমলালেবুর মধু সওদা করতে চলেছে। মেয়েদুটি নিতান- নিরীহভাবে সরল ভাষায় বললে, এই অপূর্ব মধু সম্বন্ধে তাদের দুর্দমনীয় কৌতুহল, তারাও সঙ্গে যেতে চায়। অমিত বললে পথ দুর্গম, যানবাহনের আয়ত্তাতীত। বলেই আলোচনাটাকে প্রথম অংশে ছেদন করেই দৌড় দিলে। এই মুধকরের ডানায় চাঞ্চল্য দেখে দুই বন্ধু সি’র করলে, আর দেরি নয়, আজই কমলালেবুর বাগানে অভিযান করা চাই। এ দিকে নরেন গেছে ঘোড়দৌড়ের মাঠে। সিসিকে নিয়ে যাবার জন্যে খুব আগ্রহ ছিল সিসি গেল না। এই নিবৃত্তিতে তার কতখানি শমদমের দরকার হয়েছিল তা দরদী ছাড়া অন্যে কে বুঝবে?