তিনসঙ্গী/শেষ কথা

উইকিসংকলন থেকে
< তিনসঙ্গী(শেষ কথা থেকে পুনর্নির্দেশিত)
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


শেষ কথা জীবনের প্রবহমান ঘোলা রঙের হ-য-ব-র-ল'র মধ্যে হঠাৎ যেখানে গল্পটা আপন রূপ ধ'রে সদ্য দেখা দেয়, তার অনেক পূর্ব থেকেই নায়ক-নায়িকারা আপন পরিচয়ের সূত্র গেথে আসে। পিছন থেকে সেই প্রাকৃগাল্পিক ইতিহাসের ধারা অনুসরণ করতেই হয়। তাই কিছু সময় নেব, আমি যে কে সেই কথাটাকে পরিষ্কার করবার জন্তে । কিন্তু নাম ধাম ভাড়াতে হবে । নইলে জানাশোনা মহলের জবাবদিহি সামলাতে পারব না। কী নাম নেব তাই ভাবছি, রোম্যান্টিক নামকরণের দ্বারা গোড়া থেকেই গল্পটাকে বসন্তরাগে পঞ্চমমুরে বাধতে চাই নে। নবীনমাধব নামটা বোধ হয় চলে যেতে পারবে, ওর বাস্তবের শ্যামলা রঙটা ধুয়ে ফেলে করা যেতে পারত নবারুণ সেনগুপ্ত ; কিন্তু তা হলে খাটি শোনাত না, গল্পটা নামের বড়াই করে লোকের বিশ্বাস হারাত, লোকে মনে করত ধার-করা জামিয়ার পরে সাহিত্যসভায় বাবুয়ানা করতে এসেছে। আমি বাংলাদেশের বিপ্লবীদলের একজন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মহাকর্ষ-শক্তি আণ্ডামান-তীরের খুব কাছাকাছি টান মেরেছিল। নানা বাকা পথে সি. আই. ডি-র ফঁাস এড়িয়ে এড়িয়ে গিয়েছিলুম আফগানিস্থান পর্যন্ত । অবশেষে পৌঁচেছি আমেরিকায় খালাসীর কাজ নিয়ে। পূর্ববঙ্গীয় জেদ ছিল মজ্জায়, একদিনও ভুলি নি যে, ভারতবর্ষের হাতপায়ের শিকলে উখো ঘষতে হবে দিনরাত যতদিন বেঁচে থাকি। কিন্তু বিদেশে কিছুদিন থাকতেই একটা কথা নিশ্চিত বুঝেছিলুম, আমরা যে প্রণালীতে বিপ্লবের পালা শুরু করেছিলুম, সে যেন আতশবাজিতে পটকা ছোড়ার মতো, তাতে নিজের পোড়াকপাল পুড়িয়েছি অনেক বার, দাগ পড়ে নি ব্রিটিশ রাজতক্তে । আগুনের উপর পতঙ্গের অন্ধ আসক্তি। যখন সদৰ্পে কাপ দিয়ে পড়েছিলুম তখন বুঝতে পারি নি, সেটাতে ইতিহাসের যজ্ঞানল \ՉԵ, তিন সঙ্গী জালানো হচ্ছে না, জ্বালাচ্ছি নিজেদের খুব ছোটো ছোটো চিতানল। ইতিমধ্যে যুরোপীয় মহাসমরের ভীষণ প্রলয়রূপ তার অতি বিপুল আয়োজন সমেত চোখের সামনে দেখা দিয়েছিল— এই যুগান্তরসাধিনী সর্বনাশাকে আমাদের খোড়োঘরের চণ্ডীমণ্ডপে প্রতিষ্ঠা করতে পারব সে তুরাশা মন থেকে লুপ্ত হয়ে গেল ; সমারোহ করে আত্মহত্যা করবার মতোও আয়োজন ঘরে নেই। তখন ঠিক করলুম, ন্যাশনাল তুর্গের গোড়া পাকা করতে হবে। স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলুম, বাঁচতে যদি চাই আদিম যুগের হাত-কুখানায় যে-কটা নখ আছে তা দিয়ে লড়াই করা চলবে না। এ যুগে যন্ত্রের সঙ্গে যন্ত্রের দিতে হবে পাল্লা ; যেমন-তেমন করে মরা সহজ, কিন্তু বিশ্বকৰ্মার চেলাগিরি করা সহজ নয়। অধীর হয়ে ফল নেই, গোড়া থেকেই কাজ শুরু করতে হবে— পথ দীর্ঘ, সাধনা কঠিন । দীক্ষা নিলুম যন্ত্রবিদ্যায়। ডেট্রয়েটে ফোর্ডের মোটর-কারখানায় কোনোমতে ঢুকে পড়লুম। হাত পাকাচ্ছিলুম, কিন্তু মনে হচ্ছিল না খুব বেশি দূর এগোচ্ছি। একদিন কী বুদ্ধি ঘটল, মনে হল, ফোর্ডকে যদি একটুখানি আভাস দিই যে, আমার উদ্দেশ্য নিজের উন্নতি করা নয়, দেশকে বাচানো, তা হলে স্বাধীনতাপূজারী আমেরিকার ধনস্মৃষ্টির জাদুকর বুঝি খুশি হবে, এমন-কি আমার রাস্ত হয়তো করে দেবে প্রশস্ত। ফোর্ড চাপা হাসি হেসে বললে, “আমার নাম হেনরি ফোর্ড, পুরাতন ইংরেজি নাম। আমাদের ইংলণ্ডের মামাতো ভাইরা অকেজো, তাদের আমি কেজো করব— এই আমার সংকল্প ।’ আমি ভেবেছিলুম, ভারতীয়কেও কেজো করে তুলতে উৎসাহ হতেও পারে। একটা কথা বুঝতে পারলুম, টাকাওয়ালার দরদ টাকাওয়ালাদেরই পরে। আর দেখলুম, এখানে চাকাতৈরির চক্রপথে শেখা বেশি দুর এগোবে না । এই উপলক্ষে একটা বিষয়ে চোখ খুলে গেল, সে হচ্ছে এই যে, যন্ত্রবিদ্যাশিক্ষার আরো গোড়ায় যাওয়া চাই, যন্ত্রের মাল শেষ কথা \OS) মসলা-সংগ্রহ শিখতে হবে । ধরণী শক্তিমানদের জন্তে জমা করে রেখেছেন তার তুর্গম জঠরে কঠিন খনিজ পদার্থ, এই নিয়ে দিগ্বিজয় করেছে তারা, আর গরিবদের জন্তে রয়েছে তার উপরের স্তরে ফসল— হাড় বেরিয়েছে তাদের পাজরায়, চুপসে গেছে তাদের পেট । আমি লেগে গেলুম খনিজবিদ্যা শিখতে। ফোর্ড বলেছে ইংরেজ অকেজো, তার প্রমাণ হয়েছে ভারতবর্ষে— একদিন হাত লাগিয়েছিল তারা নীলের চাষে, আর-একদিন চায়ের চাষে— সিবিলিয়ানের দল দপ্তরখানায় তকমাপরা law and order-এর ব্যবস্থা করেছে, কিন্তু ভারতের বিশাল অন্তর্ভাণ্ডারের সম্পদ উদঘাটিত করতে পারে নি, কি মানবচিত্তের, কি প্রকৃতির। বসে বসে পাটের চাষীর রক্ত নিংড়েছে। জামৃশেদ টাটাকে সেলাম করেছি সমুদ্রের ওপার থেকে। ঠিক করেছি আমার কাজ পটকা ছোড়া নয়। সিধ কাটতে যাব পাতালপুরীর পাথরের প্রাচীরে। মায়ের আঁচলধরা বুড়ে খোকাদের দলে মিশে মা মা’ ধ্বনিতে মন্তর পড়ব না, আর দেশের দরিদ্রকে অক্ষম অভুক্ত অশিক্ষিত দরিদ্র বলেই মানব, দরিদ্রনারায়ণ’ বুলি দিয়ে তার নামে মন্তর বানাব না। প্রথম বয়সে এরকম বচনের পুতুলগড় খেলা অনেক খেলেছি— কবিদের কুমোরবাড়িতে স্বদেশের যে রাংতালাগানো প্রতিমা গড়া হয়, তারই সামনে বসে বসে অনেক চোখের জল ফেলেছি। কিন্তু আর নয়, এই জাগ্রত বুদ্ধির দেশে এসে বাস্তবকে বাস্তব বলে জেনেই শুকনো চোখে কোমর বেঁধে কাজ করতে শিখেছি। এবার গিয়ে বেরিয়ে পড়বে এই বিজ্ঞানী বাঙাল কোদাল নিয়ে কুডুল নিয়ে হাতুড়ি নিয়ে দেশের গুপ্তধনের তল্লাসে, এই কাজটাকে কবির গদগদ-কণ্ঠের চেলারা দেশমাতৃকার পূজা বলে চিনতেই পারবে না। ফোর্ডের কারখানাঘর ছেড়ে তার পরে ন বছর কাটিয়েছি খনিবিদ্যা খনিজবিদ্যা শিখতে। যুরোপের নানা কেন্দ্রে ঘুরেছি, হাতে 8o তিন সঙ্গী কলমে কাজ করেছি, দুই-একটা যন্ত্রকৌশল নিজেও বানিয়েছি, তাতে উৎসাহ পেয়েছি অধ্যাপকদের কাছে, নিজের উপরে বিশ্বাস হয়েছে, ধিক্কার দিয়েছি ভূতপূর্ব মন্ত্রমুগ্ধ অকৃতাৰ্থ নিজেকে । আমার ছোটোগল্পের সঙ্গে এই-সব বড়ো বড়ো কথার একান্ত যোগ নেই– বাদ দিলে চলত, হয়তো ভালোই হত। কিন্তু এই উপলক্ষে একটা কথা বলার দরকার ছিল, সেটা বলি। যৌবনের গোড়ার দিকে নারীপ্রভাবের ম্যাগনেটিজমে জীবনের মেরুপ্রদেশের আকাশে যখন অরোরার রঙিন ছটার আন্দোলন ঘটতে থাকে, তখন আমি ছিলুম অন্যমনস্ক, একেবারে কোমর বেঁধে অন্যমনস্ক । আমি সন্ন্যাসী, আমি কর্মযোগী— এই-সব বাণীর দ্বারা মনের আগল শক্ত করে তাটা ছিল । কন্যাদায়িকরা যখন আশেপাশে আনাগোনা করেছিল, আমি স্পষ্ট করেই বলেছি, কন্যার কুষ্ঠিতে যদি অকালবৈধব্যযোগ থাকে, তবেই যেন কন্যার পিতা আমার কথা চিন্তা করেন । পাশ্চাত্য মহাদেশে নারীসঙ্গ ঠেকাবার বেড়া নেই। সেখানে আমার পক্ষে ছর্যোগের বিশেষ আশঙ্কা ছিল । আমি যে সুপুরুষ, দেশে থাকতে নারীদের মুখে সে কথা চোখের মৌন ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় শোনবার কোনো সম্ভাবনা ছিল না, তাই এ তথ্যটা আমার চেতনার বাইরে পড়ে ছিল । বিলেতে গিয়ে যেমন আবিষ্কার করেছি সাধারণের তুলনায় আমার বুদ্ধি বেশি আছে, তেমনি ধরা পড়েছিল আমাকে দেখতে ভালো । আমার এদেশী পাঠকদের মনে ঈর্ষা জন্মাবার মতো অনেক কাহিনীর ভূমিকা দেখা দিয়েছিল, কিন্তু হলফ করে বলছি, আমি তাদের নিয়ে ভাবের কুহকে মনকে জমাট বাধতে দিই নি । হয়তো আমার স্বভাবটা কড়া, পশ্চিমবঙ্গের শৌখিনদের মতো ভাবালুতায় আৰ্দ্ৰচিত্ত নই ; নিজেকে পাথরের সিন্ধুক করে তার মধ্যে আমার সংকল্পকে ধরে রেখেছিলুম। মেয়েদের নিয়ে রসের পালা শুরু করে তার পরে সময় বুঝে খেলা ভঙ্গ করা, শেষ কথা 8 \ সেও ছিল আমার প্রকৃতিবিরুদ্ধ ; আমি নিশ্চয় জানতুম, যে-জেদ নিয়ে আমি আমার ব্রতের আশ্রয়ে বেঁচে আছি, এক-পা ফসকালে সেই জেদ নিয়েই আমার ভাঙা ব্রতের তলায় পিষে মরতে হবে । আমার পক্ষে এর মাঝখানে কোনো ফঁাকির পথ নেই। তা ছাড়া আমি জন্মপাড়াগেয়ে, মেয়েদের সম্বন্ধে আমার সেকেলে সংকোচ ঘুচতে চায় না। তাই মেয়েদের ভালোবাসা নিয়ে যারা অহংকারের বিষয় করে, আমি তাদের অবজ্ঞা করি । বিদেশী ভালো ডিগ্রিই পেয়েছিলুম। সেটা এখানে সরকারী কাজে লাগবে না জেনে ছোটনাগপুরে চন্দ্রবংশীয় এক রাজার— মনে করা যাক, চণ্ডবীর সিংহের দরবারে কাজ নিয়েছিলুম। সৌভাগ্যক্রমে র্তার ছেলে দেবিকাপ্রসাদ কিছুদিন কেমব্রিজে পড়াশুনো করেছিলেন । দৈবাৎ তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল জুরিকে, সেখানে আমার খ্যাতি র্তার কানে গিয়েছিল। র্তাকে বুঝিয়েছিলুম আমার প্ল্যান । শুনে খুব উৎসাহিত হয়ে তাদের স্টেটে আমাকে জিয়লজিকাল সর্ভের কাজে লাগিয়ে দিলেন। এমন কাজ ইংরেজকে না দেওয়াতে উপরিস্তরের বায়ুমণ্ডল বিক্ষুব্ধ হয়েছিল। কিন্তু দেবিকাপ্রসাদ ছিলেন ঝাঁঝালো লোক। বুড়ো রাজার মন টলমল করা সত্ত্বেও টিকে গেলুম। এখানে আসবার আগে মা আমাকে বললেন, ‘বাবা, ভালো কাজ পেয়েছ, এইবার একটি বিয়ে করো, আমার অনেক দিনের সাধ মিটুক। আমি বললুম, অর্থাৎ কাজ মাটি করে । আমার যে-কাজ তার সঙ্গে বিয়ের তাল মিলবে না।” দৃঢ় সংকল্প, ব্যর্থ হল মায়ের অনুনয় । যন্ত্রতন্ত্র সমস্ত বেঁধে-ছেদে নিয়ে চলে এলুম জঙ্গলে । এইবার আমার দেশব্যাপী কীৰ্তিসম্ভাবনার ভাবী দিগন্তে হঠাৎ যে একটুকু গল্প ফুটে উঠল তাতে আলেয়ার চেহারাও আছে, আরো আছে শুকতারার। নীচের পাথরকে প্রশ্ন করে মাটির সন্ধানে বেড়াচ্ছিলুম বনে বনে। পলাশফুলের রাঙা রঙের মাৎলামিতে তখন ৪২ তিন সঙ্গী বিভোর আকাশ । শালগাছে ধরেছে মঞ্জরি, মৌমাছি ঘুরে বেড়াচ্ছে বাকে বাকে । ব্যাবসাদাররা জোঁ সংগ্রহে লেগে গিয়েছে । কুলের পাতা থেকে জমা করছে তসরের রেশমের গুটি । সাঁওতালরা কুড়োচ্ছে পাকা মহুয়া-ফল। বিরঝির শব্দে হালকা নাচের ওড়না ঘুরিয়ে চলেছিল একটি ছিপছিপে নদী, আমি তার নাম দিয়েছিলুম-তনিক । এটা কারখানাঘর নয়, কলেজক্লাস নয়, এ সেই মুখতন্দ্রায় আবিল প্রদোষের রাজ্য যেখানে একলা মন পেলে প্রকৃতি মায়াবিনী তার উপরেও রঙরেজিনীর কাজ করে—যেমন সে করে সূর্যাস্তের পটে । মনটাতে একটু আবেশের ঘোর লেগেছিল। মন্থর হয়ে এসেছিল কাজের চাল, নিজের উপরে বিরক্ত হয়েছিলুম, ভিতর থেকে জোর লাগাচ্ছিলুম দাড়ে । মনে ভাবছিলুম, ট্রপিকাল আবহাওয়ার মাকড়সার জালে জড়িয়ে পড়লুম বুঝি। শয়তানি ট্রপিক্স্ এ দেশে জন্মকাল থেকে হাতপাখার হাওয়ায় হারের মন্ত্র চালাচ্ছে আমাদের রক্তে—এড়াতে হবে তার স্বেদসিক্ত জাছ। বেলা পড়ে এল। এক জায়গায় মাঝখানে চর ফেলে তুভাগে চলে গিয়েছে নদী । সেই বালুর দ্বীপে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে বকের দল। দিনাবসানে রোজ এই দৃশ্যটি ইঙ্গিত করত আমার কাজের বঁাক ফিরিয়ে দিতে, ঝুলিতে মাটি-পাথরের নমুনা নিয়ে ফিরে চলছিলুম আমার বাংলো-ঘরে, সেখানে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করতে যাব । অপরাহু আর সন্ধ্যার মাঝখানে দিনের ষে একটা পোড়ে জমির মতো ফালতো অংশ আছে, একলা মানুষের পক্ষে সেইটে কাটিয়ে চলা শক্ত। বিশেষত নির্জন বনে । তাই আমি ওই সময়টা রেখেছি পরখ করার কাজে । ডাইনামোতে বিজলি বাতি জ্বালাই, কেমিক্যাল নিয়ে মাইক্রসৃকোপ নিয়ে নিক্তি নিয়ে বসি । একএকদিন রাত দুপুর পেরিয়ে যায়। আজ আমার সন্ধানে এক জায়গায় ম্যাঙ্গানিজের লক্ষণ যেন ধরা পড়েছিল। তাই দ্রুত শেষ কথা 8°C) উৎসাহে চলেছিলুম। কাকগুলো মাথার উপর দিয়ে গেরুয়ারঙের আকাশে কা কা শব্দে চলেছিল বাসায় । এমন সময় হঠাৎ বাধা পড়ল আমার কাজে ফেরায় । পাঁচটি শালগাছের ব্যুহ ছিল বনের পথে একটা টিবির উপরে। সেই বেষ্টনীর মধ্যে কেউ বসে থাকলে কেবল একটিমাত্র ফঁাকের মধ্যে দিয়ে তাকে দেখা যায়, হঠাৎ চোখ এড়িয়ে যাবারই কথা । সেদিন মেঘের মধ্যে আশ্চর্য একটা দীপ্তি ফেটে পড়েছিল । বনের সেই ফাকটাতে ছায়ার ভিতরে রাঙা আলো যেন দিগঙ্গনার গাঠছেড়া সোনার মুঠোর মতো ছড়িয়ে পড়েছে। ঠিক সেই আলোর পথে বসে আছে মেয়েটি, গাছের গুড়িতে হেলান দিয়ে পা-ফুটি বুকের কাছে গুটিয়ে একমনে লিখছে একটি ডায়ারির খাতা নিয়ে। এক মুহূর্তে আমার কাছে প্রকাশ পেল একটি অপূর্ব বিস্ময় । জীবনে এরকম দৈবাৎ ঘটে। পূর্ণিমার বান ডেকে আসার মতো বক্ষতটে ধাক্কা দিতে লাগল জোয়ারের ঢেউ । গাছের গুড়ির আড়ালে দাড়িয়ে চেয়ে রইলুম। একটি আশ্চর্য ছবি চিহ্নিত হতে লাগল মনের চিরস্মরণীয়াগারে । আমার বিস্তৃত অভিজ্ঞতার পথে অনেক অপ্রত্যাশিত মনোহরের দরজায় ঠেকেছে মন, পাশ কাটিয়ে চলে গেছি, আজ মনে হল জীবনের একটা কোন চরমের সংস্পর্শে এসে পৌছলুম। এমন করে ভাবা, এমন করে বলা আমার একেবারে অভ্যস্ত নয়। যে-আঘাতে মানুষের নিজের অজানা একটা অপূর্ব স্বরূপ ছিটকিনি খুলে অবারিত হয়, সেই আঘাত আমাকে লাগল কী করে । বরাবর জানি, আমি পাহাড়ের মতো খটখটে, নিরেট। ভিতর থেকে উছলে পড়ল ঝরনা । একটা-কিছু বলতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু মানুষের সঙ্গে সবচেয়ে বড়ো আলাপের প্রথম কথাটি কী হতে পারে ভেবে পাই নে। সে হচ্ছে খৃস্টীয় পুরাণের প্রথম স্মৃষ্টির বাণী, আলো জাগুক, অব্যক্ত হয়ে যাক ব্যক্ত । একসময়ে মনে হল—মেয়েটি—ওর আসল নাম পরে 88 ङित्र श्लक्री জেনেছি কিন্তু সেটা ব্যবহার করব না, ওকে নাম দিলুম অচিরা । মানে কী । মানে এই, যার প্রকাশ হতে বিলম্ব হল না, বিদ্যুতের মতো। রইল ঐ নাম – মুখ দেখে মনে হল অচিরা জানতে পেরেছে, কে-একজন আড়ালে দাড়িয়ে আছে। উপস্থিতির একটা নীরব ধ্বনি আছে বুঝি। লেখা বন্ধ করেছে, অথচ উঠতে পারছে না। পলায়নটা পাছে বডড বেশি স্পষ্ট হয়। একবার ভাবলুম বলি, 'মাপ করুন, কী মাপ করা, কী অপরাধ, কী বলব তাকে। একটু তফাতে গিয়ে বিলিতি বেঁটে কোদাল নিয়ে মাটিতে খোচা মারবার ভান করলুম, বুলিতে একটা কী পুরলুম, সেটা অত্যন্ত বাজে। তার পরে বুকে পড়ে মাটিতে বিজ্ঞানী দৃষ্টি চালনা করতে করতে চলে গেলুম । কিন্তু নিশ্চয় মনে জানি, র্যাকে ভোলাবার চেষ্টা করেছিলুম তিনি ভোলেন নি। মুগ্ধ পুরুষচিত্তের দুর্বলতার আরো অনেক প্রমাণ তিনি আরো অনেকবার পেয়েছেন, সন্দেহ নেই। আশা করলুম আমার বেলায় এটা তিনি মনে মনে উপভোগ করেছেন । এর চেয়ে বেড়া আর অল্প একটু যদি ডিঙোতুম, তা হলে—তা হলে কী হত কী জানি । রাগতেন, ন রাগের ভান করতেন ? অভ্যন্ত চঞ্চল মন নিয়ে চলেছি আমার ংলো-ঘরের পথে, এমন সময় আমার চোখে পড়ল দুই টুকরায় ছিন্নকরা একখানা চিঠির খাম । এটাকে জিয়লজিকাল নমুনা বলে না। তবু তুলে দেখলুম। নামটা ভবতোষ মজুমদার আই. সি. এস. ; ঠিকানা ছাপরা, মেয়েলি হাতে লেখা । টিকিট লাগানো আছে, তাতে ডাকঘরের ছাপ নেই। যেন কুমারীর দ্বিধা । আমার বিজ্ঞানী বুদ্ধি ; স্পষ্ট বুঝতে পারলুম, এই ছেড়া চিঠির খামের মধ্যে একটা ট্র্যাজেডির ক্ষতচিহ্ন আছে। পৃথিবীর ছেড়া স্তর থেকে তার বিপ্লবের ইতিহাস বের করা আমাদের কাজ। সেই আমার সন্ধানপটু হাত এই ছেড়া খামের রহস্য আবিষ্কার করতে সংকল্প করলে । ইতিমধ্যে ভাবছি, নিজের অন্তঃকরণের রহস্য অভূতপূর্ব। একএকটা বিশেষ অবস্থার সংস্পর্শে তার ভাবখানা কী যে একটা নতুন শেষ কথা 8 & আকারে দানা বেঁধে দেখা দেয়, এবারে তার পরিচয়ে বিস্মিত হয়েছি । এতদিন যে-মনটা নানা কঠিন অধ্যবসায় নিয়ে শহরে শহরে জীবনের লক্ষ্য সন্ধানে ঘুরেছে, তাকে স্পষ্ট করে চিনেছিলুম। ভেবেছিলুম সেই আমার সত্যকার স্বভাব, তার আচরণের ধ্রুবত্ব সম্বন্ধে আমি হলপ করতে পারতুম। কিন্তু তার মধ্যে বুদ্ধিশাসনের বহিভূত যে একটা মূঢ় লুকিয়ে ছিল, তাকে এই প্রথম দেখা গেল। ধরা পড়ে গেল আরণ্যক, যে যুক্তি মানে না, যে মোহ মানে। বনের একটা মায়া আছে, গাছপালার নিঃশবদ চক্রান্ত, আদিম প্রাণের মন্ত্রধ্বনি । দিনে দুপুরে বী-বী করে তার উদাত্ত সুর, রাতে দুপুরে মন্দ্ৰগম্ভীর ধ্বনি, গুঞ্জন করতে থাকে জীবচেতনায়, আদিম প্রাণের গৃঢ় প্রেরণায় বুদ্ধিকে দেয় আবিষ্ট করে। জিয়লজির চর্চার মধ্যেই ভিতরে ভিতরে এই আরণ্যক মায়ার কাজ চলছিল, খুজছিলুম রেডিয়মের কণা, যদি কৃপণ পাথরের মুঠির মধ্য থেকে বের করা যায় ; দেখতে পেলুম অচিরাকে, কুসুমিত শালগাছের ছায়ালোকের বন্ধনে। এর পূর্বে বাঙালি মেয়েকে দেখেছি সন্দেহ নেই। কিন্তু সব-কিছু থেকে স্বতন্ত্রভাবে এমন একান্ত করে তাকে দেখবার সুযোগ পাই নি । এখানে তার শ্যামল দেহের কোমলতায় বনের লতাপাতা আপন ভাষা যোগ করে দিল । বিদেশিনী রূপসী তো অনেক দেখেছি, যথোচিত ভালোও লেগেছে। কিন্তু বাঙালি মেয়ে এই যেন প্রথম দেখলুম ঠিক যে-জায়গায় তাকে সম্পূর্ণ দেখা যেতে পারে, এই নিভৃত বনের মধ্যে সে নানা পরিচিত অপরিচিত বাস্তবের সঙ্গে জড়িয়ে মিশিয়ে নেই ; দেখে মনে হয় না, সে বেণী তুলিয়ে ডায়োসিশনে পড়তে যায়, কিংবা বেথুন কলেজের ডিগ্রিধারিণী, কিংবা বালিগঞ্জের টেনিস পার্টিতে উচ্চ কলহাস্তে চা পরিবেশন করে । অনেক দিন আগে ছেলেবেলায় হরু ঠাকুর কিংবা রাম বসুর যে গান শুনে তার পরে ভুলে গিয়েছিলুম, যে-গান আজ রেডিয়োতে বাজে না, গ্রামোফোনে 8も তিন সঙ্গী পাড়া মুখরিত করে না, জানি নে কেন মনে হল সেই গানের সহজ রাগিণীতে ঐ বাঙালি মেয়েটির রূপের ভূমিকা— মনে রইল, সই, মনের বেদনা। এই গানের সুরে যে একটি করুণ ছবি আছে, সে আজ রূপ নিয়ে আমার চোখে স্পষ্ট ফুটে উঠল। এও সম্ভব হল। কোন প্রবল ভূমিকম্পে পৃথিবীর যে তলায় লুকোনো আগ্নেয় সামগ্রী উপরে উঠে পড়ে, জিয়লজি শাস্ত্রে তা পড়েছি, নিজের মধ্যে দেখলুম সেই নীচের তলার অন্ধকারের তপ্তবিগলিত জিনিসকে হঠাৎ উপরের আলোতে । কঠোর বিজ্ঞানী নবীনমাধবের অটল অন্তঃস্তরে এই উলটপালট আমি কোনোদিন আশা করতে পারি নি । বুঝতে পারছি, যখন আমি রোজ বিকেলবেলায় এই পথ দিয়ে আমার কাজে ফিরেছি, ও আমাকে দেখেছে, অন্ত্যমনস্ক আমি ওকে দেখি নি। বিলেতে যাবার পর থেকে নিজের চেহারার উপর একটা গর্ব জন্মেছে । ও হাউ হ্যাণ্ডসম—এই প্রশস্তি কানাকানিতে আমার অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল । কিন্তু বিলেতফেরত আমার কোনো কোনো বন্ধুর কাছে শুনেছি, বাঙালি মেয়ের রুচি আলাদা, তারা মোলায়েম মেয়েলি রূপই পুরুষের রূপে খোজে। চলিত কথা হচ্ছে—কার্তিকের মতো চেহারা । বাঙালি কাতিক আর যাই হোক, কোনো পুরুষে দেবসেনাপতি নয়। প্যারিসে একজন বান্ধবীর মুখে শুনেছি, বিলিতি সাদারঙ রঙের অভাব ; ওরিয়েণ্টালের দেহে গরম আকাশ যে রঙ এ কে দেয় সে সত্যিকার রঙ, সে ছায়ার রঙ, ঐ রঙই আমাদের ভালো লাগে ; এ কথাটা বঙ্গোপসাগরের ধারে বোধ হয় খাটে না । এতদিন এ-সব আলোচনা আমার মনেই ওঠে নি। কয়েকদিন ধ’রে আমাকে ভাবিয়েছে । রোদে-পোড়া আমার রঙ, লম্বা আমার প্রাণসার দেহ, শক্ত আমার বাহু, দ্রুত আমার গতি, শুনেছি দৃষ্টি আমার তীক্ষ, নাক চিবুক কপাল নিয়ে মুস্পষ্ট জোরালো আমার চেহারা। এপস্টাইন পাথরে আমার মূর্তি গড়তে চেয়েছিল, সময় দিতে পারি নি। কিন্তু বাঙালিকে আমি মায়ের খোকা বলেই শেষ কথা 8 জানি, আর মায়েরা তাদের কোলের ধনকে মোমে-গড়া পুতুলের মতো দেখতেই ভালোবাসে। এসব কথা মনের মধ্যে ঘুলিয়ে উঠে আমাকে রাগিয়ে তুলছিল। আগেভাগেই কল্পনায় ঝগড়া করছিলুম অচিরার সঙ্গে ; বলছিলুম, “তুমি যাকে বলে সুন্দর সে বিসর্জনের দেবতা, তোমাদের স্তব যদি বা পায় সে— টেকে না বেশিদিন ।’ বলছিলুম, “আমি বড়ো বড়ো দেশের স্বয়ম্বরসভার মালা উপেক্ষা করে এসেছি, আর তুমি আমাকে উপেক্ষা করবে ? গায়ে পড়ে এই বানানো ঝগড়া এমনি ছেলেমাতুষি যে, একদিন হেসে উঠেছি আপন উষ্মায়। এদিকে বিজ্ঞানীর যুক্তি কাজ করছে ভিতরে ভিতরে । মনকে জানাই, এটাও একটা মস্ত কথা, আমার যাতায়াতের পথের ধারে ও বসে থাকে— একান্ত নিভৃতই যদি ওর প্রার্থনীয় হত, তা হলে ঠাই বদল করত। প্রথম প্রথম আমি ওকে আড়ে আড়ে দেখেছি, যেন দেখি নি এই ভান করে । ইদানীং মাঝে মাঝে স্পষ্ট চোখোচোখি, হয়েছে— যতদূর আমার বিশ্বাস, সেটাকে চার চোখের অপঘাত বলে ওর মনে হয় নি । এর চেয়েও বিশেষ একটা পরীক্ষা হয়ে গেছে । এর আগে দিনের বেলায় মাটি-পাথরের কাজ সাঙ্গ করে দিনের শেষে ঐ পঞ্চবটীর পথ দিয়ে একবারমাত্র যেতেম বাসার দিকে । সম্প্রতি যাতায়াতের পুনরাবৃত্তি হতে আরম্ভ হয়েছে। এই ঘটনাটা যে জিয়লজি সম্পকিত নয়, সে কথা বোঝবার মতো বয়স হয়েছে অচিরার, আমারও সাহস ক্রমশ বেড়ে চলল যখন দেখলুম, এই সুস্পষ্ট ভাবের আভাসেও তরুণীকে স্থানচ্যুত করতে পারল না। এক-একদিন হঠাৎ পিছন ফিরে দেখেছি, অচিরা আমার তিরোগমনের দিকে চেয়ে আছে, আমি ফিরতেই তাড়াতাড়ি ডায়ারির দিকে চোখ নামিয়ে নিয়েছে । সন্দেহ হল, ওর ডায়ারি লেখার ধারায় আগেকার মতো বেগ নেই। আমার বিজ্ঞানী বুদ্ধিতে মনোরহস্যের আলোচনা জেগে উঠল। বুঝেছি সে কোনো-এক পুরুষের জন্তে তপস্যার ব্রত নিয়েছে, કપ્ત ङिबू जत्री তার নাম ভবতোষ, সে ছাপরায় অ্যাসিস্টেণ্ট ম্যাজিস্ট্রেটি করছে বিলেত থেকে ফিরে এসেই। তার পূর্বে দেশে থাকতে এদের স্থজনের প্রণয় ছিল গভীর, কাজ নেবার মুখেই একটা আকস্মিক বিপ্লব ঘটেছে । ব্যাপারটা কী, খবর নিতে হবে । শক্ত হল না, কেননা পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার কেন্থিজের সতীর্থ আছে বঙ্কিম। ডাকে চিঠি লিখে পাঠালুম, বেহার সিভিল সার্ভিসে আছে ভবতোষ । কন্যাকর্তাদের মহলে জনশ্রুতি শোনা যায়, লোকটি সৎপাত্র। আমার কোন বন্ধু আমাকে তার মেয়ের জন্যে ঐ লোকটিকে প্রজাপতির ফঁাদে ফেলতে সাহায্য করতে অনুরোধ করেছেন । রাস্তা পরিষ্কার আছে কি না, আদ্যন্ত খবর নিয়ে তুমি যদি আমাকে জানাও কৃতজ্ঞ হব। লোকটির মতিগতি কী রকম তাও জানতে চাই ।” উত্তর এল, ‘রাস্তা বন্ধ । আর মতিগতি সম্বন্ধে এখনো যদি কৌতুহল বাকি থাকে, তবে শোনো – ‘কলেজে পড়বার সময় আমি ছাত্র ছিলুম ডাক্তার অনিলকুমার সরকারের— অ্যালফাবেটের অনেকগুলি অক্ষর জোড়া তার নাম । যেমন র্তার অসাধারণ পাণ্ডিত্য, তেমনি ছেলেমানুষের মতো তার সরলতা । একমাত্র সংসারের আলো তার নাতিনীটিকে যদি দেখো, তা হলে মনে হবে সাধনায় খুশি হয়ে সরস্বতী কেবল যে অবিভূতি হয়েছেন তার বুদ্ধিলোকে তা নয়, রূপ নিয়ে এসেছেন তার কোলে । ঐ শয়তান ভবতোষ ঢুকল ওঁর স্বৰ্গলোকে বুদ্ধি তার তীক্ষ, বচন তার অনর্গল । প্রথমে ভুললেন অধ্যাপক, তার পরে ভুলল তার নাতনী । ওদের অসহ অন্তরঙ্গতা দেখে আমাদের হাত নিসপিস করত। কিছু বলবার পথ ছিল না, বিবাহসম্বন্ধ পাকাপাকি স্থির হয়ে গিয়েছিল, কেবল অপেক্ষা ছিল বিলেত গিয়ে সিভিল সাভিসে উত্তীর্ণ হয়ে আসার । তার পাথেয় আর খরচ জুগিয়েছেন অধ্যাপক । লোকটার সর্দির ধাত ছিল। বধির ভগবানের কাছে আমরা ছবেলা প্রার্থনা করেছি, বিবাহের পূর্বে লোকটা যেন কুমোনিয়া হয়ে মরে । শেষ কথা Bసి কিন্তু মরে নি। পাস করেছে । করেই ইণ্ডিয়া গবর্মেন্টের উচ্চপদস্থ একজন মুরুবিবর মেয়েকে বিয়ে করেছে। লজ্জায় ক্ষোভে নিজের কাজ ছেড়ে দিয়ে মর্মাহত মেয়েটিকে নিয়ে অধ্যাপক কোথায় যে অন্তর্ধান করেছেন, তার খবর রেখে যান নি ।” চিঠিখানা পড়লুম। দৃঢ় সংকল্প করলুম, এই মেয়েটিকে তার লজ্জা থেকে অবসাদ থেকে উদ্ধার করব । ইতিমধ্যে অচিরার সঙ্গে কোনোরকম করে একটা কথা আরম্ভ করবার জন্তে মন ছটফট করতে লাগল। যদি বিজ্ঞানী না হয়ে হতুম সাহিত্যরসিক, কিংবা বাঙাল না হয়ে যদি হতুম পশ্চিমবঙ্গের আধুনিক, তা হলে নিশ্চয় মুখে কথা বাধত না । কিন্তু বাঙালি মেয়েকে ভয় করি, চিনি নে বলে বোধ হয় । একটা ধারণা ছিল, হিন্দুনারী অজানা পরপুরুষমাত্রের কাছে একান্তই অনধিগম্য। খামকা কথা কইতে যাই যদি, তা হলে ওর রক্তে লাগবে অশুচিত । সংস্কার জিনিসটা এমনি অন্ধ। এখানে কাজে যোগ দেবার পূর্বে কিছুদিন তো কলকাতায় কাটিয়ে এসেছি—আত্মীয়-বন্ধুমহলে দেখে এলুম সিনেমামঞ্চ-পথবর্তিনী রঙমাখানো বাঙালি মেয়ে, যারা জাতবান্ধবী, তাদের— থাক তাদের কথা । কিন্তু অচিরার কোনো পরিচয় না পেয়েই মনে হল, ও আর-এক জাতের— একালের বাইরে আছে দাড়িয়ে, নির্মল আত্মমর্যাদায়, স্পশভীরু মেয়ে । মনে মনে কেবলই ভাবছি, প্রথম একটি কথা শুরু করব কী করে । o এই সময়ে কাছাকাছি দুই-একটা ডাকাতি হয়ে গিয়েছিল। মনে হল এই উপলক্ষে অচিরাকে বলি, “রাজাকে বলে আপনার জন্ত্যে পাহারার বন্দোবস্ত করে দিই !’ ইংরেজ মেয়ে হলে হয়তো এই গায়ে-পড়া আনুকূল্যকে স্পর্ধ মনে করত, মাথা বাকিয়ে বলত, সে ভাবনা আমার ; কিন্তু এই বাঙালির মেয়ে যে কী ভাবে কথাটা নেবে, আমার সে অভিজ্ঞতা নেই । দীর্ঘকাল বাংলার বাইরে থেকে আমার মনের অভ্যাস অনেকখানি জড়িয়ে গেছে বিলিতি সংস্কারে । 8 .,جمه .د+ ي . های ۹م - حاجی -حسیعی ۹ گی & o তিন সঙ্গী দিনের আলো প্রায় শেষ হয়ে এসেছে । এইবার অচিরার ঘরে ফেরবার সময়, কিংবা ওর দাদামশায় এসে ওকে বেড়াতে নিয়ে যাবেন । এমন সময়ে একজন হিন্দুস্থানী গোয়ার এসে অচিরার হাত থেকে হঠাৎ তার ব্যাগ আর ডায়ারিটা ছিনিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছিল, আমি সেই মুহূর্তেই বনের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে বললুম, “কোনো ভয় নেই আপনার ”— এই বলে ছুটে সেই লোকটার ঘাড়ের উপর গিয়ে ঝাপিয়ে পড়তেই সে ব্যাগ আর খাতা ফেলে দৌড় মারলে। আমি লুঠের ধন নিয়ে এসে অচিরাকে দিলুম। অচিরা বললে, “ভাগ্যিস আপনি—” আমি বললুম, “আমার কথা বলবেন না, ভাগ্যিস ও লোকটা এসেছিল ।” “তার মানে ?” “তার মানে, ওরই সাহায্যে আপনার সঙ্গে প্রথম কথাটা হয়ে গেল। এতদিন কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিলুম না, কী যে বলি।” “কিন্তু ও যে ডাকাত ।” “না, ও ডাকাত নয়, ও আমার বরকন্দাজ ।” অচিরা মুখে তার খয়েরি রঙের আঁচল তুলে ধরে খিলখিল করে হেসে উঠল। কী মিষ্টি তার ধ্বনি, যেন ঝরনার স্রোতে কুড়ির মুরওয়ালা শবদ । হাসি থামতেই বললে, “কিন্তু সত্যি হলে খুব মজা হত।” “মজা হত কার পক্ষে ।” “যাকে নিয়ে ডাকাতি তার পক্ষে । এই রকম যে একটা গল্প পড়েছি।” “তার পরে উদ্ধারকর্তার কী হত ।” “তাকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে চা খাইয়ে দিতুম ।” “আর এই ফঁাকি উদ্ধারকর্তার কী হবে ।” *তার তো আর-কিছুতে দরকার নেই। সে তো আলাপ করবার শেষ কথা & S. প্রথম কথাটা চেয়েছিল— পেয়েছে দ্বিতীয় তৃতীয় চতুর্থ পঞ্চম কথা।” “গণিতের সংখ্যাগুলো হঠাৎ ফুরবে না তো ?” “কেন ফুরবে।” “আচ্ছা, আপনি হলে আমাকে প্রথম কথা কী বলতেন।” “আমি হলে বলতুম, রাস্তায় ঘাটে কতকগুলো কুড়ি কুড়িয়ে কুড়িয়ে কী ছেলেমাতুষি করছেন। আপনার কি বয়স হয় নি।” “কেন বলেন নি ।” “ভয় করেছিল ।” “ভয় ? অামাকে ভয় ?” “আপনি যে বড়োলোক। দাতুর কাছে শুনেছি। তিনি যে আপনার লেখা প্রবন্ধ বিলিতি কাগজে পড়েছিলেন। তিনি যা পড়েন আমাকে বোঝাতে চেষ্টা করেন ।” “এটাও করেছিলেন ?” “হা, করেছিলেন । কিন্তু লাটিন নামের পাহারার ঘটা দেখে জোড়হাত করে বলেছিলুম, দাহ্, এটা থাক্, বরঞ্চ তোমার কোয়ণ্টম থিয়োরির বইখানা নিয়ে আসি ।” “সেটা বুঝি আপনি বুঝতে পারেন ?” “কিছুমাত্র না। কিন্তু দাহ্র একটা বদ্ধ সংস্কার আছে—সবাই সবকিছুই বুঝতে পারে। র্তার সে বিশ্বাস ভাঙতে আমার ভালো লাগে না। র্তার আর-একটা আশ্চর্য ধারণা আছে— মেয়েদের সহজবুদ্ধি পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি তীক্ষ। তাই ভয়ে ভয়ে আছি এইবার নিশ্চয়ই Time-Space-এর জোড়-মেলানো সম্বন্ধের ব্যাখ্যা আমাকে শুনতে হবে । আসল কথা, মেয়েদের উপর তার করুণার অন্ত নেই । দিদিমা যখন বেঁচে ছিলেন, বড়ো বড়ো কথা পাড়লেই তিনি মুখ বন্ধ করে দিতেন । তাই মেয়েদের তীক্ষ বুদ্ধি যে কতদূর যেতে পারে, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ দিদিমার কাছ থেকে পান নি। আমি ওঁকে হতাশ করতে পারব না। অনেক শুনেছি, বুঝি নি, .á文 তিন সঙ্গী আরো অনেক শুনব আর বুঝব না।” অচিরার দুই চোখ কৌতুকে স্নেহে জলজল ছলছল করে উঠল। ইচ্ছে করছিল, স্নিগ্ধ কণ্ঠের এই আলাপ শীঘ্ৰ যেন শেষ হয়ে না যায়। দিনের আলো স্নান হয়ে এল। সন্ধ্যার প্রথম তারা জ্বলে উঠেছে শালবনের মাথার উপরে। সাওতাল মেয়েরা জ্বালানি-কাঠ সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছে ঘরে, দূর থেকে শোনা যাচ্ছে তাদের গান। এমন সময় বাইরে থেকে ডাক এল, “দিদি, কোথায় তুমি ? অন্ধকার হয়ে এল যে । আজকাল সময় ভালো নয় ।” “ভালো তো নয়ই দাহ, তাই একজন রক্ষাকর্তা নিযুক্ত করেছি।” অধ্যাপক আসতেই তার পায়ের ধুলো নিয়ে প্রণাম করলুম। তিনি শশব্যস্ত হয়ে উঠলেন। পরিচয় দিলুম, “আমার নাম নবীনমাধব সেনগুপ্ত ।” বৃদ্ধের মুখ উজ্জল হয়ে উঠল, বললেন, “বলেন কী, আপনিই ডাক্তার সেনগুপ্ত ? আপনি তো ছেলেমানুষ।” আমি বললুম, “নিতান্ত ছেলেমানুষ । আমার বয়স ছত্রিশের বেশি নয় ।” আবার অচিরার সেই কলমধুর কণ্ঠের হাসি, আমার মনে যেন ফুনো লয়ের ঝংকারে সেতার বাজিয়ে দিলে। বললে, “দাদুর কাছে পৃথিবীর সবাই ছেলেমানুষ, আর দাহ হচ্ছেন সকল ছেলেমানুষের আগরওয়ালা ।” অধ্যাপক বললেন, “আগরওয়ালা ? একটা নতুন শব্দ বাংলায় আমদানি করলে । কোথা থেকে জোটালে।” “সেই যে তোমার ভালোবাসার মাড়োয়ারি ছাত্র, কুন্দনলাল আগরওয়ালা ; আমাকে এনে দিত বোতলে করে আমের চাটনি ; আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলুম, আগরওয়ালা কথাটার মানে কী । সে বলেছিল, পায়োনিয়র ।” অধ্যাপক বললেন, “ডাক্তার সেনগুপ্ত, আপনার সঙ্গে আলাপ শেষ কথা ○ ○ হল যদি, আমাদের ওখানে যেতে হবে তো ।” “কিছু বলতে হবে না, দাহ । যাবার জন্যে লাফালাফি করছেন । আমার কাছে শুনেছেন, দেশকালের একজোট তত্ত্ব নিয়ে তুমি ব্যাখ্যা করবে আইনস্টাইনের কাধে চড়ে ।” মনে মনে বললুম, “সর্বনাশ । কী তুষ্টুমি ।’ অধ্যাপক অত্যন্ত উৎসাহিত হয়ে বললেন, “আপনার বুঝি TimeSpace-to-” আমি ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলুম, “কিছু বুঝি নে Time-Spaceএর । আমাকে বোঝাতে গেলে আপনার সময় নষ্ট হবে মাত্র।” বৃদ্ধ ব্যগ্র হয়ে বলে উঠলেন, “সময় ! এখানে সময়ের অভাব কোথায় । আচ্ছ এক কাজ করুন-না, আজকে না-হয় আমাদের ওখানে আহার করবেন, কী বলেন ।” আমি লাফ দিয়ে বলতে যাচ্ছিলুম, “এখখনি।’ অচিরা বলে উঠল, “দাতু, সাধে তোমাকে বলি ছেলেমানুষ । যখন-তখন নেমন্তয় করে তুমি আমাকে মুশকিলে ফেলো । এই দণ্ডকারণ্যে ফিরপির দোকান পাব কোথায় । ওঁরা বিলেতের ডিনারখাইয়ে জাতের সর্বগ্রাসী মানুষ, কেন তোমার নাতনীর বদনাম করবে। অন্তত ভেটকি মাছ আর ভেড়ার ব্যবস্থা করতে হবে তো !” “আচ্ছা আচ্ছা, তা হলে কবে আপনার সুবিধে হবে বলুন ।” “সুবিধে আমার কালই হতে পারবে । কিন্তু অচিরা দেবীকে বিপন্ন করতে চাই নে । ঘোর জঙ্গলে পাহাড়ে গুহাগহবরে আমাকে ভ্রমণে যেতে হয় । সঙ্গে রাখি থলে ভ'রে চিড়ে, ছড়া-কয়েক কলা, বিলিতি বেগুন, কাচা ছোলার শাক, চিনেবাদামও কখনো থাকে । আমি সঙ্গে নিয়ে আসব ফলারের আয়োজন, অচিরা দেবী দই দিয়ে স্বহস্তে মেখে আমাকে খাওয়াবেন, এতে যদি রাজি থাকেন তা হলে কোনো কথা থাকবে না ।” “দাছ, বিশ্বাস কোরো না এ-সব লোককে । তুমি বাংলা মাসিকে (to তিন সঙ্গী লিখেছিলে বাঙালির খাদ্যে ভিটেমিনের প্রভাব, সে উনি পড়েছেন, তাই কেবল তোমাকে খুশি করবার জন্যে চিড়ে-কলার ফর্দ তোমাকে শোনালেন ।” আমি ভাবলুম, মুশকিলে ফেললে । বাংলা কাগজে ডাক্তারের লেখা ভিটামিনের তত্ত্ব পড়া কোনোকালে আমার দ্বারা সম্ভব নয় ; কিন্তু কবুল করি কী করে – বিশেষত উনি যখন উৎফুল্ল হয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “সেটা পড়েছেন নাকি ৷” আমি বললুম, “পড়ি বা না-পড়ি তাতে কিছু আসে যায় না, আসল কথা—” “আসল কথা, উনি নিশ্চয় জানেন কাল যদি ওঁকে খাওয়াই, তা হলে ওঁর পাতে পশুপক্ষী স্থাবরজঙ্গম কিছুই বাদ পড়বে না । সেইজন্যে অত নিশ্চিন্ত মনে বিলিতি বেগুনের নামকীর্তন করলেন । ওঁর শরীরটার দিকে দেখো না চেয়ে, শুধু শাকান্নে গড় ব’লে কেউ সন্দেহ করতে পারে ? দা, তুমি সবাইকেই অত্যন্ত বেশি বিশ্বাস করো, এমন-কি, আমাকেও । সেইজন্যে ঠাট্টা করে তোমাকে কিছু বলতে সাহস করি নে ৷” বলতে বলতে ধীরে ধীরে আমরা ওঁদের বাড়ির দিকে চলেছি, এমন সময় হঠাৎ অচিরা বলে উঠল, “এইবার আপনি ফিরে যান বাসায় ।” “কেন, আমি ভেবেছিলুম আপনাদের বাড়ির দরজা পর্যন্ত পৌছে দিয়ে আসব ।” • “ঘর এলোমেলো হয়ে আছে । আপনি বলবেন, বাঙালি মেয়ের সব অগোছালো । কাল এমন করে সাজিয়ে রাখব যে, মেমসাহেবের কথা মনে পড়বে ।” অধ্যাপক বললেন, “আপনি কিছু মনে করবেন না ডক্টর সেনগুপ্ত, অচি বেশি কথা কচ্ছে, কিন্তু ওর স্বভাব নয় সেট । এখানে বড়ো নির্জন বলে ও জুড়ে রাখে আমার মনকে অনর্গল কথা শেষ কথা © ☾ কয়ে । সেটাই ওর অভ্যেস হয়ে গেছে । ও যখন চুপ করে থাকে তখনই আমার ঘরটা যেন ছমছম করতে থাকে, আমার মনটাও । ও জানে সে-কথা । আমার ভয় করে পাছে ওকে কেউ ভুল বোঝে।” বুড়োর গলা জড়িয়ে ধ'রে অচিরা বললে, “বুঝুক-না দাহ্, অত্যন্ত অনিন্দনীয়া হতে চাই নে, সেটা অত্যন্ত আন্‌ইণ্টারেস্টিঙ।” অধ্যাপক সগর্বে বলে উঠলেন, “জানেন সেনগুপ্ত, আমার দিদি কিন্তু কথা কইতে জানে, আমন আমি কাউকে দেখি নি।” “তুমি আমার মতো কাউকে দেখে নি দাছ, আমিও কাউকে দেখি নি তোমার মতো ।” আমি বললুম, “আচার্যদেব, যাবার আগে আমাকে কিন্তু একটা কথা দিতে হবে ।” “আচ্ছা বেশ ।” “আপনি যতবার আমাকে আপনি বলেন, আমি মনে মনে ততবার জিভ কাটতে থাকি। আমাকে তুমি যদি বলেন, তা হলে সেটাতেই যথার্থ আপনার স্নেহের সম্মান পাব । এ বাড়িতে আমাকে তুমি-শ্রেণীতে তুলে দিতে আপনার নাতনীও সাহায্য করবেন।” “সর্বনাশ ! আমি সামান্য নাতনী, হঠাৎ অত উচুতে নাগাল পাব না, আপনি বড়োলোক। আমি বলি আর-কিছুদিন যাক, যদি ভুলতে পারি আপনার ডিগ্রিধারী রূপ, তা হলে সবই সম্ভব হবে । কিন্তু দাঙ্কুর কথা স্বতন্ত্র । এখনই শুরু করো। দাতু, বলো তো, তুমি কাল খেতে এসো, দিদি যদি মাছের ঝোলে কুন বেশি দিয়ে ফেলে, তা হলে ভালোমানুষের মতো সহ কোরো, বোলো, বাঃ, কী চমৎকার, পাতে আরো একটু দিতে হবে।” 配 অধ্যাপক সক্ষেহে আমার কাধে হাত দিয়ে বললেন, “ভাই, আরকিছুকাল আগে যদি আমার দিদিকে দেখতে, তা হলে বুঝতে পারতে, আসলে ও লাজুক । সেইজন্ত্যে ও যখন আলাপ করা কর্তব্য মনে ○ ○ डिन जङ्गी করে, তখন জোর করতে গিয়ে কথা বেশি হয়ে পড়ে ।” “দেখেছেন ডক্টর সেনগুপ্ত, দাছ আমাকে কী রকম মধুর করে শাসন করেন। যেন ইক্ষুদণ্ড দিয়ে। অনায়াসে বলতে পারতেন, তুমি বড়ো মুখরা, তোমার প্রগলভতা অত্যন্ত অসহ। আপনি কিন্তু আমাকে ডিফেণ্ড করবেন। কী বলবেন, বলুন-না।” “আপনার মুখের সামনে বলব না।” “বেশি কঠোর হবে ?” “আপনি জানেন আমার মনের কথা ।” “তা হলে থাক্ ! এখন বাড়ি যান ।” “একটা কথা বাকি আছে । কাল আপনাদের ওখানে যে নেমন্তন সে আমার নতুন নামকরণের । কাল থেকে নবীনমাধব নাম থেকে লোপ পাবে ডাক্তার সেনগুপ্ত । সূর্যের কাছে আনাগোনা করতে গিয়ে ধূমকেতুর যেমন লেজটা যায় উড়ে, মুণ্ডটা থাকে বাকি।” “তা হলে নামকর্তন বলুন, নামকরণ বলছেন কেন।” “আচ্ছা, তাই সই।” এইখানে শেষ হল আমার প্রথম বড়োদিন । বার্ধক্যের কী প্রশান্ত সৌন্দর্য, কী সৌম্য মূর্তি। চোখদুটি যেন আশীৰ্বাদ করছে । হাতে একটি পালিশ-করা লাঠি, গলায় শুভ্র পাট-করা চাদর, ধুতি যত্নে কোচানো, গায়ে তসরের জামা, মাথায় শুভ্র চুল বিরল হয়ে এসেছে, কিন্তু পরিপাটি করে আঁচড়ানো । স্পষ্ট বোঝা যায় এর সাজসজ্জায় এর দিনযাত্রায় নাতনীর হাতের শিল্পকার্য । ইনি যে অতিলালনের অত্যাচার সহ করেন, সে কেবল এই মেয়েটিকে খুশি রাখবার জন্যে । আমার বৈজ্ঞানিক খবরকে ছাড়িয়ে উঠল, এদের খবর নেওয়া । অধ্যাপকের নাম ব্যবহার করব, অনিলকুমার সরকার। গত জেনেরেশনের কেম্বি জ য়ুনিভারসিটির পি-এইচ. ডি. দলের একজন । মাসকয়েক আগে একটি ঔপনাগরিক কলেজের অধ্যক্ষতা ত্যাগ করে শেষ কথা * 《속 এখানকার স্টেটের একটা পরিত্যক্ত ডাকবাংলা ভাড়া নিয়ে নিজের খরচে সেটা বাসযোগ্য করেছেন । এইটে হল ইতিহাসের খসড়া, বাকিটুকু বঙ্কিমের চিঠি থেকে মিলিয়ে নেওয়া যেতে পারে। আমার গল্পের আদিপর্ব শেষ হয়ে গেল । ছোটোগল্পের আদি ও অন্তে বেশি ব্যবধান থাকে না । জিনিসটাকে ফলিয়ে বলবার লোভ করব না, ওর স্বভাব নষ্ট করতে চাই নে । অচিরার সঙ্গে স্পষ্ট কথা বলার যুগ এল সংক্ষেপেই । সেদিন চড়িভাতি হয়েছিল তনিকা নদীর তীরে । অধ্যাপক ছেলেমানুষের মতন হঠাৎ আমাকে জিগ গেসা করে বসলেন, “নবীন, তোমার কি বিবাহ হয়েছে।” প্রশ্নটা এতই সুস্পষ্ট ভাবব্যঞ্জক যে, আর কেউ হলে ওটা চেপে যেত । আমি উত্তর করলুম, “না, এখনো তো হয় নি।” অচিরার কাছে কোনো কথাই এড়ায় না । সে বললে, “দাতু, ঐ এখনো শবদটা সংশয়গ্রস্ত কন্যাকর্তাদের মনকে সাস্তুনা দেবার জন্তে । ওর কোনো যথার্থ মানে নেই।” “একেবারে মানে যে নেই, এ কথা নিশ্চিত স্থির করলেন কী করে ।” “এটা গণিতের প্রব্লেম— তাও হাইয়ার ম্যাথম্যাটিক্স বললে যা বোঝায়, তা নয়। পূর্বেই শোনা গেছে, আপনি ছত্রিশ বছরের ছেলেমানুষ । হিসেব করে দেখলুম, এর মধ্যে আপনার মা অন্তত পাঁচ-সাতবার আপনাকে বলেছেন, ‘বাবা, ঘরে বউ আনতে চাই ।” আপনি বলেছেন, ‘তার আগে চাই লোহার সিন্দুকে টাকা আনতে । মা চোখের জল মুছে চুপ করে রইলেন। তার পরে ইতিমধ্যে আপনার আর-সব হয়েছে, কেবল ফঁাসি ছিল বাকি । শেষকালে এখানকার রাজসরকারে যখন মোটা মাইনের পদ জুটল, মা আবার ՓԵ তিন সঙ্গী বললেন, “বাবা এবার বিয়ে করতে হবে, আমার আর কদিন-ব সময় আছে । আপনি বললেন, “আমার জীবন আর আমার সায়ান্স এক, সে আমি দেশকে উৎসর্গ করব । আমি কোনোদিন বিয়ে করব না। হতাশ হয়ে আবার তিনি চোখের জল মুছে বসে আছেন। আপনার ছত্রিশ বছর বয়সের গণিতফল গণনা করতে আমার গণনায় ভুল হয়েছে কি না বলুন, সত্যি করে বলুন।” এ মেয়ের সঙ্গে অনবধানে কথা কওয়া বিপদজনক । কিছুদিন আগেই একটা ব্যাপার ঘটেছিল। প্রসঙ্গক্রমে অচিরা আমাকে বলেছিল, “আমাদের দেশে মেয়েদের আপনারা পান সংসারের সঙ্গিনীরূপে । সংসারে যাদের দরকার নেই, এদেশের মেয়েরাও তাদের কাছে অনাবশ্যক। কিন্তু বিলেতে যারা বিজ্ঞানের তপস্বী, তাদের তো উপযুক্ত তপস্বিনী জোটে, যেমন ছিল অধ্যাপক কুরির সহধর্মিণী মাডাম কুরি । সেরকম কোনো মেয়ে আপনি সে দেশে থাকতে পান নি ?” মনে পড়ে গেল ক্যাথারিনের কথা । একসঙ্গে কাজ করেছি লণ্ডনে থাকতে । এমন-কি, আমার একটা রিসর্চের বইয়ে আমার নামের সঙ্গে তার নামও জড়িত ছিল । মানতে হল কথাটা । অচিরা বললে, “র্তাকে আপনি বিয়ে করলেন না কেন । তিনি কি রাজী ছিলেন না।” আবার মানতে হল, “হা, প্রস্তাব র্তার দিক থেকেই উঠেছিল।” “তবে ?” “আমার কাজ যে ভারতবর্ষের। শুধু সে তো বিজ্ঞানের নয়।” “অর্থাৎ ভালোবাসার সফলতা আপনার মতো সাধকের কামনার জিনিস নয় । মেয়েদের জীবনের চরম লক্ষ্য ব্যক্তিগত, আপনাদের নৈর্ব্যক্তিক ।” এর জবাবটা হঠাৎ মুখে এল না। আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে অচিরা বললে, “বাংলা সাহিত্য আপনি বোধ হয় পড়েন না । কচ ও দেবযানী বলে একটা কবিতা আছে । তাতে ঐ কথাই শেষ কথা (tఏ আছে, মেয়েদের ব্রত হচ্ছে পুরুষকে বাধা, আর পুরুষদের ব্ৰত সে বাধম কাটিয়ে অমরলোকের রাস্ত বানানো। কচ বেরিয়ে পড়েছিল দেবযানীর অনুরোধ এড়িয়ে, আপনি কাটিয়ে এসেছেন মায়ের অকুনয়। একই কথা । মেয়ে-পুরুষের এই চিরকালের দ্বন্দ্বে আপনি জয়ী হয়েছেন। জয় হোক আপনার পৌরুষের । কাতুক মেয়েরা, সে কান্না আপনার নিন পূজার নৈবেদ্য। দেবতার উদ্দেশে আসে নৈবেদ্য, কিন্তু দেবতা থাকেন নিরাসক্ত ।” অধ্যাপক এই আলোচনার মূল লক্ষ্য কিছুই বুঝলেন না। সগৰ্বে বললেন, “দিদির মুখে গভীর সত্য কেমন বিনা চেষ্টায় প্রকাশ পায়, বাইরের লোকে শুনলে মনে করবে—” র্তার কেবলই ভয়, বাইরের লোক তার নাতনীকে ঠিক বুঝতে পারবে না । অচিরা বললে, “বাইরের লোকে মেয়েদের জেঠামি সইতে পারে না, তাদের কথা তুমি ভেবো না । তুমি আমাকে ঠিক বুঝলেই হল ।” অচিরা খুব বড়ো কথাও বলে থাকে হাসির ছলে, কিন্তু আজ সে কী গম্ভীর । আমার একটা কথা আন্দাজে মনে হল, ভবতোষ ওকে বুঝিয়েছিল যে, সে যে ভারত-সরকারের উচ্চ গগনের জ্যোতিলোক থেকে বধূ এনেছে, তারও লক্ষ্য খুব উচ্চ এবং নিঃস্বার্থ। ব্রিটিশ রাষ্ট্রশাসনের ভাণ্ডার হতেই সে শক্তি সংগ্রহ করতে পারবে দেশের কাজে লাগাতে । এত সহজ নয় অচিরাকে ছলনা করা । সে যে ভোলে নি, তার প্রমাণ রয়ে গেছে সেই দ্বিখণ্ডিত চিঠির খামটা থেকেই । অচিরা আবার বললে, “দেবযানী কচকে কী অভিসম্পাত দিয়েছিল জানেন, নবীনবাবু ?” “নী !” “বলেছিল, ‘তোমার জ্ঞানসাধনার ধন তুমি নিজে ব্যবহার করতে পারবে না, অন্তকে দান করতে পারবে ।’ আমার কাছে 9 o তিন সঙ্গী কথাটা আশ্চর্য বোধ হয়। যদি এই অভিসম্পাত আজ দিত কেউ যুরোপকে, তা হলে সে বেঁচে যেত। বিশ্বের জিনিসকে নিজের জিনিসের মতো ব্যবহার করেই ওরা লোভের তাড়ায় মরছে । সত্যি কি না বলে দাতু।” “খুব সত্যি কিন্তু আশ্চর্য এই, এত কথা তুমি কী করে ভাবলে ।” “নিজগুণে একটুও নয়। ঠিক এই রকম কথা তোমার কাছে অনেকবার শুনেছি । তোমার একটা মহদগুণ আছে, ভোলানাথ তুমি, কখন কী বলো, সমস্ত ভুলে যাও । চোরাই মালের উপর নিজের ছাপ লাগিয়ে দিতে ভয় থাকে না ।” আমি বললুম, “চুরি বিদ্যা বড়ো বিদ্যা ! বিদ্যায় বলো, রাষ্ট্রেই বলো, বড়ো বড়ো সম্রাট বড়ো বড়ো চোর । আসল কথা, তারাই ছিচকে চোর, ছাপ মারবার পূর্বেই যারা ধরা পড়ে ।” অচিরা বললে, “ওঁর কত ছাত্র ওঁর মুখের কথা খাতায় টুকে নিয়ে বই লিখে নাম করেছে । উনি তাদের লেখা পড়ে আশ্চর্য হয়ে প্রশংসা করেন । জানতেই পারেন না, নিজের প্রশংসা নিজেই করছেন ! আমার ভাগ্যে এ প্রশংসা প্রায়ই জোটে ; নবীনবাবুকে জিজ্ঞাসা করলেই উনি কবুল করবেন, আমার ওরিজিন্ত্যালিটির কথা খাতায় লিখতে শুরু করেছেন, যে খাতায় তাম্রপ্রস্তরযুগের নোট রাখেন। মনে আছে দাতু, অনেক দিনের কথা, যখন কলেজে ছিলে, আমাকে কচ ও দেবযানীর কবিতা শুনিয়েছিলে ? সেইদিন থেকে আমি পুরুষের উচ্চ গৌরব মনে মনে মেনেছি, ককখনো মুখে স্বীকার করি নে ৷” “কিন্তু দিদি, আমার কোনো কথায় আমি মেয়েদের গৌরবের লাঘব করি নি।” “তুমি করবে ? তুমি যে মেয়েদের অন্ধ ভক্ত, তোমার মুখের স্তবগান শুনে মনে মনে হাসি । মেয়েরা নির্লজ্জ হয়ে সব মেনে নেয়। সস্তায় প্রশংসা আত্মসাৎ করা ওদের অভ্যেস হয়ে গেছে ।” শেষ কথা Wり) সেদিন এই—যে কথাবার্তা হয়ে গেল, এ নেহাত হাস্যালাপ নয় । এর মধ্যে ছিল যুদ্ধের সূচনা। অচিরার স্বভাবের ছটে দিক ছিল, আর তার ছিল দুটো আশ্রয়। এক ছিল তাদের নিজেদের বাড়ি আর ছিল সেই পঞ্চবটী । ওর সঙ্গে যখন আমার বেশ সহজ সম্বন্ধ হয়ে এসেছে, তখন স্থির করেছিলুম, ঐ পঞ্চবটীর নিভৃতে হাসিকৌতুকের ছলে আমার জীবনের সদ্যসংকটের কথা কোনো রকম করে তুলব এবং নিষ্পত্তির দিকে নিয়ে যাব। কিন্তু ওখানে পথ বন্ধ । আমাদের পরিচয়ের প্রথম দিনে প্রথম কথা যেমন মুখে আসছিল না, তেমনি এখানে যে অচিরা আছে তার কাছে প্রথম কথা নেই । মোকাবিলায় ওর চরম মনের কথায় পৌছবার কোনো উপায় খুঁজে পাই নে। ওর ঘরের কাছে ওর সহাস্যমুখরতা রোধ করে দেয় আমার তরফের এক পা অগ্রগতি । আর ওর নিভৃত বনচ্ছায়ায় আমার সমস্ত চাঞ্চল্য ঠেকিয়ে রেখেছে নির্বাক নিঃশব্দতায় । কোনো কোনোদিন ওদের ওখানে চায়ের নিমন্ত্রণ সভার একটা কোনো সীমানায় মন খোলবার সুযোগ পাওয়া যায়, অচিরা বুঝতে পারে আমি বিপদমণ্ডলীর কাছাকাছি আসছি, সেইদিনই ওর বাক্যবাণবর্ষণের অবিরলতা অস্বাভাবিক বেড়ে ওঠে। একটুও ফাক পাই নে আর আবহাওয়াও হয়ে ওঠে প্রতিকূল । আমার মন হয়েছে অত্যন্ত অশান্ত, কাজের বাধা এমনি ঘটছে যে, আমি লজ্জা পাচ্ছি মনে মনে । সদরে বাজেটের মিটিঙে আমার রিসর্চ-বিভাগে আরো কিছু টাকা মঞ্জুর করে নেবার প্রস্তাব আছে, তারই সমর্থক রিপোর্ট অর্ধেকের বেশি লেখা হয় নি। ইতিমধ্যে ক্রোচের এস্থেটিকস্ সম্বন্ধে আলোচনা রোজ কিছুদিন ধরে শুনে আসছি। বিষয়টা সম্পূর্ণ আমার উপলব্ধির এবং উপভোগের বাইরে— সে কথা অচিরা নিশ্চিত জানে। দাতুকে উৎসাহিত করে আর মনে মনে হাসে । সম্প্রতি চলছে behaviourism সম্বন্ধে যত বিরুদ্ধ যুক্তি আছে, তার ব্যাখ্যা । এই তত্ত্বালোচনার শোচনীয়তা হচ্ছে এই যে, ৬২ তিন সঙ্গী অচিরা এই সময়টাতে ছুটি নিয়ে বাগানের কাজে চলে যায়, বলে, "এ-সব তর্ক পূর্বেই শুনেছি। আমি বোকার মতো বসে থাকি, মাঝে মাঝে দরজার দিকে তাকাই । একটা সুবিধে এই যে, অধ্যাপক জিজ্ঞাসা করেন না— তর্কের কোনো একটা দুরূহ গ্রন্থি বুঝতে পারছি কি না । তার মনে হয় সমস্তই জলের মতো বোঝা যায়। কিন্তু আর তো চলবে না, কোনো ছিদ্রে আসল কথাটা পাড়তেই হবে । পিক্‌নিকের এক অবকাশে অধ্যাপক যখন পোড়ো মন্দিরের সিড়িটাতে বসে নব্য কেমিস্ট্রির নতুন-আমদানির বই পড়ছিলেন, বেঁটে আবলুস গাছের ঝোপের মধ্যে বসে অচিরা হঠাৎ আমাকে বললে, “এই চিরকালের বনের মধ্যে যে একটা অন্ধ প্রাণের শক্তি আছে, ক্রমেই তাকে আমার ভয় করছে।” আমি বললুম, “আশ্চর্য, ঠিক এই রকমের কথা সেদিন আমি আমার ডায়ারিতে লিখেছি।” অচিরা বলে চলল, “পুরনো ইমারতের কোনো-একটা ফাটলে লুকিয়ে লুকিয়ে অশথের একটা অঙ্কুর ওঠে, তার পরে শিকড়ে শিকড়ে জড়িয়ে ধরে তার সর্বনাশ করে, এও তেমনি । দাতুর সঙ্গে এই কথাটাই হচ্ছিল। দাহু বলছিলেন, লোকালয় থেকে বহুদিন একান্ত দূরে থাকলে মানবচিত্ত প্রকৃতির প্রভাবে হুৰ্বল হতে থাকে, প্রবল হয়ে ওঠে আদিম প্রাণ-প্রকৃতির প্রভাব । আমি বললুম, এ রকম অবস্থায় কী করা যায়। তিনি বললেন, “মানুষের চিত্তকে আমরা তো সঙ্গে করে আনতে পারি— ভিড়ের চেয়ে নির্জনে তাকে বরঞ্চ বেশি করে পাই, এই দেখো-না আমার বইগুলি ।” দাদুর পক্ষে বলা সহজ, কিন্তু সবাইকে এক ওষুধ খাটে না। আপনি কী বলেন।” আমি বললুম, “আচ্ছা, বলব। আমার কথাটা ঠিকমত বুঝে দেখবেন । আমার মত এই যে, এই রকম জায়গায় এমন একজন মানুষের সঙ্গ সমস্ত অন্তর বাহিরে পাওয়া চাই, যার প্রভাব মানবপ্রকৃতিকে সম্পূর্ণ করে রাখতে পারে। যতক্ষণ না পাই ততক্ষণ শেষ কথা ՆԾ অন্ধশক্তির কাছে কেবলই হার ঘটতে থাকবে । আপনি যদি সাধারণ মেয়েদের মতো হতেন, তা হলে আপনার কাছে সত্য কথা শেষ পর্যন্ত স্পষ্ট করে বলতে মুখে বাধত।” অচিরা বললে, “বলুন আপনি, দ্বিধা করবেন না।” বললুম, “আমি সায়ন্টিস্ট, যেটা বলতে যাচ্ছি সেটা ইম্পার্সোনাল ভাবে বলব। আপনি একদিন ভবতোষকে অত্যন্ত ভালোবেসেছিলেন । আজও কি আপনি তাকে তেমনি ভালোবাসেন ।” “আচ্ছা, মনে করুন, বাসি নে ৷” “আমিই আপনার মনকে সরিয়ে এনেছি।” “তা হতে পারে, কিন্তু একলা আপনি নন, বনের ভিতরকার এই ভীষণ অন্ধশক্তি। সেইজন্তে আমি এই সরে আসাকে শ্রদ্ধা করি নে, লজ্জা পাই ।” “কেন করেন না ।” “দীর্ঘকালের প্রয়াসে মানুষ চিত্তশক্তিতে নিজের আদর্শকে গড়ে তোলে, প্রাণশক্তির অন্ধতা তাকে ভাঙে। আপনার দিকে আমার যে ভালোবাসা, সে সেই অন্ধশক্তির আক্রমণে ।” “ভালোবাসাকে আপনি এমন করে গঞ্জনা দিচ্ছেন নারী হয়ে ?” “নারী বলেই দিচ্ছি। ভালোবাসার আদর্শ আমাদের পূজার জিনিস। তাকেই বলে সতীত্ব । সতীত্ব একটা আদর্শ। এ জিনিসটা বনের প্রকৃতির নয়, মানবীর । এ নির্জনে এতদিন সেই আদশকে আমি পূজা করছিলুম সকল আঘাত সকল বঞ্চনা সত্ত্বেও। তাকে রক্ষা করতে না পারলে আমার শুচিতা থাকে না ।” “আপনি শ্রদ্ধা করতে পারেন ভবতোষকে ?” “all” “তার কাছে যেতে পারেন ?” “না । কিন্তু সে আর আমার সেই জীবনের প্রথম ভালোবাসা, এক নয়। এখন আমার কাছে সেই ভালোবাসা ইম্পার্সোনাল । o 8 তিন সঙ্গী কোনো আধারের দরকার নেই।” “ভালো বুঝতে পারছি নে ৷” “আপনি বুঝতে পারবেন না। আপনাদের সম্পদ জ্ঞানের— উচ্চতম শিখরে সে জ্ঞান ইম্পার্সোনাল । মেয়েদের সম্পদ হৃদয়ের, যদি তার সব হারায়—যা কিছু বাহিক, যা দেখা যায়, ছোওয়া যায়, ভোগ করা যায়, তবু বাকি থাকে তার সেই ভালোবাসার আদর্শ যা অবাঙ মনসোগোচরঃ । অর্থাৎ ইম্পার্সোনাল।” আমি বললুম, “দেখুন, তর্ক করবার সময় আর নেই। এখানকার কাগজে বোধ হয় দেখে থাকবেন, আমার এখানকার কাজ শেষ হয়ে গেছে। অ্যাসিস্টাণ্ট জিয়লজিস্ট লিখেছেন, এখান থেকে আরো কিছু দূরে সন্ধানের কাজ আরম্ভ করতে হবে, কিন্তু—” “কেন গেলেন না ।” “আপনার কাছ থেকে —” “আমার কাছ থেকে শেষ কথাটা শুনতে চান, প্রথম কথাটা পূর্বেই আদায় করা হয়েছে !” “হা, ঠিক তাই ।” “তা হলে কথাটা পরিষ্কার করে বলি। আমার ঐ পঞ্চবটীর মধ্যে বসে আপনার অগোচরে কিছুকাল আপনাকে দেখেছি । সমস্ত দিন পরিশ্রম করেছেন, মানেন নি প্রখর রৌদ্রের তাপ। কোনো দরকার হয় নি কারো সঙ্গের । এক-একদিন মনে হয়েছে হতাশ হয়ে গেছেন, যেটা পাবেন নিশ্চিত করেছিলেন সেটা পান নি । কিন্তু তার পরদিন থেকেই আবার অক্লান্ত মনে খোড়াখুঁড়ি চলেছে। বলিষ্ঠ দেহকে বাহন করে বলিষ্ঠ মনের যেন জয়যাত্রা চলছে। এমনতরো বিজ্ঞানের তপস্বী আমি আর কখনো দেখি নি। দূরে থেকে ভক্তি করেছি।” “এখন বুঝি—” “না, বলি শুকুন। আমার সঙ্গে আপনার পরিচয় যতই এগিয়ে চলল, ততই দুর্বল হল সেই সাধনা। নানা তুচ্ছ উপলক্ষে কাজে শেষ কথা \p& বাধা পড়তে লাগল। তখন ভয় হল নিজেকে, এই নারীকে । ছি ছি, কী পরাজয়ের বিষ এনেছি আমার মধ্যে। এই তো আপনার দিকের কথা, এখন আমার কথাটা বলি। আমারও একটা সাধনা ছিল, সেও তপস্যা । তাতে আমার জীবনকে পবিত্র করবে, উজ্জল করবে, এ আমি নিশ্চয় জানতুম। দেখলুম ক্রমেই পিছিয়ে যাচ্ছি —যে চাঞ্চল্য আমাকে পেয়ে বসেছিল, তার প্রেরণা এই ছায়াছন্ন বনের নিশ্বাসের ভিতর থেকে, সে আদিম প্রাণের শক্তির । মাঝে মাঝে এখানকার রাক্ষসী রাত্রির দ্বারা আবিষ্ট হয়ে মনে হয়েছে, একদিন আমার দাতুর কাছ থেকে আমাকে ছিনিয়ে নিতে পারে বুঝি এমন প্রবৃত্তিরাক্ষস আছে। তার বিশ হাত দিনে দিনে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। তখনই বিছানা ফেলে ছুটে গিয়ে ঝরনার মধ্যে ঝাপিয়ে পড়ে আমি স্নান করেছি।” এই কথা বলতে বলতে অচিরা ডাক দিলে, “দা ।” অধ্যাপক র্তার পড়া ফেলে রেখে কাছে এসে মধুর স্নেহে বললেন, “কী দিদি ।” “তুমি সেদিন বলছিলে না, মানুষের সত্য তার তপস্যার ভিতর দিয়ে অভিব্যক্ত হয়ে উঠছে ?— তার অভিব্যক্তি বায়োলজির নয়।” “হঁ্যা, তাই তো আমি বলি। পৃথিবীতে বর্বর মানুষ জন্তুর পর্যায়ে। কেবলমাত্র তপস্যার ভিতর দিয়ে সে হয়েছে জ্ঞানী মানুষ । আরো তপস্যা সামনে আছে, আরো স্থূলত্ব বর্জন করতে হবে, তবে সে হবে দেবতা । পুরাণে দেবতার কল্পনা আছে, কিন্তু অতীতে দেবতা ছিলেন না, দেবতা আছেন ভবিষ্যতে, মানুষের ইতিহাসের শেষ অধ্যায়ে ।” “দাতু, এইবার তোমার আমার কথাটা চুকিয়ে দিই। কদিন থেকে মনের মধ্যে তোলপাড় করছে ।” আমি উঠে পড়ে বললুম, “তা হলে আমি যাই।” “না, আপনি বসুন। দাদু, তোমার সেই কলেজের যে অধ্যক্ষপদ তোমার ছিল, সেটা আবার খালি হয়েছে। সেক্রেটরি খুব Woo তিন সঙ্গী অনুনয় করে তোমাকে লিখেছেন সেই পদ ফিরে নিতে। তুমি আমাকে সব চিঠি দেখাও, কেবল এই চিঠিটাই দেখাও নি। তাতেই তোমার হুরভিসন্ধি সন্দেহ করে ঐ চিঠিটা চুরি করে দেখেছি।” “আমারই অন্যায় হয়েছিল।” “কিছু অন্যায় হয় নি। আমি তোমাকে টেনে এনেছি তোমার আসন থেকে নীচে । আমরা কেবল নামিয়ে আনতেই আছি।” “কী বলছ দিদি ৷” “সত্যি কথাই বলছি । বিশ্বজগৎ না থাকলে বিধাতার হাত খালি হয়, ছাত্র না থাকলে তোমার তেমনি । সত্যি কথা বলো ।” “বরাবর ইস্কুলমাস্টারি করেছি কিনা, তাই—” “তুমি আবার ইস্কুলমাস্টার! তুমি born teacher, তুমি আচার্য । তোমার জ্ঞানের সাধনা নিজের জন্তে নয়, অন্তকে দানের জন্যে। দেখেন নি নবীনবাবু, মাথায় একটা আইডিয়া এলে আমাকে নিয়ে পড়েন, দয়ামায়া থাকে না ; বারো-আনা বুঝতে পারি নে ; নইলে আপনাকে নিয়ে বসেন, সে আরো শোচনীয় হয়ে ওঠে । আপনার মন যে কোন দিকে বুঝতেই পারেন না, ভাবেন বিশুদ্ধ জ্ঞানের দিকে। দাহু, ছাত্র তোমার নিতান্তই চাই, কিন্তু বাছাই করে নিতে ভুলো না।” অধ্যাপক বললেন, “ছাত্রই তো শিক্ষককে বাছাই করে, গরজ ভো তারই ।” “আচ্ছা, সে কথা পরে হবে । সম্প্রতি আমার চৈতন্য হয়েছে, যিনি শিক্ষক তাকে গ্রন্থকীট করে তুলছি। এমনি করে তপস্যা ভাঙি নিজের অন্ধ-গরজে । সে কাজ তোমাকে নিতে হবে, এখনই যেতে হবে সেখানে ফিরে ।” অধ্যাপক হতবুদ্ধির মতো অচিরার মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। অচিরা বললে, “ও, বুঝেছি, তুমি ভাবছ আমার কী গতি হবে। আমার গতি তুমি । ভোলানাথ, আমাকে যদি তোমার পছন্দ না শেষ কথা (ԵՊ হয়, তা হলে দিদিমা দি সেকেণ্ডের আমদানি করতে হবে, তোমার লাইব্রেরি বেচে তার গয়না বানিয়ে দেবে, আমি দেব লম্বা দৌড়। অত্যন্ত অহংকার না বাড়লে এ কথা তোমাকে মানতেই হবে, আমাকে না হলে একদিনও তোমার চলে না। আমার অনুপস্থিতিতে পনেরোই আশ্বিনকে পনেরোই অক্টোবর বলে তোমার ধারণা হয়, যেদিন বাড়িতে তোমার সহযোগী অধ্যাপকের নিমন্তয়, সেইদিনই লাইব্রেরি ঘরে দরজা বন্ধ করে নিদারুণ একটা ইকোয়েশন কষতে লেগে যাও। গাড়িতে চড়ে ড্রাইভরকে যে ঠিকানা দাও, সে ঠিকানায় আজও বাড়ি তৈরি হয় নি। নবীনবাবু মনে করছেন আমি অত্যুক্তি করছি।” আমি বললুম, “একেবারেই না । কিছুদিন তো ওঁকে দেখছি, তার থেকেই অসন্দিগ্ধ বুঝেছি, আপনি যা বলছেন তা খাটি সত্য ।” “আজ এত অলুক্ষণে কথা তোমার মুখ দিয়ে বেরুচ্ছে কেন। জানো নবীন, এই রকম যা-তা বলবার উপসর্গ ওর সম্প্রতি দেখা দিয়েছে।” “সব লক্ষণ শান্ত হয়ে যাবে, তুমি চলো দেখি তোমার কাজে । নাড়ী আবার ফিরে আসবে। থামবে প্রলাপ-বকুনি।” অধ্যাপক আমার দিকে চেয়ে বললেন, “তোমার কী পরামর্শ নবীন।” উনি পণ্ডিত মানুষ বলেই জিয়লজিস্টের বুদ্ধির পরে ওঁর এত শ্রদ্ধা । আমি একটুক্ষণ স্তব্ধ থেকে বললুম, “অচিরা দেবীর চেয়ে সত্য পরামর্শ আপনাকে কেউ দিতে পারবে না।” অচিরা উঠে দাড়িয়ে পা ছুয়ে আমাকে প্রণাম করলে । আমি সংকুচিত হয়ে পিছু হঠে গেলুম। অচিরা বললে, “সংকোচ করবেন না, আপনার তুলনায় আমি কেউ নই। সে কথাটা একদিন স্পষ্ট হবে। এইখানেই শেষ বিদায় নিলুম। যাবার আগে আর কিন্তু দেখা হবে না।” অধ্যাপক আশ্চর্য হয়ে বললেন, “সে কী কথা দিদি ।” “দাহ, তুমি অনেক কিছু জানো, কিন্তু অনেক কিছু সম্বন্ধে ᏬᎭ তিন সঙ্গী তোমার চেয়ে আমার বুদ্ধি অনেক বেশি, সবিনয়ে এ কথাটা স্বীকার করে নিয়ো ।” আমি পদধূলি নিয়ে প্রণাম করলুম অধ্যাপককে। তিনি আমাকে বুকে আলিঙ্গন করে ধরে বললেন, “আমি জানি সামনে তোমার কীর্তির পথ প্রশস্ত ।” এইখানে আমার ছোটোগল্প ফুরল। তার পরেকার কথা জিয়লজিস্টের। বাড়ি ফিরে গিয়ে কাজের নোট এবং রেকর্ডগুলো আবার খুললুম। মনে হঠাৎ খুব একটা আনন্দ জাগল— বুঝলুম একেই বলে মুক্তি। সন্ধ্যাবেলায় দিনের কাজ শেষ করে বারান্দায় এসে বোধ হল— খাচা থেকে বেরিয়ে এসেছে পাখি, কিন্তু পায়ে আছে এক টুকরো শিকল । নড়তে-চড়তে সেটা বাজে।