শেষ লীলা/প্রথম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

শেষ লীলা।[১]

প্রথম পরিচ্ছেদ।

 দিবা আন্দাজ নয়টার সময় সংবাদ পাইলাম যে, আজ কয়েকদিবস হইল, পাঁচুধোপানির গলিতে রাজকুমারী নাম্নী একটী স্ত্রীলোককে কে হত্যা করিয়া তাহার যথাসর্ব্বস্ব অপহরণ করিয়া পলায়ন করিয়াছে। পুলিশের প্রধান প্রধান কর্ম্মচারীগণের মধ্যে প্রায় সকলেই সেই অনুসন্ধানে নিযুক্ত হইয়াছেন। কিন্তু এ পর্য্যন্ত কেহই তাহার কোনরূপ সন্ধান করিয়া উঠিতে পারেন নাই।

 যে দিবস রাজকুমারীর হত্যা-সংবাদ প্রথমে থানায় আসিয়া উপস্থিত হয়, সে দিবস আমি কলিকাতায় ছিলাম না; অপর একটী সরকারী কার্য্যের মিমিত্ত স্থানান্তরে গমন করিয়াছিলাম।

 কলিকাতায় আসিয়া, যেমন এই সংবাদ জানিতে পারিলাম, অমনি পাঁচুধোপানির গলির যে বাড়ীতে রাজকুমারী হত্যা হইয়াছিল, সেই বাড়ীতে গিয়া উপস্থিত হইলাম। দেখিলাম, সেই স্থানে বসিয়া চারি পাঁচজন উচ্চপদস্থ পুলিস-কর্ম্মচারী অনুসন্ধান করিতেছেন।

 আমাকে দেখিয়া, তাঁহারা যে স্থানে ছিলেন, অনুগ্রহপূর্ব্বক তাহার এক পার্শ্বে আমাকে বসিবার স্থান প্রদান করিলেন। আমি সেই স্থানে উপবেশন করিলে, একজন কর্ম্মচারী আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “এতদিবস আপনি কোথায় ছিলেন? আজ কয়েকদিবস হইল, এই হত্যা হইয়া গিয়াছে; কিন্তু আপনি একবারের নিমিত্তও এদিকে আসেন নাই কেন?”

 আমি। আমি কলিকাতায় ছিলাম না। অপর কার্য্যের নিমিত্ত স্থানান্তরে গমন করিয়াছিলাম বলিয়া, আপনাদিগের সহিত এই অনুসন্ধানে যোগ দিতে পারি নাই। অদ্য কলিকাতায় আসিয়া এই ব্যাপার যেমন শুনিতে পাইলাম, অমনি আপনাদিগের সাহায্যের নিমিত্ত আসিয়া উপস্থিত হইয়াছি। এখন আমাকে কি করিতে হইবে বলুন?

 কর্ম্মচারী। আপনাকে এখন আর বেশী কিছু করিতে হইবে না, কেবল যে ব্যক্তি রাজকুমারীকে হত্যা করিয়া তাহার যথাসর্ব্বস্ব অপহরণ করিয়া লইয়া গিয়াছে, কেবল তাহারই অনুসন্ধান করিয়া ধরিয়া দিলেই হইবে।

 আমি। আপনারা দেখিতেছি, সমস্ত কার্য্যই প্রায় শেষ করিয়াছেন, আমার নিমিত্ত অতি অল্পই রাখিয়া দিয়াছেন।

 কর্ম্মচারী। সে যাহা হউক, এখন এই মোকদ্দমার অবস্থা সমস্ত শুনিয়াছেন কি?

 আমি। রাজকুমারীকে কোন ব্যক্তি হত্যা করিয়া তাহার যথাসর্ব্বস্ব অপহরণ করিয়া লইয়া গিয়াছে, ইহা ব্যতীত আর কোন বিষয়ই আমি এ পর্য্যন্ত শ্রবণ করি নাই। কিরূপ ঘটিয়াছিল, এবং অনুসন্ধান করিতে করিতে আপনারাই বা কতদূর অগ্রগামী হইতে পারিয়াছেন, তাহা আমাকে বিস্তারিতরূপে বলুন দেখি।

 কর্ম্মচারী। দিবস অতীত হইল, এই সংবাদ প্রথমে থানায় গিয়া দুষ্পাঠ্য

 আমি। কে দুষ্পাঠ্য সংবাদ দেয়?

 কর্ম্মচারী। যাহার দুষ্পাঠ্য সেই থানায় গিয়া এই সংবাদ প্রথমে প্রদান করে।

 আমি। সে গিয়া সর্ব্বপ্রথমে কি বলে?

 কর্ম্মচারী। তাহার সংবাদ এইরূপ,—“আমার যে বাড়ীতে রাজকুমারী বাস করিত, আমি সেই বাড়ীতে থাকি না। আমার অপর আর একখানি বাড়ী আছে, সেই বাড়ীতে আমি থাকি। অদ্য দিবা আন্দাজ আটটার সময় সেই বাড়ীর একজন ভাড়াটিয়া আসিয়া আমাকে সংবাদ দেয় যে, রাজকুমারীকে কে হত্যা করিআছে। এই সংবাদ শুনিবামাত্র আমি সেই বাড়ীতে গমন করিলাম। দেখিলাম, রাজকুমারীর গৃহের দরজা খোলা রহিয়াছে, ও রাজকুমারী মৃত-অবস্থায় তাহার গৃহের মেঝের উপর পড়িয়া রহিয়াছে। এই ব্যাপার দেখিয়া, আমি থানায় সংবাদ প্রদান করিতে আসিয়াছি।”

 আমি। এইরূপ সংবাদ পাইয়া আপনারা যখন এই বাড়ীতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন, তখন বাড়ীর অবস্থা কিরূপ দেখিলেন?

 কর্ম্মচারী। দেখিলাম, বাড়ীওয়ালার সংবাদ সম্পূর্ণরূপে সত্য; এই বাড়ীর নীচের তালায় এই গৃহের ভিতর একটী মৃতদেহ পড়িয়া রহিয়াছে। অনুসন্ধানে আরও জানিতে পারিলাম, উহারই নাম রাজকুমারী।

 আমি। গৃহের দরজা?

 কর্ম্মচারী। গৃহের দরজা খোলা রহিয়াছে।

 আমি। উহার মৃতদেহ সর্ব্বপ্রথমে কাহা কর্ত্তৃক এবং কিরূপে দেখিতে পাওয়া গেল?

 কর্ম্মচারী। প্রায় প্রত্যহই রাজকুমারী প্রত্যূষে গাত্রোত্থান করিত। সেই দিবস প্রাতঃকালে উহাতে দেখিতে না পাইয়া, এই বাড়ীর একজন ভাড়াটিয়া তাহার গৃহের বাহির হইতে রাজকুমারীকে প্রথমে ডাকিতে থাকে। কিন্তু কোনরূপে তাহার উত্তর না পাইয়া তাহার গৃহের দরজায় ধাক্কা দেয়। ধাক্কা দিবামাত্রই গৃহের দরজা খুলিয়া যায়। সে গৃহের ভিতর প্রবেশ করিতে গিয়াই দেখিতে পায়, রাজকুমারী মেঝের উপর মৃত-অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে। এই ব্যাপার দেখিয়া সে চীৎকার করিয়া উঠে। তাহার চীৎকারে বাড়ীর অপরাপর ভাড়াটিয়াগণ আসিয়া সেই স্থানে উপস্থিত হয়, এবং সকলেই রাজকুমারীর এই দশা দেখিতে পায়। পরিশেষে একজন গিয়া বাড়ীওয়ালাকে সংবাদ প্রদান করে। সংবাদ পাইয়া বাড়ীওয়ালা যাহা করিয়াছিল, তাহা আমি পূর্ব্বেই আপনাকে বলিয়াছি।

 আমি। বাড়ীতে যে সকল ভাড়াটিয়া আছে, তাহারা কি সকলেই স্ত্রীলোক?

 কর্ম্মচারী। ভাড়াটিয়ামাত্রেই স্ত্রীলোক। কিন্তু তাহাদিগের প্রত্যেকের গৃহেই রাত্রিকালে পুরুষ মানুষের সমাগম হইয়া থাকে।

 আমি। রাজকুমারীর গৃহের দরজায় সামান্য ধাক্কা দিলেই সেই গৃহের দরজা খুলিয়া যায়। তখন বোধ হয়, হত্যাকারী হত্যা করিয়া প্রস্থান করিবার সময় সেই গৃহের দরজা ভেজাইয়া রাখিয়া গিয়াছিল?

 কর্ম্মচারী। তদ্বিষয়ে আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই।

 আমি। পুলিসকর্ম্মচারীগণের মধ্যে সর্ব্বপ্রথমে সেই গৃহের ভিতর কে প্রবেশ করিয়াছিল।

 কর্ম্মচারী। আমিই প্রথমে সেই গৃহের ভিতর প্রবেশ করি।

 আমি। আপনি গিয়া গৃহের কিরূপ অবস্থা দেখিতে পান?

 কর্ম্মচারী। গৃহের ভিতর প্রবেশ করিয়া প্রথমেই রাজকুমারীকে মৃতাবস্থায় গৃহের মেঝের উপর পড়িয়া রহিয়াছে দেখিতে পাই।

 আমি। উহার মৃতদেহ একেবারে মৃত্তিকার উপর পতিত ছিল, কি কোনরূপ বিছানার উপর পড়িয়াছিল?

 কর্ম্মচারী। একখানি বিছান মাজুরের উপর উহার মৃতদেহ পড়িয়াছিল।

 আমি। সেই মৃতদেহের অঙ্গে কোনরূপ আঘাতের চিহ্ন ছিল কি?

 কর্ম্মচারী। বিশেষ কোনরূপ আঘাতের চিহ্ন ছিল না। কেবল উহার গলার দুই পার্শ্বে অঙ্গুলের দাগের সহিত নখের দাগ ছিলমাত্র।

 আমি। তবে কি উহাকে গলা টিপিয়া মারিয়া ফেলা হয়?

 কর্ম্মচারী। যে ডাক্তার সাহেব সেই মৃতদেহ পরীক্ষা করিয়াছেন, তাঁহার বিবেচনায় গলা টিপিয়া উহাকে মারিয়া ফেলা হইয়াছে। তিনি আরও বলেন, রাজকুমারীকে চিৎ করিয়া লইয়া তাহার বুকের উপর বসিয়া তাহার গলা টেপা হয়।

 আমি। তাঁহার এ অনুমানের কারণ কি?

 কর্ম্মচারী। বুকের উপর যে সকল ছোট ছোট হাড় আছে, তাহার কতকগুলি ভগ্নাবস্থায় পাইয়াছেন বলিয়াই, ডাক্তার সাহেব এইরূপ অনুমান করেন।

 আমি। তাঁহার এ অনুমান কিছু একবারে অমূলক নহে।

 কর্ম্মচারী। এ অনুমান প্রকৃত বলিয়াই অনুমান হয়।

 আমি। গৃহের ভিতর আর কোন বস্তু পাওয়া গিয়াছিল কি?

 কর্ম্মচারী। দুইখানি কাঁসার বাসন সেই গৃহের এক পার্শ্বে পাওয়া গিয়াছিল, উহাতে চিড়া ও দধি কিছু কিছু লাগিয়াছিল। বোধ হয়, উহাতে করিয়া চিড়া ও দই দিয়া ফলার করা হইয়াছিল।

 আমি। যখন দুইটী পাত্রে চিড়া-দধির চিহ্ন রহিয়াছে, তখন অনুমান হয়, দুইজন সেই গৃহের ভিতর বসিয়া পৃথক পৃথক পাত্রে চিড়া-দধির ফলার করিয়াছিল। এখন সেই দুই ব্যক্তি কে?

 কর্ম্মচারী। একজন রাজকুমারী।

 আমি। তাহার প্রমাণ?

 কর্ম্মচারী। পরীক্ষায় তাহার পেটের ভিতর চিড়া-দধির চিহ্ন পাওয়া গিয়াছে।

 আমি। তাহা হইলে যে রাজকুমারীকে হত্যা করিয়াছে, সেই অপর ব্যক্তি হইবে।

 কর্ম্মচারী। খুব সম্ভব।

 আমি। গৃহের ভিতর আর কিছু দেখিতে পাইয়াছিলেন কি?

 কর্ম্মচারী। উহার গাত্রে অলঙ্কার-পত্র কিছুই ছিল না, বাক্সপেট্‌রা ভাঙ্গা।

 আমি। উহার যে সকল অলঙ্কার ছিল, তাহার তালিকা পাইয়াছেন কি?

 কর্ম্মচারী। প্রস্তুত করিয়া লইয়াছি।

 আমি। রাজকুমারী ত মরিয়া গিয়াছে, তাহার যে সকল দ্রব্য অপহৃত হইয়াছে, তাহার সমস্ত বৃত্তান্ত কিরূপে প্রাপ্ত হইলেন?

 কর্ম্মচারী। সমস্ত যে পাইয়াছি, তাহা বোধ হয় না। বাড়ীর অপরাপর স্ত্রীলোকগণের নিকট হইতে যতদূর অবগত হইতে পারিয়াছি, তাহারই তালিকা প্রস্তুত করিয়াছি।

 আমি। রাজকুমারীর গৃহে সেই রাত্রিতে কোন্ ব্যক্তি আসিয়াছিল, তাহার কোন কথা জানিতে পারা গিয়াছে কি?

 কর্ম্মচারী। না, তাহার গৃহে যে কোন পুরুষ মানুষ আসিয়াছিল, এ কথা কেহই বলিতে পারিতেছে না। কেবলমাত্র ইহাই জানিতে পারা গিয়াছে যে, সন্ধ্যার পর এই বাড়ীর অপর দুইটী স্ত্রীলোক উহার গৃহে গমন করিয়াছিল; কিন্তু তাহারা অতি অল্পক্ষণ থাকিয়াই তাহার গৃহ হইতে বাহির হইয়া আসিয়াছিল।

 আমি। সেই দুইটী স্ত্রীলোক কে?

 কর্ম্মচারী। তাহাদিগের একজনের নাম প্রিয়, এবং অপর আর একজনের নাম ত্রৈলোক্য। তাহারা উভয়েই এই বাড়ীর ভাড়াটিয়া, ও উভয়েই উপরে থাকে।

 আমি। সেই দুইটী স্ত্রীলোক ভিন্ন এই বাড়ীতে আর কে কে থাকে?

 কর্ম্মচারী। আরও চারি পাঁচজন স্ত্রীলোক এই বাড়ীতে বাস করে।

 আমি। অনুসন্ধান করিয়া কিছু জানিতে পারিয়াছেন কি, এই বাড়ীর সদর দরজা রাত্রিতে বন্ধ করা হইয়াছিল কি না? যদি হইয়া থাকে, তাহা হইলে কত রাত্রিতে ও কাহার দ্বারা বন্ধ হইয়াছিল?

 কর্ম্মচারী। কে যে এই দরজা শেষ বন্ধ করিয়াছিল, তাহা এ পর্য্যন্ত ঠিক করিতে পারা যায় নাই। কিন্তু এখন যতদূর জানিতে পারা যাইতেছে, তাহাতে রাত্রি বারটার সময় কামিনী সদর দরজা বন্ধ করিয়া দেয়; তাহার পর আর কেহ খুলিয়াছিল কি না, তাহা এ পর্য্যন্ত কেহই স্বীকার করিতেছে না।

 আমি। পরদিন প্রত্যূষে সদর দরজা কখন খুলিয়াছিল?

 কর্ম্মচারী। বিধু নাম্নী অপর স্ত্রীলোক প্রত্যূষে সদর দরজা খুলিয়া বাড়ী হইতে বহির্গত হইয়া যায়। সেই স্ত্রীলোকটী নিতান্ত অল্পবুদ্ধি-সম্পন্না। যে সময় সে দরজা খুলিয়া বাড়ী হইতে বহির্গত হইয়া যায়, সেই সময় দরজা ভিতর হইতে বন্ধ ছিল, কি খোলা ছিল, তাহা ঠিক করিয়া বলিতে পারে না। কখনও বলে, দরজার হুড়কা খুলিয়া সে বাড়ী হইতে বহির্গত হইয়া যায়, কখনও বলে, না, হুড়কা খোলা ছিল।

 আমি। উহার কথা শুনিয়া প্রকৃতপক্ষে সদর দরজা বন্ধ ছিল, কি খোলা ছিল, তাহার কিছু অনুমান করিয়া লইতে পারা যায় না কি?

 কর্ম্মচারী। সে অনুমান ঠিক নহে। কারণ, তাহার কথার উপর নির্ভর করিলে, সেই দরজা খোলা ছিল, এরূপ অনুমান করা যায় না। আর যদি দরজা ভিতর হইতে বন্ধই থাকিবে, তাহা হইলে হত্যাকারী কোন সময় ও কোথা দিয়া বাহির হইয়া গেল?

 আমি। বিধু দরজা খুলিয়া বাহির হইয়া যাইবার পর যদি হত্যাকারী বাড়ী হইতে বহির্গত হইয়া গিয়া থাকে?

 কর্ম্মচারী। তাহা অসম্ভব। কারণ, যে সময় বিধু বাড়ীর বাহির হইয়া যায়, সেই সময় এই বাড়ীর আরও দুই একটী স্ত্রীলোক উঠিয়াছিল। সেই সময় হত্যাকারী বাড়ী হইতে বহির্গত হইয়া যাইলে কাহার না কাহারও নয়নগোচর হইবার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা।

 আমি। তাহা হইলে এই বাড়ীর ভিতর যে সকল স্ত্রীলোেক আছে, তাহাদিগের গৃহে যে সকল পুরুষ মানুষ আসিয়াছিল, তাহাদিগের মধ্যে কাহার দ্বারা এই কার্য্য হয় নাই?

 কর্ম্মচারী। প্রত্যেক গৃহে যে সকল পুরুষ মানুষ সেই দিবস আসিয়াছিল, এবং যাহারা প্রায়ই এই বাড়ীতে আসিয়া থাকে, অনুসন্ধান করিয়া তাহাদিগের প্রত্যেককেই বাহির করা হইয়াছে, ও তাহাদিগের সম্বন্ধে অনেকরূপ অনুসন্ধান করা হইয়াছে, কিন্তু ফলে কিছুই হয় নাই।

 আমি। এ বাড়ীতে যে সকল স্ত্রীলোক বাস করে, তাহাদিগের মধ্যেও সবিশেষরূপ যে অনুসন্ধান করা হইয়াছে, তাহার আর কিছু মাত্র সন্দেহ নাই। কিন্তু ইহাদিগের মধ্যে কাহারও উপর কোনরূপ সন্দেহ হয় না কি?

 কর্ম্মচারী। কাহারও উপর কোনরূপ সন্দেহ হয় নাই। কিন্তু পরিশেষে একটী স্ত্রীলোকের উপর সবিশেষরূপ সন্দেহ হইয়াছে, তাহাকে লইয়া আজ তিনদিবসকাল অনবরত অনুসন্ধান চলিতেছে। কিন্তু এ পর্য্যন্ত তাহার নিকট হইতে কোন প্রকৃত কথা বাহির হয় নাই।

 আমি। সেই স্ত্রীলোকটীর উপর সন্দেহ হইবার কারণ কি?

 কর্ম্মচারী। সে নাকি পূর্ব্বে আরও কয়েকটী স্ত্রীলোককে হত্যা করা অভিযোগে অভিযুক্ত হইয়াছিল। কিন্তু বিচারে অব্যাহতি পায়। শুনিয়াছি, তাহার চরিত্র ভাল নহে, তাই তাহারই উপর সমস্ত কর্ম্মচারীরই সবিশেষরূপ সন্দেহ।

 আমি। সেই স্ত্রীলোকটীর নাম কি?

 কর্ম্মচারী। তাহার নাম ত্রৈলোক্য।

 আমি। হত্যাপরাধে যে ত্রৈলোক্যের আলিপুর সেসন-কোর্টে বিচার হয়, এবং পরিশেষে সেই মোকদ্দমা হইতে অব্যাহতি পায়, এই কি সেই ত্রৈলোক্য?

 কর্ম্মচারী। আলিপুরের মোকদ্দমার সময় আমি তাহাকে দেখি নাই। কিন্তু শুনিয়াছি, এ সেই ত্রৈলোক্য।

 আমি। আমি সে ত্রৈলোক্যকে বিলক্ষণ চিনি। যে মোকদ্দমায় আলিপুরে তাহার বিচার হয়, সেই মোকদ্দমায় আমি উহাকে ধৃত করিয়াছিলাম। ত্রৈলোক্য যদি এই বাড়ীতে থাকে, তাহা হইলে এই কার্য্য যে তাহার দ্বারা হয় নাই, ইহা আমি বলিতে পারি না। কারণ, তাহার দ্বারা না হইতে পারে, এরূপ কার্য্য এ জগতে নাই। আমি তাহাকে দেখিলে এখনই জানিতে পারিব, বর্ত্তমান ত্রৈলোক্য সেই ত্রৈলোক্য কি না।

 কর্ম্মচারী। আপনি কি তাহাকে এখন দেখিতে চান?

 আমি। না, এখন নয়। অগ্রে আপনার নিকট হইতে সমস্ত বিষয় অবগত হইয়া লই, তাহার পর তাহাকে দেখিব। এখন ত্রৈলোক্য সম্বন্ধে আমার দুই একটা কথা জিজ্ঞাস্য আছে।

 কর্ম্মচারী। কি?

 আমি। আপনি যখন প্রথম অনুসন্ধান করিতে আসিয়াছিলেন, তখন তাহাকে কিরূপ অবস্থায় দেখিতে পান?

 কর্ম্মচারী। বাড়ীতে প্রবেশ করিয়া অপর স্ত্রীলোকগণকে যেরূপ অবস্থায় দেখিতে পাইয়াছিলাম, তাহাকেও সেইরূপ অবস্থায় দেখিতে পাই। আমরা বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিবার পর, অপরাপর স্ত্রীলোকগণ যেমন আমাদিগের নিকট আসিয়া উপস্থিত হইল, ত্রৈলোক্যও সেইরূপ তাহাদিগের সঙ্গে আমাদিগের নিকট উপস্থিত হইল, এবং যাহাকে যেরূপ কথা জিজ্ঞাসা করিলাম, তাহারাও পরিষ্কাররূপে তাহার উত্তর প্রদান করিতে লাগিল।

 আমি। অপরাপর স্ত্রীলোকগণ আপনাদিগের সহিত যেরূপ ব্যবহার করিয়াছিল ত্রৈলোক্য কি ঠিক সেইরূপ ভাবে ব্যবহার করিয়াছিল, কি তাহার মধ্যে একটু পার্থক্য বুঝিতে পারিয়াছিলেন।

 কর্ম্মচারী। পার্থক্য একটু কেন, সবিশেষরূপই ছিল। অপরাপর সকলকে যখন ডাকিতাম, তখনই তাহারা আমাদিগের নিকট আসিত; যাহা জিজ্ঞাসা করিতাম তাহার উত্তর প্রদান করিয়া, আমাদিগের অনুমতি লইয়া আমাদিগের নিকট হইতে গমন করিত; কিন্তু ত্রৈলোক্যকে একবারের নিমিত্ত ডাকিতে হইত না। আমরা যতক্ষণ পর্য্যন্ত এই বাড়ীর ভিতর থাকিতাম, ছায়ার ন্যায় সে আমাদিগের সঙ্গে সঙ্গে ঘুরিত, মুহুর্ত্তে মুহূর্ত্তে তামাক সাজিয়া দিত। এক পান ফুরাইতে না ফুরাইতে অপর পান আনিয়া, আমাদিগের সম্মুখে উপস্থিত করিত। তাহার এইরূপ যত্ন দেখিয়া কর্ম্মচারীমাত্রেই তাহার উপর সবিশেষ সস্তুষ্ট ছিলেন; সুতরাং তাহাকে অধিক কথা প্রায় কেহই জিজ্ঞাসা করিতেন না। সামান্য যাহা কিছু তাহাকে জিজ্ঞাসা করা হইত, সঙ্গে সঙ্গে সে তাহার উত্তর প্রদান করিত। অধিকন্তু তাহার উপর কাহারও কোনরূপ সন্দেহ হইত না। বরং সকলেই তাহাকে একটু ভালবাসিতেন।

 আমি। কখন তাহার উপর সন্দেহ হইল?

 কর্ম্মচারী। দুই দিবস অনুসন্ধান হইবার পর, আপনার থানার একজন কর্ম্মচারী কোন কার্য্য উপলক্ষে এই স্থান দিয়া গমন করিতে ছিলেন। এই বাড়ীতে খুন হইয়াছে শুনিতে পাইয়া, এই বাড়ীর ভিতর আগমন করেন, এবং সম্মুখেই ত্রৈলোক্যকে দেখিতে পাইয়া তাহাকে কহেন, “কি গো ত্রৈলোক্য তুমি এই বাড়ীতে থাক নাকি? তবে এই সকল কর্ম্মচারীকে কেন আর মিথ্যা কষ্ট দিতেছ, রাজকুমারীকে কেন হত্যা করূিলে, তাহা বলিয়া দেও না; তাহা হইলে সমস্ত গোলযোগ চুকিয়া যাউক। সেই কর্ম্মচারীর এইরূপ কথা শুনিয়া আমি তাহাকে কহিলাম, “কেন মহাশয়! ত্রৈলোক্য এই হত্যা করিয়াছে, এরূপ সন্দেহ আপনার হইতেছে কেন?” উত্তরে তিনি কহিলেন, “আপনারা কি তবে ইহাকে চিনেন না? এই ত্রৈলোক্য যে কত স্ত্রীলোক পুষ্করিণীতে ডুবাইয়া মারিয়া, তাহাদিগের অলঙ্কার সকল আত্মসাৎ করিয়াছে, তাহা কি আপনারা পূর্ব্বে শ্রবণ করেন নাই?” আমি কহিলাম, “শুনিয়াছি, আলিপুরকোর্টে তাহার মোকদ্দমা হয়, এবং বিচারে তাহার দণ্ড হয় নাই; কিন্তু এই কি সেই ত্রৈলোক্য?” কর্ম্মচারী কহিলেন, “ইনিই সেই ত্রৈলোক্য।” এই কথা শুনিয়া আমরা আর স্থির থাকিতে পারিলাম না; তখন উহাকে লইয়া আমরা সকলেই অনুসন্ধানে নিযুক্ত হইলাম, এবং সেই পর্য্যন্ত উহাকে লইয়া সবিশেষরূপে অনুসন্ধান চলিতেছে; কিন্তু এ পর্য্যন্ত ইহার নিকট হইতে কোন কথা প্রকাশ করাইতে পারা যায় নাই।

 আমি। উহার নিকট হইতে কোন কথা বাহির করা, বা অপহৃত অলঙ্কারগুলির পুনরুদ্ধার করা নিতান্ত সহজ কার্য্য নহে। ও যে কি ভয়ানক স্ত্রীলোক, তাহা আপনারা জানেন না; কিন্তু আমি উহাকে উত্তমরূপে চিনি।

 কর্ম্মচারী। তাহা হইলে আপনারও কি বিশ্বাস যে, উপস্থিত মোকদ্দমায় এ-ই আসামী? রাজকুমারী ত্রৈলোক্যের দ্বারা হত হইয়াছে?

 আমি। তাহাতে আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই।

 কর্ম্মচারী। তাহা হইলে উহাকে লইয়া এখন আর কি করা যাইতে পারে?

 আমি। উহাকে লইয়া উত্তমরূপে অনুসন্ধান করা আবশ্যক।

 কর্ম্মচারী। তাহা হইয়াছে, এবং এখনও হইতেছে; কিন্তু ফলে ত কিছুই হইতেছে না।

 আমি। ও কোন্ গৃহে থাকে?

 কর্ম্মচারী। উপরের একখানি গৃহে।

 আমি। সেই ঘরখানি উত্তমরূপে অনুসন্ধান করা হইয়াছে কি?

 কর্ম্মচারী। যেরূপে অনুসন্ধান করিতে হয়, তাহার কিছুমাত্র বাকী নাই। উহার গৃহে অনুসন্ধান করিবার উপযোগী দ্রব্য-সামগ্রী অধিক নাই, কেবল একটী আলমারী আছে মাত্র। তাহা পাঁচ সাতজন কর্ম্মচারী পাঁচ সাতবার উত্তমরূপে দেখিয়াছেন; কিন্তু তাহার ভিতর অলঙ্কার-পত্র প্রভৃতি কোনরূপ অপহৃত দ্রব্য পাওয়া যায় নাই।

 আমি। আমি ত্রৈলোকের বিষয় উত্তমরূপে অবগত আছি। তাহার নিকট হইতে কোন কথা সহজে বাহির করিয়া লইবার ক্ষমতা যে কোন পুলিস-কর্ম্মচারীর আছে, তাহা আমার বোধ হয় না। কোনরূপ কৌশল করিয়া উহার নিকট হইতে যদি কথা বাহির করিতে পারেন, তাহা হইলেই হইবে; নতুবা উহার কিছুই করিয়া উঠিতে পারিবেন না।

 কর্ম্মচারী। উহাকে লইয়া আজ তিনদিবস অনুসন্ধান করিতেছি; সুতরাং উহার চরিত্রের বিষয় বেশ বুঝিতে পারিতেছি। আপনি যাহা বলিলেন, তাহা প্রকৃত; কিন্তু এমন কি কৌশল আছে যে, তাহা অবলম্বন করিলে, আমরা সফল কাম হইব?

 আমি। আমি যতদিন পর্য্যন্ত ত্রৈলোক্যকে দেখিতেছি, ততদিবস হইতে আমি জানিতে পারিয়াছি, ও একাকী কোন কার্য্যে হস্তক্ষেপ করে না। যখন যে কার্য্য করে তাহার নিমিত্ত একজন না একজন সহকারী সংগ্রহ করিয়া লয়। ইতিপুর্ব্বে একটী হাবা স্ত্রীলোক উহার সহকারিণী ছিল, তাহার সাহায্যে, ও অনেক হত্যা করিয়াছে। কিন্তু কিছুদিবস হইল সেই হাবা স্ত্রীলোকটী মরিয়া গিয়াছে; সুতরাং অপর কোন একটি স্ত্রীলোককে যে সে তাহার সহকারিণী করিয়া লইয়াছে, তাহাতে আর বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। উহার সহিত সবিশেষ প্রণয় আছে, এমন কোন স্ত্রীলোক এই বাড়ীতে, বা নিকটবর্ত্তী অপর কোন বাড়ীতে কি না?

 কর্ম্মচারী। আছে, ওই বাড়িতে প্রিয় নাম্নী একটী স্ত্রীলোেক আছে; সে তাহার বিশেষরূপে অনুগতা।

 আমি। তাহা হইলে অনুসন্ধান করিয়া দেখুন, এই হত্যা যদি ত্রৈলোক্যের দ্বারা হইয়া থাকে, তাহা হইলে প্রিয় যে তাহার সহকারী তাহার আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই।

 কর্ম্মচারী। প্রিয়-সম্বন্ধে আমরা এ পর্য্যন্ত কোনরূপ অনুসন্ধান করি নাই, বা প্রিয় যে এই হত্যাকাণ্ডে সংলিপ্ত হইতে পারে, তাহাও আমরা ইতিপূর্ব্বে মনে করি নাই।

 আমি। ত্রৈলোক্যের একটী পুত্র আছে, তাহার নাম হরি। ত্রৈলোক্য তাহাকে আপন প্রাণ অপেক্ষাও ভালবাসে। সেই হরি এখন কোথায়, তাহার কিছু অবগত হইতে পারিয়াছেন কি?

 কর্ম্মচারী। সেই হরিও এই বাড়ীতে থাকে। কিন্তু এখন তাহাকে দেখিতে পাইতেছি না। বোধ হয়, সে তাহার মায়ের সহিত গমন করিয়া থাকিবে।

 আমি। ত্রৈলোক্য এখন কোথায়? সে কি এখন এখানে উপস্থিত নাই?

 কর্ম্মচারী। না একজন কর্ম্মচারী তাহাকে লইয়া বাহির হইয়া গিয়াছে। যদি বলেন তাহা হইলে তাহাদিগকে ডাকিয়া আনিবার নিমিত্ত লোক পাঠাই।

 আমি। না, ত্রৈলোক্যকে এখন ডাকিবার প্রয়ােজন নাই। প্রিয় এখন কোথায়?

 কর্ম্মচারী। সে বাড়ীতেই আছে। তাহাকে একবার দেখিতে চাহেন কি?

 আমি। না, এখন নহে। কিন্তু একটী কার্য্যের প্রয়োজন হইয়াছে।

 কর্ম্মচারী। কি?

 আমি। প্রিয়কেও কোন কার্য্যের ভানে, বা কোনরূপ অনুসন্ধানের নিমিত্ত জনৈক কর্ম্মচারীর সঙ্গে এখন বাড়ী হইতে বাহির করিয়া দিন।

 কর্ম্মচারী। কেন?

 কর্ম্মচারীর কথার উত্তরে আমি আমার অভিসন্ধির কথা তাঁহাকে কহিলাম, এবং আমি যাহা যাহা করিতে ইচ্ছা করিতেছি, তাহা তাঁহাকে কহিলাম। তিনিও আমার প্রস্তাবে সম্মত হইলেন। সন্ধ্যার কিছু পূর্ব্বে আমি পুনরায় আসিব বলিয়া, আমিও সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলাম। আমি সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিবার পর, কর্ম্মচারী মহাশয় আমার প্রস্তাবানুযায়ী কার্য্য করিলেন। এক জন কর্ম্মচারীর সহিত একটী অনুসন্ধানের ভান করিয়া প্রিয়কে বাড়ী হইতে বাহির করিয়া দিলেন। ত্রৈলােক্য এবং হরি পূর্ব্ব হইতেই বাহিরে ছিল। তারপর বাড়ীর অপরাপর ভাড়াটিয়াগণকে একত্র করিয়া, আমি তাহাদিগকে যাহা যাহা বলিতে বলিয়াছিলাম, তিনি তাহাদিগকে সেইরূপ বলিলেন। ভাড়াটিয়াগণও আমাদিগের অভিসন্ধি বুঝিতে পারিয়া, আমাদের প্রস্তাবে সম্মত হইল।

  1. এই প্রবন্ধ-লিখিত ঘটনাটী ত্রৈলোক্যতারিণীর জীবনের শেষ লীলা। যদি কেহ এই পাপীয়সীর জীবন-চরিত্র সবিশেষরূপে জানিতে ইচ্ছা করেন, তাহা হইলে তিনি শ্রীযুক্ত বাবু প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় প্রণীত ডিটেক টিভ পুলিস ৫ম কাণ্ড “পাহাড়ে মেয়ে” নামক পুস্তক পাঠ করিবেন। উহাতে ত্রৈলোক্য বাল্যকাল হইতে আরম্ভ করিয়া যে সকল মহাপাপ ও ভয়ানক ভয়ানক কার্য্য সকল সম্পন্ন করিয়াছিল, তাহার সবিশেষ বৃত্তান্ত বর্ণিত আছে।
    দাঃ দঃ প্রঃ।