শ্মশানের ফুল/উচ্ছ্বাস

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


উচ্ছ্বাস।

কার কাছে যাই, কাহারে দেখাই
চিরিয়া আমার পাষাণ বুক।
কে আছে জগতে আমার আপন
কে দেখিবে সেথা বিষাদ সুখ।—?
দুঃখে বিষাদিত সুখে আমোদিত
কে আর আমার এখন বল?
হাসিলে হাসিবে কাঁদিলে কাঁদিয়া
মিশাবে নয়নে নয়ন জল।
এত টুকু স্নেহ এত টুকু সুখ
অসহ্য সংসার বিষাদ-ভার;
দু’জনে সমান ভাগাভাগি করি
বহিয়া শুধেছি প্রাণের ধার।
এখন এ প্রাণ এক অসহায়
নাহি সুখলেশ নাহিকো সখা।
সমস্ত দুর্ব্বহ বিষাদের ভার
বহিছে জীবন বহিবে একা।
তাতেই কি প্রাণ এত কষ্টকর
অসহ্য বিপদ যাতনা-মাখা,

অথবা অতীত স্মৃতির আলেখ্যে
বর্ত্তমান ছবি উজল আঁকা।
নাহি কেহ মম এখন এমন
চাপি নিজ দুঃখ হৃদয়তলে
হাসিয়া আদরে, সান্ত্বনাবচনে
কাঁদিলে মুছায় নয়নজলে।
তবে কার তরে করিব সঞ্চয়
বিদ্যা যশঃ মান প্রতিভা ধন
মুখের লালসা সে যে মিছে আশা
তবে কার তরে ধরি জীবন?
যে বলিবে ভালো বলিয়া এ প্রাণ
উদ্যম উৎসাহে নাচিত মন
যার আঁখিতলে ঝরিত লাবণ্য
প্রমোদে লীলায় মাতিত মন।
যে বাসিলে ভালো জগত মধুর
সার্থক জীবন, সার্থক ধরা
চাহিনা নন্দন পারিজাত শচী
পেলে সে আনন আমোদে ভরা।
এজীবনে কিংবা জন্ম জন্মান্তরে
বল তারে বিধি! পাইব কিনা?
ছিন্ন তারে আর পরিচিত সুরে
বাজিবে কি পুনঃ হৃদয়ে বীণ?

কে জানে বিধির এ কেমন রীত,
দেখিতে না দেয় সুখ কেমন,
না পুরিতে আশা না মিটিতে সাধ
কেড়ে নিয়ে যায় প্রাণের ধন।
আজন্ম সৌভাগ্য বঞ্চিত হইয়া
কাঁদে কত লোক রজনী দিবা,
না ফুটিতে ফুল সুবাস হারায়
এ জগতে হায় হয় না কিবা?
যে বাসিলে ভালো জগত মধুর
সার্থক জীবন সার্থক ধরা,
চাহিনা নন্দন পারিজাত শচী
পেলে সে আনন আমোদে ভরা।
বহু তপস্যায় ফিরে এ জীবনে
বল তারে বিধি পাইব কি না?
ছিন্ন তারে আর পরিচিত সুরে
বাজিবে কি পুনঃ হৃদয়ে বীণা?
বল্‌না অনল! বল কি করিয়া
ছাই মাটি হলো সে দেহখানি,
দেখিস্‌নি কিরে সে মুখের হাসি,
শুনিস্‌নি কি সে মধুর বাণী?
হনা কেন তুই যতই নিঠুর;
থাক তোর বুকে বাঁধা পাষাণ;

শুনিলে সে বাণী, দেখিলে সে হাসি
কি করিছে তোর ভাবিত প্রাণ
এত ভালবাসা যতন আদর
বল্‌না আমায় ভুলিলি কিসে?
এরূপে কি যত সাধের জিনিস
ছাই মাটি হয় মাটিতে মিশে?
যে অমিয় হৃদি পূর্ণ পরিমলে
পবিত্র প্রণয় সঙ্গীতে ভরা,
যে নয়ন দুটী পুলক আধার
সুচারু শোভায় জুড়ানো ধরা,
যে মুখের হাসি, কুমুমের শোভা
হৃদয়-প্লাবন অনন্তমুখ;
যে শরীরে ক্ষুদ্র লাগিলে আঁচড়
কাঁদিত জীবন, ফাটিত বুক।
সেই মুখ চোখ অধর হৃদয়
ছাই মাটি হলো আঁখির পরে
কে জানিত আগে প্রাণে এত সয়
ফাটে না যে প্রাণ যাতনা ভরে?
এই হাত কত আদরে যতনে
রাখিত তাহারে সোহাগে বুকে;
তুষিত তাহার অপূর্ণবাসনা
সেই হাত দিল আগুন মুখে।

এই চোখে কত দেখেছি লাবণ্য
বালিকা যুবতী তনয়-মায়,
সেই চোখে আজি দেখিনু সম্মুখে
সে মুরতি ভস্ম ভাসিয়া যায়।
ফাটেনি হিয়ার চর্ম্ম আবরণ
বিদীর্ণ শতধা অন্তর প্রাণ;
বিচূর্ণ অন্তর আঘাতি হিয়ায়,
তুলিছে কখনো অস্ফুট গান।
কেন গাঁথি হার কবিতা-কুসুমে
ফেলিনা ছড়ায়ে শ্মশানভূমে?
বাসে বিদূরিত হতে পারে কারো
লিপ্ত যার হৃদি চিতার ধূমে।
মধুর সম্ভাষি হাসি কেহ বলে
কায কি পরিয়া প্রণয়মালা?
জানি আমি নহে প্রণয় অমিশ্র
একাধারে সুখ বিষাদ ঢালা।
কখনো কখনো ভাবি মনে মনে,
প্রণয়ের চেয়ে অভাব ভালো।
আঁধারে হাসিব আঁধারে কঁদিব
আঁধার(ই) হইবে আমার আলো।
দুদণ্ডে প্রণয় ভাসিয়া কি যায়
যেন ছেলেখেলা বালির বাধ?

বজর-বন্ধনে মুকুতার জালে
ধরিতে চাহে সে অনন্ত চাঁদ
নাই প্রণয়িণী নাই ক্ষতি নাই
ছিল এককালে এইত সুখ
সারাটি জীবন কাটাবো একাকী
বাঁধিয়া কল্পনা পাষাণে বুক।

—:o:—