শ্মশানের ফুল/সময়শিক্ষক

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


সময়শিক্ষক।

সময়! তোমার কোলে হ’য়েছি পালন,
তোমার আজ্ঞায় বহি এ পাপ জীবন,
আসিলাম এ জগতে প্রথম যখন
নিজে আছি এই জ্ঞান ছিলনা তখন।
পরে শিখিলাম ‘আমি' তব মহিমায়
‘তোমার’ ‘আমার’ ভিন্ন ‘তোমায়’ ‘আমায়’।
‘আমি’ দৃশ্যমান ধরা হইতে পৃথক্‌
বোধোদয় স্মৃতিলাভ হইল কতক
ধীরে ধীরে স্মৃতি আসি করিল সঞ্চয়
জ্ঞান চিন্তা নানাভাবে পূরিল হৃদয়।
কে জানিত সে সময় প্রেম কি জিনিষ
তুমি ঢেলে দিলে হৃদে প্রণয়ের বিষ।
তুমি শিখাইলে পোড়া পরের ভাবন।
অর্থলাভ অনুরাগ দুর্জ্জয় কামনা।

সময়! সাদরে আজি শিখাও আমায়
জীবনের প্রণয়িনী নাহি এ ধরায়।
কেন হে বিরত আজি শিখাতে আমায়
শৈশবের সহচরী নাহিক হেথায়।
আঁখির আড়ালে যেতে দিতাম না যারে,
জনমের শোধ বিদায় দিয়াছি তারে।
বহুতর দুঃখ কষ্ট জ্বলিছে পরাণে
জুড়ায় সে সব সান্ত্বনা শীতল গানে।
কিন্তু এই চিরকাল দহিবে জীবন,
এজনমে দেখা তার পাবনা কখন।
পারিলে না শিখাইতে আজিও আমায়
যৌবনের সোহাগিনী নাহি এ ধরায়।
বল কতদিন এরূপে কাটিবে আরো
সন্দেহ শিখাতে তুমি পারে কি না পারো।
কখনো ঘুমের ঘোরে, আপন শয্যায়
ফেলিয়াছি হাত পরশিতে তার গায়;
কোথা তার দেহ তারে পরশিবে হাত
সেতো নাহি হেথা মনে হইল হঠাৎ।
হায়! হায়! কি কপাল সে নিরাশা চিরকাল
যতদিন দেহে প্রাণ থাকিবে আমার
ততদিন ঝরিবে সে অশ্রু নিরাশার।

একদিন নিশাযোগে নিদ্রয় স্বপনে
দেখেছি সে মুখখানি জীবন্ত মরণে,
নহে মৃত্যু-কলঙ্কিত রোগ-কৃশ কায়া
শান্তি-মাখা সুহাসিনী লাবণ্যের ছায়া;
ভাসিল যে রূপবিভা আমার নয়ন
সন্দেহ দেখেছি কিনা জীবন্তে তেমন।
মুক্তকেশ নীলম্বুজ প্রসারিয়া দুই ভুজ
আসিছে আমারে দিতে প্রেম-উপহার
দুলিতে আমার গলে বিদ্যুতের হার।
কহিছে মনের কথা সুখদুঃখ তার
প্রণয়ের সম্ভাষণ জীবনের সার।
তুলি বাহু ধরি ধরি আমিও যেমন
স্বর্ণপ্রতিমারে, মোর টুটিল স্বপন।
কেন ভেঙ্গে গেল আহা সে সুখ স্বপন?
কেন রহিল না ধরি সমস্ত জীবন?
হেন বাস্তবতা যদি স্বপনেতে রহে
কেন মিছা জাগরণে এজীবন বহে?
স্বপন সে জাগরণ চেতনা আমার
স্বপনের কোলে আশা পাবো দেখা তার।
দিবালোকে জাগরণে অসাধ্য যে দেখা
আঁধারে স্বপন দেখা সে দেখায় একা
স্বপনরে! তাই তোরে এত ভালবাসি
মরণের প্রাণ তুই রোদনের হাসি।

চাহিনা জনম আমি, চাহিনা জীবন
বারেক দেখায় যদি সে বিধুবদন,
কি নিদ্রায় জাগরণে কি মোহস্বপনে
দেখিব কাঁদিব আমি আপনার মনে;
চাহিনা ছুঁইতে তারে দেখিব কেবল
নয়নের দেখা, নয়নে ঝরিবে জল,
এও পাইব না? এ দুঃখ রাখিব কোথা?
হিয়ায় গোপনে? হিয়াটি বজরাহতা।
ফাটিয়া পাষাণ হৃদি বহে নেত্রধার
তাই শোভে গলে মম অশ্রু-কণ্ঠহার।
থেকে থেকে দিনরাত কেঁদে উঠে মন
এজগতে তোর সনে হবে না মিলন।
নিশায় সন্ধ্যায় কিম্বা প্রভাত সমীরে
দিবসের কার্য্য সেরে ঘরে আসি ফিরে,
দেখি সে শয়নাগার, বিনষ্ট সৌন্দর্য্য যার,
ছিল তার ছিল যবে ছিল প্রণয়িনী
সে শোভা সৌন্দর্য্য এবে অতীত কাহিনী!
পারিলে না শিখাইতে আজিও আমায়
জীবনের সোহাগিনী নাহি এধরায়।
সময় মানিল হার বিগলিত অশ্রুধার
বহিল, ভাসিল গও, পরাণ, হৃদয়;
অনেক যাতনা দিল নিষ্ঠুর প্রণয়।

এসো দেখি একবার শিখাও আমার
ভুলিতে সে মুখখানি অতুল ধরায়,
যেমন বালুকা মাঝে বিফলে না যায়
প্রত্যেক উদ্যমে পদ গ্রাসে বালুকায়।
তেমতি সে মুখখানি ভুলা নাহি যায়
স্মৃতি যেন খালি সেই মুখ পানে চায়।
কিরূপে কিরূপে তারে ভুলিব বল না,
সেই মুখখানি ভূভারতে অতুলনা।
কেমনে ভুলিব বল সে বিষের জ্বালা
সে যে গাঁথিয়াছে এক কণ্টকের মালা,
ফুল তার বিজড়িত কাঁটায় কাঁটায়,
ছুঁলে একগাছি কাঁটা সব বিঁধে গায়,
টানিলে একটী কাঁটা সব নড়ে চড়ে
হেরিলে একটী ফুল সব মনে পড়ে।
হেন কণ্টকিত মালা দুলে যার গলে
অবিরল ভাসে সেই বিষাদের জলে।
থাকি যব অন্যমনে, নিরজনে বন্ধুসনে,
কিংবা কর্ম্মস্থলে নিজ কার্য্যেতে মগন,
না ভুলেও থাকি যেন ভোলার মতন,
উঠিলে সে কথা প্রাণে, হৃদয়ে বজরহানে,
হাস্যপরিহাস লীলা সব ঘুছে যায়
জীবন—বিষাদমাখা আঁধারে লুকায়।

যে ধারে নয়ন চায় চিহ্ন দেখি তার
কি সাগর কি অম্বর সমস্ত সংসার।
পাতার নীলিমা মিশে অম্বরের নীলে
লহরী লহর সনে, অনল অনিলে,
গাছে যে কুসুম ফুটে পবনহিল্লোলে
চুম্বে নিজ প্রণয়িনী সোহাগেতে দোলে,
জন্মে যদি লতা এক তরুবর পাশে
তারেও সময়ে বাঁধে লতা ভূজপাশে।
দূরে যে সরসী হাসে তাতেও চন্দ্রমা ভাসে,
তাতেও কিরণ নাচে তরঙ্গের গায়,
নীল জলে নীল মেঘ ভাসিয়া বেড়ায়।
বিদারিয়া ভূমিতল উঠে তরুশাখাদল,
ফুটে ফুল ছুটে বাস অলি লোভে ধায়,
বিহগবিহগী তায় সঙ্গীত শুনায়।
যুগল মিলন যুগ্ম প্রকৃতির গান
প্রকৃতির পতাকায় আঁকা যুগ্ম প্রাণ।
যেজন ভুলিতে চায় দুঃখ কবিতায়
মরণে সে চাহে প্রাণ সান্ত্বনা চিতায়।
যে অনল অবিরল জ্বলিছে হিয়ায়
সঙ্গীত কবিতা ভাষা পরশেনা তায়;
কখনো সকালে সাঁঝে আঁচ তার গায়ে বাজে

তাতেই ঠাওর পায় কি তেজ আগুণ
কে জানে যে হবে না সে কালে দশগুণ?
জুড়াবে এ জ্বালা আমার চিতার সনে
ভুলিব না তারে প্রাণ আছে যতক্ষণে;
কিরূপে সময়! তুমি ভুলাবে আমায়
এত নহে ভুলিবার; একি ভুলা যায়?
শিখাইতে ভুলাইতে অক্ষম সময়,
কল্পনে! করহ আসি সমস্যা নির্ণয়।

-:০:-