বিষয়বস্তুতে চলুন

শ্যামলী (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৯৪৫)/দুর্বোধ

উইকিসংকলন থেকে

দুর্বোধ

অধ্যাপকমশায় বোঝাতে গেলেন নাটকটার অর্থ,
সেটা হয়ে উঠল বোধের অতীত।
আমার সেই নাটকের কথা বলি।—

বইটার নাম ‘পত্রলেখা’,
নায়ক তার কুশলসেন।
নবনীর কাছে বিদায় নিয়ে সে গেল বিলেতে।
চার বছর পরে ফিরে এসে হবে বিয়ে।
নবনী কাঁদল উপুড় হয়ে বিছানায়;
তার মনে হল, এ যেন চার বছরের মৃত্যুদণ্ড।

নবনীকে কুশলের প্রয়োজন ছিল না ভালোবাসার পথে,
প্রয়োজন ছিল সুগম করতে বিলাতযাত্রার পথ।
সে কথা জানত নবনী;
সে পণ করেছিল, হৃদয় জয় করবে প্রাণপণ সাধনায়।
কুশল মাঝে মাঝে
রুচিতে বুদ্ধিতে উঁচট খেয়ে ওকে হঠাৎ বলেছে রূঢ় কথা,
ও সয়েছে চুপ করে;
মেনে নিয়েছে নিজেকে অযোগ্য ব’লে;
ওর নালিশ নিজেরই উপরে।

ভেবেছিল, দীনা ব’লেই একদিন হবে ওর জয়,
ঘাস যেমন দিনে দিনে নেয় ঘিরে কঠোর পাহাড়কে।
এ যেন ছিল ওর ভালোবাসার শিল্পরচনা,
নির্দয় পাথরটাকে ভেঙে ভেঙে রূপ আবাহন করা
ব্যথিত বক্ষের নিরন্তর আঘাতে।
আজ নবনীর সেই দিনরাতের আরাধনার ধন গেল দূরে
ওর দুঃখের থালাটি ছিল অশ্রুভেজা অর্ঘ্যে ভরা,
আজ থেকে দুঃখ রইবে কিন্তু দুঃখের নৈবেদ্য রইবে না।
এখন ওদের সম্বন্ধের পথ রইল
শুধু এপারে ওপারে চিঠি-লেখার সাঁকো বেয়ে।
কিন্তু নবনী তো সাজিয়ে লিখতে জানে না মনের কথা,
ও কেবল যত্নের স্বাদ লাগাতে জানে সেবাতে,
অর্‌কিডের চমক দিয়ে যেতে ফুলদানির ’পরে
কুশলের চোখের আড়ালে,
গোপনে বিছিয়ে আসতে
নিজের হাতে-কাজ-করা আসন
যেখানে কুশল পা রাখে।


কুশল ফিরল দেশে,
বিয়ের দিন করল স্থির।
আঙটি এনেছে বিলেত থেকে,
গেল সেটা পরাতে;
গিয়ে দেখে ঠিকানা না রেখেই নবনী নিরুদ্দেশ।

তার ডায়ারিতে আছে লেখা,
“যাকে ভালোবেসেছি সে ছিল অন্য মানুষ;
চিঠিতে যার প্রকাশ, এ তো সে নয়।”
এদিকে কুশলের বিশ্বাস
তার চিঠিগুলি গদ্যে মেঘদূত,
বিরহীদের চিরসম্পদ।
আজ সে হারিয়েছে প্রিয়াকে
কিন্তু মন গেল না, চিঠিগুলি হারাতে—
ওর মমতাজ পালালো, রইল তাজমহল।
নাম লুকিয়ে ছাপালো চিঠি ‘উদ্‌ভ্রান্তপ্রেমিক’ আখ্যা দিয়ে।


নবনীর চরিত্র নিয়ে
বিশ্লেষণ ব্যাখ্যা হয়েছে বিস্তর।
কেউ বলেছে, বাঙালির মেয়েকে
লেখক এগিয়ে নিয়ে চলেছে
ইবসেনের মুক্তিবাণীর দিকে;
কেউ বলেছে, রসাতলে।


অনেকে এসেছে আমার কাছে জিজ্ঞাসা নিয়ে;
আমি বলেছি, “আমি কী জানি।”
বলেছি, “শাস্ত্রে বলে, দেবা ন জানন্তি।”
পাঠকবন্ধু বলেছে,—

“নারীর প্রসঙ্গে না-হয় চুপ করলেম
হতবুদ্ধি দেবতারই মতো,
কিন্তু পুরুষ?
তারও কি অজ্ঞাতবাস চিররহস্যে।
নানুষটা হঠাৎ পোষ মানলে কোন্ মন্ত্রে।”


আমি বলেছি,—
“মেয়েই হোক আর পুরুষই হোক, স্পষ্ট নয় কোনো পক্ষই;
যেটুকু সুখ দেয় বা দুঃখ দেয় স্পষ্ট কেবল সেইটুকুই।
প্রশ্ন কোরো না,
পড়ে দেখো কী বলছে কুশল।”—


কুশল বলে, “নবনী চার বছর ছিল দৃষ্টির বাইরে,
যেন নেমে গেল সৃষ্টির বাইরেতেই;
ওর মাধুর্যটুকুই রইল মনে,
আর সব-কিছু হল গৌণ।
সহজ হয়েছে ওকে সুন্দর ছাঁদে চিঠি লিখতে।
অভাব হয়েছে, করেছি দাবি;
ওর ভালোবাসার উপর অবাধ ভরসা
মনকে করেছে রসসিক্ত, করেছে গর্বিত।
প্রত্যেক চিঠিতে আপন ভাষায় ভুলিয়েছি আপনারই মন।
লেখার উত্তাপে ঢালাই-করা অলংকার
ওর স্মৃতির মূর্তিটিকে সাজিয়ে তুলেছে দেবীর মতো।

ও হয়েছে নূতন রচনা।
এই জন্যেই খৃস্টান শাস্ত্রে বলে,—
সৃষ্টির আদিতে ছিল বাণী।”


পাঠকবন্ধু আবার জিগেস করেছে,
“ও কি সত্যি বললে,
না, এটা নাটকের নায়কগিরি।”
আমি বলেছি, “আমি কী জানি।”

শাস্তিনিকেতন

৫ জুলাই, ১৯৩৬