শ্যামাপ্রসাদের কয়েকটি রচনা/একখানি চিঠি
একখানি চিঠি
(১৯৫৩ সালের ৬ই জুন শ্রীনগর সেণ্ট্রাল জেল হইতে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা শ্রীযুক্ত রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রীকে লিখিত)
বৌদি,
সেদিন তোমাকে চিঠি লিখে রাখার পর ডাকের চিঠি এল। এক সঙ্গে তোমার আগের লেখা বাঙলায় তিনখানা চিঠি পেয়ে খুব সুখী হলাম। এই সব চিঠি আগে আমাকে দেওয়া হয়নি হয়ত যিনি বাঙলায় লেখা চিঠি পড়ে ‘পাস’ করবেন—তিনি ছিলেন না। আমার সব চিঠি ঠিক পেয়েছ আশা করি। আমি মোটের উপর ভালই ছিলাম —কিন্তু আবার দুদিন ডান-পায়ে ব্যথা বেড়েছে। কেন এমন হয় জানি না। ডাক্তার কাল এসে ওষুধ দিয়ে গেছেন। সারাদিন যেন না দাঁড়াই—এই বলেন। এমনি ত বেড়াবার উপায় নেই—বাগানের মধ্যে ছাড়া—তাতে কোন রকম ক্ষিধে হয় না—তার উপর যদি একেবারে শুয়ে বা বসে থাকতে হয়, তাহলে আরো মুশকিল। ক’দিন আবার সন্ধ্যার পর একটু জ্বর হচ্ছে—বেশী নয়, ৯৯°। চোখমুখ জালা করে। ওষুধ খাচ্ছি। খাওয়া ত খুব সাবধানে খাই। সিদ্ধ খাওয়া—তরকারি। মাছ পাওয়া যায় না। দুদিন এনেছিল। ভোরে ঘুম ভেঙে যায়। তবে সাড়ে পাঁচটার আগে উঠি না। মুখ ধুয়ে একটু বাগানে ঘুরি—ঘরে বসি—সে সময়টা খুব সুন্দর থাকে—চণ্ডীপাঠ করি। ৭টায় এক কাপ চা। তারপর বসে পড়া ও কিছু লেখা। সাড়ে আটটার আগে বাগানে গিয়ে বসি—রোদ আসে সেখানে তখন। মুখ পুড়ে কালি হয়েছে—তাই মুখটা গাছের ছায়ায় রাখি ও তার জন্য চেয়ার সরাতে সরাতে চলতে হয়। তখন খাবার আনে। দুখানা ক্রীম ক্রেকার বিস্কুট —হাসু [১] পাঠিয়েছে—একটু মাখন দিয়ে আধসিদ্ধ ডিম একটা ও এক কাপ দুধ কফি। তারপর সেখানেই বসে থাকি—বা একটু ঘুরি। বই আর বই—এই চলে—বারোটা অবধি। তখন স্নান করি—ও প্রায়ই বাগানে গাছতলায় খাই। একঘণ্টা বিশ্রাম হয় চিঠি লিখি বা পড়ি। সাড়ে তিনটায় সুপারিনটেণ্ডেণ্ট আসেন-খবরের কাগজ বা ডাক নিয়ে। খালি চা—লেবু দিয়ে—ও ফল (যদি থাকে) খাই। সাড়ে সাতটা থেকে আটটা সন্ধ্যা পর্যন্ত আলো থাকে। তারপর ঘরে এসে বসি। বই, কবিতা, গীতা—এই সব চলে তখন—পৌনে নটা পর্যন্ত। তখন বারান্দায় খাওয়া হয়—দুবেলার খাওয়া একই। একখানা রুটি খাই। সিদ্ধ তরকারি—কোনদিন মাংস দই দুবেলাই খাই। মিষ্টি দু-একদিন এনেছিল। রাত ১০টা পর্যন্ত জেগে থাকি। তারপর আলো নিবিয়ে শুয়ে পড়ি। ঘুম প্রথম রাত ভাল হয় না। তারপর একঘুমে ভোর হয়। হাতে অগাধ সময় ভাবতে আরম্ভ করলে তার সীমা পাওয়া যায় না। শুধু যা দিন, বছর পার হয়ে গেছে তার কথা ভাবি না-তার ভিতরেও অনেক জিনিস আছে যা দুঃখ ও সুখ মিশান, কাজেই তাদের ভুলব কেমন করে—তাই ভাবি সেই সব কথা। তার সঙ্গে বর্তমান সময়ের কথা ভাবি—মানুষ ও ঘটনা—ছবির মত মনে আসে—কে কোথায় আছে, কি করছে, কোন ঘটনা কেমন ঘটছে নানা ভাবে এই সব মনে আসে। আবার যখন ভাবি অনিশ্চিত দূর ভবিষ্যতের কথা—তখন আর একরকর্ম ভাবে সব ভাবনা জেগে ওঠে। অন্ধকারের মধ্যে আলো দেখি—পরাজয়ের মধ্যে বিজয় দেখি সবার ভাল দেখি। বেশী দেখেছি এই ক’দিনে কত ক্ষুদ্র, কত তুচ্ছ অথচ কত গর্বিত ও মদমত্ত আমরা—অথচ তা জানি না। বুঝি না যে যন্ত্রচালিত হয়ে চলেছে এ জগৎ ও যাঁর কৃপায় এই সৃষ্টির জন্ম, বুদ্ধি ও নাশ হচ্ছে তাঁর কথা ভাবি না। জীবনের প্রায় সময় কেটে এল কি করলাম এর ভিতর জানি না। কত ছোট কত বাজে কথায় ও কাজে সময় কেটে গেছে ভুল ও অন্যায় কত করেছি তাই ভাবি। বই পড়তে খুব ভাল লাগে, তুমি জান। বই পড়ছি নানা বিষয়ের উপর—নতুন ও পুরাতন—আর শিখছি কত নতুন করে। লিখতে খুব ইচ্ছা করে কিন্তু ঠিক সম্ভব হচ্ছে না। বাবার জীবনী একটা লেখা হল না-এই ত্রিশ বৎসরে—এর জন্য দুঃখ হয়। এখনও চেষ্টা করলে তাঁর সময়ের অনেক কথা লেখা ইত্যাদি খাজে পাওয়া যায়। ক’দিন ধরে আমারই ইচ্ছা করছে এই লিখতে। নিজের জীবনেও কম অভিজ্ঞতা হয়নি—তাও লিখতে মন চায়। ভাবি তোমাদের কথা, ছেলেমেয়েদের কথা, নাতিনাতনীর কথা আর যে হাজার হাজার ছেলেরা আজ বন্ধ জেলে রয়েছে তাদের কথা। কতদিন এভাবে থাকব জানি না। ভবিষ্যতে কাজ কি করব তাও জানি না। তবে মনে কোন দুঃখ বা দুশ্চিন্তা নেই। বরং আগে যে অফুরন্ত বিশ্বাস নিজের উপর রাখতাম, তা এ ক’দিনে রাখতে পেরেছি—সেই অজানা পরমশক্তির উপর -যাঁর নির্দেশ বিনা আমরা চলতে বা বাঁচতে পারি না। এতে আনন্দ হয়, মনে জোর হয়। সবাই ভাল থাক ও সুখী হও। আজ এই থাক। চিঠি দিও। তোমার মেজঠাকুরপো।
- ↑ কনিষ্ঠা কন্যা।