শ্যামাপ্রসাদের কয়েকটি রচনা/কটকের অভিভাষণ
কটকের অভিভাষণ
[ নিখিল ভারত বঙ্গ-সাহিত্য সম্মেলন-১৩৫৯ ]
অদ্যকার সভায় যে সম্মানের আসন গ্রহণ করিবার জন্য আমাকে আপনারা আহ্বান করিয়াছেন, তাহা যে আমি নিঃসঙ্কোচে গ্রহণ করিয়াছি এমন কথা বলিতে পারি না। আমি নিজে সাহিত্যিক নহি, তবে জাতীয় জীবনকে পরিপুষ্ট করিতে, বলশালী করিতে সহিত্যের প্রয়োজনীয়তা যে কি তাহা আমি বুঝি। সেই কারণে সুধীজনের অনুরাগপূর্ণ আহ্বানকে উপেক্ষা করিতে পারি নাই। এই সম্মেলনের কাজ সুসম্পন্ন করিবার জন্য আপনাদের পূর্ণ সহযোগিতা কামনা করি।
উড়িষ্যার রজধানী কটক নগরীতে এই সম্মেলন আহ্বান করিয়া আপনারা সুবিবেচনার কার্য করিয়াছেন। এই প্রদেশের সহিত বাঙলার ঘনিষ্ঠ সংযোগ আছে। ধর্ম’, কর্ম, আচার-ব্যবহার, ভাষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এই দুই প্রদেশের মধ্যে অনেকখানি ঐক্য রহিয়াছে। মহাপ্রভুর প্রেমের বন্যায় বাংলার সহিত উড়িষ্যাও প্লাবিত হইয়াছিল। সেই ভাবধারা আজও সুস্পষ্টভাবে জনগণের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করিয়া আছে। শ্রীগৌরাঙ্গের পদরেণুস্পর্শে এখানকার ধূলিকণা পর্যন্ত পবিত্র হইয়াছে। ভেদাভেদ ও জাতিবিচারশূন্য মহাতীর্থ শ্রীক্ষেত্র ভারতের মিলনক্ষেত্র হইয়াছে। জীবাত্মার ও পরমাত্মার মহামিলন-মন্ত্রে এ দেশ পুণ্যভূমি হইয়াছে। উড়িষ্যার নিজস্ব একটি ঐতিহ্য আছে। সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও তাহার দান কম নহে। কোনারক ও ভুবনেশ্বরের মন্দিরের স্থাপত্যশিল্প, পুরীর জগন্নাথদেবের মন্দিরের শিল্পচাতুর্য প্রভৃতির তুলনা নাই। শিল্প ও স্থাপত্য-জগতে ইহারা বিস্ময়ের বন্ধু। এই কটক নগরী বাঙলার তথা সারা ভারতের শ্রেষ্ঠ বীর সন্তান সুভাষচন্দ্রের জন্মস্থান। পাঠান ও মোগল শক্তির আক্রমণ হইতে রাজনৈতিক স্বাধীনতা উড়িষ্যা বহুদিন রক্ষা করিয়াছিল। শৌর্য বীর্যের ক্ষেত্রে ইহা কম শ্লাঘার কথা নহে। এই সকল কারণে আজ আমরা এইস্থানে সম্মিলিত হইয়া গৌরব অনুভব করিতেছি।
বঙ্গসাহিত্য সম্মেলনের যখন জন্ম হয়, সে সময়টিকে আমাদের মধ্যে অনেকেই বাঙলার একটা দুঃসময় বলিয়া উল্লেখ করিয়া থাকেন। কিন্তু, আমার মনে হয় আজিকার তুলনায় তাহাকে সুসময় বলিলে বিশেষ অন্যায় হইবে না। বঙ্গদেশ তখন বিদেশী শাসকদের কূটনৈতিক চালে দ্বিখণ্ডিত হইলেও সে সময়ে বঙ্গসাহিত্য সম্মেলনের প্রথম অধিবেশন উপলক্ষে বরিশালের নিমন্ত্রণপত্রে ঘোষণা করা হইয়াছিল যে, “সভার উদ্দেশ্য সাহিত্যিকদের মধ্যে প্রীতি-স্থাপন ও মাতৃভাষার উন্নতিসাধন"। আজ এইরূপ আমন্ত্রণপত্র ঢাকা বা বরিশাল হইতে আসিবার শীঘ্র কোন সম্ভাবনা নাই। ইংরাজ শাসক জোর করিয়া যে বাগুলাকে সে দিন ভাঙিয়া খণ্ডিত করিয়াছিলেন, বাঙালী আপন শক্তিতেই সেই খণ্ডিত বাঙলাকে আবার জোড়া লাগাইয়াছিল। আজ আবার যখন নিয়তির পরিহাসে সেই জোড়া বাঙলা ভাঙিয়াছে, তাহা কি পুনরায় বাঙালী হিন্দু ও মুসলমানের সমবেত শক্তিতে জোড়া লাগিবে? এ প্রশ্ন অনেকেরই মনে জাগিতেছে।
বঙ্কিমচন্দ্র একস্থানে বলিয়াছেন “যে রাজ্য পরজাতি পীড়ন শূন্য, তাহা স্বাধীন” ভারতের স্বাধীনতার জন্য বাঙলায় যে বৃহৎ অংশকে বলি দিতে হইয়াছে, সেই অংশের বাঙালী অধিবাসীরা পর-জাতির পীড়নের তাঁর জ্বালা আজ মর্মে মর্মে অনুভব করিতেছে। আর স্বাধীন ভারতের অন্তর্ভুক্ত ক্ষুদ্রাংশ পশ্চিম বাঙলার মধ্যে যাহারা আছে, তাহারাও আজ নিরাশার নিঃশ্বাস ফেলিয়া ভাবিতেছে “যে রাজ্য স্বজাতি-সহানুভূতি-শূন্য, তাহা কি স্বাধীন? যে রাজ্য তোষণনীতির নিমিত্ত স্বজাতির দুঃখ-দুর্দশার প্রতি উদাসীন, সে রাজ্যকে কি স্বাধীন বলিব? বাঙালীর জীবন আজ মহা বিপন্ন। এমন ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে বাঙালী জাতিকে আর কখনও পড়িতে হয় নাই। এই বিপর্যয়ের হাত হইতে বাঙালীকে রক্ষা করিতে হইবে। বাঙালীর অস্তিত্ব যাহাতে বিলুপ্ত হইয়া না যায়, তাহার জন্য কর্তব্য-পথ নির্ণয় করিতে হইবে। সেই কারণেই আমি বলিতে চাই-কেবলমাত্র মাতৃভাষার উন্নতিসাধন ও সাহিত্যিকদের মধ্যে প্রীতি-স্থাপন এই সাহিত্য সম্মেলনের উদ্দেশ্য হইতে পারে না। এই সাহিত্য-সভা কেবলমাত্র বঙ্গসাহিতাসেবীদের সভা নহে। নিজেরা লেখক না হইয়াও যাঁহারা সাহিত্যের ভিতর দিয়া জাতীয়-সমস্যা সমাধানের জন্য, জনগণের আশা, আকাঙ্ক্ষা, ভাবকে রূপায়িত দেখিতে চান, তাঁহারাও এখানে উপস্থিত আছেন। সকলে মিলিয়া বাঙালী জাতির জটিলতাপূর্ণ সমস্যাকে আজ স্বাধীন ভারতের সকল প্রদেশের অধিবাসীদের অন্তরে জাগ্রত করিয়া তুলিতে হইবে। অধিকন্তু বিভিন্ন প্রদেশ হইতে অন্য ভাষাভাষী সাহিত্যানুরাগী অনেকেই এখানে সমবেত হইয়াছেন। তাঁহারাও উপলব্ধি করিবেন ভিন্ন ভিন্ন ভারতীয় ভাষা ও সাহিত্যের মধ্যে ঐক্য স্থাপনের একান্ত প্রয়োজনীয়তা আছে। সেই ঐক্য-নীতিকে ভিত্তি করিয়া যাহাতে সর্ব’ প্রদেশের ভাষার ও ভাবের সংগঠনকার্য নির্বাহ হয়, তাহার উপায় নির্ধারণ করা এই সম্মে-লনের এক প্রধান কর্তব্য হইবে। এই প্রকার বিভিন্নমুখী চিন্তাধারার সংযোগে ভারতের বিরাট সাংস্কৃতিক ঐক্য রক্ষিত ও পরিবর্ধিত হইবে।
ভাষা হইতেছে ভাব ও সংস্কৃতির বাহন। এই বাহন যে দেশের যত শক্তিশালী, সভ্যতা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সেই দেশ তত বীর্য’ ও ঐশ্বর্যশালী। দেশের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে শক্তিশালী ভাষাই একসূত্রে গাঁথিয়া রাখিতে পারে। ভাষার মুকুরে আমরা অতীতকে প্রতিবিম্বিত দেখি, বর্তমানকে কর্মমুখর করিয়া তুলি এবং ভবিষ্যতের ইঙ্গিত পাইয়া উন্নত মস্তকে লক্ষাপথে অগ্রসর হই। সেই লক্ষ্যপথে ভাষা ও সাহিত্যই যুগে যুগে, দেশে দেশে সভ্যতার পরি-রাজকদের পরিচালিত করে। ইহা শাশ্বত অভ্রান্ত সত্য। ভারতবর্ষে হিমালয় হইতে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত বহুতর ভাষা প্রচলিত। প্রধান প্রধান সকল ভাষার মধ্যেই অল্পবিস্তর কিছু না কিছু ভাব-সুষমা সঞ্চিত আছে। আধুনিক ভারতীয় ভাষাগুলির মধ্যে আমাদের মাতৃভাষা বাঙলা, বিশিষ্ট সাহিত্যগৌরব ও মর্যাদা লাভ করিয়াছে। ইহা সকলেই স্বীকার করেন। দেড়শত বৎসর ধরিয়া সাহিত্য-সাধকদের তপস্যায় ইহা সম্ভব হইয়াছে। তাঁহাদেরই ঐকান্তিক নিষ্ঠা, সাধনা ও তপস্যার প্রভাবে সারা ভারতে এক অভিনব জাগরণ হইয়াছিল। বাঙলায় যে নূতন ভাববন্যা ও কর্মধারার প্রবাহ ছুটিয়াছিল, তাহা বাঙালী নিজের ঘরেই সীমাবদ্ধ করিয়া রাখে নাই-নূতন সভ্যতা ও কৃষ্টির বাণী সে ভারতের প্রদেশ হইতে প্রদেশান্তরে বহন করিয়া লইয়া গিয়াছে। সাহিত্যের মাধ্যমে বাঙালী সমগ্র দেশের সুপ্ত মনকে জাগাইয়া তুলিয়া স্বাধীনতার উগ্র আকাঙ্ক্ষায় দেশবাসীকে অস্থির ও উদ্দীপ্ত করিয়া তুলিয়াছিল। স্বদেশ ও স্বজাতির কল্যাণ ও উন্নতিবিধানের জন্য বাঙলার সাহিত্যরথীরাই প্রথম পথের ইঙ্গিত দেন। কবি ঈশ্বর গুপ্ত হইতে আরম্ভ করিয়া আধুনিক কাল পর্যন্ত বহু খ্যাত ও অখ্যাত কবি ও সাহিত্যিক যাত্রাগান, কথকতা, কাবা, গল্প, উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধাদির ভিতর দিয়া সমগ্র বাঙালী-চিত্তকে উদ্বুদ্ধ করিয়াছেন। রঙ্গলাল, মধুসূদন, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র, গিরিশচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল, শরৎচন্দ্র প্রমুখ বাণীর বরপুত্ররা কাব্য, উপন্যাস, নাটক ও কাহিনীর মধ্য দিয়া স্বদেশের চিত্তভূমিকে তাঁর দেশাত্মবোধের অমৃতধারায় যেমন অভিসিঞ্চিত করিয়াছেন, তেমনি অনাদিকে অক্ষয়, ভূদেব, রাজনারায়ণ, রামেন্দ্রসুন্দর, জগদীশচন্দ্র, প্রফুল্লচন্দ্র প্রমুখ চিন্তাশীল মনীষিগণ দেশের চিন্তাক্ষেত্রকে প্রসারিত করিয়া দিয়াছেন। কাব্য, উপন্যাস ও নাটক ইত্যাদি রসসমন্বিত সাহিত্য সৃষ্টির পার্শ্বে জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস সব কিছুই বঙ্গভারতীর অঙ্গন ও প্রাঙ্গণকে সুশোভিত করিয়া তুলিয়াছে। সংস্কৃত ভাষা বা সংস্কৃতানুগ বাঙলা ভাষা পণ্ডিতমণ্ডলীর একচেটিয়া সম্পত্তিরূপে গণ্য হইত। কিন্তু সব্যসাচী বঙ্কিম সেই যে তাহাকে একটি সার্বজনীন রূপ দিয়া সাধারণের সম্মুখে তুলিয়া ধরিলেন, তদবধি বাঙলাভাষা অজস্র প্রাণধারায় প্রবাহিত হইয়া সমাজের সকল স্তরের মানুষের সম্পত্তিরূপে গড়িয়া উঠিয়াছে। ইহার পর সেই ভাষাকে জনসাধারণের নিকটে লইয়া আসিলেন প্রমথ চৌধুরী। রবীন্দ্রনাথের লেখনীর পুণ্যস্পর্শে এই রচনাপদ্ধতি আরো সরলতা ও বিকাশলাভ করিয়া সাহিতো স্থায়ীরূপ পাইয়াছে। নব নব বিষয়বস্তুর প্রাচুর্যে কবি ও সাহিত্যরথীদের দাক্ষিণ্যে, বৈজ্ঞানিক, ইতিহাসবিদ, প্রত্নতাত্ত্বিক ও দার্শনিকদের অকৃপণ দানের সম্ভার লইয়া বাঙলা-সাহিত্য যে কত শীঘ্র গতিবেগ লাভ করিয়াছে, তাহার কাহিনী ও ইতিহাস আপনাদের অবিদিত নাই। ইংরাজী সাহিত্যের প্রভাব বাঙলার এই গতিশীলতার ক্ষেত্রে অস্বীকার করা যায় না।
ভারতের অন্যান্য প্রদেশ হইতে বাঙলার একটা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে। বাঙলার সভ্যতা, কৃষ্টি, আচার-ব্যবহার, রীতিনীতি ও ধর্ম, সকল ক্ষেত্রেই একটা স্বাতন্ত্র্যবোধ ও নিজস্বতা চিরকালই আছে। সাধারণতঃ সংকীর্ণতা বা স্বার্থপরতাকে বাঙলাদেশ আমল দেয় নাই। এক সমন্বয় পদ্ধতিতে সে আপনার এই বৈশিষ্ট্যকে গড়িয়া তুলিয়াছে। ভাব, কৃষ্টি ও চিন্তার ক্ষেত্রেও এই সমন্বয় পদ্ধতি বাঙলার সাহিত্যকে সেই কারণে সর্বপ্রকার সংকীর্ণ পরিধির ঊর্ধ্বে, উঠিতে সহায়তা করিয়াছে। ইংরাজ যখন বণিকের মানদণ্ড হাতে লইয়া আসিয়া এদেশে রাজদণ্ড অধিকার করিয়া বসিল, তখন সর্বপ্রথম বাংলার সহিত ইংরাজী সভ্যতা, ভাবধারা ও চিন্তাজগতের সংঘাত ঘটিয়া গেল। চারিদিকে এক নব জাগরণের সাড়া পড়িয়া গেল। ইংরাজী সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন ও বিজ্ঞান প্রভৃতি বাঙালীর মননশীলতাকে যেমন উদ্বুদ্ধ করিয়া তুলিল তেমনি দেশাত্মবোধের অভিমন্ত্রও তাহার বুকে এক আলোড়নের সৃষ্টি করিল। কিন্তু, বাঙালী আপন ঘরেই এই নূতন আলোকের দ্যুতিকে ধরিয়া রাখে নাই। আসমুদ্র হিমাচল ভারতের প্রদেশে প্রদেশে তাহার দিব্যচ্ছটা পরিব্যাপ্ত করিয়া দিবার সুযোগ সে গ্রহণ করিয়াছিল। সংকীর্ণ মনোভাব বাঙালীর কোনদিন ছিল না, পরকে সে আপন করিয়াছে, দূরকে নিকট করিয়াছে এবং বাহিরকে ঘর করিয়াছে। তাহার সাহিত্যে বৃহত্তর ভারতের রূপ সে ফুটাইয়া তুলিয়াছে। বৈষ্ণব গীতি-কবিতার’ যুগ হইতে আরম্ভ করিয়া বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত যাহা কিছু, ভাষা অলংকার ও ছন্দে বাঙালী গাঁথিয়া তুলিয়াছে, তাহার সব কিছুই সে বৃহত্তর ভারতের ক্ষেত্রে ছড়াইয়া দিতে চাহিয়াছে। প্রাদেশিকতার বিষবাষ্প আজ কোথাও কোথাও ধুমায়িত হইতে দেখা যাইতেছে, বিরাটের পরিপ্রেক্ষিতে, সর্বভারতীয় মনুষ্যত্ববোধের উদারতার দ্বারা এই আত্মধ্বংসী বিষের বিনাশ সাধন আশু প্রয়োজন হইয়া পড়িয়াছে। এই কার্যের ভার সর্বভারতীয় কবি ও সাহিত্যিকদেরই গ্রহণ করিতে হইবে।
ভারতের বিভিন্ন ভাষাসমূহের প্রত্যেকটির মধ্যেই ভারতীয় সংস্কৃতির বহুধা রূপ ছড়াইয়া আছে। ভারতের কবি, সাধক ও ভাবুকদের অন্তরের অপূর্ব ভাবরাজি সাহিত্যের মধ্য দিয়াই নানাভাবে অজস্র ধারায় আত্মপ্রকাশ করিয়াছে। কবীর, দাদু, নানক, সুরদাস, মীরা ও তুলসীদাস প্রভৃতির অমর রচনাবলীর মধ্যে কতই না মহামূল্য সম্পদ পরিব্যাপ্ত হইয়া আছে। বিভিন্ন ভাষাভাষী হইলেও, আচার-ব্যবহার, রীতিনীতির মধ্যে পার্থক্য থাকিলেও আধ্যাত্মিক ও চিন্তার রাজ্যে যে এই বিরাট দেশের মনীষীরা এক অখণ্ড একাত্মতার সুর জাগাইয়া তুলিয়াছেন, তাহাতে সন্দেহ করিবার অবকাশ নাই।
ভারতের প্রধান লক্ষ্য বিভিন্নতার মধ্যে ঐক্য স্থাপনা। সাহিত্যের মাধ্যমে এই লক্ষ্যের ফল্ম প্রবাহ চিরদিন ভারতের প্রদেশে প্রদেশে চলিয়া আসিয়াছে। ইহা স্মরণ রাখিয়া ভারতের প্রত্যেক প্রদেশের ভাষাই যাহাতে সমৃদ্ধ হইয়া উঠে, সেইদিকে লক্ষ্য রাখিয়া আজ আন্তঃপ্রাদেশিক ভাববিনিময়ের ব্যবস্থার আবশ্যকতা দেখা দিয়াছে। প্রাদেশিক সাহিত্য-গুলি পঠন-পাঠনের দ্বারা এই কাজ সুষ্ঠুভাবে হইতে পারে। তাই আজ প্রয়োজন ভারতীয় সাহিত্যের মধ্যে যেগুলি সমধিক ঐশ্বর্যশালী তাহারা যাহাতে আপন আপন ক্ষেত্রে উন্নত হইয়া উঠে, গৌরবময় হইয়া উঠে, নব নব ভাবধারায় পরিপুষ্ট হইয়া উঠে, সেদিকে আমাদের দৃষ্টি দেওয়া। এক ভাষাকে দাবাইয়া রাখিয়া অন্য ভাষার প্রসার ও প্রভাব বিস্তৃতির চেষ্টা উচিত নহে, সমর্থনযোগ্যও নয়। ভাষা লইয়া যদি পরস্পরের মধ্যে কলহ ব্যাধয়া উঠে, তাহার অপেক্ষা মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আর কিছুই থাকিতে পারে না।
স্বাধীনদেশের একটা রাষ্ট্রভাষা থাকা প্রয়োজন। ইংরাজ এদেশ হইতে চলিয়া যাইবার পর রাষ্ট্রভাষারূপে হিন্দী ভাষাকে মর্যাদা দেওয়া হইয়াছে। একথা অস্বীকার করিয়া লাভ নাই যে, ভারতের অধিকাংশ প্রদেশেই হিন্দীভাষা প্রচলিত এবং জনসাধারণের মধ্যেও হিন্দীভাষা অপেক্ষাকৃত সহজবোধ্য। অনেকের ধারণা, হিন্দী ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করিবার কথা কংগ্রেসমহল হইতেই প্রথম উঠিয়াছিল। কিন্তু, সে ধারণা ঠিক নহে। অনেকেই হয়ত জানেন না, বাঙ্গালীর সাহিত্যগুর, বঙ্কিম-চন্দ্রই বহুকাল পূর্বে, বোধহয় সর্বপ্রথম, বলিয়াছিলেন- “হিন্দীভাষার সাহায্যে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে যাঁহারা ঐক্যবন্ধন স্থাপন করিতে পারিবেন, তাঁহারাই প্রকৃত ভারতবন্ধ নামে অভিহিত হইবার যোগ্য।” বঙ্কিমের এই উক্তির সদৃশ অভিমত বঙ্কিমের অন্যতম সাহিত্য-সহচর অক্ষয়চন্দ্রের “সাধারণী” পত্রিকাতেও প্রকাশিত হইয়াছিল। রক্ষণশীল নৈষ্ঠিক বাঙালী ব্রাহ্মণ-মনীষী ভূদেবচন্দ্রও হিন্দীভাষার পক্ষে অনুরূপ অভিমত ব্যক্ত করিয়াছিলেন। এই প্রাদেশিকতা-বর্জিত শুভবিচারবুদ্ধি বাঙালীর তখনও যেমন ছিল, এখনও তেমনি আছে। তবে, অন্য কোন ভাষার ঊর্ধ্বে মাতৃভাষাকে স্থান দেওয়ার নাম যদি প্রাদেশিকতা হয়, তাহা হইলে অকুণ্ঠচিত্তে বলিব, সে প্রাদেশিকতা আমাদের মধ্যে আছে এবং তাহা না থাকিলে আমরা সর্বহারা হইয়া যাইব। মনে রাখিতে হইবে, যে বঙ্কিমচন্দ্র হিন্দীভাষার সাহায্যে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে ঐক্য-বন্ধনের কথা বলিয়াছিলেন, তিনিই তাঁহার ‘বঙ্গদর্শনের’ সূচনায় লিখিয়াছিলেন- “যতদিন না সুশিক্ষিত, জ্ঞানবন্ত বাঙালীরা বাঙলাভাষায় আপন উক্তি সকল বিন্যস্ত করিবেন, ততদিন বাঙালীর উন্নতির কোন সম্ভাবনা নাই।” ভারতের সকল প্রদেশের ভাষাভাষীই নিজেদের ভাষা সম্বন্ধে একথা বলিতে পারেন। সর্ব জাতির পক্ষে সকল সময়েই ইহা সত্য।
কোন প্রদেশ যদি অপর প্রদেশের লোক যাহারা সেখানে কার্যব্যাপ-দেশে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে বসবাস করিতেছে, তাহাদের মাতৃভাষা শিখিতে না দিয়া নানা উপায়ে অপর ভাষায় লেখাপড়া শিখাইবার ব্যবস্থা বা চেষ্টা করে, তবে তাহাকে নিন্দা না করিয়া উপায় নাই। যদি কোন প্রদেশ এরূপ ব্যবস্থা প্রবর্তিত করিতে অগ্রসর হয়, তবে তাহাকে কুব্যবস্থাই বলিব। কারণ, তাহার ফল কিছুতেই কল্যাণজনক হইতে পারে না। তাহাতে অন্য ভাষাভাষীর জাতিগত পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য বিনষ্ট হইবার সম্ভাবনা থাকিবেই। কোন জাতির পরিচয় ও বৈশিষ্ট্যকে নষ্ট করিয়া তাহাকে উন্নত করিতে পারা যায় বলিয়া আমি বিশ্বাস করি না। রবীন্দ্রনাথও একদিন বলিয়াছিলেন- “ভালই বল, আর মন্দই বল, প্রকৃতি ভিন্ন জাতিকে এমন ভিন্ন ভিন্ন রকম করিয়া গড়িয়াছেন যে, এক জাতকে ভিন্ন জাতের কাঠামোর মধ্যে পুরিতে গেলে সমস্তই খাপছাড়া হইয়া যায়।” এই মারাত্মক মনোবৃত্তির নামই প্রাদেশিকতা। এই মনো-বৃত্তি মিলনের পথকে অবরুদ্ধ করিয়া জাতি-পরস্পরের মধ্যে কেবল বিরোধ ও বিদ্বেষের ভাবকেই জাগাইয়া তোলে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনও বলিয়াছিলেন-"জীবন-ধর্মে’র নিয়মে যেখানে বৈচিত্র্য খুব বেশী, সেখানে ঐক্যও তেমনি গভীর ও সুদৃঢ় হইতে পারে-এই ঐক্যই তো জাতীয়তা।” কিন্তু দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় এই যে, এই সত্যবাণীর মর্ম স্বাধীনতা লাভের পর আমরা অনেকেই আজ বুঝিতে চাহিতেছি না।
হিন্দীভাষা যদি সহজ সরল হইয়া উঠিয়া সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে ভাবপ্রকাশের সাধারণ বাহনরূপে গড়িয়া উঠে, তাহার জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ হইতে যে নির্দেশ আসিয়াছে তাহা মানিয়া লইতে কাহারো আপত্তি থাকা সমীচীন নহে। এই ভাষাকে প্রকৃত ভারতীয় রূপ দিতে হইলে ও সকলের কাছে বোধগম্য করিতে হইলে অন্যান্য প্রাদেশিক ভাষায় ব্যবহৃত উপযুক্ত শব্দাবলী স্বাভাবিক ভাবে হিন্দীর অন্তর্গত করিতে হইবে। ইহার ব্যাকরণও সরল করা আবশ্যক হইয়া পড়িয়াছে। তবে বিশ্বের সহিত যোগসূত্র রক্ষার জন্য এবং আমাদের শিক্ষা প্রসারের জন্য ইংরাজী ভাষা আমাদের ত্যাগ করা সমীচীন হইবে না। ইংরাজ এদেশ হইতে চলিয়া গিয়াছে বলিয়া তাহার ভাষাকেও এই দেশ ছাড়া করিতে হইবে, এমন কথা কোন শিক্ষিত ব্যক্তি বলিবেন না। বাঙলার যে সময়কার সাহিত্য-সম্পদ দেখাইয়া আমরা গর্ব ও গৌরব প্রকাশ করিয়া থাকি, তাহার সৃষ্টি পাশ্চাত্তা সাহিত্যের সহিত বাঙালীর পরিচয় না ঘটিলে সম্ভবপর হইত না।
এই প্রসঙ্গে আর একটি দায়িত্ব আমাদের গ্রহণ করিতে হইবে। প্রত্যেক প্রদেশে নিজের প্রাদেশিক ভাষা শিক্ষা ছাড়াও ভারতের একাধিক প্রাদেশিক ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা হওয়া উচিত। অন্ততঃ যে সকল প্রাদেশিক ভাষার ঐতিহ্য আছে, বিস্তৃতি আছে, ঐশ্বর্য এবং রস-মাধুর্য’ আছে, সেই ভাষাগুলি লইয়া কাজ আরম্ভ করা যাইতে পারে। এই আদর্শ অনুযায়ী কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতের বিভিন্ন ভাষাগুলির পঠন-পাঠনের রীতি প্রায় ৩৫ বৎসর পূর্বে প্রবর্তিত হইয়াছিল। আমার মনে হয় প্রত্যেক প্রাদেশিক বিশ্ববিদ্যালয় যদি এই আদর্শ গ্রহণ করেন, তাহা হইলে শুভ ফলই পাওয়া যাইবে।
প্রত্যেক প্রদেশেই কিছু না কিছু অন্যান্য প্রদেশের লোক স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে বসবাস করেন। তাঁহারা যদি মাতৃভাষার চর্চা অক্ষুণ্ণ রাখেন এবং সভা-সমিতি ও সম্মেলনের মাধ্যমে সাহিত্য, শিল্প, সংগীত, প্রভৃতি পরিবেশনের ব্যবস্থা করেন, তাহা হইলে তাঁহাদের স্ব স্ব মাতৃভাষার প্রসার ও প্রচার বৃদ্ধি পাইবে। আন্তঃপ্রাদেশিক ভাষা ও ভাব বিনিময় এই পথে অতি সহজেই হইতে পারে। ভারতের যে ভাষাগুলি সমধিক ঐশ্বর্যশালী, সেগুলির উৎকৃষ্ট গ্রন্থগুলিকে অন্য প্রদেশের ভাষায় অনুবাদ করিয়া প্রত্যেক প্রদেশের সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করা যাইতে পারে। ইহার ফলে আমাদের চিত্তক্ষেত্র রসসমন্বিত হইয়া উঠিবে এবং এক প্রদেশের অধিবাসীর সহিত অন্য প্রদেশের অধিবাসীর অন্তরের ক্ষেত্রে, ভাবের ক্ষেত্রে এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একাত্মতার ভাব জাগরিত হইবে। অনুবাদ সাহিত্যের যে একটা বিশেষ মূল্য আছে, তাহা বাঙলার গৌড়ীয়যুগ এবং ইংরাজ শাসনের প্রথমযুগের সাহিত্য পর্যালোচনা করিলে বুঝিতে বিলম্ব হয় না। সুতরাং আজ স্বাধীন-ভারতে প্রত্যেক প্রাদেশিক ভাষাকে সমুন্নত, গতিশীল ও ঐশ্বর্যমণ্ডিত করিয়া তুলিবার জন্য সাহিত্যে মৌলিক রচনার পাশাপাশি অনুবাদ কার্যেরও যথেষ্ট আবশ্যকতা আছে বলিয়াই মনে হয়। ইহার মধ্য দিয়া একটা মানসিক উদারতার ক্ষেত্র গড়িয়া উঠিবে-দৃষ্টিভঙ্গির সাম্য ও ঐক্যভাব সৃষ্টি হইবে। কেবল ভারতীয় সাহিত্যগুলির অনুবাদ করিয়াই তৃপ্ত থাকিলে চলিবে না, বিশ্বসাহিত্যে যেখানে মূল্যবান যাহা কিছু পাওয়া যাইবে, তাহা প্রয়োজন অনুযায়ী অনুবাদ সাহিত্যের মাধ্যমে আত্মগত করিয়া লইতে হইবে।
বাঙলা দেশের কবি, সাহিত্যিক ও চিন্তাশীল ব্যক্তিরা যদি বাঙলা ভাষার উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধির চেষ্টায় আত্মনিয়োগ করেন, জীবনের সকল ক্ষেত্রকে জড়াইয়া লইয়া যদি সাহিত্যের মাধ্যমে নূতন ভাবধারা সৃষ্টি করিতে পারেন, বর্তমানের পরিধিকে অতিক্রম করিয়া ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিতে পারেন, তাহা হইলে কোন আঘাতই তাহাকে খর্ব করিতে পারিবে না। আপন প্রাণ-প্রাচুর্যে, অন্তরের শক্তির বেগে সে ভাষা সকল বাঘাবিঘ্য অতিক্রম করিয়া স্বমহিমায় সুদৃঢ় গৌরবোজ্জল ভিত্তিতে আত্মপ্রতিষ্ঠ হইয়া উঠিবে।
বাঙলাদেশ আজ খণ্ডিত। কিন্তু, সাহিত্যের ক্ষেত্রে উভয় বাঙলার ভাষা আজও এক। একই ভাষায় হিন্দু-মুসলমান মনের ভাব প্রকাশ করে, চিন্তাধারাকে প্রবাহিত করে। রাষ্ট্রিক ক্ষেত্রে আজ আমরা পরস্পর হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়াছি বটে, কিন্তু ভাষারক্ষেত্রে আজও আমাদের মধ্যে অখণ্ড যোগ রহিয়াছে। বাঙলা ভাষা হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মাবলম্বীর দ্বারা পরিপুষ্ট হইয়াছে। বহু মুসলমান কবি ও সাহিত্যিক বাঙলা ভাষাকে শ্রীসম্পন্ন করিয়াছেন। রাজনৈতিক ভুল-ভ্রান্তিতে পূর্ব বাঙলা পশ্চিম বাঙলা হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া গেলেও সেখানকার মুসলমান অধিবাসীরা তাহাদের প্রাণের ভাষা এই বাঙলা ভাষাকে আঁকড়াইয়া ধরিয়া রাখিয়াছে। তাহার অমর্যাদা হইতে দিতে তাহারা নারাজ। ভাষা লইয়া আন্দোলন সেখানে ইতিমধ্যেই দেখা দিয়াছে। তাহাদের মাতৃভাষা বাঙলা ভাষাকে ফেলিয়া উর্দ, শিক্ষা করিবার জন্য তাহারা প্রস্তুত নয়। জোর করিয়া উর্দুভাষাকে প্রচলিত করিবার অপচেষ্টা সেখানে আজ পদে পদে বাধা পাইতেছে। বাঙলার সহিত উর্দশব্দ মিশাইয়া এক কৃত্রিম ভাষা-সৃষ্টির চেষ্টাও চলিয়াছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই সকল চেষ্টা ব্যর্থই হইবে। কে জানে এই ভাষার বেদীমূলেই হয়ত কৃত্রিম ভেদরেখার অস্তিত্ব বিলোপ পাইবে, আবার নূতন করিয়া এক সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে, সাহিত্যের উদার ছত্রতলে উভয় বঙ্গের মিলন সাধিত হইবে। শান্ত, সংযতচিত্তে আমাদের সেই শুভদিনের প্রতীক্ষা করিতে হইবে। আজ এই সভাক্ষেত্র হইতে সমস্ত বাঙালীজাতিকে যে যেখানেই থাকুন না কেন -আমাদের আন্তরিক শুভ কামনা জ্ঞাপন করি।
অনেকই বলিতেছেন বাঙালী আজ পিছাইয়া পড়িতেছে। বাঙালীর সেই তেজ ও সজীবতা নাই, সেই উদ্যম ও উৎসাহ নাই। এই অভিযোগ যে অসত্য, এমন কথা অবশ্য বলিতে পারি না। ইংরাজ শাসনের আমলে শুধু বাঙালী নহে ভারতের অন্যান্য প্রদেশবাসীও পাশ্চাত্ত্য শিক্ষা ও সভ্যতার সংস্পর্শে আসিয়াছিল। কিন্তু, সে সংস্পর্শে’র ফলে বাঙলায় যেমন মনীষা ও প্রতিভার দীপ্তি দেখা দিয়াছিল, তেমনটি আর কোথাও দেখা যায় না। ধর্ম’নীতি, সমাজনীতি, রাজনীতি ও সাহিত্যনীতি প্রভৃতি সকল ক্ষেত্রেই বাঙালী ছিল তখন অগ্রণী-সকল বিষয়েই ভারতবাসীর পথপ্রদর্শক। রামমোহন, রাম-গোপাল, বিদ্যাসাগর, মধুসূদন, রাজেন্দ্রলাল, বঙ্কিমচন্দ্র, গিরিশচন্দ্র, কেশবচন্দ্র, সুরেন্দ্রনাথ প্রভৃতি দিকপাল এই কথারই জাজ্জলামান প্রমাণ। ইহার পর বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, আশুতোষ, অরবিন্দ, প্রফুল্লচন্দ্র, জগদীশচন্দ্র, চিত্তরঞ্জন ও সুভাষচন্দ্র প্রভৃতি দিগ্বিজয়ী শক্তিধর বাঙালী-শিরোমণিগণ আসিয়া দেশের ধর্মে, শিক্ষায়, দর্শনে ও বিজ্ঞানে, সাহিত্যে ও রাজনীতিতে যে অপূর্ব শক্তি সঞ্চার করিয়াছিলেন, তাহাও অনতিকালপূর্বে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশবাসীর অন্তরে প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল। কিন্তু, আজ আর সে দিন নাই। বাঙালীর সেই মনীষাপারম্পর্যের দ্যোতক বা স্মারক বলিতে এখন আর কিছু দেখিতে পাওয়া যায় না। যাঁহাদের নাম এই মাত্র করিলাম, অনেক সময়ে মনে হয়, তাঁহারা বুঝি আমাদের কেহ নহেন। বাস্তবিকই বাঙালী আজ সর্ব কার্যে’ প্রভাহীন, হৃতসর্বস্ব হইতে বসিয়াছে। কিন্তু, কেন এমন হইল, তাহাই ত’ ভাবিবার বিষয়।
কেহ কেহ হয়ত বলিবেন, যে জাতি দুঃখ-দারিদ্র্যের দাবানলে আজ জলিয়া পুড়িয়া মরিতেছে, সে জাতির আত্মোন্নতি সম্বন্ধে চিন্তা করিবার অবসর কোথায়? এই উক্তির মধ্যে যে কিছু সত্য নাই, তাহা আমি বলি না। দুঃখের ভীষণ আঘাতে সকল মানুষই প্রথম বিভ্রান্ত ও বিচলিত হইয়া পড়ে। বাঙালীরও আজ সেই দশা ঘটিয়াছে। কিন্তু, সেইজন্য হতাশ হইলে চলিবে না। বাঙালী কোন দিন তাহা হয় নাই। যে বাঙালী একদিন মাৎস্যন্যায় দূর করিয়া মনের মতন রাজা নির্বাচন করিয়াছিল, সেই বাঙ্গালীর বংশধরেরা যে আজ কাঁদিয়া কাঁদিয়া জীবন ক্ষয় করিবে, এ কথা আমি বিশ্বাস করি না। দুঃখই শক্তির উৎস। দুঃখই মানুষের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। সুতরাং দুঃখ হইতে, বেদনা হইতে, আজ যদি আমরা শক্তি-সঞ্চয় না করিতে পারি, শিক্ষালাভ না করিতে পারি, তবে তাহার অপেক্ষা বড় ক্ষোভের কথা আর কিছু থাকিবে না।
এখন প্রশ্ন এই যে, সে আশার বাণী, সে শিক্ষার কথা আজ আমাদিগকে কে শুনাইবে? ইহার উত্তরে বলিব, মানব-মঙ্গলের শ্রেষ্ঠ মন্দির যে সাহিত্য তাহারই পুরোহিতবর্গ সে কার্যে ব্রতী হইবেন। সাহিত্যই জাতি-জাগরণের প্রধান সহায়। আমাদের দেশের স্বদেশীযুগের সৃষ্ট সাহিতা এই কথারই সাক্ষ্য বহন করিতেছে। বঙ্কিমচন্দ্র বলিয়া-ছিলেন-"যে লেখনী আর্তে’র উপকারার্থে’ না লিখিল, সে লেখনী নিষ্ফল হউক।” সাহিত্যগুরুর এই বাণী আধুনিক সাহিত্যসেবীরা যেন বিস্মৃত না হন, ইহাই আমার প্রার্থনা। লোকরঞ্জন করা তাঁহাদের প্রধান উদ্দেশ্য হইতে পারে না, মানুষকে দেবত্বে অনুমাণিত করাই তাঁহাদের ব্রত।
এককালে যে বাঙলাভাষা গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও পদ্মার ত্রিস্রোতা শক্তিবেগ সম্পন্না হইয়া সারা বাঙলার চিত্তভূমিকে উর্বরা ঐশ্বর্যশালিনী ও গরবিনী করিয়া তুলিয়াছিল রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের তিরোধানে সেই বাঙলা-সাহিত্যের দিক্চক্রবাল কিছুটা তমসাচ্ছন্ন হইলেও, তাহা স্থায়ী হইতে পারে না। যে ভাষায় প্রাণশক্তির প্রাচুর্য আছে, শক্তি, সাধ্য ও সাধনা আছে তাহার মৃত্যু হইতে পারে না। নূতন সাহিত্যসাধকদের আবির্ভাবে, তাঁহাদের তপস্যার প্রভাবে এই ক্ষণস্থায়ী অন্ধকার অচিরেই বিদূরিত হইবে। অমিত প্রাণশক্তির সঞ্জীবনী ধারায় মরাগাঙে আবার বান ডাকিবে। সেইসব শক্তিধর সাহিত্যসাধকদের আবির্ভাব প্রতীক্ষায় আমাদের আজ তাই নূতন করিয়া সাধনার পঞ্চপ্রদীপ জালাইয়া বঙ্গ-সরস্বতীর মন্দিরকে আলোকিত করিয়া তুলিতে হইবে। নূতন নূতন ভাব-প্রবাহে, বিষয়বস্তুর বিচিত্র সম্ভারে, চিন্তার রাজ্যে নব নব উদ্ভাবনী-শক্তিতে দেবীর অর্থা-উপচার সাজাইয়া তুলিতে হইবে। নূতন নূতন সংকীর্ণতা, স্বার্থপরতাকে বর্জন করিয়া উদার দৃষ্টিভঙ্গি লইয়া আনন্দ-মূলক সাহিত্যের পাশাপাশি জ্ঞানমূলক ও শিক্ষামূলক সাহিত্যের পরিধি বিস্তারে যত্নবান হইতে হইবে। তাহা না হইলে আমাদের নবলব্ধ স্বাধীনতার ভিত্তি সুদৃঢ় হইয়া উঠিবে না।
বাঙলার বাহিরে যেখানেই বঙ্গসন্তান থাকুক না কেন, তাঁহাদের একটি বড় দায়িত্ব প্রতিপালন করিতে হইবে। এক দিকে সেই প্রদেশের ভাষা তাঁহাদের শিখিতে হইবে, সেখানকার সুখদুঃখের সমভাগী হইতে হইবে, অপর দিকে বাঙলা ভাষায় পঠন-পাঠন, আলাপ ও আলোচনা যাহাতে সুষ্ঠুরূপে চলে, সেদিকে তাঁহাদের দৃষ্টি সদ্য-জাগ্রত সৈনিকের মত রাখিতে হইবে। অত্যন্ত সুখের ও আনন্দের বিষয় যে, নিখিল ভারত বঙ্গভাষা প্রসার সমিতি এই বিষয়ে প্রশংসনীয় কাজ করিতেছেন। এই কমিতির চেষ্টায় বঙ্গের বাহিরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাঙলা পঠন-পাঠন ও আলোচনার কিছু কিছু ব্যবস্থা হইয়াছে। বোম্বাই, দিল্লী, এলাহাবাদ, কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, পাটনা, কটক, সাগর, এমন কি রেঙ্গুন বিশ্ব-বিদ্যালয়েও বাঙলা রচনা প্রতিযোগিতার প্রবর্ত’ন ও পুরষ্কার দিবার ব্যবস্থা হইয়াছে। এই সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে বাঙলা পুস্তক সংগ্রহ করিয়া তাহাদের পাঠাগারকে সমৃদ্ধ করিবার চেষ্টাও এই সমিতি করিতেছে। এই কার্যে বাঙালী সাহিত্যসেবীদের সহায়তা, এবং বিত্তশালীদের দান সর্বসময়েই বিশেষভাবে কাম্য। সমিতির এই মহান কার্যে অনুপ্রেরণা যোগাইবার ভার বাঙালীমায়েরই লওয়া কর্তব্য।
আজ যাঁহারা এই মহাসম্মেলনে সম্মিলিত হইয়াছেন, ভারতীয় সংস্কৃতি ও সাধনার অখণ্ডরূপ প্রচার করিবার জন্য, সাংস্কৃতিক দূত-রূপে এক নূতন সংগঠনী শক্তিতে নূতন ভারত গড়িয়া তুলিবার জন্য তাঁহাদের আহবানে করিতেছি। নানা বিষয়ে পুস্তক রচনা করিয়া জ্ঞানের ক্ষেত্রকে তাঁহারা প্রসারিত করিয়া দিন। ভাষার দৈন্য ঘুচাইয়া নব নব শব্দ-সম্পদ সৃষ্টি করিয়া স্ব স্ব ভাষাকে তাঁহারা শক্তিশালী করিয়া তুলুন। বাঙলার সাহিত্যসেবীদের নিকটও আমি সেই নিবেদন জ্ঞাপন করিতেছি। অপরিমেয় প্রাণ প্রাচুর্যের দাক্ষিণ্যে তাঁহারা নূতন বাঙলা গড়িয়া তুলুন। ভাষাকে তাঁহারা এমন রূপ দিন যাহাতে আপামর জনসাধারণের কাছে তাঁহাদের চিন্তাধারা ও সৃষ্টিতত্ত্ব সহজেই পৌঁছাইতে পারে। বঙ্কিমচন্দ্র হইতে আরম্ভ করিয়া শরৎচন্দ্র পর্যন্ত অনেকেই ভাষার এই সহজবোধ্য রূপ যাহাতে ফুটিয়া উঠে, তাহার জন্য পথ প্রদর্শন করিয়া গিয়াছেন। আজ নূতন সাহিত্য-পথিক ও চিন্তানায়কদের সেই কাজ হাতে লইতে হইবে। তবেই ভাষা সৃষ্টির একটা সার্বজনীন সার্থকতা ফুটিয়া উঠিবে। জনমনের সংস্পর্শে সাহিত্যকে নূতন রূপ দিতে পারিলে শিক্ষার আলোক চতুর্দিকে বিকীর্ণ হইয়া পড়িবে। তাহাতেই দেশের সত্যকার মঙ্গল সাধিত হইবে। কেবলমাত্র বাঙলা-সাহিত্য সম্বন্ধেই আমি একথা বলিতেছি না, ভারতের বিভিন্ন ভাষার মাধ্যমে এই গণ-সংযোগ গড়িয়া তুলিতে হইবে। আজ সেই শুভদিন সমাগত—শুভকার্যে বিলম্ব ঘটিলে বিঘ্যের সৃষ্টি হয়। তাই এই শুভলগ্নে আমাদের কর্মক্ষেত্রে নামিয়া পড়িতে হইবে। বঙ্গ-ভারতীর অপূর্ব দান ও প্রেরণার কথা স্মরণ রাখিয়া ভারতীয় অখণ্ড সংস্কৃতির রূপ ও অতীত ঐশ্বর্যের চিত্র সম্মুখে রাখিয়া ভবিষ্যতের গরিমা উজ্জল দিকচক্রবাল জয় করিবার জন্য আমাদের অগ্রসর হইতে হইবে। আমার দুঢ় বিশ্বাস, বিধাতার আশীর্বাদ আমাদের উপর বর্ষিত হইবে—আমরা জয়যুক্ত হইব।—বন্দে মাতরম্।