শ্যামাপ্রসাদের কয়েকটি রচনা/দিল্লীর অভিভাষণ
দিল্লীর অভিভাষণ
[ প্রবাসী বঙ্গ-সাহিত্য সম্মেলন-১৩৫৫]
প্রবাসী বঙ্গ-সাহিত্য সম্মেলনের অভ্যর্থনা-সমিতির পক্ষ হইতে আমি আপনাদিগকে স্বাগত-সম্ভাষণ জানাইতেছি। বঙ্গ-সাহিত্যের বিশাল বনস্পতির ছায়াতলে আমরা বৎসরে একবার করিয়া বাঙলার বাহিরে সম্মিলিত হই। এই সম্মেলন ভারতের নানাস্থান হইতে সমাগত বঙ্গ-সাহিত্যসেবক ও সাহিত্যামোদীদের পারস্পরিক মিলনের এক সার্থক উপলক্ষ।
এবারকার সম্মেলনের অধিবেশন-স্থান ভারতের রাজধানী দিল্লী; অতীত ইতিহাসের সুদূর অস্পষ্ট দিনেও দিল্লীর উপকণ্ঠে আর্যরাষ্ট্র-শক্তি কেন্দ্রীভূত হইয়াছিল। তারপর শতাব্দীর পর শতাব্দী অতীত হইয়াছে, পাঠান-মোগল-ইংরাজ-রাজত্বের অবসান ঘটিয়াছে, কিন্তু দিল্লীর মহিমাসূর্য অস্তমিত হয় নাই। ইংরেজ কবি বলিয়াছেন, “Soft! thy tread is on an empire's dust.” দিল্লী কত সাম্রাজ্যের উত্থান পতনই না দেখিয়াছে—রবীন্দ্রনাথের ভাষায়
“তাহাদের স্মৃতি আজ বায়ুভরে
উড়ে যায় দিল্লীর পথের ধূলি ‘পরে।”
ইতিহাসবিধাতার প্রিয় লীলাভূমি এই নগরীতে যেখানে বিংশ শতাব্দীর বাঙালী বীর ও ভারতের নেতাজী সুভাষচন্দ্রের স্বপ্ন সত্য হইয়া উঠিয়াছে,—লালকেল্লায় ভারতীয় স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়াছে, সেই দিল্লীতে আপনাদিগকে অভ্যর্থনা জানাইয়া কৃতার্থ বোধ করিতেছি।
এই সম্মেলনের পরিধি সংকীর্ণ নহে। ভাষার ভিত্তিতে প্রদেশ-বিভাগের নীতি বহুক্ষেত্রে স্বীকৃত হইলেও সাহিত্যের ক্ষেত্রে সে নীতি অচল; প্রাদেশিক বিভাগের দ্বারা সাহিত্যের ক্ষেত্র বিভক্ত বা সীমাবদ্ধ হয় না বা করা যায় না। সকল সভ্যদেশেই ইহা স্বীকৃত। সাহিত্যের মানচিত্রে প্রান্ত-প্রত্যন্তের সীমারেখা অবলুপ্ত। আজিকার সাহিত্য সম্মেলনে তাই ভারতের সকল প্রদেশবাসীকেই আমরা সাদরে আহ্বান করি।
প্রতিবৎসর আপনারা ভারতবর্ষের নানা প্রদেশ হইতে সমাগত হইয়া এই সম্মেলনে জ্ঞানবিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে ভাবের আদান-প্রদান করেন। দীর্ঘকাল এই বাৎসরিক সম্মেলন ভারতে বাঙালী সমাজের বিস্তার এবং ঐক্যের পরিচয় দিয়াছে। নিজ প্রদেশের বাহিরে গিয়াও বাঙালী বঙ্গ-দেশকে ভোলে নাই, বাঙলার সংস্কৃতির সঙ্গে যোগ রাখিয়া তাহাকে বৈচিত্র্য দানে সমৃদ্ধ করিয়াছে। বাঙলার সঙ্গে প্রবাসী বাঙালীর সহমর্মিতা স্বাভাবিক এবং দীর্ঘকাল ধরিয়াই বিদ্যমান রহিয়াছে। অদৃষ্টের নানা ঘাতপ্রতিঘাতেও ইহা লুপ্ত হয় নাই।
পাঁচ বৎসর পূর্বে ১৩৫০ বঙ্গাব্দে এই দিল্লী-নগরীতেই প্রবাসী বঙ্গসাহিত্যের একবিংশতিতম অধিবেশন আহত হইয়াছিল। বাঙলা সেদিন মন্বন্তরে মুমুর্ষ; লোভীর নিষ্ঠুর লোভ ও বঞ্চিতের নিত্য-চিত্তক্ষোভে সমগ্র দেশ আলোড়িত। আজ ভারত স্বাধীনতা অর্জন করিয়াছে বটে, কিন্তু আজও বাঙালীর দুর্দিনের অবসান হয় নাই। আজ বাঙলা খণ্ডিত হইয়াছে। তাহার বৃহৎ এক অংশ ভারতের বাহিরে চলিয়া গিয়াছে। অগণিত বাস্তুহীন বাঙালীর যেন আজ ধরণীর কোলে কোথাও স্থান নাই। দুর্ভিক্ষ ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার নিপীড়ন শেষ হইতে না হইতে বাঙালী আবার গৃহহীন সর্বহারা হইয়া পড়িয়াছে। একদিক দিয়া দেখিতে গেলে আজ ছয় কোটি বাঙালীর অধিকাংশ প্রবাসী, কেবল প্রবাসী নহে তাহারও অধিক,—রাষ্ট্র-ব্যবস্থায় বিচ্ছিন্ন।
যে সমস্ত বাঙালী বাঙলার বাহিরে ভারতীয় রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রদেশে বাস করেন, তাঁহাদের সঙ্গে বাঙলার যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব ও অপেক্ষাকৃত সহজ। কিন্তু পূর্ববঙ্গে ও উত্তরবঙ্গে যে অগণিত বাঙালী ভারতীয় রাষ্ট্রের বাহিরে গিয়া পড়িয়াছেন তাঁহাদের সমস্যার কি প্রতিকার হইবে? তাঁহাদিগকে লইয়া বাঙালী সমাজের যে সমগ্রতা তাহা রক্ষা করার কি কি ব্যবস্থা হইবে? ইহা আমাদের সম্মুখে এক প্রকাণ্ড সমস্যা। এই সমস্যার সমাধান চিন্তা করিতে সাহিত্য-সাধকগণকে আমি অনুরোধ জানাইতেছি; রাজনীতি ও রাষ্ট্র আমাদের পরস্পরের মধ্যে যে ছেদ ঘটাইয়াছে তাহার উপর দিয়া মিলনের সেতু রচনা করিতে সাহিত্যিকগণকে আমি আহ্বান করিতেছি।
বাঙালী বলিয়া আমরা যদি গৌরব বোধ করি, আশা করি কেহ তাহাকে স্পর্ধা বলিয়া বিবেচনা করিবেন না। আমাদের জীবনেও দুঃখ আছে, দারিদ্র্য আছে, অপমান-অত্যাচার আছে এবং হয়তো কিছু বেশী পরিমাণেই আছে। তাহার জন্য আক্ষেপ করিব না; দুই শতাব্দীর পরাধীনতা আমাদের দেহমনকে যতটা পীড়িত করিয়াছে আর কাহাকেও ততটা আঘাত করিয়াছে কিনা সন্দেহ। আজ বিদেশী শাসনের অবসান ঘটিয়াছে; সংগ্রামে আমরা জয়লাভ করিয়াছি, কিন্তু আমাদের ক্ষতচিহ্ন এখনও মুছিয়া যায় নাই। কখনও যদি নাই মুছে, তাহাতেই বা দুঃখ কি? ব্যক্তিগত সুখের জন্য নহে, প্রদেশগত সুবিধার জন্য নহে, সমগ্র দেশের ও সমগ্র জাতির কল্যাণের দিকে চাহিয়া যাহারা বুক পাতিয়া আঘাত সহ্য করে তাহাদের ত্যাগ ব্যর্থ হয় না।
কিছুকাল যাবৎ ভারতের স্থানে স্থানে সংকীর্ণ প্রাদেশিক বুদ্ধির অতিমাত্রায় প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়াছে। এখন হইতেই এই ভাব দূর করিতে না পারিলে সাম্প্রদায়িকতার ন্যায় প্রাদেশিকতাও ভারতের সমস্যা হইয়া দাঁড়াইবে। বিহার বিহারীর জন্য, আসাম অসমীয়াদের জন্য, বাঙলা দেশ বাঙালীর জন্য এই প্রকার ভাবধারা জাতীয়তা এবং ঐক্যের পরিপন্থী। এই সংকীর্ণ প্রাদেশিকতা দূর করিতে হইলে প্রত্যেক প্রদেশের স্থানীয় অধিবাসীদের মত প্রবাসীদেরও তত্তৎপ্রদেশের প্রতি কর্তব্য আছে। একথা প্রত্যেক প্রদেশের প্রবাসীদের পক্ষে প্রযোজ্য। ইংরেজেরা যেভাবে ভারতবর্ষে দীর্ঘকাল বাস করিয়া দূরবীণ দিয়া দূর হইতে এ দেশবাসীকে দেখিয়া তাহাদের সঙ্গে আত্মীয়তা স্থাপন না করিয়াই স্বদেশে চলিয়া যাইতেন, ভারতবর্ষে’র এক প্রদেশের লোক অন্য প্রদেশে বাস করিবার সময়ে যেন সেই মনোবৃত্তি অবলম্বন না করেন।
ভারতে বিভিন্ন প্রদেশগুলির যে স্বাতন্ত্যই গড়িয়া উঠুক না কেন, প্রত্যেকেরই ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মূলে রহিয়াছে এক সংস্কৃত ভাষা এবং এক ভারতীয় সংস্কৃতি। সুতরাং ভারতের বিভিন্ন ভাষা এবং সংস্কৃতিতে ঐক্যের সন্ধান পাওয়া শুধু সম্ভবপর নয়, অনায়াস-সাধ্য। বিভিন্ন প্রাদেশিক লিপি এ-ক্ষেত্রে যে বাধ্য সৃষ্টি করে তাহা দূর করা কিছুমাত্র দুঃসাধ্য নহে। আজ যদি সমস্ত প্রাদেশিক ভাষাই স্বীয় লিপির সঙ্গে সঙ্গে দেবনাগরী লিপিও গ্রহণ করে, অর্থাৎ যদি দেবনাগরী লিপিতেও প্রাদেশিক সাহিত্যগুলির মুদ্রণ হয়, তবে তাহাতে শুধু যে প্রদেশগুলির পক্ষে পরস্পরের সংস্কৃতির স্বাদ গ্রহণ করার পথ সুগম হইবে তাহা নয়, আপাতদৃষ্টিতে বিভিন্ন সংস্কৃতিগুলি একটা স্বাভাবিক সমন্বয় এবং সর্বভারতীয় ঐক্যের পথে চলিবে। শুধু অনুবাদের ভিতর দিয়া কেবল বিভিন্ন সাহিত্যের মূল রস পূর্ণভাবে আস্বাদ করা যায় না। সর্বভারতীয় ঐক্যের জন্য একটি সর্বভারতীয় লিপি আবশ্যক -এক্ষেত্রে দেবনাগরীই হইবে সেই লিপি। অবশ্য একথাও মনে রাখিতে হইবে যে, লিপি ভাষা নহে, ভাষার চিহ্নমাত্র। সমগ্র ইউরোপে একই রোম্যান লিপি প্রচলন থাকা সত্ত্বেও সেখানে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংকীর্ণতা ও দ্বন্দ্বের লাঘব হয় নাই। তাহা হইলেও যেখানে বিভিন্ন প্রাদেশিক সাহিত্যের মূল উৎসও অভিন্ন, সেখানে সর্বভারতীয় লিপির প্রচলনের দ্বারা প্রদেশগুলির মধ্যে আত্মীয়তা ও সম্প্রীতি বর্ধিত হইবে, প্রাদেশিক ভাষা ও সাহিত্য সমৃদ্ধ হইবে এবং সর্বভারতীয় ঐক্য একটা দৃঢ়ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হইবে।
বাঙলা ভাষা ও বাঙলা সাহিত্য আজ যে স্থান অধিকার করিয়াছে তাহা যেমন বাঙালীর গৌরব, তেমনই ভারতের গৌরব; সাহিত্যের দিক দিয়া পৃথিবীর মানচিত্রে বাঙালীই যে ভারতের স্থান করিয়া দিয়াছে একথা ভারতবর্ষ’ উপলব্ধি করে এবং আনন্দের সহিত স্বীকার করে। বাঙলা সাহিত্যের ঐশ্বর্যে আজ ভারতের সর্বসাধারণের অধিকার। সে অধিকার যাহাতে তাহারা প্রত্যক্ষভাবে গ্রহণ করিতে পারে তাহার সুযোগ করিয়া দেওয়া আমাদের বিশেষ কর্তব্য। বিশ্বভারতীর উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথের ‘সঞ্চয়িতা’ গ্রন্থ দেবনাগরী অক্ষরে (বাঙলা ভাষাতেই) প্রকাশ করিবার ব্যবস্থা হইতেছে। ইহা আনন্দের সংবাদ সন্দেহ নাই। কিন্তু শুধু ‘সঞ্চয়িতা’ নহে, রবীন্দ্রনাথের অন্যান্য বাঙলা রচনারও এইরূপ দেবনাগরী সংস্করণ আবশ্যক। বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র প্রমুখ সুপ্রতিষ্ঠিত বাঙালী সাহিত্যিকদিগের পরিচয় এ-পর্যন্ত অনুবাদের সাহায্যেই অবাঙালী পাঠক-পাঠিকারা লাভ করিয়া আসিয়াছে। ই’হাদের গ্রন্থাবলীরও দেবনাগরী সংস্করণ প্রকাশিত হওয়া প্রয়োজন বলিয়া মনে করি। ভারতের বিভিন্ন অংশের সাংস্কৃতিক মিলন সাধনের পক্ষে প্রস্তাবিত এই উপায়কে আপনাদের বিবেচনার জন্য এই সভাসমক্ষে উপস্থিত করিলাম। এই প্রসঙ্গে আরও একটি উপায় বিশেষ চিন্তনীয়। প্রতি বৎসর ভিন্ন ভিন্ন প্রাদেশিক সাহিত্য-সম্মেলন পৃথকভাগে আপন আপন সমস্যা আলোচনা করে ও করিবে। কিন্তু ইহা ছাড়া তাহাদের প্রতিনিধিদের লইয়া সর্বভারতীয় সাহিত্য-সম্মেলনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কিভাবে ভারতের ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও সাহিত্যের মধ্যে নিকট সম্বন্ধ স্থাপিত হয়, তাহাদের প্রসার ও প্রচার ঘটিতে পারে, কিভাবে সাহিত্যসাধনার ভিতর দিয়া প্রাদেশিকতার ভাব দূর হয়, ভারতের জাতীয় ঐক্য পরিপুষ্ট হয় ও ভারতীয় সংস্কৃতি শক্তিশালী হইতে পারে, ইহাই সেই সম্মেলনের প্রধান আলোচ্য বিষয় হইবে। আমি আশা করি, আমার এই প্রস্তাব বিভিন্ন প্রাদেশিক সাহিত্য-সম্মেলনের কর্তৃ-পক্ষেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করিবে।
বাঙলা সাহিত্যে এক অভাবনীয় জাগরণ শুরু হইয়াছে ঊনবিংশ শতাব্দীতে। ইহার মূলে ছিল যেমন বাঙ্গালীর প্রতিভা, অবস্থাও ছিল তেমনই অনুকূল। ঊনবিংশ শতাব্দীতে পাশ্চাত্ত্য শিক্ষা এবং চিন্তা-ধারার স্রোত বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনে জোয়ার আনিয়াছিল। এই রেনেসাঁসের শ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ। বাঙালী সর্বপ্রথম পাশ্চাত্ত্য ভাবধারার সন্ধান পাইয়াছিল; তাই ভারতে নূতন যুগের বাণী সর্বপ্রথম বাঙালীর কণ্ঠেই উচ্চারিত হইয়াছিল। এই ঘটনা হইতেই প্রমাণ হয় জাতীয় জীবনে বিচ্ছিন্নতা এবং সংকীর্ণতাই মৃত্যু। সমস্ত পৃথিবীতে জীবনের ধারা বহিয়া চলিয়াছে তাহার সঙ্গে যোগ স্থাপনেই জীবন এবং অগ্রগতি। পিছনে থাকিয়া স্বদেশের সংস্কৃতিতে বিধি-নিষেধের সংকীর্ণ প্রাচীরের মধ্যে আবদ্ধ রাখিতে চাহিলে আমরা শুধু অচলায়তনই গড়িয়া তুলিব। তাই বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যের গতি অব্যাহত রাখিতে হইলে অন্য ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে যোগ রাখিতে হইবে, বিদেশের ভাবধারায়ও অবগাহন করিতে হইবে। এই জনাই বাঙালীকে এখন পূর্বাপেক্ষাও অধিকভাবে ইংরেজী, ফরাসী ইত্যাদি বিদেশী ভাষার সঙ্গে পরিচয় রাখিতে হইবে। এতকাল ভারতীয়দের ইংরেজী শিখিতে হইয়াছিল ইংরেজী রাষ্ট্রভাষা ছিল বলিয়া, কিন্তু বাঙালী ইংরেজী ভাষা এবং সাহিত্য আত্মস্থ করিয়াছে তাহার সাহিত্যিক এবং সাংস্কৃতিক মূল্যের জন্য। শুধু চাকরির প্রয়োজনে যে শিক্ষার দরকার ছিল বাঙালী তাহা অপেক্ষা অধিক শিখিয়াছে এবং সে শিক্ষাকে আনন্দে পরিণত করিয়াছে। আজ চাকরির প্রয়োজনে ইংরেজীর মূল্য কমিলেও বাঙালী-প্রতিভার নিকট বিদেশী ভাষা ও সাহিত্যের মূল্য এবং প্রয়োজন কমিতে পারে না। পশ্চিমে যে দ্বার একদিন খুলিয়া গিয়াছিল, সে দ্বার যদি আরও প্রসারিত করিতে না পারি, তবে স্বাধীনতার সার্থকতা কোথায়? যে সমস্ত মহাপুরুষ বাঙলাদেশে জন্মগ্রহণ করিয়া বাঙালী সমাজের উন্নতির ভিত্তি সংস্থাপন করিয়া গিয়াছেন, তাঁহারাই একদিন পাশ্চাত্ত্য শিক্ষার সংস্পর্শে বাঙালী জীবনের বিপুল বিকাশ দেখাইয়া গিয়াছেন। আজ বাঙালী সমাজের সর্বাধিক গৌরবের সামগ্রী বাঙলা ভাষা এবং সাহিত্য। আমাদের যে দেশপ্রীতির বন্যা একদিন সমস্ত ভারতকে প্লাবিত করিয়াছিল সে দেশপ্রীতি শুধু কর্মেই নিঃশেষিত হয় নাই; সেদিন বাঙলার চিত্তের উন্মাদনা সাহিত্যরূপেও প্রকাশ পাইয়াছে, আবার সাহিত্যই তাহাকে জন্ম দিয়াছে, পুষ্ট করিয়াছে। বাঙালী ভারতবর্ষে অর্থসম্পদে প্রাধান্য পায় নাই। কিন্তু চিত্তের সম্পদে যেমন নিজেকে পরিপুষ্ট করিয়াছে তেমনই দেশমাতৃকার সেবা করিয়া আপনাকে ধন্য মনে করিয়াছে।
স্বদেশী আন্দোলনের বহু পূর্বে বঙ্কিমচন্দ্র ‘আনন্দমঠে’ সন্তান-ধর্মের আদর্শ ঘোষণা করিয়াছেন, সমগ্র ভারতবর্ষের জন্য “বন্দেমাতরম্” মন্ত্র প্রচার করিয়াছেন। রবীন্দ্রনাথের অপূর্ব সংগীত বাঙালী-চিত্তে দেশপ্রীতির উৎস খুলিয়া দিয়াছে। বাঙালী গাহিয়াছে-
“ও আমার দেশের মাটি,
তোমার ’পরে ঠেকাই মাথা,
তোমাতে বিশ্বময়ীর,
তোমাতে বিশ্বমায়ের
আঁচল পাতা।”
শুধু দেশপ্রীতিই যে বাঙলা কাব্যে গান গাহিয়া উঠিয়াছে তাহা নয়, বাঙলা কাব্যের সরস্বতী বহুসুরবিশিষ্টা। কাব্য এবং কথা-সাহিত্যে বাঙালীর কীর্তি লইয়া আমরা যথার্থই গর্ব অনুভব করিতে পারি। কিন্তু যতদূর অগ্রসর হইয়াছি তাহাতে গৌরব অনুভব করিয়া সেখানেই থামিয়া যাওয়া জীবনের লক্ষণ নয়। বরং আমাদের কাঁর্তিতে কোথাও ফাঁক রহিয়াছে কি না সেদিকে দৃষ্টি রাখিয়া সেই ফাঁক পুরণ করিয়া নূতন নূতন সম্ভাবনার দিকে আমাদের অগ্রসর হইতে হইবে। এই প্রসঙ্গে আমাদের সাহিত্যের যে দিকটা অপেক্ষাকৃত দুর্বল তাহার উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করি। কাবোর তুলনায় আমাদের প্রবন্ধ-সাহিত্য দরিদ্র ইহা অস্বীকার করা চলে না। অক্ষয়কুমার দত্ত, ভূদেব মুখোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, প্রমথ চৌধুরী প্রমুখ মনীষিগণ অতীতে প্রবন্ধ-সাহিত্য যথেষ্ট সমৃদ্ধ করিয়া গিয়াছেন সত্য এবং কাব্যের মত গগনস্পর্শী’ না হইলেও, প্রবন্ধ-সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের কীর্তি’ যে বিরাট ইহা স্বীকার করিয়াও বলা যায় যে, বৈচিত্র্য এবং প্রাচুর্যের দিক দিয়া বাঙলা প্রবন্ধ-সাহিত্য বর্তমানে আশানুরূপ সমৃদ্ধ নয়। বাঙলা সাহিত্যে আজ পর্যন্ত যাহা কিছু উন্নতি হইয়াছে তাহা রাষ্ট্রশক্তির আনুকূলোর অপেক্ষা রাখে নাই। কাজেই অবস্থা এবং পারিপার্শ্বিকের দোষ দিয়া লাভ নাই। আমাদের স্থিরচিত্তে ভাবিয়া দেখিতে হইবে কি উপায়ে বর্তমানে বাঙলা সাহিত্যের এই উপেক্ষিত অংশ বলিষ্ঠ করা যায়। যে প্রখর বাস্তবনিষ্ঠা, গভীর মননশীলতা এবং বলিষ্ঠ চিন্তাশীলতা প্রবন্ধ-সাহিত্যের উৎকর্ষের মূলে তাহার যথাযোগ্য অনুশীলন আজকাল দেখা যাইতেছে না। বাঙলা সাহিত্যের যাঁহারা দিপাল তাঁহাদের দৃষ্টি এদিকে আকর্ষণ করি।
আজ বাঙালী সমাজের সম্মুখে বিভিন্ন এবং বিচিত্র প্রকার কঠিন সমস্যা দেখা দিয়াছে। এই সমস্যাগুলির সন্তোষজনক সমাধান না হইলে বাঙালী সমাজ সম্মানের সঙ্গে বাঁচিতে পারিবে না। হীন এবং দুর্বল হইয়া পড়িলে বাঙলাদেশ ভারতবর্ষ’কেও দুর্বল করিবে, কেননা অংশের শক্তিই সমগ্রের শক্তির উৎস। দুর্গতি হইতে বাঙলাদেশকে বাঁচাইবার ভার সমগ্র বাঙালী সমাজের উপর। আজ কি উপায়ে সেই মহৎ কর্তব্য পালন করা সম্ভব তাহাই আপনাদিগকে ভাবিতে বলি। এ-বিষয়ে গত শতাব্দীতে যে সমস্ত মনীষীর প্রতিভার জন্য আজ বাঙালী শ্রদ্ধেয়, তাঁহাদের জীবন হইতে আমরা এক বিশেষ শিক্ষালাভ করিতে পারি। বস্তুতঃ আজিকার দিনে এই শিক্ষা গ্রহণেরই প্রয়োজন হইয়াছে। স্বামী বিবেকানন্দ বলিয়াছেন “চালাকির দ্বারা কোন মহৎ কার্য হয় না।” এই পরম সত্য কথা আজ বিশেষভাবে স্মরণ করিবার সময় হইয়াছে। সাধনা ও নিষ্ঠা, সততা ও শৃঙ্খলাপরায়ণতা, নিয়মানু- বর্তিতা ও শ্রমশীলতা অবলম্বন না করিয়া আমরা বড় হইতে পারিব না। এই গুণসমষ্টির অভাবে জাতি বাঁচিতেই পারে না, বড় হওয়া দূরের কথা। কিছুকাল পূর্বেও শিক্ষা, সাহিত্য এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে অগ্রণী হইয়া বাঙালী ভারতে নেতৃত্বের অধিকার পাইয়াছিল। ইহার পিছনে ছিল বাঙালীর বিরাট সাধনা। আজিকার দুর্দিন অতিক্রম করিতে হইলে আমাদের পূর্ববর্তীগণ যে সাধনার বলে বড় হইয়াছিলেন তাহারই অনুশীলন করা কর্তব্য। আজ আমরা যে সংকটের মধ্যে আসিয়া দাঁড়াইয়াছি বাঙালী-সমাজের ইতিহাসে এমন সংকট ইতিপূর্বে আসে নাই। প্রথম হইতে বাঙালী ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অগ্রণী হইয়া দীর্ঘকাল ধরিয়া ত্যাগস্বীকার করিয়া আসিয়াছে। ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য শেষ পর্যন্ত বাঙলাকে খণ্ডিত হইতে হইয়াছে। জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইহার নিদারূণ প্রতিক্রিয়া হইতে বাঙালী সমাজের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাহিত্যিক ভবিষ্যৎকে বাঁচাইতে হইলে বাঙালীকে আবার পুরুষসিংহের মত দাঁড়াইতে হইবে। শুধু পূর্বগৌরবের কথা প্রচারের দ্বারা শ্লাথা বোধ করিলে চলিবে না, অথবা বর্তমান দুর্দশার কথা বারবার ঘোষণা করিয়াও মুক্তি আসিবে না। কঠিন হস্তে সকল মলিনতা ও দুর্বলতাকে দূর করিতে হইবে এবং স্বীয় চরিত্রশক্তি সম্বল করিয়া কর্তব্যসাধনের ক্ষেত্রে অগ্রসর হইতে হইবে; তবেই সমাজ রক্ষা পাইবে, পুনরুত্থান সম্ভব হইবে। সাহিত্যের দিক দিয়া এক্ষেত্রে যাহা কর্তব্য, বর্তমান সম্মেলনে আপনারা তাহা বিবেচনা করিবেন। ৭৭ বৎসর পূর্বে জাতিগঠনের মহৎ উদ্দেশ্য লইয়া সাহসে বুক বাঁধিয়া বঙ্কিমচন্দ্র “বঙ্গদর্শন” স্থাপন করিয়াছিলেন। তিনি দেখাইয়াছিলেন সাহিত্য শুধু জীবন প্রতিফলিত করিয়াই ক্ষান্ত হয় না, সাহিত্য জাতির পথপ্রদর্শনও করিয়া থাকে। সাহিত্য জাতির আশা আকাঙ্ক্ষাকে যেমন রূপায়িত করে, তেমনই তাহাকে গতিও দেয়। ভাষা এবং সাহিত্যের পথ দিয়াই বঙ্কিমচন্দ্র জাতিগঠনে অগ্রসর হইয়াছিলেন। কি অসামান্য কীর্তি’র প্রতিষ্ঠাই তিনি করিয়াছিলেন, তাহা আজ আমরা তাঁহার পরবর্তীরা সম্যক হৃদয়ঙ্গম করিতেছি। তাঁহার তিরোধানের পর প্রত্যক্ষে হউক, পরোক্ষে হউক, রবীন্দ্রনাথ বাঙালী-সমাজের পথ-প্রদর্শন করিয়াছেন। বাঙালীর সাহিত্য-প্রতিভা একদিন জাতিগঠনের প্রয়োজন সিদ্ধ করিয়াছে, আজ চরম দুর্দিনে সমাজকে রক্ষা করিবার প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করিয়া তাহার প্রাণে পুনরায় বল সঞ্চার করুক, ইহাই প্রার্থনা।
বন্দে মাতরম্