বিষয়বস্তুতে চলুন

শ্যামাপ্রসাদের কয়েকটি রচনা/পঞ্চাশের মন্বন্তর

উইকিসংকলন থেকে

পঞ্চাশের মন্বন্তর

 ছিয়াত্ত‍ুরে মন্বন্তরের ভয়াবহ স্মৃতি বাঙালী ভুলিতে পারে নাই। পঞ্চাশের মন্বন্তরও বাঙলার ইতিহাস চিরদিন মসীচিহ্নিত করিয়া রাখিবে।

 ১৭৬৫ খ্রীস্টাব্দের ১২ই আগস্ট ক্লাইভ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির নামে বাঙলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লইলেন। দেশে তখন যে অবস্থা চলিতেছিল, তাহা অরাজকতারই নামান্তর। নানা কর্তা—অসংখ্য শাসনবিধি। শোষণ পুরাদস্তুর তো চলিতেই ছিল, তাহার উপর অনাবৃষ্টি ও অল্পবৃষ্টির দরুন অজন্মা ও শস্যহানি ঘটিল। ইহারই অবশ্যম্ভাবী ফল মন্বন্তর (১৭৭০ অব্দ)। দেশ শ্মশান হইয়া গেল। ছিয়াত্ত‍ুরে মন্বন্তরের কতকটা কৈফিয়ৎ চলিতে পারে,—ইংরেজ যে শাসনমহিমার জগৎময় ঢক্কা পিটাইয়া থাকে, মাত্র পাঁচ বৎসর কালের মধ্যে উহা তখনও দৃঢ়মূল হইবার অবকাশ পায় নাই।

 কিন্তু ১৯৪৩ খ্রীস্টাব্দে (১৩৫০ বঙ্গাব্দে) এরূপ কোন কৈফিয়ৎ চলিতে পারে না। পৌনে দুই শত বৎসরের অধিককাল দোর্দণ্ড প্রতাপে শ্বেত-রাজত্ব চলিয়াছে। বিংশ শতাব্দী অজস্র সুযোগ-সুবিধা মানুষের হাতে আনিয়া দিয়াছে; বিজ্ঞান-দক্ষিণ্যে সমগ্র পথিবীর সঙ্গে আত্মীয়তা ঘটিয়াছে। এখনও দুধের অভাবে কত ছেলে মায়ের কোলে মরিয়া গেল, ডাস্টবিনে মানুষ পশ‍ুর সঙ্গে কাড়াকাড়ি করিয়া উচ্ছিষ্ট খাইল, এ দৃশ্য মাসের পর মাস আমরা চোখে দেখিয়াছি।

 বাঙলার অসামরিক সরবরাহ-সচিব পঞ্চাশের মন্বন্তরের বারোটি কারণ দিয়াছিলেন, তাহা এইরূপ—

(১) ১৯৪২ অব্দে আউশ ফসল ভাল হয় নাই।
(২) ১৯৪২-৪৩ অব্দে আমন ধানও কম ফলিয়াছে।
(৩) মেদিনীপুর ও ২৪ পরগণা জেলা বাত্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন কম হইয়াছে।
(৪) কীটের উপদ্রবে ফসল নষ্ট হইয়াছে।
(৫) সরকারের নৌকা-নিয়ন্ত্রণনীতি চলাচলের বিঘ্ন ঘটাইয়াছে।
(৬) সমুদ্রকূল হইতে লোক-অপসারণের ফলে উৎপাদনের ক্ষতি হইয়াছে।
(৭) ব্রহ্ম ও আরাকান হইতে আগত আশ্রয়প্রার্থীরা ভিড় জমাইয়াছে।
(৮) শিল্পকেন্দ্রগুলিতে ভিন্ন প্রদেশের মজুর অনেক বাড়িয়াছে।
(৯) ব্রহ্মদেশ হইতে চাউলের আমদানি বন্ধ হওয়ায় ঘাটতি পূরণের উপায় হয় নাই।
(১০) অনেক বিমানঘাটি তৈয়ারি হওয়ায় সেই সব জায়গায় চাষ হইতে পারে নাই।
(১১) সামরিক লোকের সংখ্যা অনেক বাড়িয়া যাওয়ায় খাবার বেশি খরচ হইয়াছে।
(১২) অন্যান্য প্রদেশ হইতে আমদানি কম হইয়াছে।

 ৪ঠা নভেম্বর (১৯৪৩) পার্লামেণ্টে ভারত সম্বন্ধে এক বিতর্ক হইয়াছিল, তাহাতে ইনফ্লেশন বা মূদ্রাস্ফীতিকে পঞ্চাশের মন্বন্তরের অন্যতম প্রধান কারণ বলিয়া ধরা হইয়াছে। সরবরাহ-সচিবের বারো দফার মধ্যে ইহার উল্লেখমাত্র নাই। স্পষ্টত তিনি গৌণ কারণগুলির উপর জোর দিয়া আসল ব্যাপার চাপিয়া গিয়াছেন। সরকার-পক্ষ যুদ্ধের ব্যাপারে তাঁহাদের কেনা জিনিসের দাম দিতে গিয়া প্রচুর কাগজি-নোট বাজারে ছাড়িয়াছেন। যাহারা সরকারি কাজ করে, যুদ্ধের মালপত্র জোগান দেয়, কলকারখানায় নানাবিধ যুদ্ধদ্রব্য উৎপাদন করে, তাহারা সেই কাগজি-নোট অজস্র পরিমাণে পাইল; তাহা দিয়া মহাস্ফূর্তিতে জিনিসপত্র কিনিতে লাগিল। দেশের অধিকাংশ লোকই ইহার অনেক পূর্বে অপেক্ষাকৃত ভাল দাম পাইয়া মাল বেচিয়া দিয়াছে; ফাঁপানো মূদ্রার অংশ তাহদের হাতে পড়িল না। জিনিসপত্র তাহাদের ক্রয়ক্ষমতার সীমা ছাড়াইয়া বহু দূরে চলিয়া গেল। লক্ষ লক্ষ লোক না খাইয়া মরিতে লাগিল। ফাঁপানো-মুদ্রানীতির জন্য ভারত-সরকার তথা ব্রিটিশ শাসনযন্ত্র দায়ী। এই বিষয়ে খুলিয়া বলিলে সাহস ও সত্যভাষণের জন্য সরবরাহ-সচিবকে প্রশংসা করা যাইত।

 পার্লামেণ্টের বির্তক-সভায় মিঃ পেথিক লরেন্স কয়েকটি খাঁটি কথা বলিয়াছিলেন। ‘বাঁচিয়া থাকিবার জন্য যে খাদ্যশস্যের প্রয়োজন, তাহা কিনিবার ক্ষমতা অসংখ্য লোকের নাই। মুদ্রাস্ফীতিই এই অত্যধিক মূল্য-বৃদ্ধির কারণ। ইহার জন্য আর কেহ নয়—একমাত্র ভারত-গভর্ণমেণ্টই দায়ী।’ মিঃ অ্যামেরিও আমতা-আমতা করিয়া ইহাতে একরকম সায় দিলেন। তিনি বলিলেন, ‘সমস্যাটি হইতেছে অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধি ও খাদ্যশস্যের অপ্রতুলতা। জনসাধারণের হাতে কিনিবার মতো টাকা ছিল না, ইহা ঠিক। তাহা হইলে অবস্থাটা আজিকার মতো এমন শোচনীয় হইয়া উঠিতে পারিত না।’

 একটা কথা মনে রাখিতে হইবে। টাকা থাকিলেই হয় না। অনেকে দিন আনিত, দিন খাইত; জিনিসের ক্রমবর্ধমান দামের সহিত তাহাদের সঙ্গতি তাল রাখিতে পারিল না। নিঃস্ব নিরন্ন হইয়া এমন অবস্থার লোক প্রভূত পরিমাণে মরিয়াছে। অথচ মুদ্রাস্ফীতি রোধ করিবার উল্লেখযোগ্য চেষ্টা কিছুই হয় নাই; অবস্থা আয়ত্তের বাহিরে গেলে তবে কর্তাদের কিছু টনক নড়িয়াছে।

 সরবরাহ-সচিবের হিসাবে অপচয়ের কথাটাও নাই। কৃষক, মধ্যবিত্ত-ক্রেতা, দোকানদার প্রভৃতির বিরুদ্ধে এ যাবত খুব আস্ফালন চলিয়াছে; মিঃ অ্যামেরির দল বলিয়াছেন, মাল মজুত করিয়া রাখিয়া ইহারাই দুর্ভিক্ষ ঘটাইয়াছে। আসল গলদ যেখানে, সেদিক হইতে এই প্রকারে সকলের দৃষ্টি আচ্ছন্ন করিয়া রাখা হইয়াছে। বাজারের সব চেয়ে বড় ক্রেতা সরকার; সব চেয়ে বড় মজুতদারও সরকার এবং সরকারের সাহায্যকারী কলকারখানার মালিক ও ধনিক-সম্প্রদায়। মজুত খাদ্যের মধ্যে কত যে অপচয় হইয়াছে, তাহার হিসাব কে দিবে? ব্রহ্ম-সীমান্তে যুদ্ধভাণ্ডারে অপরিমেয় আহার্য নষ্ট হইয়াছে। ভারত-সরকারের সঞ্চিত ময়দা ছোলা ছাতু প্রভৃতির কি পরিমাণ অপচয় হইয়াছে, তাহার সঠিক হিসাব পাইলে বর্তমান দুর্ভিক্ষের অনেক রহস্য উদ্ঘাটিত হইবে। কলিকাতায় এ. আর. পি-র আনুকূল্যে শত্রু-বিড়ম্বিতদের জন্য যে সামান্য পরিমাণ জিনিস মজুত করা হইয়াছিল—তাহাতেও প্রচুর অপচয় ঘটিয়াছিল, এ তথ্য সকলের জানা আছে।

 দুর্ভিক্ষ একদিনে আসে নাই। সরবরাহ-সচিবের উল্লিখিত বারো দফার কারণ হইতেই বুঝিতে পারা যায়, করাল মন্বন্তর ধীরে ধীরে বাঙলাকে গ্রাস করিয়াছে। ইহার প্রতিকার-চেষ্টায় কেন্দ্রীয় সরকার শোচনীয় ঔদাসীন্য দেখাইয়াছেন। দেশ-বিদেশের সৈন্য দলে দলে আসিয়া বাঙলাদেশ ভরিয়া ফেলিল, সহস্র সহস্র শত্রুকে বন্দী করিয়া আনা হইল—তাঁহাদের অনেকের বোঝা বাঙলার কাঁধে চাপিল, ব্রহ্ম হইতে অসংখ্য আশ্রয়ার্থী আসিয়া জুটিল, কলকারখানায় ভিন্ন প্রদেশ হইতে সংখ্যাতীত মজুর আসিল। কেন্দ্রীয় সরকার তখনও মনে করিতেছেন বাঙলাদেশ অবাধে সকলের অন্ন যোগাইয়া যাইবে, কোন প্রকার অতিরিক্ত ব্যবস্থার প্রয়োজন নাই।

 সৈন্যদের খাদ্য সাধারণ বরাদ্দ হইতে অনেক বেশি। শুধু চাউল নয়—ফলমূল তরি-তরকারি মাছ-ডিম-মাংস প্রভৃতিও তাহদের জন্য প্রচুর পরিমাণে ক্রীত হয়। ঐ সব জিনিস দুর্মূল্য ও দুষ্প্রাপ্য হওয়ায় চাউলের উপর টান বাড়িয়া গেল। ইহার উপর সরকার আবার সৈন্যদলের জন্য দশ লক্ষ টন খাদ্যশস্য সর্বদাই মজুত রাখিতে লাগিলেন। বড় বড় কারখানার মালিকরা যুদ্ধের ব্যাপারে প্রচুর লাভবান হইয়া মজুর ও কর্মচারীদের জন্য ভবিষ্যতের খাদ্য-সঞ্চয় করিতে লাগিলেন। সরকার পরোক্ষে ইহাদের সহায়তা করিলেন। জনসাধারণের কথা কেহ ভাবিল না।

 শত্রুর আক্রমণের আশঙ্কায় কয়েকটি জেলা হইতে ধান সরানো হইল। ধান সরাইলেই তো স্থানীয় লোকের পেটের ক্ষুধা ঐ সঙ্গে লোপ পায় না! খাদ্যবস্তুর সন্ধানে তাহারা ঘোরাঘুরি করিতে লাগিল। চাউলের দর হঠাৎ খুব বাড়িয়া গেল। ইহার উপর নৌকা ডুবাইয়া দিয়া নৌকার চলাচল নিয়ন্ত্রণ করিয়া জনসাধারণকে আরও ভীতিগ্রস্ত করা হইল। এরূপ ক্ষেত্রে লোকের মনে ভরসা জাগাইয়া রাখিবারই চেষ্টা করা উচিত। সরকার তাড়াহুড়া করিয়া এমন সব কাণ্ড করিতে লাগিলেন যে সাধারণে সরকারের উপর ক্রমশঃ আস্থা হারাইয়া ফেলিল। মন্বন্তর দেশব্যাপ্ত হইয়া পড়িল।

 ছিয়াত্তুরে মন্বন্তরের ছবি বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠে প্রোজ্জ্বল হইয়া রহিয়াছে। এই বর্ণনায় সাহিত্যিক-সুলভ অতিশয়োক্তি কিছুমাত্র নাই। ১৭৭৮ খৃস্টাব্দে একটি দুর্ভিক্ষ-কমিশন বসে। কমিশন যে রিপোর্ট দিয়াছিলেন, আনন্দমঠের বর্ণনা তাহার কোন কোন অংশের হুবহু বাঙলা অনুবাদ। আনন্দমঠের চিত্রের সঙ্গে আজিকার দুরবস্থা মিলাইয়া দেখিলে বোঝা যাইবে, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়াছে।

 ছিয়াত্তুরে মন্বন্তরের পরেও দুর্ভিক্ষ অনেকবার হইয়াছে[]। ইহার মধ্যে ১৮৭৩-৭৪ অব্দের দুর্ভিক্ষ দুই কোটি লোকের অন্নকষ্ট হইয়াছিল। কিন্তু দ্রুততার সহিত যথাযোগ্য ব্যবস্থা অবলম্বিত হয়; তাই সেবার লোকক্ষয় সামান্যই হইয়াছিল। দুর্ভিক্ষ-দমনে এই একবার মাত্র সরকার কৃতিত্ব দেখাইয়াছিলেন। কিন্তু ৭৩-৭৪ অব্দের ব্যবস্থা এবারে সম্পূর্ণ উপেক্ষিত হইয়াছে। বরঞ্চ ১৭৭০, ১৭৮৩ ও ১৮৬৬ অব্দে যে অদূরদর্শিতা ও অব্যবস্থার ফলে অবস্থা ভয়াবহ হইয়াছিল, পঞ্চাশের মন্বন্তরে অবিকল তাহাই দেখা যাইতেছে। আজিকার মতো তখন অবশ্য বৈদেশিক আক্রমণের আতঙ্ক ছিল না, কিন্তু এই একটি বিষয় ছাড়া সকল পারিপার্শ্বিকতা আশ্চর্যরূপ মিলিয়া যায়।

 ১৭৭০ খৃস্টাব্দে দুর্ভিক্ষের সূচনা হইলে, কর্তৃপক্ষ অমনি সৈন্যমণ্ডলীর ছয়মাসের খোরাকি কিনিয়া গুদামজাত করিবার মতলব করিলেন।’ অক্টোবর মাস হইতে দেশে হাহাকার উঠিল; নভেম্বর মাসে ‘যাহার দুই এক কাহন হইয়াছিল, রাজপুরুষেরা তাহা সিপাহীর জন্য কিনিয়া রখিলেন।’ এই নভেম্বর মাসেই ‘কালেক্টর-জেনারেল আশঙ্কা করিলেন, দেশ। জনশূন্য হইয়া যাইবে।’

 ১৯৪৩ অব্দের অবস্থা অনুরূপ নয় কি? সরকারি ভাষাই উদ্ধৃত করিতেছি—‘দেশরক্ষীদের ক্রমবর্ধমান প্রয়োজনে সৈন্য-বিভাগের তরফ হইতে প্রচুর পরিমাণে খাদ্য-ক্রয় হইল। তাহা ছাড়া ‘জরুরী অবস্থার প্রতিষেধ হিসাবেও খাদ্য-ক্রয় করিতে হইয়াছে।’

 তখনকার দিনে এই চাউল-মজতের ব্যাপারে এলাহাবাদ ও ফৈজাবাদের বৃটিশ অফিসারের নিকট কোম্পানি চাউল কিনিতে পারেন নাই। এবারেও দেখা গিয়াছে, অন্য প্রদেশ হইতে—বিশেষতঃ লাটশাসিত প্রদেশগুলি হইতে—চাউল কিনিতে গিয়া বাঙলা-সরকার সুবিধা করিয়া উঠিতে পারেন নাই।

 ছিয়াত্তুরে মন্বন্তরের আমলে সন্দেহ করা হইয়াছে, ‘ব্যক্তিগত লাভের কারবার খুব চলিয়াছিল।’ কোম্পানির কর্মচারীরা এমন অবস্থা করিয়া তুলিল যে বাজারে চাউল পাইবার উপায় রহিল না। দেশে হাহাকার উঠিল; প্রতিবাদ উঠিতে লাগিল। এমন কি কোম্পানির ডিরেক্টররাও কর্মচারীদের অপকর্ম ও অর্থগৃধ্নুতার অজস্র নিন্দা করিয়াছিলেন। কিন্তু তাহাতে ফল হয় নাই।

 ১৯৪৩ অব্দেও ঐরূপ ঘটিয়াছে। চারিদিকে প্রচুর কলরব উঠিলে মাত্র ১৫ই সেপ্টেম্বর সরবরাহ-সচিব স্বীকার করিলেন, অন্য প্রদেশের চাউল বাঙলায় বেচিয়া গবর্ণমেণ্টের লাভ হইয়াছে বটে, তবে সেটা গোড়ার দিকটায়। ইত্যাদি, ইত্যাদি।

 তখনকার দিনেও অধিক পরিমাণে মাল কেনা ও মজুত করার বিরুদ্ধে হুকুম জারি হইয়াছিল। অন্নাভাবে মানুষ মরিতেছে, তবু, অবাধ-রপ্তানি চলিতেছিল। জর্জ টমসনের মতে, ‘দুর্ভিক্ষের সময়ে রপ্তানিটা যদি বন্ধ থাকিত, তাহা হইলে চাউলে কুলাইয়া যাইত অনাহারে মানুষ মরিত না।’ এই রপ্তানি কবে শুরু হইয়াছিল জানা যায় নাই; ১৪ই নভেম্বর (১৭৭০) অনেক চেষ্টার পর রপ্তানি বন্ধ করা হয়, ইতিহাসে এই বিবরণ রহিয়াছে।

 এবারেও রপ্তানির বিরুদ্ধে অনেক চেঁচামেচি হইয়াছিল; কর্তৃপক্ষ কর্ণপাত করেন নাই। অনেক বিলম্বে ২৩শে জুলাই তারিখ হইতে রপ্তানি কতক পরিমাণে বন্ধ হইল, একেবারে বন্ধ হয় নাই। এখনও কয়েকটি ব্যাপারে বিদেশে চাউল রপ্তানি হইতে পরিবে, তবে সরকারি হিসাবে উহা মাসিক এক হাজার টনের অধিক হইবে না। সরবরাহ-সচিব পঞ্চাশের মন্বন্তরের যে-সব কারণ দিয়াছেন, তাহার মধ্যে এই রপ্তানি-প্রসঙ্গেরও উল্লেখ নাই।

 বাঙলাদেশ ১৭৭০ অব্দের ধাক্কা সহজে সামলাইতে পারে নাই; অভাব লাগিয়াই ছিল। ১৭৮৩ অব্দে আবার দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। এইবার কর্তৃপক্ষ একটু সুবুদ্ধির পরিচয় দিলেন, জলপথে রপ্তানি একেবারে বন্ধ করিয়া দিলেন। একটি কমিটি তৈয়ারি করিয়া তাহার উপর দণ্ডমুণ্ডের চরম ক্ষমতা দেওয়া হইল। নির্দেশ দেওয়া হইল, যদি কোন ব্যবসাদার খাদ্যশস্য গোপনে মজুত করিয়া রাখে, বাজারে আনিয়া ন্যায্য মূল্যে বেচিতে অস্বীকার করে—তবে তাহাকে ভয়ানক শাস্তি দেওয়া তো হইবেই, অধিকন্তু তাহার মাল বাজেয়াপ্ত করিয়া গরিবদের মধ্যে বিলাইয়া দেওয়া হইবে।

 পঞ্চাশের মন্বন্তরেও এইরূপ আদেশ দেওয়া হইয়াছিল। ফল কি হইয়াছে, হাজার হাজার মানুষ প্রাণ দিয়া তাহা দেখাইয়া গেল। সরকারি আদেশ অবাধে এবং প্রায় প্রকাশ্য ভাবেই অবহেলিত হইয়াছে। সরকারও আদেশের পর আদেশ সংশোধন করিয়া চলিয়াছিলেন।

 ১৭৮৩ অব্দের দুর্ভিক্ষে আর একটি উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব হইয়াছিল, বাঙলা ও বিহার এই দুই প্রদেশের জন্য একটি কায়েমী শস্যাগার তৈয়ারি করিতে হইবে। তদনুযায়ী পাটনায় পাকা-গাঁথনির এক প্রকাণ্ড গোলাঘর নির্মিত হইয়াছিল। তাহাতে লেখা আছে—For the perpetual prevention of famines in India. কিন্তু গোলাঘর চিরদিনই শূন্য রহিয়া গেল, কোনদিন একমুঠা ধান তাহার মধ্যে পড়ে নাই।

 পঞ্চাশের মন্বন্তরের সময়েও ফুড গ্রেইনস্‌‌ কমিটি সুপারিশ করিয়াছেন, একটা কেন্দ্রীয় শস্যাগার তৈয়ারি করিতে। এই শস্যাগারের জন্য পাকা ইমারত তৈয়ারি হইবে কিনা, এবং শেষ পর্যন্ত ইহাতে কি পরিমাণ শস্য উঠিবে, তাহা দেখিবার বিষয়।

 ১৮৬৬ অব্দে যে মন্বন্তর ঘটে, উহাকে সাধারণত উড়িষ্যার দুর্ভিক্ষ বলা হয়। ‘সর্বগ্রাসী দুর্ভিক্ষের সমুদ্রে’ সমগ্র উড়িষ্যা পরিপ্লাবিত হইয়া গিয়াছিল। বাঙলাদেশের মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বর্ধমান, নদীয়া, হুগলি ও মুর্শিদাবাদ জেলায় উহার ঢেউ আসিয়াছিল। এই মন্বন্তরের কবলে উড়িষ্যার যে অবস্থা বর্ণিত হইয়াছে, আজ বাঙলার অবস্থাও অবিকল সেইরূপ। দেশের একপ্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত প্রতিদিন অগণিত অন্নহীন মারা পড়িতেছে, শিয়াল-কুকুর মানুষের শব ছেঁড়াছেঁড়ি করিতেছে। সরবরাহ-সচিব অবশ্য বলিতে চাহিয়াছেন, বাঙলার সমস্ত অঞ্চল দুর্ভিক্ষগ্রস্ত হয় নাই। কিন্তু ধাপ্পা দিয়া সত্যকে চাপা দেওয়া যায় না। ১৮৬৬ অব্দের মন্বন্তরে প্রায় দশ লক্ষ লোক মরিয়াছিল। যদি কোনদিন ১৯৪৩ অব্দের নিরপেক্ষ সত্য বিবরণ বাহির হয়, দেখা যাইবে সেবারের লোকক্ষয় পূর্ববর্তী সকল মন্বন্তরকে ছাড়াইয়া গিয়াছে।

 ১৮৬৫ অব্দে বিভিন্ন জেলার কালেক্টররা আংশিক অজন্মা লক্ষ্য করিয়া প্রকৃত অবস্থা অনুসন্ধান করিতে চাহিলেন। কিছু খাজনা মকুব করিবারও কথা হইল। কিন্তু কমিশনারেরা উহা সমর্থন করিলেন না। রেভেনিউ-বোর্ডও এইরূপ প্রস্তাব সরাসরি বাতিল করিয়া দিলেন। বোর্ড এক বিস্তৃত বিবরণীতে বাঙলা-সরকারকে জানাইলেন, ফসল কিছু কম হইতে পারে বটে—কিন্তু তাহাতে ভাবনার কিছু, নাই; এই ফসলেই লোকের খাবার কুলাইয়া যাইবে। আগামী বৎসরের জন্য মজুত অবশ্য কম থাকিবে, কিন্তু দুর্ভিক্ষ হইবার কোনই সম্ভাবনা নাই।

 ১৯৪৩ অব্দেও সেই অবস্থা। ব্রহ্মদেশ বেহাত হইয়া যাইবার পর কথা উঠিল, বৎসরের শেষের দিকে বাঙলায় অন্নাভাব ঘটিতে পারে। কথাটা তুলিলেন, ভারত-সরকারের খুব মোটা মাহিনার এক কর্মচারী। ব্যস, ঐ পর্যন্ত। ৩০শে এপ্রিল (১৯৪৩) তারিখের কাগজে বাহির হইল, একটা লোকের শব ব্যবচ্ছেদ করিয়া পেটের মধ্যে ঘাস পাওয়া গিয়াছে। ক্ষুধার তাড়নায় হতভাগ্য ঘাস খাইয়াছে, হজম করিতে পারে নাই। কিন্তু উহারই এক সপ্তাহ পরে (৭ই মে) সরবরাহ-সচিব বলিলেন, ‘সঙ্কটের সমাধান অদূরবর্তী’। পরদিন ৮ই মে বলিলেন, ‘বাস্তবিক পক্ষে বাঙলায় যথেষ্ট খাদ্যশস্য রহিয়াছে।’ তখনকার খাদ্য-বিভাগের বড়কর্তা মেজর জেনারেল উড ১৩ই মে বিস্তর অঙ্ক কষিয়া দেখাইলেন, বাঙলায় কোন অভাব নাই। কেন্দ্রীয় সরকারের সচিব মাননীয় আজিজুল হক ১৫ই মে কৃষ্ণনগরে বলিলেন, ‘বাঙলায় এখনও চাউলের কমতি হয় নাই’। ৩০শে তারিখেও ‘বাঙলার অপ্রচুর খাদ্য রহিয়াছে অথবা আমদানি অপ্রচুর হইতেছে’—একথা সুরাবর্দি সাহেব বলিতে পারেন নাই।

 ১৮৬৬ অব্দে তখনকার লাট স্যার সিসিল বীডনের গবর্ণমেণ্ট বলিয়াছিলেন, দেশে প্রকৃত অন্নাভাব হয় নাই; ব্যবসায়ীদের হাতে প্রচুর খাদ্যশস্য রহিয়াছে, অতিরিক্ত মুনাফার আশায় তাহারা মজুত করিয়া রাখিয়াছে। ১৯৪৩ অব্দে বাংলা-সরকারও বলিলেন, ‘বাংলায় যে পরিমাণ খাদ্য রহিয়াছে তদনুপাতে মূল্যবৃদ্ধি অসংগত হইয়াছে। মজুত মাল বাজারে বাহির করিতে পারিলেই সংকট দূর হইয়া যাইবে।’

 ১৮৬৬ অব্দের মার্চ মাসেই চাউল-আমদানির দাবি উঠিয়াছিল। তখন বাড়ি-ঘর ছাড়িয়া লোকে ইতস্তত ঘুরিতে শুরু করিয়াছে, স্থানে স্থানে খাদ্য লুঠ হইতেছে। কিন্তু সরকার প্রত্যাসন্ন সংকট উপলব্ধি করিতে পারিলেন না। ২৮শে মার্চ স্যার আর্থার কটন দুর্ভিক্ষ-নিবারণের জন্য সরকারকে অবহিত হইতে বলিলেন। এপ্রিল মাসে কলিকাতায় চাঁদা তুলিয়া লোক খাওয়াইবার ব্যবস্থা হইল। কিন্তু রেভেনিউ-বোর্ডের তখনও সন্দেহ, সত্যই খাদ্যাভাব ঘটিয়াছে কিনা। ক্রমে চাউল একেবারে অমিল হইয়া গেল। সৈন্য, সরকারি চাকুরিয়া এবং কয়েদিদের জন্যও চাউল মিলে ‘না। তখন লেফটেন্যাণ্ট-গবর্ণর বাহির হইতে চাউল আমদানির হহুকুম দিলেন। সরকারের অকর্মণ্যতায় এই দুর্ভিক্ষে প্রায় দশ লক্ষ লোক মারা যায়। এইজন্য দুর্ভিক্ষ-কমিশন রেভেনিউ-বোর্ডকে খুব দোষ দিলেন। ১৮৬৭ অব্দের ১১ই আগস্ট রেভেনিউ-বোর্ড অজস্র ত্রুটি স্বীকার করিয়া বলিলেন, ‘সময় মতো কাজে হাত না দেওয়ায় এবং প্রয়োজনের তুলনায় ব্যবস্থা নিতান্ত অপর্যাপ্ত হওয়ায় দুর্দৈব ঘটিয়াছে। কর্মকর্তাদের মধ্যে আনাড়ি লোক ছিল, দুর্ভিক্ষের লক্ষণ দেখিয়াও তাঁহারা ধরিতে পারেন নাই। কাজে নামিতে অনেক দেরি হইয়া যাওয়ায় এমন অবস্থা ঘটিল যে শেষে টাকা দিয়াও খাদ্য মিলে নাই।’ রেভেনিউ-বোর্ড স্বীকার করিলেন, মিঃ র‍্যাভেন শ’র টেলিগ্রাম পাইয়া তৎক্ষণাৎ যদি কাজে নামা হইত, তাহা হইলে অসংখ্য জীবন রক্ষা পাইত।

 ১৯৪৩ অব্দের দুর্ভিক্ষের ঠিক এই অবস্থা। আনাড়ি লোকের উপর ভার দিয়া বিস্তর অঘটন ঘটিয়াছে। একজনে একটা কাজের ভার পাইলেন, সে বিষয়ে কিছু অভিজ্ঞতা লাভের পূর্বেই তাঁহাকে অন্য বিভাগে চালান করা হইল। বাঙলা ও কেন্দ্রীয় সরকার খাদ্য-সংক্রান্ত কর্মচারীদের এত রদবদল করিয়াছেন যে দ্রুততায় উহার কাছে সিনেমা-ছবিও হার মানিয়া যায়। ১৯৩৯ অব্দের অক্টোবর হইতে ১৯৪২ অব্দের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকার মূল্য-নিয়ন্ত্রণের জন্য ছয়টি কনফারেন্স করিয়াছেন। ১৯৪২ অব্দের ডিসেম্বরে খাদ্য-বিভাগ সৃষ্ট হয়; ১৯৪২ অব্দের এপ্রিলে ফল্ড এডভাইসরি কাউন্সিল হয়। ১৯৪৩ অব্দের এপ্রিলে রিজিওন্যাল ফুড-কমিশনার নিযুক্ত হন। গড়ে মাস দুয়েক অন্তর পর পর চারি জন ফুড-মেম্বার হইলেন। ইহা কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যাপার; বাঙলায় যে কত রকম পট-পরিবর্তন হইয়াছে, তাহা সকলেই আমরা চোখের উপর দেখিয়াছি।

 সরকারি ঔদাসীন্যের ফলে ১৯৪৩ অব্দে ঠিক ১৮৬৬ অব্দের মতো অবস্থা অতি শোচনীয় হইল। টাকা ফেলিলেও চাউল মিলে নাই। চাঁদা তুলিয়া নানা প্রতিষ্ঠান লোক খাওয়াইবার ব্যবস্থা করিল। সরকার মনে করিলেন, এই রকম হাজার কয়েক লোক খাওয়াইয়াই জনসাধারণ হাঙ্গামাটা চুকাইয়া দিবে, তাঁহাদের মাথা ঘামাইবার গরজ হইবে না। পেটের দায়ে মানুষ যে ঘরবাড়ি ছাড়িয়া পথে বাহির হইয়াছে, শহরমুখো ধাওয়া করিয়াছে, কর্তাদের সেদিকে নজর পড়িল না।

 অথচ এই অবস্থাই সকলের চেয়ে মারাত্মক। গ্রামের মধ্যে খাদ্য পৌঁছাইয়া দিলে লোকের ঘর-গৃহস্থালি খানিকটা বজায় থাকিত, তাহারা কিছু কিছু আয় করিতেও পারিত, যথাসম্ভব শীঘ্র স্বাবলম্বী হইয়া আবার মাথা তুলিবার প্রবৃত্তি তাহাদের মনের মধ্যে জাগরূক থাকিত। দুর্ভিক্ষ গ্রামের মানুষকে তাড়াইয়া শহরে আনে। যে ছিল গৃহস্থ, আত্মসম্মান হারাইয়া সে পথের ভিখারী হইয়া দাঁড়ায়। ১৮৭৮ অব্দের দুর্ভিক্ষ-কমিশনে স্যার রিচার্ড টেম্পল এই সম্পর্কে বলেন, ‘খাদ্যের সন্ধানে মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়িয়া যখন ঘোরাঘুরি আরম্ভ করে, দুর্ভিক্ষে সেই অবস্থা সকলের চেয়ে ভয়াবহ। ইহার ফলে লোক নীতিভ্রষ্ট হইয়া পড়ে। গ্রামে শৃঙ্খলার সহিত সাহায্যদানের ব্যবস্থা করিয়া এই ঘোরাঘুরি বন্ধ করিয়া ফেলা উচিত। কয়েকটি গ্রাম লইয়া এক একটি সাহায্যকেন্দ্র হইবে। উপযুক্ত সময়ে দ্রুত সাহায্যের ব্যবস্থা করিলে ঘোরাঘুরি বন্ধ হইবে।’

 ১৮৬৬ অব্দেও লোকে ঘরবাড়ি ছাড়িয়াছিল; ১৯৪৩ অব্দের মতোই সদর রাস্তায় মুমূর্ষ, অবস্থায় মানুষে পড়িয়া থাকিত। আগস্ট মাসে বৃষ্টিতে ভিজিয়া সেবার বিস্তর লোক মরিয়াছিল। দলে দলে অস্থিসার মানুষ লঙ্গরখানায় জমায়েত হইত। তাহাদের উপযুক্ত আশ্রয় ছিল না। সরকার লক্ষ্য করিলেন, বাহিরের লোক আসিয়া শহরের স্বাস্থ্য নষ্ট করিতেছে। তখন একরকম জোর করিয়াই শহরের অন্নসত্র বন্ধ করিয়া দেওয়া হইল; দুঃস্থদের বাহিরে পাঠানো হইল। সত্তর বৎসর পরে সেই ঘটনারই পুনরাবৃত্তি দেখিতে পাইয়াছি। সেবার কলিকাতা শহরে লোক জমিয়াছিল পনের ষোল হাজার। ১৯৪৩ অব্দে সরকারি অনুমান, একলক্ষ।

 সেবারও রান্না-করা খাদ্য দেওয়া হইত। এ সম্বন্ধে আপত্তি উঠিয়াছিল। কটকের রিলিফ-ম্যানেজার মিঃ কার্কউডের মতে, এই প্রকার সাহায্য দানে গ্রহীতার নৈতিক অধোগতি হয়। এ কথা ঠিক যে, লোকে রান্নাকরা খাদ্য গোপনে বিক্রি করিয়া উদ্দেশ্যের অপব্যবহার করিতে পারে না। কিন্তু আর একটা দিক ভাবিবার আছে। বহু পরিবারেরই এইরূপ সাহায্য লইতে ইজ্জতে বাধে, তাহারা নিঃশব্দে মৃত্যুপথের যাত্রী হয়। ১৯৪৩ অব্দেও এই সমস্যা দেখা দিয়াছে। যাহারা লঙ্গরখানায় যাইতে পারে না, তাহাদিগকে বাঁচাইবার জন্য সরকারি তরফ হইতে কি বিশেষ ব্যবস্থা হইয়াছিল?

 ১৮৭৩-৭৪ অব্দে দুর্ভিক্ষের সূচনাতেই সরকার অবহিত হইয়াছিলেন, তাই সেবার বেশি লোকক্ষয় হইতে পারে নাই। খাদ্যের সন্ধানে লোকে গ্রাম ছাড়িবার পূর্বেই যাহাতে সাহায্য পৌঁছায়, দেহের শক্তি অবশেষ হইবার আগে যাহাতে কাজ পায়, অতি দ্রুত তাহার ব্যবস্থা হইয়াছিল। প্রার্থী সাহায্যের যোগ্য কিনা, এ বিষয়ে স্থানীয় লোকের সাক্ষ্য সকলের চেয়ে প্রামাণ্য। শহরের উপর অন্নসত্র খুলিলে এই প্রমাণের উপায় থাকে না; অনেক বাজে লোক সাহায্য পায়, অথচ অধিকাংশ দুঃস্থ সেবাকেন্দ্রে পৌঁছিয়া উঠিতে পারে না। যাহাতে এইরকম গোল-যোগ না ঘটে, তখনকার ছোটলাট স্যার জর্জ ক্যাম্পবেল সে বিষয়ে বিশেষ উদ্যোগী হইয়াছিলেন। লোকজনকে তাহাদের ঘরবাড়িতে বসাইয়া নামে নামে এবং গ্রাম হিসাবে ভাগ না করিলে সুশৃঙ্খল সাহায্য অসম্ভব, এই ছিল তাঁহার অভিমত। পঞ্চাশ হইতে একশ’টি গ্রাম লইয়া এক একটি সাহায্যকেন্দ্র খোলা হইল; সমগ্র বাঙলাদেশকে এইভাবে ভাগ করিয়া ফেলা হইল। প্রতি কেন্দ্রে এক একটি বড় শস্যাগার—সেখান হইতে গ্রামের শস্যভাণ্ডারে খাদ্য পাঠান হইত। একজন দায়িত্বশীল কর্মচারী প্রতি সপ্তাহে কাজকর্ম পরিদর্শন করিতেন। ১৮৭৩-৭৪ অব্দে দুর্ভিক্ষ দমনের এই প্রচেষ্টা—সকল দিক দিয়া ইহাকে আদর্শস্থানীয় বলা খাইতে পারে। কিন্তু পঞ্চাশের মন্বন্তরে ইহা সম্পূর্ণ অবহেলিত হইয়াছে।

 কিন্তু সেবার এত সুব্যবস্থার মধ্যেও চাউল রপ্তানি হইতেছিল। স্যার জর্জ ক্যাম্পবেল উহার তীব্র প্রতিবাদ করেন। ১২ই অক্টোবর (১৮৭৩) তিনি আসন্ন বিপদ সম্পর্কে ভারত-সরকারকে সতর্ক করিয়া অনুরোধ জানাইলেন যেন—(১) অবিলম্বে সেবাকার্য শুরু করিয়া দেওয়া হয়; (২) বাহির হইতে চাউল আনিবার বন্দোবস্ত হয়; এবং (৩) ভারতবর্ষ হইতে চাউল রপ্তানি একেবারে বন্ধ করিয়া দেওয়া হয়। বড়লাট চাউল রপ্তানি বন্ধ করিতে রাজি হইলেন না; সেক্রেটারি অব স্টেটকে তাঁহার আপত্তির বিষয় জানাইলেন। যে-সব ভারতীয় কুলি মরিসস, ওয়েস্টইণ্ডিজ, সিংহল ও অন্যান্য দেশে গিয়াছে (বেশির ভাগই ইউরোপীয় বাগিচায় কাজ করিতে) চাউল বন্ধ করিলে তাহাদের উপায় কি? ১৯৪৩ অব্দে অবিকল ইহারই প্রতিধ্বনি শোনা গিয়াছে। সিংহলের ভারতীয় কুলি, ভূমধ্যসাগরের ভারতীয় সৈন্য—তাহাদের সকলের ভাবনা আমাদিগকে ভাবিতে হইয়াছে। ১৮৭৩-৭৪ অব্দে সুব্যবস্থা যত কিছু হইয়াছিল, কিছুই গ্রহণ করি নাই; কেবল সেবারকার চাউল রপ্তানি নীতিটা বহাল রাখিয়াছিলাম।[]

  1. যথা:—১৭৮৩, ১৮৬৬, ১৮৭৩-৭৪, ১৮৭৫-৭৬, ১৮৮৪-৮৫, ১৮৯১-৯২, ১৮৯৭, ১৯০০ ইত্যাদি।
  2. এই প্রবন্ধ-সংকলনে শ্রীযুত কালীচরণ ঘোষ কর্তৃক সংগৃহীত উপাদানের সাহায্য লওয়া হইয়াছে।