শ্যামাপ্রসাদের কয়েকটি রচনা/বঙ্কিমচন্দ্র
বঙ্কিমচন্দ্র
চুয়াল্লিশ বৎসর হইল, বঙ্কিমচন্দ্র বঙ্গমাতার অঙ্ক হইতে চিরবিদায় গ্রহণ করিয়াছেন। অনন্ত কালস্রোতের বক্ষে এই চুয়াল্লিশ বৎসর সময়কে সামান্য জলবুদ্বুদ-স্বরূপ মনে করিলেও বোধহয় অসঙ্গত হয় না, কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্রই বলিয়া গিয়াছেন—“বৎসরে কি কালের মাপ? ভাবে ও অভাবে কালের মাপ।”[১]
বাস্তবিক, বঙ্কিমচন্দ্রের জন্য আমাদের যে অভাববোধ—তাহার পরিমাপ বৎসর-গণনার দ্বারা নিরূপিত হয় না। তাঁহার ‘প্রতিভা-উৎসের ভাব-প্রবাহিণী হইতে বাঙালী যে নূতন জীবন-রস প্রাপ্ত’ হইয়াছে, এ কথা কখনও ভুলিবার নহে। তাই আজ মনে হইতেছে, যেন কত চুয়াল্লিশ বৎসর গত হইল, বঙ্কিমচন্দ্রকে আমরা হারাইয়াছি। তাই আজি তাঁহার শততম জন্মবার্ষিকী[২] উপলক্ষে বাংলার বহু স্থানেই তাঁহার স্মৃতিপূজার উৎসব আয়োজন হইয়াছে ও হইতেছে।
যে সাহিত্য মানুষ গড়ে, সেই সাহিত্যই তিনি গড়িয়া গিয়াছেন। “স্বদেশপ্রীতিকেই সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম বলা উচিত”—ইহাই ছিল তাঁহার মর্মোক্তি। গঙ্গা হিন্দুমাত্রেরই নিকট পরমপূজ্যা দেবীবিশেষ। তাঁহার ‘ইন্দিরা’তেও আছে “গঙ্গা যথার্থ পূণ্যময়ী”। কিন্তু দেশের জন্য দুঃখ করিতে গিয়া তিনি সেই গঙ্গার উদ্দেশ্যে নিঃসঙ্কোকচেই বলিয়াছেন— “তুমি যাহার পা ধুয়াইতে, সেই মাতা কোথায়?” সত্য সত্যই দেশমাতাকে তিনি সকল দেবতার উপর আসন দিয়াছিলেন। তাঁহার নিকট হইতে আমরা যে আদর্শ ভাষা, অমূল্য ভাব ও অপূর্ব সাহিত্য-সম্পদ্ লাভ করিয়াছি, তাহা তাঁহার অনন্যসাধারণ প্রতিভাপ্রসূত হইলেও, মনে রাখিতে হইবে, সে প্রতিভা তাঁহার প্রগাঢ় দেশপ্রীতির প্রভাবেই পরিাচালিত হইয়াছিল। তাঁহার প্রবল স্বদেশানুরাগই যে তাঁহার বঙ্গদর্শনের[৩] স্রষ্টা, এ কথা কে অস্বীকার করিবে?
“বঙ্গদর্শন বলিতে বঙ্কিমচন্দ্র এবং বঙ্কিমচন্দ্র বলিতে ‘বঙ্গদর্শন’-এর কথা স্বতঃই স্মরণ-পথে উদিত হয়। ‘বঙ্গদর্শন’-এর প্রথম সংখ্যাতেই তিনি ‘ভারতকলঙ্ক’ শীর্ষক প্রবন্ধ লিখিয়া তাঁহার স্বদেশবাসীকে বুঝাইয়া দেন যে, “মধ্যকালে যাহা ভারতকলঙ্ক বলিয়া মনে ধারণা করিয়াছ, ইতিহাসের সূক্ষ্ম অস্ত্র লইয়া সেই কলঙ্ক ব্যবচ্ছেদ করিলে দেখিবে, তাহাই ভারতগৌরব।”
‘বঙ্গদর্শন’ যখন প্রকাশিত হয়, তখন তাঁহার বয়স চৌত্রিশ বৎসর মাত্র। ভাবিলে বিস্মিত হইতে হয় যে, এত অল্প বয়সেই তিনি শিক্ষিত বাঙালীর উপদেষ্টার আসন গ্রহণ করিয়া তাঁহার ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রে এই উপদেশবাণী—“আমাদের ভরসা আছে। আমরা স্বয়ং নির্গুণ হইলেও রত্নপ্রসবিনীর সন্তান। সকলে সেই কথা মনে করিয়া জগতীতলে আপনার যোগ্য আসন গ্রহণ করিতে যত্ন কর।”—নানা প্রকারে প্রচার করিতে আরম্ভ করেন।
বঙ্কিমচন্দ্র বাঙলা ও বাঙালীর গৌরব। তাঁহার গৌরবে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ও আজ গর্ব ও গৌরব প্রকাশের অধিকারী। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন সর্বপ্রথম এণ্ট্রান্স্ ও বি. এ. পরীক্ষা গৃহীত হয়, তখন এই উভয় পরীক্ষারই উত্তীর্ণ ছাত্র তালিকায় তাঁহার নাম আমরা দেখিতে পাই। তারপর ১৮৮৫ খ্রীস্টাব্দ হইতে আরম্ভ করিয়া যতকাল তিনি জীবিত ছিলেন, ততকাল এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সদস্যপদে নিযুক্ত থাকিয়া ইহার কল্যাণসাধনের জন্য যত্ন ও শ্রম করিয়া গিয়াছেন। তাই তাঁহার তৈলচিত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্ষে সাদরে স্থাপিত রহিয়াছে। তাই তাঁহার শততম বার্ষিকী উপলক্ষে বাঙলার ছাত্র সম্প্রদায়কে উপহার দিবার উদ্দেশ্যেই কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হইতে আজ এই ‘বঙ্কিম পরিচয়’ প্রকাশিত হইল। বঙ্কিমচন্দ্রের রচনা-সমূদ্র মন্থন করিয়া ছাত্রগণের পাঠোপযোগী রচনামৃত ইহাতে সংগৃহীত হইয়াছে। তিনি বলিতেন, “কবিতা দর্পণমাত্র, তাহার ভিতর কবির অবিকল ছায়া আছে।”[৪] তাঁহার রচনা কবিতা না হইলেও সে রচনার ভিতর তাঁহার ছায়া দেখিতে পাওয়া যায়। বাঙলার যুবক সম্প্রদায় যদি এই পুস্তক মধ্যে তাঁহার ছায়া দেখিয়া তাহাকে চিনিতে ও বুঝিতে চেষ্টা করেন, তাহা হইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উদ্যম ও উদ্দেশ্য সার্থক হইল, বিবেচনা করিব।[৫]
- ↑ চন্দ্রশেখর।
- ↑ জুন, ১৯৩৮ খ্রীঃ।
- ↑ বঙ্গদর্শন-বঙ্কিম-সম্পাদিত মাসিকপত্র। প্রথম প্রকাশকাল ১৮৭২ খ্রীঃ।
- ↑ ঈশ্বর গুপ্তের কবিত্ব।
- ↑ ১৯৩৮ খ্রীস্টাব্দে বঙ্কিমচন্দ্রের শতবার্ষিকী উৎসব উপলক্ষে ডাঃ শ্যামাপ্রসাদের উৎসাহে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হইতে “বঙ্কিম-পরিচয়” নাম দিয়া বঙ্কিমচন্দ্রের বাণী-সংকলন প্রকাশিত হয়। এই প্রবন্ধ তাহারই ভুমিকাস্বরূপ মূদ্রিত হয়।