শ্যামাপ্রসাদের কয়েকটি রচনা/বাঙলার রঙ্গালয়
বাঙলার রঙ্গালয়
বর্তমানে ভারতে নাট্যাভিনয়ের যে প্রচলন আমরা দেখিতে পাই, পাশ্চাত্ত্য সভ্যতার প্রভাবের মধ্যে তাহার মূল নিহিত রহিয়াছে। ব্রিটিশ রাজত্বের গোড়ার দিকে যে কয়জন ইউরোপীয় ভদ্রলোক কলিকাতায় সখের নাট্যশালা নির্মাণ করিয়া নিজেদের আমোদ-প্রমোদের জন্য অভিনয় করিতেন, তাঁহারাই হইতেছেন বাঙলাদেশে আধুনিক রঙ্গালয়ের প্রবর্ত’ক। রঙ্গালয় প্রতিষ্ঠার পূর্বে বাঙলাদেশের লোকেদের আমোদ-প্রমোদের প্রধান বিষয় ছিল যাত্রা, কথকতা, কবিগান, তক্তা ও আখড়াই। ভারতের নাট্য-সাহিত্যের ইতিহাসে এমন এক সময় ছিল যখন রঙ্গালয় স্থাপন করিয়া অভিনয় করার রীতি অত্যন্ত সুপ্রচলিত ছিল। রঙ্গপীঠ, প্রেক্ষাগৃহ, নৃত্য-গীত-বাদ্য এবং অভিনয়ের নানা উপকরণের কথ্য সুবিখ্যাত ভরতনাট্যশাসের বিস্তৃতভাবে বর্ণিত আছে। প্রাচীন ভারতে একদিন নাট্যকলা উচ্চন্তরে উঠিয়াছিল সত্য, কিন্তু অষ্টাদশ শতকে প্রাচীন গৌরবের দিনগুলি হইতে বিচ্যুত হইয়া বাঙালীরা তাঁহাদিগের মূল্যবান কীর্তিগুলির কথা ভুলিয়া গিয়াছিলেন। ইংরাজদের সংস্পর্শে আসিয়া রঙ্গাভিনয়ের প্রতি তাঁহাদিগের সুপ্ত প্রীতি আবার জাগিয়া উঠিয়াছিল। লালবাজারের ‘ওল্ড প্লে হাউস’ কলিকাতায় ইংরাজদের প্রথম নাট্যশালা। ১৮৫৬ সালে কলিকাতা অবরোধকালের কিছু পূর্বে ইহার পত্তন হয়। হেরাসিম লেবেডেফ নামে একজন রুশ ভ্রাম্যমাণের চেষ্টায় বঙ্গ-রঙ্গালয়ে অভিনীত বাঙলা নাটকে ইউরোপীয় নাটকের আংগিক সর্বপ্রথম অনুসৃত হয়। মহামান্য গভর্ণর জেনারেলের অনুমতিক্রমে কলিকাতার মধ্যস্থিত ‘ডোমতলায়’ ১৭৯৫ সালে তিনি একটি ভারতীয় রঙ্গালয় প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে The Disguise এবং Love is the Best Doctor নামে দুইখানি ইংরাজি নাটকের স্বয়ং বঙ্গানুবাদ করিয়া বাঙালী নটনটীদের দ্বারা যথাক্রমে নভেম্বর ১৭৯৫ এবং মার্চ ১৭৯৬ সালে তিনি অভিনয় করান। ইতিমধ্যে ইংরাজদের রঙ্গালয়ের যথেষ্ট উন্নতি হইলেও ১৮৩১ সালের পূর্বে বাঙলা নাট্যাভিনয়ের সম্বন্ধে আর কোন সন্ধান পাওয়া যায় না। ইংরাজদের বহু নাট্যশালার মধ্যে বিখ্যাত ‘চৌরঙ্গী থিয়েটার’ ১৮১৩ সালে স্থাপিত হয়। দ্বারকানাথ ঠাকুর প্রমুখ কয়েকজন ধনী ব্যক্তি ছাড়া এই রঙ্গালয়ের প্রতি সাধারণ বাঙালীদের প্রথমে কোন আকর্ষণ ছিল না। ১৮৪১ সালে “সাঁ সুসি” নামে যে ইংরাজি রঙ্গালয়টি স্থাপিত হয়, তাহার অভিনয়-খ্যাতি হইয়াছিল প্রচুর। এই খ্যাতির কারণ হইতেছে এই, সেখানে সুপ্রসিদ্ধ সংস্কৃতজ্ঞ হোরেশ হোম্যান উইলসন, বোর্ডের মেম্বার টরেন্স, বোর্ডের জুনিয়র মেম্বার এইচ, এম, পার্কার ও ব্যারিস্টার হিউম (যিনি পরে কলিকাতার প্রধান ম্যাজিস্ট্রেট হইয়াছিলেন) প্রভৃতি উচ্চশ্রেণীর শিক্ষিত ইউরোপীয়েনরা অভিনয় করিতেন। যে সব ধনী বাঙালী দর্শ’ক-হিসাবে এই সব রঙ্গালয়ে যাতায়াত করিতেন, তাঁহারা এখানকার অভিনব অভিনয়-চাতুর্য, বিশেষ করিয়া অপরূপ দৃশ্যাবলী এবং তাহাদিগের ঐন্দ্রজালিক পরিবর্তন দেখিয়া মুগ্ধ হইয়াছিলেন। ইউরোপীয় আদর্শে নিজেদের আমোদ-প্রমোদকে উন্নত ও সুশোভিত করিবার বাসনা তাঁহাদিগের মনে তখন জাগিয়াছিল।
এইরূপে ১৮৩১ খ্রীস্টাব্দে শ্যামবাজারের নবীনচন্দ্র বসুর বাড়ি ‘বিদ্যাসুন্দর’ নামে একখানি জনপ্রিয় নাটক বিপুল অর্থ ব্যয় করিয়া অভিনীত হইয়াছিল। এই অভিনয়ের বৈশিষ্ট্য ছিল এই, ইহা ইংরাজি রঙ্গমঞ্চের হুবহু অনুকৃতি না হইলেও ইহার মধ্যে নূতনত্ব আনিবার একটা সুস্পষ্ট চেষ্টা ছিল। মেয়েদের চরিত্রগুলি বারনারীদের দ্বারা এবং নাটকের বিভিন্ন দৃশ্য বাড়ির বিভিন্ন স্থানে অভিনীত হইয়া-ছিল। দৃশ্য-পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দর্শকবৃন্দকেও দৃশ্যানুযায়ী স্থান পরিবর্তন করিতে হইয়াছিল। ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্যে স্থান-পরিবর্তনের সময় আসন সংগ্রহের জন্য অনবরত হুটোপাটি হওয়া সত্ত্বেও, অভিনয়ের মধ্যে নূতনত্ব থাকায়, দর্শকদের উৎসাহ বিন্দুমাত্র হ্রাস পায় নাই। এই অভিনয়ের সুখ্যাতি হইয়াছিল প্রচুর এবং সুখ্যাতির সহিত ব্যয়ের পরিমাণটিও তুলনীয়; কারণ ব্যয় হইয়াছিল সর্বসমেত দুই লক্ষ টাকা। অভিনয়ের সুখ্যাতির জন্য এই নাটক তিন-চার বছর ধরিয়া সুযোগসুবিধা মত নানা স্থানে অভিনীত হইয়াছিল; কিন্তু মেয়েদের ভূমিকা পতিতা নারীদের দ্বারা অভিনীত হওয়ায় ইহার বিরুদ্ধে প্রচুর আন্দোলনও হইয়াছিল। মজার কথা হইতেছে এই, এই বিরোধীদলের মধ্যে অনেক শিক্ষিত ইংরাজও ছিলেন। যাহা হৌক, দৃশ্যপটাদিসহ বিদ্যাসুন্দরের অভিনয়-কৌশল ভবিষ্যতে নূতন নাটকের প্রযোজনায় একটা সাধারণ নাট্য-রীতির সৃষ্টি করিয়াছিল।
কিন্তু অসুবিধা হইল, এই সব তরুণ মনের আশা পুরাইতে পারে এমন কোন বাঙলা নাটক তখন ছিল না। খাঁটি বাঙলা নাটকের অভাবে ইংরাজি নাটকের অভিনয়ে মুগ্ধ হইয়া তাঁহারা ইংরাজি নাটকের অভিনয় করিতে লাগিলেন। কিন্তু এইরূপ অভিনয় অল্পশিক্ষিত সাধারণ লোকের নাট্য-পিপাসা দূর করিতে পারে নাই; কারণ ইহা তাহাদিগের নিকট দুর্বোধ্য ছিল। ইতিমধ্যে তাহারা নাট্যাভিনয় সম্বন্ধে বিশেষভাবে সচেতন হইয়া উঠিয়াছিল এবং স্বভাবতঃই উপযুক্ত বাঙলা নাটকের অভিনয় দেখিবার জন্য আগ্রহান্বিত হইয়া উঠিয়াছিল। এই সময়ে দুই একখানি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নাটিকার অভিনয় দেখার সুযোগ তাহাদের হইয়াছিল বটে, কিন্তু সেগুলি এত দোষ-ত্রুটিপূর্ণ ছিল যে, তাহা জন-সাধারণের ক্রমবর্ধমান নাট্য-পিপাসা ঘুচাইতে পারে নাই। ইংরাজি নাটকের অভিনয় সৌকর্যে যাঁহারা মুগ্ধ হইয়াছিলেন, তাঁহাদের কাছে এই সব নাটকে ভাষা, শব্দ ও রচনারীতির অপপ্রয়োগ, বিষয়বস্তুর আকর্ষণ-হীনতা, নাট্যকারদের নাট্য-প্রয়োগ-কৌশল সম্বন্ধে অজ্ঞতা, যেমন ‘প্রবেশ’ ও ‘নির্গমন’ এবং’ ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্যে নাটকীয় কাহিনীকে বিভাগ করার বিষয়ে যে সকল ত্রুটি দেখা গিয়াছিল, তাহা তাঁহাদিগকে নিরাশ করিয়া-ছিল। ১৮৫৭ সালে পণ্ডিত রামনারায়ণ তর্করত্নের একখানি বাঙলা নাটক অভিনয় না হওয়া পর্যন্ত, বাঙলা নাটক ও নাট্যাভিনয়ের অবস্থা এইরূপ চলিয়াছিল।
ইংরাজি ১৮৫৭ সাল বাঙলা নাটকের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় বৎসর। এই সময়ে এমন একটি নাটকের প্রকাশ হইয়াছিল, যাহার উদ্দেশ্য এবং মৌলিকতা দর্শকদের বহুদিনকার আকাঙ্ক্ষিত নাটকের অভাব পূর্ণ করিয়াছিল এবং ইংরাজি নাটক অভিনয়ের যে প্রথা এতদিন প্রচলিত ছিল, তাহার মূলে আঘাত হানিয়াছিল। সেই নাটকের নাম 'কুলীনকুল-সর্বস্ব'। সেই নাটক বাঙালীদের কাছে সহজেই গ্রহণীয় হইয়াছিল। তাঁহারা এই ভাবিয়া খুশী হইয়াছিলেন যে, যাঁহারা এই নাটকের অভিনয় আয়োজন করিয়াছেন, তাঁহাদের প্রধান উদ্দেশ্য হইতেছে, বহুবিবাহ এবং কৌলীন্য প্রথার অতিশয় ক্ষতিকর দোষগুলি প্রদর্শন করাইয়া সমাজের মঙ্গল করা। ১৮৫৭ সাল আর এক বিষয়ে বাঙলার রঙ্গমণ্ডের ইতিহাসে স্মরণীয়। বর্তমান কালে আমরা যে রঙ্গমঞ্চে দৃশ্যপটের ব্যবহার দেখিতে পাই, তাহার প্রচলন এই কুলীনকুল-সর্বস্ব নাটকেই প্রথম দেখা গিয়াছিল। তদানীন্তন কালের রঙ্গমঞ্চে নাটা-প্রয়োগ বিষয়ে যতখানি কৌশল ও বৈচিত্র্য সম্পাদন করা সম্ভব, তাহা এই নাটকের অভিনয়ে প্রয়োগ করা হইয়াছিল। বস্ত্রের দ্বারা রঙ্গমঞ্চ-সজ্জার মৌলিকতা তৎক্ষণাৎ দর্শকদের প্রশংসা অর্জন করিয়াছিল এবং আরও মৌলিক নাট্যাভিনয়ের জন্য তাহারা বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ হইয়াছিল।
এখানে এই কথা বলা আবশ্যক যে, এই নাট্যাভিনয়ের পরে যে বাঙলা নাটকগুলি অভিনীত হইয়াছিল তাহাদের মধ্যে সবই ছিল সংস্কৃতের অনুবাদ। ইহা হইতে এই তথ্য বিশেষভাবে প্রমাণিত হয়, যে যুগে সংস্কৃত নাটক হইতে ইংরাজিতে অনুবাদ করিয়া অভিনয় করার প্রয়োজন ও সম্ভাবনা দেখা দিয়াছিল, সে যুগ আর নাই। এ কথা সত্য, ১৮৩২ সালে মৌলিক বাঙলা নাটকের যেমন অভাব ছিল, এ-যুগেও তেমনি ছিল। তবে একথা দ্বিগুণ জোরের সহিত বলা চলে, সংস্কৃত নাটকের অভিনয় হইতেই মৌলিক বাঙলা নাটক লেখার প্রেরণা আসিয়াছিল এবং ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত মধুসূদনের ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটকে সেই মৌলিকতা দেখা গিয়াছিল। আর বেশীদূর অগ্রসর না হইয়া, ‘কুলীনকুল-সর্বস্ব’ হইতে ‘রত্নাবলী’র অভিনয় পর্যন্ত নাটকীয় ইতিহাসের ঘটনাবলী কালানুসারে সাজাইয়া দিলে বুঝিবার পক্ষে আগ্রহ জাগিবে। নাট্য-সাহিত্যের ইতিহাসে এ-যুগকে প্রধানত অনু-বাদের যুগ বলা হয়।
১৮৫৭-(১) কুলীনকুল-সর্বস্ব নাটকের প্রথম অভিনয় হয় পাথুরিয়া-ঘাটা অঞ্চলের চড়কডাঙ্গাস্থিত জয়রাম বসাকের বাড়ি। অভিনেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হইতেছেন ‘বেঙ্গল থিয়েটারে’র পরবর্তীকালের ম্যানেজার, অভিনেতা ও নাট্যকার বিহারীলাল চট্টোপাধ্যায়। এই অভিনয়ে বিহারীলাল একটি স্ত্রী-চরিত্র গ্রহণ করিয়াছিলেন।
(২) কুলীনকুল-সর্বস্বের অভিনয়ের পরের দিন আশুতোষ দেবের (সাতুবাবুর) বাড়িতে শকুন্তলা অভিনয় হয়। সাতুবাবুর পৃষ্ঠপোষকতায় সংস্কৃত হইতে শকুন্তলার অনুবাদ করা হয়। ‘বেঙ্গল থিয়েটারে’র ভাবী স্বত্বাধিকারী শরৎচন্দ্র ঘোষ ইহাতে অভিনয় করিয়াছিলেন। দর্শক-হিসাবে উপস্থিত ছিলেন-পাইকপাড়ার রাজা প্রতাপচন্দ্র সিংহ ও ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ এবং বাবু (পরে মহারাজা) যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর।
(৩) রামনারায়ণ তর্ক’রত্নের দ্বারা অনুদিত বেণী-সংহারের প্রথম অভিনয় হয়, মহাভারতের বিখ্যাত অনুবাদক কালীপ্রসন্ন সিংহের জোড়া-সাঁকোর বাড়িতে। অভিনেতাদের মধ্যে প্রধান হইতেছেন কালীপ্রসন্ন সিংহ, উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (ব্যারিস্টার, বিখ্যাত গুরু, সি, ব্যানার্জি) এবং বিহারীলাল চট্টোপাধ্যায়।
(৪) বেণী-সংহারের অভিনয়ের আট মাস পর কালীপ্রসন্ন সিংহের বাড়িতে বিক্রমোর্বশীর বঙ্গানুবাদের প্রথম অভিনয় হয়। বেণী-সংহারের অভিনয়-সাফল্যে উৎসাহিত হইয়া কালীপ্রসন্ন নিজেই কয়েকজন পণ্ডিতের সাহায্যে বিক্রমোর্বশীর বঙ্গানুবাদ করেন এবং স্বয়ং পুরুরবার ভূমিকা গ্রহণ করেন। এই অভিনয় দেখিবার জন্য বাঙলা সরকারের তখনকার কর্মসচিব সার সিসিল বিডন এবং আরও কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী নিমন্ত্রিত হইয়া উপস্থিত ছিলেন।
১৮৫৮-এই বছরের ৩১শে জুলাই রাজা ঈশ্বরচন্দ্র সিংহের বেলগাছিয়ার বাগানবাড়িতে রত্নাবলীর বঙ্গানুবাদের প্রথম অভিনয় মহাধুমধামে সম্পন্ন হয়।
১৮৫৮ সালে অর্থাৎ রত্নাবলীর অভিনয়ের বছরে বাঙলা রঙ্গমণ্টের অগ্রগতি আর একটু, প্রসারিত হয়। এতদিন পর্যন্ত অস্থায়ী রঙ্গমঞ্চে যে অভিনয় চলিয়া আসিতেছিল, এবার তাহার একটু, পরিবর্তন হয়। পাইক-পাড়ার রাজাদের বদান্যতায় তাঁহাদেরই বেলগাছিয়ার বাগানবাড়িতে স্থায়ী রঙ্গমঞ্চে রত্নাবলীর অভিনয় হয়। এই নাট্যাভিনয়ের একটি বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে, অভিনয় কালে ইংরাজি রঙ্গালয়ের অনুসরণে ঐকতান-বাদনের প্রথম প্রবর্তন করা হয়। বাঙলা নাট্য-সাহিত্যের ইতিহাসে রত্নাবলীর অভিনয় আরও একটি বিষয়ে স্মরণীয়। ইহা মধুসূদনের শর্মিষ্ঠা নাটক এবং আরও অনেক মৌলিক বাঙলা নাটকের রচনা-বিষয়ে পথপ্রদর্শক। রত্নাবলীর পরে আরও কয়েকখানি নাটকের অভিনয়ের তালিকা নিম্নে প্রদত্ত হইল।
১৮৫৯-(১) সেপ্টেম্বর মাসে মধুসূদনের শর্মিষ্ঠা নাটকের প্রথম অভিনয় হয় বেলগাছিয়া থিয়েটারে। রত্নাবলীর ন্যায় এ নাটকের অভিনয় অতি ধুমধামের সহিত সম্পন্ন হয় এবং রত্নাবলীর ন্যায় নাট্যকার নিজেই এ নাটকের একটি ইংরাজি অনুবাদ করেন। ইংরাজি নাটকের অনুসরণে এ নাটকের আংগিক রচনা করা হয় এবং শিক্ষিত লোকেরা ইহাকে সমাদরে গ্রহণ করেন; কিন্তু একদল প্রাচীনপন্থী পণ্ডিত ইহার বিরোধী ছিলেন। শর্মিষ্ঠা প্রকাশের পর রামনারায়ণের খ্যাতি মধুসুদনে আরোপিত হইয়াছিল। তখন লোকে সংস্কৃত অনুবাদের সাহায্যে নাট্যাভিনয় দর্শনে ক্লান্তি বোধ করিতে-ছিল। তাই তাহারা সংস্কৃত নাটকের দাঁতভাঙ্গা শব্দাবলী ত্যাগ করিয়া সহজ প্রথায় লেখা ইংরাজি নাটকের আদর্শে গঠিত বাঙলা নাটকের পক্ষপাতী হইয়া উঠিতেছিল।
(২) শকুন্তলার দ্বিতীয় অভিনয় হয় জনাই-এর বিখ্যাত জমিদার চন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের আহিরীটোলার বাস-ভবনে।
১৮৬০-সুপ্রসিদ্ধ কেশবচন্দ্র সেনের শিক্ষা ও পরিচালনায় বড়বাজার সিন্দুরিয়াপটিস্থিত গোপালচন্দ্র মল্লিকের গৃহে বিধবা-বিবাহ নাটকের অভিনয় হয়। ইহার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বেলগাছিয়া থিয়েটারের খ্যাতিকে নিষ্প্রভ করা এবং সেই কথা মনে রাখিয়া ইহার উদ্যোক্তারা বহু পরিশ্রম করিয়াছিলেন। একজন বিখ্যাত ইংরাজ চিত্রকরের দ্বারা দৃশ্যপট অঙ্কিত করানো হইয়াছিল এবং গান ও ঐকতান-বাদনের ভার সূযোগ্য বাক্তির উপর অর্পিত হইয়াছিল। ‘বিশ্বকোষে’র মতে, ইহার অভিনয় বেলগাছিয়া থিয়েটার অপেক্ষা কোনক্রমেই ন্যূন হয় নাই এবং ইহাতে সর্বসমেত চার হাজার টাকা ব্যয় হইয়াছিল।
১৮৬৪-(১) মধুসূদনের একেই কি বলে সভ্যতা রাজা দেবীকৃষ্ণ দেবের বাড়িতে প্রথম অভিনীত হয়। শোভাবাজারের রাজারা ‘শোভাবাজার প্রাইভেট থিয়েট্রিক্যাল সোসাইটি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করেন। ইহা চমৎকারকৃষ্ণ ঘোষের বহি বাটীতে স্থাপন করা হয়। এই প্রতিষ্ঠান তিনটি অভিনয়ের আয়োজন করেন, তন্মধ্যে একটিতে কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় দর্শক হিসাবে উপস্থিত ছিলেন।
(২) কালিদাস সান্যালের রচিত নলদময়ন্তী নাটক বাগবাজারের গোপাল-চন্দ্র চক্রবর্তী’র অধিনায়কত্বে অভিনীত হয়। অভিনেতাদের মধ্যে একজনের নাম গিরিশচন্দ্র ঘোষ। ইনি সুবিখ্যাত কবি ও নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ নন, ইনি “ল্যাদাড় গিরিশ” নামে পরিচিত ছিলেন। দুই বৎসর পরে চটামহেশতলা গ্রামের গিরিশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ইন্দুপ্রভা নাটক এই সম্প্রদায় কর্তৃক অন্ততঃ পরপর সাতবার অভিনীত হয়।
১৮৬৫—যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের উৎসাহে পাথুরিয়াঘাটা রাজবাড়িতে মালবিকাগ্নি মিত্র নাটকের অভিনয় হয়। যতীন্দ্রমোহনের গৃহে তাঁহার নিজস্ব একটি নাট্যশালা ছিল, সেখানে মাঝে মাঝে তাঁহার নিজের লেখা নাটক -যেমন কর্ম তেমনি ফল, বিদ্যাসুন্দর, মালতীমাধব, উভয়সংকট, চক্ষুদান, বুঝলে কি, রুক্মিণী হরণ প্রভৃতি অভিনীত হইত। এই সকল অভিনয়ে বিনামূল্যে টিকিট বিতরণ করা হইত। যাহারা রাজবাড়ির গেটে টিকিট দেখাইতে পারিত না, তাহারা দরওয়ানদের দ্বারা অপমানিত হইয়া গৃহে ফিরিয়া যাইত।
১৮৬৬—(১) বৈশাখ মাসে এই নাটকগুলি অভিনীত হইয়াছিল—মহাশ্বেতা, শকুন্তলা, মধুসূদনের বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ, নিমাইচরণ শীলের চন্দ্রাবলী এবং একখানি প্রহসন-এরাই আবার বড়লোক।
(২) চৈত্র মাসে নীলমণি মিত্রের বাড়িতে (স্যার রমেশচন্দ্র মিত্রের পৈতৃক বাস-ভবনে) উমেশচন্দ্র মিত্রের লেখা সীতার বনবাস অভিনীত হয়।
(৩) মধুসূদনের পদ্মাবতী অভিনীত হয় শিমুলিয়ায় (শাড়ীপাড়া)। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, বাঙলার সাধারণ রঙ্গমঞ্চের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনেতাদের শিক্ষা দিয়াছিলেন।
১৮৬৭—(১) ১২ই ফেব্রুয়ারি শোভাবাজার রাজবাটীতে মধুসূদনের কৃষ্ণকুমারী নাটকের অভিনয় হয়। দর্শকদের মধ্যে বাঙলা রঙ্গমণ্ডের জনক গিরিশচন্দ্র ঘোষ উপস্থিত ছিলেন। তিনি তখন তেইশ বৎসরের যুবক। নায়ক ভীমসিংহের চরিত্র অভিনয় করিয়াছিলেন বিহারীলাল চক্রবর্তী। ছয় বৎসর পরে গিরিশচন্দ্র এই ভূমিকা অভিনয় করিয়া বিহারীলালের খ্যাতিকে স্নান করিয়া অপূর্ব সার্থকতা লাভ করিয়াছিলেন।
(২) বহু বিবাহের বিরুদ্ধে লেখা রামনারায়ণ তর্করত্নের নব নাটক ৬ই জানুয়ারি দ্বারকানাথ ঠাকুরের পুত্র গিরীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়িতে “জোড়াসাঁকো নাট্য-সমাজে” অভিনীত হয়। এই নাটকথানি লিখিয়া রামনারায়ণ পুরস্কার পাইয়াছিলেন।
(৩) মধুসূদনের পদ্মাবতী নাটকের দ্বিতীয় অভিনয় হয় ৩০৯নং আপার চিৎপুর রোডস্থিত বিখ্যাত জয়চাঁদ মিত্রের পুত্র পাঁচকড়ি মিত্রের বাড়িতে। সেখানে নাট্য-শিক্ষক ছিলেন বিহারীলাল চক্রবর্তী এবং সংগীত-শিক্ষক ছিলেন প্রসিদ্ধ সংগীতজ্ঞ জওলাপ্রসাদ এবং নিতাই চক্রবর্তী।
(৪) ২রা নভেম্বর হরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের কয়লাহাটার বাড়িতে (রতন সরকার গার্ডেন পাটি, জোড়াসাঁকো) ভোলানাথ মুখোপাধ্যায়ের লেখা প্রহসন কিছু কিছু বুঝি অভিনীত হয়। ভোলানাথ মুখোপাধ্যায় নাটক এবং যাত্রা, পাঁচালী ও তর্জার গান লেখায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। এই প্রহসন-খানি তিনি লিখিয়াছিলেন যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের প্রহসন ‘বুঝলে কি’—র প্রত্যুত্তরে। এই অভিনয় বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য যে, ইহাতে ভবিষ্যৎ সাধারণ রঙ্গমঞ্চের দুইজন নেতা-অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি এবং ধর্ম’দাস সূর প্রথম নাট্য-পরিচালনা ব্যাপারে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। অর্ধেন্দুশেখর নাটা-শিক্ষকের কার্য’ করিয়াছিলেন এবং তদতিরিক্ত ‘দন্তবক্র’, ‘মুরাদ আলি’ এবং ‘চন্দনবিলাসে’র চরিত্র অভিনয় করিয়াছিলেন। পরবর্তী কালের বিখ্যাত স্টেজ-ম্যানেজার ধর্ম’দাস সূর রঙ্গমঞ্চ তৈরি করিয়াছিলেন এবং ‘চন্দনবিলাসে’র ভূমিকা অভিনয় করিয়াছিলেন।
১৮৬৮—এই সময়ে যদুনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে (রাজবল্লভপাড়া, বাগবাজার) রত্নাবলীর পুনরাভিনয় হয় এবং প্রিয়মাধব বসু-মল্লিকের লেখা একখানি প্রহসন অভিনীত হয়। এ-খানি কিছু কিছু বুঝি-র বিরুদ্ধে বিষোঙ্গার।
তখনকার দিনে এই সব আমোদ-প্রমোদ জনসাধারণের মনকে আকর্ষণ করিয়াছিল এবং ইহার প্রভাব কলিকাতার সর্বত্র ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। কলিকাতার চোরবাগান, বহুবাজার এবং সহরতলীর ভবানীপুর ও শিবপুর-এই সব স্থানে নাট্যাভিনয় লইয়া প্রতিযোগিতা চলিত। কলিকাতার গণ্ডী ছাড়াইয়া ক্রমে চু’চূড়া এবং মফঃস্বলের সহরেও যে নাট্যাভিনয় ছড়াইয়া পড়িয়াছিল, তাহার প্রমাণও যথেষ্ট পাওয়া যায়। ১৮৬৮ সালে যে সকল নাটা-সংঘ গড়িয়া উঠিয়াছিল তাহাদিগের মধ্যে বহুবাজারে অবস্থিত “বহুবাজার অবৈতনিক নাটা-সমাজ” সবিশেষ খ্যাত। এই প্রতিষ্ঠান রঙ্গমঞ্চের ইতিহাসের অগ্রগতিতে কম সাহায্য করে নাই। কারণ এখানে বহুবাজারের বসুগণ যে স্থায়ী রঙ্গমঞ্চের সূচনা করেন, তাহাতে মনোমোহন বসুর লেখা নাটকগুলি অভিনীত হইবার সুযোগ পাইয়াছিল। নিকটবর্তী’ ধর-পরিবারের সহিত একযোগে বসু-পরিবারের মতিলাল বসু ও চুণীলাল বসু নাট্যাভিনয়ে অগ্রসর হইয়াছিলেন। তাঁহাদিগের নেতৃত্ব করিয়াছিলেন অক্লান্তকর্মী এবং অভিনেতা প্রতাপচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। এই বসুগণ, প্রতি শনিবারে যে অভিনয় হইত তাহার সকল ব্যয় এবং ছয় বৎসর ধরিয়া প্রতি সপ্তাহে বিশেষ বিশেষ অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য যে ব্যয় হইত, তাহা বহন করিতেন। ইহার পরে অর্থের অভাবে এখানকার অভিনয় বন্ধ হইয়া যায়। এই বহুবাজার থিয়েটারে মনোমোহন বসুর “রামের রাজ্যাভিষেক”, “সতী” এবং “হরিশ্চন্দ্র” অভিনীত হয়। সংগীত, দৃশ্যপটাদি, বাচন-ভঙ্গী, ঐকতান এবং সাধারণ পরিচালনা বিষয়ে অভিনয় এত সুসংগত হইত যে, তাহার খ্যাতি সহরের সর্বত্র ছড়াইয়া পড়িয়াছিল এবং ভারতীয় ও ইউরোপীয় সকল দর্শকই একবাক্যে উহার প্রশংসা করিয়াছিলেন।
১৮৩১ সালের প্রথম বাঙলা নাটকের অভিনয়কাল হইতে এ পর্যন্ত আমরা যত নাটক অভিনীত হইবার সংবাদ পাইয়াছি, তাহার সংখ্যা ও মূল্য কম নয়। এ কথা স্বীকার করিতে হইবে যে, বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিরা যে অভিনয়ের আয়োজন করিয়াছিলেন, তাঁহাদিগের কৃতিত্ব স্বল্প নয়; কিন্তু তাঁহারা যে জনসাধারণের আমোদ-প্রমোদের জন্য উৎসুক ছিলেন, সে-কথা বলা যায় না। যদিও এমন এক সময় ছিল, যখন ঠাকুর পরিবারের মধ্যে নিজেদের অভিনয়কে ক্রমশঃ জনপ্রিয় করিবার জন্য বিনামূল্যে টিকিট বিতরণ করিবার ইচ্ছা জাগিয়াছিল। কিন্তু মনে রাখিতে হইবে, যাহারা ধনী এবং পদস্থ ব্যক্তি তাঁহাদিগকেই সাধারণতঃ বিনামূল্যের টিকিটে আমন্ত্রণ জানানো হইত। যাহা হৌক, বিনামূল্যের টিকিট সাধারণ লোকের জন্য ছিল না এবং তাহারা নাট্যশিল্পের প্রতি যতই অনুরাগী হৌক না কেন, তাহাদিগকে নিরাশ হইতে হইত। কিন্তু এখান হইতেই একদল তরুণ উদ্যোক্তার মনে এই চিন্তা জাগিল যে, জনসাধারণের আনন্দের জন্য একটি রঙ্গালয়ের প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে।
ঠাকুর-পরিবারের অভিনয় উপলক্ষে বিনামূল্যের টিকিট সংগ্রহের যে বাধা এবং প্রবেশের যে কঠিন নিয়ম ছিল, তাহা দেখিয়া একজন দর্শকের মনে হইয়াছিল যে, ঠাকুর-পরিবারের এই রক্ষণশীল নিয়মের বিরুদ্ধে একটা ব্যবস্থা করিতে হইবে এবং পদমর্যাদা এবং জাতিবর্ণের ভেদাভেদের দিকে না তাকাইয়া নাট্যাভিনয়কে সকলের পক্ষে সহজ করিতে হইবে। এই দর্শকটি আর কেহ নন, তিনি হইতেছেন তরুণ গিরিশচন্দ্র ঘোষ। ধনীর সাহায্য ব্যতীত কোন পরিকল্পনা করিতে গেলে, খরচের দিকটা বাধাস্বরূপ হইয়া ওঠে। তথাপি এক্ষেত্রে নিরাশার গহ্বর হইতে আশার উৎস দেখা দিয়াছিল। গিরিশচন্দ্র নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও ধর্ম’দাস সুর প্রভৃতি বন্ধ ও প্রতিবেশীদের সহিত পরামর্শ করিয়া স্থির করিয়াছিলেন যে, খরচের স্বল্পতার দিক দিয়া যাত্রা পার্টির স্থাপনা করা মন্দ নয় এবং তদনুযায়ী ১৮৬৭ সালে তাঁহারা বাগবাজারে একটি কোম্পানী সৃষ্টি করিয়া মধুসূদনের “শর্মিষ্ঠা” অভিনয়ের আয়োজন করিয়াছিলেন। কয়েকটি অতিরিক্ত গানের প্রয়োজন হওয়ায় প্রসিদ্ধ গীতকার প্রিয়মাধব মল্লিককে রচনা করিবার জন্য অনুরোধ করা হয়, কিন্তু তিনি কোন প্রকার উৎসাহ না দেখানোতে উদ্যোক্তারা নিজেদের শক্তির উপর নির্ভর করেন। কাজটি গিরিশচন্দ্রকে দেওয়া হয় এবং তিনি তাঁহার বন্ধু উমেশচন্দ্র চৌধুরীর সহযোগে প্রয়োজনীয় গানগুলি রচনা করিয়া ফেলেন। শর্মিষ্ঠার অভিনয় হয় এবং বাগবাজারে সে অভিনয়ের প্রশংসাও যথেষ্ট শোনা গিয়াছিল। ইতিমধ্যে গিরিশচন্দ্র থিয়েটার কোম্পানী স্থাপনার বিষয়ে তাঁহার মনোগত ইচ্ছার কথা ভুলিয়া যান নাই, যদিও আনুষঙ্গিক ব্যয়ের অসম্ভব্যতা বিশেষভাবে তাঁহার মনকে আলোড়িত করিতেছিল। যাহা হৌক, একটি সুন্দর সুযোগ শীঘ্রই তাঁহার নিকট উপস্থিত হইয়াছিল। এই সময়ে দীনবন্ধু মিত্র তাঁহার “সধবার একাদশীর” অভিনয় করাইয়াছিলেন এবং সেই অভিনয় অভূতপূর্ব-ভাবে লোকপ্রিয় হইয়াছিল এবং লোকের মুখে মুখে তাহার আলোচনা চলিতেছিল। বাঙলার তরুণদের মুখে তখন ‘নিমচাঁদের’ অজস্র প্রশংসা শোনা যাইতেছিল। গিরিশচন্দ্র দূরদৃষ্টির বলে তখনই অল্প ব্যয়ে এই নাটকের অভিনয়ের কথা ভাবিয়াছিলেন। ব্যয়বহুল অভিনয় করিবার ক্ষমতা তখন তাহাদের ছিল না। এই নাটক সামাজিক বিষয়ের হওয়ায়, উদ্যোক্তারা এতদিন পর্যন্ত যে বিপদের সম্মুখীন হইয়াছিলেন, তাহা অনেকটা কাটিয়া গেল। পোশাক-পরিচ্ছদ বিষয়ে কোন খরচ ছিল না, কারণ ইহাতে বাঙালী ঘরের সাধারণ পরিচ্ছদের দ্বারা অভিনয় করা চলিবে। দৃশ্যপট বিষয়ে গিরিশচন্দ্র বলিয়াছিলেন যে, তাহা মোটামুটি সহজভাবে রচনা করা হইবে। এই প্রস্তাব সুন্দর মনে হওয়ায় তরুণেরা তৎক্ষণাৎ কাজে লাগিয়া গিয়াছিলেন। বাগবাজারের হরলাল মিত্রের লেনে অরুণচন্দ্র হালদারের গৃহে রিহার্সাল আরম্ভ হইয়া গেল এবং বাগবাজারের সৌখীন দলের যাঁহারা সম্প্রতি “শর্মিষ্ঠা যাত্রা” করিয়াছিলেন, তাঁহাদিগের মধ্য হইতে অভিনেতা বাছাই করা হইল। নাটকের মধ্যে গানের প্রয়োজন হইলে গিরিশচন্দ্রকে অনুরোধ করা হইল। ইতিপূর্বে গিরিশচন্দ্র মেসার্স এ্যাটকিনসন টিল্টন এণ্ড কোম্পানীতে বুক-কিপারের কাজ করিবার সময় সাহিত্যিক এবং সংস্কৃতিবান লোক বলিয়া পরিগণিত হইয়াছিলেন। তিনি তৎকালীন প্রচলিত জনপ্রিয় হিন্দী গানের রীতি অনুসারে কয়েকটি বাঙলা গান লিখিয়া দিলেন এবং তখনকার রীতি অনুসারে একটি প্রস্তাবনাও লিখিয়া ফেলিলেন। তাহা মূল নাটকে ছিল না।
এই সময়ে একজন নূতন অভিনেতার আগমন হওয়ায় বাগবাজার এমেচার কোম্পানীর শক্তি আরও বাড়িয়া গেল। তখনই তাঁহার প্রতিভা দেখিয়া মনে হইয়াছিল যে, ভবিষ্যতে বাঙলা রঙ্গমঞ্চের ইতিহাসে তিনি নাম রাখিয়া যাইবেন। তিনি হইতেছেন প্রসিদ্ধ নট অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি। নাটক ও নাট্যাভিনয় বিষয়ে তিনি এরূপ আগ্রহ প্রকাশ করিতেন যে, তাহাতে পরিচালক গিরিশচন্দ্র তাঁহাকে সধবার একাদশীর রিহার্সালে উপস্থিত হইতে অনুরোধ জানাইয়াছিলেন। অর্ধেন্দুশেখরের এই উপস্থিতি গিরিশচন্দ্রের সহিত যে মিলন ঘটাইয়াছিল, তাহাতে এই দুই মনীষীর মধ্যে প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করিয়াছিল, এবং আজিকার দিনে বঙ্গ-রঙ্গমঞ্চের যে উন্নতি দেখা যাইতেছে, তাহার মূলে রহিয়াছে এই দুই জনের মিলুন। ইতিপূর্বে উভয়পক্ষীয় কয়েকজন বন্ধুর নিকট হইতে গিরিশচন্দ্র অর্ধেন্দর নাট্য-প্রতিভার কথা শুনিয়াছিলেন এবং শুনিয়াই সানন্দে তাঁহাকে দলভুক্ত করিয়াছিলেন। অর্ধেন্দু ছোট ছোট ভূমিকাগুলি শিখাইবার ভার লওয়ায়, গিরিশচন্দ্র দিনের বেলায় অফিস ও রাত্রিতে রিহার্সাল-এইরূপ কঠিন পরিশ্রম হইতে কিছুটা রেহাই পাইয়াছিলেন। অর্ধেন্দুর অসাধারণ অভিনয় শক্তি শীঘ্রই সকলের দৃষ্টিগোচর হইল এবং অরুণচন্দ্র হালদার যিনি ‘কেনারামের’ ভূমিকা করিতেছিলেন, তিনি সানন্দে তাহা অর্ধেন্দুকে ছাড়িয়া দিলেন।
তারপরে আসিল ১৮৬৯ সালের (১২৭৫ বঙ্গাব্দের) স্মরণীয় সপ্তমী পূজার দিন। সেদিন দীনবন্ধুর প্রথম সৃষ্ট নাটকের অভিনয় হইল এবং সেদিন যুবকগণের বহু দিনের মনের আশা ও আকাঙ্ক্ষা সার্থকতা লাভ করিল। যাঁহারা অভিনয় করিয়াছিলেন তাঁহাদিগের মধ্যে গিরিশচন্দ্র এবং অর্ধেন্দুশেখরকে বাদ দিয়া বিশিষ্ট হইতেছেন—নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, রাধামাধব কর এবং অমৃতলাল মুখোপাধ্যায় (ক্যাপ্টেন বেল)। ই’হারা সকলেই পরবর্তীকালে বঙ্গরঙ্গমঞ্চের গৌরব ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করিয়াছিলেন। এই অভিনয়ের অভূতপূর্ব নাম হইয়াছিল এবং গিরিশচন্দ্রের ‘নিমচাঁদের’ ভূমিকায় অভিনয় পূর্ববর্তী সকল অভিনেতাদের গৌরব ম্লান করিয়া দিয়াছিল। যদিও মঞ্চে এই তাঁহার প্রথম অবতরণ, তথাপি নাটকের অন্তর্গত প্রচুর ইংরাজি উদ্ধৃতির সুস্পষ্ট উচ্চারণ এবং তাঁহার দ্বারা প্রধান চরিত্রটির সম্পূর্ণ মর্ম-গ্রহণ, দর্শকবৃন্দের ভক্তি ও বিস্ময় উৎপাদন করিয়াছিল। এই অভিনয়ের কথা বহুদিন পর্যন্ত লোকে স্মরণে রাখিয়াছিল এবং এখনও অনেকে শ্রদ্ধার সঙ্গে সেই কথা বলিয়া থাকেন। উদ্যোক্তারা সেদিন কিছুতেই বুঝিতে পারেন নাই যে, যে বীজ খেলার ছলে এবং আমোদের জন্য সেদিন তাঁহারা প্রোথিত করিয়াছিলেন, তাহাই কালক্রমে বনস্পতির রূপ ধরিয়া নানা শাখা-প্রশাখায় চারিদিকে বিস্তারিত হইবে। যাহাকে আমরা বাঙলার সাধারণ রঙ্গমঞ্চ বলিয়া থাকি, দীনবন্ধুর ‘সধবার একাদশী’ তাহারই অগ্রদূত, একথা দীনবন্ধুকে তাঁহার ‘শান্তি-কি-শান্তি’ নাটক উৎসর্গ করার কালে গিরিশচন্দ্রই বলিয়াছিলেন। সেদিন দীন-বন্ধুকে বিনম্নচিত্তে প্রণাম জানাইয়া গিরিশ্চন্দ্র বলিয়াছিলেন, দীনবন্ধই বাঙলা রঙ্গমঞ্চের স্রষ্টা। ১৮৬৯ হইতে ১৮৭০ সাল পর্যন্ত এই নাটক কলিকাতার বিভিন্ন স্থানে অন্ততঃ ছয় বার অভিনীত হইয়াছিল। তৃতীয় এবং চতুর্থ অভিনয়ের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আগের-টিতে নাট্যকার স্বয়ং, তাঁহার কয়েকজন বন্ধু এবং সহরের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। তাঁহাদিগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হইতেছেন, শোভাবাজারের “বিজু বাহাদুর”, কলিকাতা পৌরসভার উপ-সভাপতি গোপাললাল মিশ্র এবং প্রসিদ্ধ চিকিৎসক দুর্গাদাস কর। ‘নিমচাঁদের’ অভিনয়ে গিরিশচন্দ্রের প্রতিভা দেখিয়া নাট্যকার এতই মুগ্ধ হইয়াছিলেন যে, তিনি এই বলিয়া গিরিশচন্দ্রকে অভিনন্দিত করিয়া-ছিলেন, “তুমি না থাকিলে এই নাটক অভিনয় হইতে পারিত না। মনে হয়, নিমচাঁদ কেবলমাত্র তোমারই দ্বারা অভিনীত হইবার জন্য সৃষ্ট হইয়াছে।” ‘জীবনচন্দ্রের’ ভূমিকায় অর্ধেন্দুশেখরের অভিনয়ও নাটা-কারের নিকট হইতে কম প্রশংসা পায় নাই। ১ম অঙ্ক, ২য় দৃশ্যে অর্ধেন্দু যখন ‘জীবনচন্দ্র’রূপে রঙ্গমঞ্চ হইতে বাহিরে যাইবার সময় ‘অটল’—কে লাথি মারিয়া নাট্যকারের কল্পনাকে অতিক্রম করিয়াছিলেন, তখন নাট্যকার তাঁহার মহানুভবতার বশে স্বীকার করিয়াছিলেন যে, ইহা নাট্যকারের কল্পনাকে নিশ্চিতরূপে উন্নত করিয়াছে। চতুর্থ অভিনয়ও যে সুন্দর ও হৃদয়গ্রাহী হইয়াছিল, বাবু (পরে বিচারপতি) সারদাচরণ মিত্র নিজে দর্শক-হিসাবে উপস্থিত থাকিয়া ১৩২৩ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ মাসের ‘বঙ্গদর্শনে’ যে প্রশংসাসূচক সমালোচনা লিখিয়াছিলেন, তাহা হইতে প্রমাণ পাওয়া যায়। চোরবাগানের অধিবাসী বিখ্যাত অভিনেতা অমরেন্দ্রনাথ দত্তের পিতামহ লক্ষক্ষ্মীনারায়ণ দত্তের বাড়িতে যে সপ্তম অভিনয় হয়, তাহার বিশেষ আকর্ষণ এই ছিল, সেখানে এই নাট্যকারের লেখা “বিয়ে পাগলা বুড়ো” নামে একটি নূতন প্রহসন অভিনীত হয়। এই প্রহসনের প্রস্তাবনা-হিসাবে গিরিশচন্দ্র নিম্নের কয়েকটি চরণ লিখিয়াছিলেন এবং সধবার একাদশীর অভিনয়-অন্তে ‘নিমচাঁদের’ বেশে তিনি আবৃত্তি করিয়া নূতন প্রহসনের অভিনয়-সূচনার সংকেত দিয়াছিলেন।
“মাতলামীটে ফুরিয়ে গেল, দেখুন বুড়োর রং।
বাসর ঘরে টোপর পরে কিবা বিয়ের ঢং॥
আয়না-নসে, রতা কোথা, যা পারিস্ তা বল।
ক্ষমা করবেন দোষ আমার রসিক মণ্ডল॥
আসছে এবার ছোঁড়ার দল, ভুনো নসে রতা।
সভ্যগণ নমস্কার, ফুরালো আমার কথা॥”
অর্ধেন্দু এবং রাধামাধব যথাক্রমে ‘রাজিব’ এবং ‘রতা’র ভূমিকা গ্রহণ কারয়াছিলেন।
এই উৎসাহী দলের পরবর্তী কৃতিত্ব হইতেছে, দীনবন্ধু মিত্রের আর একখানি নাটক “লীলাবতীর” অভিনয়। এই অভিনয়ের বৈশিষ্ট্য একাধিক ছিল এবং ইহা যে কেবল বঙ্গ রঙ্গমঞ্চের উন্নতির সহায়তা করিয়াছিল তাহা নয়, ইহা বাঙলায় স্থায়ী রঙ্গমঞ্চ স্থাপনের সহায়ক হইয়াছিল। লীলাবতীর অভিনয়ই “ন্যাশনাল থিয়েটার” স্থাপনার সূত্রপাত করিয়াছিল। সে ইতিহাস যেমন প্রয়োজনীয় তেমনি চিত্তাকর্ষী। সধবার একাদশীর অভিনয় সাফল্যে উৎসাহিত হইয়া দীনবন্ধু গিরিশ-চন্দ্রের নিকট প্রস্তাব করিয়াছিলেন যে, ইহার পরে যেন তাঁহার নূতন নাটক লীলাবতীর অভিনয় আয়োজন করা হয়। গিরিশচন্দ্র এই প্রস্তাবে দ্বিরুক্তি না করিয়া বইখানি রিহার্সাল দিতে আরম্ভ করেন। ইতিমধ্যে উদ্যোক্তারা পাড়া হইতে যে সামান্য চাঁদা তুলিয়াছিলেন, তাহা গোবর্ধন নামে একজন দেশী শিল্পীর দ্বারা একটিমাত্র দৃশ্যপট অঙ্কিত করাইতে বায় হইয়া যায়। অভিনয়কে উন্নত করার কল্পনা গিরিশচন্দ্রের মনে চিরদিনই ছিল এবং সেইজন্য তিনি একটি স্থায়ী রঙ্গালয় স্থাপন করিয়া অভিনয়কালে দৃশ্যপট ব্যবহার করার জন্য উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছিলেন। তাঁহার এই কল্পনাকে সফল করিয়া তুলিতে আর একজন উৎসাহী ব্যক্তির যে আন্তরিক সমর্থন ছিল, তিনি শেষ পর্যন্ত তাহা দেখিয়া যাইতে পারেন নাই। তিনি হইতেছেন গিরিশচন্দ্রের শ্যালক, ব্রজনাথ দেব। তিনি এবং গিরিশচন্দ্র টাকা তুলিবার জন্য একটি সুন্দর মতলব করিয়াছিলেন। উভয়েই মেসার্স এ্যাটকিনসন টিলটন এণ্ড কোম্পানীর মুহরী ছিলেন। তাঁহারা ঠিক করিলেন যে, ঐ কোম্পানীতে কাজ করিয়া তাহাদিগের যে দস্তুরি পাওনা হইয়াছিল, তাহা একটি রঙ্গমঞ্চ স্থাপনের জন্য যাহাতে পাওয়া যায়, তাহার জন্য ঐ কোম্পানীর দালালদের নিকট তাঁহারা অনুরোধ করিবেন। এ-পর্যন্ত ঐ টাকা তাঁহারা কখনো দাবি করেন নাই। ঐ টাকা পাইয়া শ্যামপুকুরের একটি গৃহ-প্রাঙ্গণে তাঁহারা একটি রঙ্গমঞ্চ স্থাপনা করিতে আরম্ভকরিলেন। রঙ্গমঞ্চের পাদপীঠ তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান কর্মকর্তা ব্রজনাথ অসুস্থ হইয়া পড়িলেন এবং অচিরেই মৃত্যুকে বরণ করিলেন। রঙ্গমঞ্চ তৈরির কাজ বন্ধ হইয়া গেল এবং তক্তাগুলি খুলিয়া নিকটস্থ বাগবাজারের একটি বাড়িতে স্থানান্তরিত করা হইল। সেখানে কালীপ্রসাদ চক্রবর্তী লেনে ধর্ম’দাস সুরের বাড়ির সামনে একটি জমিতে তক্তাগুলি খাটাইয়া রঙ্গপীঠ তৈরি করা হইল। এই সময়ে আকস্মিকভাবে একজনের সাহায্য পাওয়া গেল। ম্যাকলীন নামে একটি দরিদ্র ইংরাজ নাবিক মাঝে মাঝে বাগবাজার অঞ্চলে ভিক্ষায় আসিত। জাহাজে ভ্রমণকালে সে রং তৈরির কাজ শিখিয়াছিল এবং বাগবাজারের সকল লোক তাহার এই গুণের কথা জানিত। ধর্মদাস যখন দৃশ্যপট অঙ্কনের কাজে ব্যাপ্ত ছিলেন, তখন এই ম্যাকলীনকে কাজে লাগাইবার কথা প্রথম তাঁহার মনে হইয়াছিল। তিনি ম্যাকলীনের সহিত এই চুক্তি করিয়াছিলেন যে, তিনি তাহাকে খাইতে দিবেন এবং তাহার পরিবর্তে সে দৃশ্যপট অঙ্কিত করিবার জন্য রং তৈরি করিয়া দিবে এবং রঙ্গমঞ্চের তক্তাগুলি পাহারা দিবে। তাঁহারা যখন রঙ্গমঞ্চ স্থাপনের এই প্রকার প্রাথমিক কাজগুলি করিতেছিলেন, তখন এমন একটি ঘটনা ঘটিল যাহাতে বাগবাজারের দলের উৎসাহ আরও বাড়িয়া গেল।
‘অমৃতবাজার পত্রিকা’য় এই সংবাদ প্রকাশিত হইল যে, ‘লীলাবতী’ নাটকখানি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক পরিবর্তিত এবং সংক্ষিপ্ত হইয়া চু’চুড়াতে অভিনীত হইয়াছে। সে অভিনয়ের পরিচালনা করিয়াছিলেন স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র এবং অক্ষয়চন্দ্র সরকার। এই সংবাদে আরও বলা হইয়াছিল, সে অভিনয়ের খ্যাতি সারা শহরে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। একটি অজ্ঞাত প্রতিদ্বন্দ্বিদলের এই সাফল্যে বিষন্ন হইয়া নগেন্দ্র, অর্ধেন্দু, ধর্ম’দাস এবং আরও কয়েকজন তৎক্ষণাৎ গিরিশচন্দ্রের নিকট দৌড়িয়া গেলেন এবং বলিলেন, “আমরা চু’চড়োর দলের কাছে হেরে যাব, আর তাই তুমি দেখবে?” ইহাতে উৎসাহিত হইয়া গিরিশ খুবই জোরের সহিত বলিলেন, “একটি কথাও না বদলিয়ে আমরা এই নাটক অভিনয় করবো এবং চু’চড়োর দলকে যে কোন উপায়েই হোক হারিয়ে দেব।” প্রত্যেক সভ্যই আরও উৎসাহ এবং শক্তি সহকারে নিজ নিজ কাজ দিন-রাতি খাটিয়া সম্পূর্ণ করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। নাটা-শিক্ষার কাজ গিরিশচন্দ্র নিজে লইলেন এবং তাঁহার ক্ষমতামত সকলই শিখাইলেন। সধবার একাদশীতে যেমন গান লিখিয়াছিলেন, তেমনি মাঝে মাঝে প্রয়োজনমত এই নাটকের জন্যও গান লিখিলেন। ধর্মদাস অতি সত্বর দৃশ্যপট আঁকা ও রঙ্গমঞ্চ তৈরির কাজ সম্পূর্ণ করিতে লাগিলেন। তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন, তাঁহার পরিবর্তে সেখানকার কাজের ভার লইলেন একটি মহাপ্রাণ যুবক (অমৃতলাল বসু)। প্রারম্ভিক কার্য শেষ হইলে, বাগবাজার দলের সমবেত চেষ্টায় জুলাই মাসের ১৮৭১ সালে লীলাবতীর অভিনয় সফল হইল। শ্যামবাজারের রাজেন্দ্রলাল পালের গৃহে স্থায়ী রঙ্গমঞ্চে এই অভিনয় হইল। ইতিমধ্যে বাগবাজার দলের নাম হইয়াছিল “ক্যালকাটা ন্যাশন্যাল থিয়েটার"। পরে আবার বদলাইয়া “ন্যাশন্যাল থিয়েটার” হইয়াছিল। এই অভিনয় আশাতীত সাফল্যলাভ করিয়াছিল এবং দীনবন্ধ, নিজে উপস্থিত থাকিয়া যে প্রকার আনন্দলাভ করিয়া-ছিলেন, তাহার সীমা ছিল না। নাটাকার নিজে, ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকার এবং অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত থাকিয়া এই অভিনয়ের প্রত্যেক চরিত্রের প্রশংসা করিয়াছিলেন। ‘লীলাবতী’র অভিনয় এত জনপ্রিয় হইয়াছিল যে, প্রত্যেক শনিবারে ইহার অভিনয় করিতে হইত। হাজারে হাজারে দর্শক আসিত এবং ভীড় কমাইবার জন্য ও স্থান সংকুলানের জন্য, যাহারা অভিনয় বুঝিতে পারিত, কেবল তাহাদিগকে বিনামূল্যে টিকিট দেওয়া হইত। মজার কথা এই যে, দলে দলে লোক আসিত এবং তাহারা যে নাটকের রস-গ্রহণে সক্ষম তাহার জন্য পরিচয়পত্র দাখিল করিত। পাঁচ রাত্রি অভিনয়ের পর প্রবল ঝড় ও বৃষ্টির জন্য অভিনয় বন্ধ করিতে হইয়াছিল।
স্বয়ং নাট্যকার এবং গিরিশচন্দ্রের পরামর্শে “ন্যাশন্যাল থিয়েটার” দীনবন্ধুর বিখ্যাত নাটক নীলদর্পণ অভিনয়ের ব্যবস্থা করিতে লাগিল। ধর্ম’দাস সুরের প্রতিবেশী ভুবনমোহন নিয়োগী এই বইয়ের রিহার্সালের জন্য গঙ্গাতীরে একটি বাড়ি দিলেন। নীলদর্পণের অভিনয়ের অব্যবহিত পূর্বে টিকিট বিক্রয় করিয়া অভিনয়ের বিষয়ে সভ্যদের মধ্যে বিরোধ বাধিল। তাহার ফলে একটি দল ভাঙিয়া দুইটি হইল। টিকিট বিক্রয়ের পক্ষে যে দল, সে-দলের নেতা হইলেন অর্ধেন্দু; আর ইহার বিপক্ষ দলের অধিনায়ক হইলেন গিরিশচন্দ্র। লীলাবতীর অভিনয়-সাফল্যে উৎসাহিত হইয়া কয়েকজন অভিনেতা বিনামূল্যে অভিনয় দেখানোর প্রথা তুলিয়া দিতে চাহিলেন। তাঁহাদিগের মতে, প্রবেশ মূল্য লইয়া অভিনয় করিয়া যে লাভ হইবে, তাহার দ্বারা দলের অনেক দরিদ্র অভিনেতাকে সাহায্য করা যাইবে। কিন্তু গিরিশচন্দ্রের যুক্তি ছিল অন্য প্রকারের। তিনি মনে করিয়াছিলেন যে, এইরূপ প্রথা প্রবর্তন করিলে বিদেশীদের নিকট তাঁহারা হাস্যাস্পদ হইবেন, কারণ “বাঙালী” কথাটি উচ্চারণ করিতে এখনই তাঁহারা নাক সিটকাইয়া থাকেন। “ন্যাশন্যাল থিয়েটার” নাম লইয়া এইরূপ স্বল্প সাজসজ্জায় ভূষিত রঙ্গমঞ্চের অভিনয়ে আশানুরূপ টিকিট বিক্রয় হইবে না এবং তাহা না হইলে গিরিশচন্দ্রের মতে ইহা বড়ই অসাময়িক এবং পরিতাপের বিষয় হইবে। কিন্তু অধিকাংশ সভ্যই গিরিশচন্দ্রের মতের বিরোধী ছিলেন বলিয়া গিরিশচন্দ্র এই থিয়েটারের সংস্রব ত্যাগ করিলেন এবং তাঁহার অনুগামী হইলেন রাধামাধব কর, যোগেন্দ্রনাথ মিত্র, সুরেশচন্দ্র মিত্র, মহেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। বেণীমাধব মিত্রকে এই থিয়েটারের সভাপতি করা হইল। উড সাহেবের যে ভূমিকা গিরিশচন্দ্র লইয়াছিলেন, তাঁহা অর্ধেন্দ গ্রহণ করিলেন। অন্যান্য ভূমিকাগুলি গ্রহণ করিলেন অর্ধেন্দু, মতিলাল সুর, মহেন্দ্রলাল বসু এবং অমৃতলাল বসু। এই সময়ে অমৃতলাল কিছুদিনের জন্য বারানসী হইতে কলিকাতায় আসিয়াছিলেন। তাঁহারা জোড়াসাঁকোর মধুসূদন সান্যালের গৃহ-প্রাঙ্গণটি (বর্তমানে ৩৬৮, আপার চিৎপুর রোডস্থিত মল্লিকদের “ঘড়িওয়ালা বাড়ি” নামে পরিচিত) ভাড়া করিয়া, সেখানে একটি রঙ্গমঞ্চ তৈরি করিয়া ১৮৭২ সালের ৭ই ডিসেম্বর নীলদর্পণ অভিনয় করিলেন। বাঙলা রঙ্গমঞ্চের ইতিহাসে ইহা একটি স্মরণীয় দিন, কারণ এই দিনে এমন একটি নূতন যুগের সৃষ্টি হইয়াছিল, যাহা সম্পূর্ণভাবে অবৈতনিক অভিনয়ের ধারার পরিবর্তন করিয়াছিল। অভিনয় অতি সুন্দর হইয়াছিল এবং এই অভিনয়ে ৫৫০, টাকা প্রবেশমূল্য পাওয়া গিয়াছিল। নীলদর্পণের অভিনয় কেবলমাত্র দুই রাত্রি হইয়াছিল, তারপর ন্যাশন্যাল থিয়েটারে পর পর দীনবন্ধুর জামাই বারিক, নবীন তপস্বিনী এবং বিয়ে পাগলা বুড়ো অভিনীত হইয়াছিল। ক্রমে দীনবন্ধুর নাটক ফুরাইয়া আসিল এবং দর্শকদের মধ্যে একই নাট্যকারের নাট্যাভিনয় বিষয়ে ক্লান্তি আসিয়াছিল; তাহার ফলে টিকিট বিক্রয়ও কমিয়া গেল। ইহার পরে এই দল মধুসূদনের কৃষ্ণকুমারী নাটক অভিনয়ের আয়োজন করিতে লাগিল, কিন্তু তাহাদিগের মধ্যে ‘ভীমসিংহে’র ভূমিকা অভিনয় করিতে পারে, এমন লোকের অভাব হইল। এই সময়ে গিরিশচন্দ্রের অনুপস্থিতি বিশেষভাবে সকলের মনে হইতে লাগিল এবং তাঁহারা গিরিশচন্দ্রের নিকট গিয়া তাঁহার সাহায্য ঐকান্তিকভাবে প্রার্থনা করিলেন। গিরিশচন্দ্র অবৈতনিক অভিনেতা-হিসাবে যোগদান করিতে সম্মত হইলেন। তাঁহার শিক্ষা ও অধিনায়কত্বে ‘কৃষ্ণকুমারী’ ১৮৭৩ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি অভিনীত হইল এবং গিরিশচন্দ্র ভীমসিংহের ভূমিকায় অবতীর্ণ হইলেন। প্রেক্ষাগৃহ দর্শকের ভীড়ে ভরিয়া গেল এবং ইহার অভিনয় পূর্ণগৌরবে কিছুদিন চলিতে লাগিল।
আয়ের দিকটা বাড়িল বটে, কিন্তু শীঘ্রই দলের মধ্যে পরিচালনা বিষয়ে নানা প্রকার গোলমাল দেখা দিল। পরিচালনার সুব্যবস্থার জন্য তিনজন পরিচালক নির্বাচন করা হইল এবং সেই তিনজন পরিচালক হইতেছেন গিরিশচন্দ্র ঘোষ, অমৃতবাজার পত্রিকার সম্পাদক শিশির-কুমার ঘোষ এবং নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভ্রাতা দেবেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। ইহাতেও ভিতরের ঝগড়া থামিল না এবং ১৮৭৩ সালের মার্চ মাসে কৃষ্ণকুমারীর প্রথম অভিনয়ের চারি মাস পরে ন্যাশন্যাল থিয়েটার বন্ধ হইয়া গেল। এই দল ভাঙিয়া আবার দুইটি দল হইল। প্রথম দলের অধিনায়ক হইলেন নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দ্বিতীয় দলের অধিনায়ক হইলেন ধর্ম’দাস সুর। প্রথম দলে রহিলেন অর্ধেন্দ, অমৃতলাল বসু, অমৃতলাল মুখোপাধ্যায় এবং আরও কয়েকজন। দ্বিতীয় দলে রহিলেন মহেন্দ্রলাল বসু, মতিলাল সূর, অবিনাশ কর এবং রাজেন্দ্রলাল পাল। এখন হইতে প্রতিযোগিতা করাই এই দুই দলের কার্য হইল, এবং সেই প্রতিযোগিতায় বিদ্বেষভাব সমানভাবেই প্রকটিত হইতে লাগিল।
এই সময়ে সুবিখ্যাত সাতুবাবুর পৌত্র শরৎচন্দ্র ঘোষ নিয়মিত ন্যাশন্যাল থিয়েটারের অভিনয় দেখিতে যাইতেন এবং কলিকাতায় একটি সাধারণ রঙ্গমণ্ড স্থাপনে ইচ্ছুক হইয়াছিলেন। তিনি ১৮৭৩ সালে আগস্ট মাসে নাট্য-পরিচালনা বিষয়ে অভিজ্ঞ বিহারীলাল চট্টোপাধ্যায় এবং অখিলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সহায়তায় বিডন স্ট্রীটস্থ সাতুবাবুর বাড়ির সম্মুখস্থ একটি টালি-ছাওয়া বাড়িতে ‘বেঙ্গল থিয়েটার’ নাম দিয়া একটি রঙ্গালয় হঠাৎ গড়িয়া তুলিলেন। এখানে মেয়েদের ভূমিকা অভিনয়ের জন্য অভিনেত্রী সংগ্রহ করা হইল। মধুসূদনের শর্মিষ্ঠা ও মায়া-কানন এবং উঃ! মোহন্তের এই কি কাজ! নামক একটি চিত্ত-চমৎকারী প্রহসনের অভিনয় বেঙ্গল থিয়েটারে হইল। শেষের অভিনয়টি হইতে কোম্পানীর যে আয় হইল তাহা তখনকার দিনে অভাবনীয়। ইতিমধ্যে ন্যাশন্যাল থিয়েটারের দুই বিরোধী দলের মধ্যে যে বিবাদ ছিল, তাহা মিটিয়া গেল। তাহার প্রমাণ পাওয়া যায় দিঘাপতিয়ার রাজ-ভবনে এই দুই দলের সম্মিলিত অভিনয় হইতে। এই দুই দলের মিলন সম্ভব হইয়াছিল এমন একটি ঘটনা হইতে, যাহার ফলে একটি নূতন রঙ্গালয় স্থাপনার প্রয়োজন তখনই হইয়াছিল। ঘটনাটি এইরূপ—ধর্মদাস সুর ও নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় দুই বিরোধী দলের নেতা ভুবন নিয়োগীর সহিত বেঙ্গল থিয়েটারে ‘উঃ! মোহন্তের এই কি কাজ’—এর অভিনয় দেখিতে গিয়াছিলেন; দর্শকদের ভাঁড় এত হইয়াছিল যে, তাঁহারা টিকিটের মূল্য দ্বিগুণ দিয়াও তাহা সংগ্রহ করিতে পারেন নাই। ভুবনমোহন এতই বিরক্ত এবং হতাশ হইয়াছিলেন যে, তিনি নিজ ব্যয়ে একটি রঙ্গালয় খুলিতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। নগেন্দ্রনাথ এবং ধর্মদাস তাহাদিগের পূর্ব বিরোধ ভুলিয়া এই প্রস্তাবে রাজি হইয়া গেলেন, এবং তাহার ফলে ১৮৭৩ সালে “গ্রেট ন্যাশন্যাল থিয়েটার“ স্থাপিত হয়। এই থিয়েটার “লুইস থিয়েটার”—এর (মিসেস জি, বি, ডরু, লুইস নাম্মী একজন ইউরোপীয় মহিলার দ্বারা পরিচালিত থিয়েটার) আদর্শে যেখানে বর্তমান মিনার্ভা থিয়েটার অবস্থিত সেখানে স্থাপিত হইয়াছিল। ১৮৭৩ সালে ৩১শে ডিসেম্বর এই থিয়েটারে কাম্য কানন নামে প্রথম নাটকের অভিনয় হয়। এ অভিনয়ের কোন বৈচিত্র্য ছিল না এবং দুর্ভাগ্যবশতঃ এই অভিনয়ের মাঝামাঝি সময়ে থিয়েটারে আগুন লাগিয়া যায়। তাঁহারা আর কোন উপায় না দেখিয়া কর্মবীর গিরিশ-চন্দ্রের শরণাপন্ন হইলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ অবৈতনিক অভিনেতারূপে তাঁহাদের বিপন্মুক্ত করিবার জন্য নিজকৃত বঙ্কিমচন্দ্রের ‘মৃণালিনী’র নাট্যরূপ লইয়া অগ্রসর হইলেন। অভিনেত্রী লইয়া অভিনয় করিবার রীতি বেঙ্গল থিয়েটার প্রবর্তন করিয়াছিল। তাহা জনপ্রিয় হওয়ায় গ্রেট ন্যাশন্যাল থিয়েটারেও ইহার পর ঐ রীতি অবলম্বন করা হইয়াছিল।
এখন হইতে বাঙলা রঙ্গমঞ্চের ইতিহাসে যে গৌরবময় যুগের সৃষ্টি হইল, তাহাতে বাঙলা নাটকের গৌরবও কম নয়। এই ইতিহাসের প্রত্যেকটি পৃষ্ঠা গিরিশচন্দ্রের কর্ম-কীর্তিতে উজ্জল হইয়া আছে। ইহার পর হইতে রঙ্গমঞ্চের ইতিহাস বুঝাইতে প্রধানতঃ গিরিশচন্দ্রের নাটকীয় অবদানকেই বুঝাইয়া থাকে। গ্রেট ন্যাশন্যালকে অনুসরণ করিয়া যেসব নূতন প্রতিষ্ঠান জন্মাইতে লাগিল, তাহারা প্রায় সকলেই গিরিশচন্দ্রের কর্মশক্তি ও উৎসাহে বর্ধিত হইয়াছিল। নূতন প্রতি-ষ্ঠানের মধ্যে ‘স্টার’, ‘এমার্যাল্ড’, ‘সিটি’, ‘মিনার্ভা’, ‘ক্লাসিক’, ‘গ্রাণ্ড’, ‘নিউ ক্লাসিক’, ‘কোহিনূর’, ‘মনোমোহন’ এবং ‘বেঙ্গল থিয়েটারে’র অপত্যস্বরূপ ‘অরোরা’, ‘ইউনিক’ ‘ন্যাশন্যাল’, ‘গ্রেট ন্যাশন্যাল’, ‘গ্রাণ্ড ন্যাশন্যাল’ এবং ‘থেস্পিয়ান টেম্পল’—এ সবই গিরিশচন্দ্রের নিকট ঋণী। গিরিশচন্দ্রের অসংখ্য গ্রন্থ এই সব প্রতিষ্ঠানের প্রাণধারাকে সঞ্জীবিত রাখিয়াছিল এবং সেইজন্যই কৃতজ্ঞ ভবিষ্যদ্বংশীয়েরা শ্রদ্ধাসহকারে তাঁহাকে ‘রঙ্গমঞ্চের পিতা’— এই নাম দিয়াছে।
অন্যান্য কীর্তিমান নাট্যকারেরা উন্নত ধরনের নাটক লিখিয়া এবং রঙ্গালয়কে নানা প্রকারে সাহায্য করিয়া যে সহায়তা দান করিয়াছেন, তাঁহাদিগের নাম এখানে না করিলে অন্যায় হইবে। তাঁহাদিগের মধ্যে স্মরণীয় হইতেছেন রাজকৃষ্ণ রায়, অতুলকৃষ্ণ মিত্র, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অমরেন্দ্রনাথ দত্ত, মনোমোহন গোস্বামী, অমৃতলাল বসু, এবং ক্ষীরোদ-প্রসাদ বিদ্যাবিনোদ।অন্যান্য কীর্তিমান নাট্যকারেরা উন্নত ধরনের নাটক লিখিয়া এবং রঙ্গালয়কে নানা প্রকারে সাহায্য করিয়া যে সহায়তা দান করিয়াছেন, তাঁহাদিগের নাম এখানে না করিলে অন্যায় হইবে। তাঁহাদিগের মধ্যে স্মরণীয় হইতেছেন রাজকৃষ্ণ রায়, অতুলকৃষ্ণ মিত্র, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অমরেন্দ্রনাথ দত্ত, মনোমোহন গোস্বামী, অমৃতলাল বসু, এবং ক্ষীরোদ-প্রসাদ বিদ্যাবিনোদ। এ কথা অস্বীকার করা চলে না যে, একটি নিয়ন্ত্রণকারী শক্তির অভাবে অনেক অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও, বর্তমানে রঙ্গমণ্ড একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়া চলিতেছে।[১]
- ↑ এই রচনাটি ১৯২৪ সালের জানুয়ারি মাসে ‘দি ক্যালকাটা রিভিউ’—এ প্রকাশিত ডাঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের একটি ইংরাজি প্রবদ্ধ হইতে শ্রীবিভাস রায়চৌধুরী কর্তৃক অনুন্দিত। ইহা তিনি এম-এ পরীক্ষার দুইটি পত্রের পরিবর্তে থিসিস’ হিসাবে লিখিয়াছিলেন।