শ্যামাপ্রসাদের কয়েকটি রচনা/শরৎচন্দ্র ও ভারতচন্দ্র
শরৎচন্দ্র ও ভারতচন্দ্র[১]
আজ দুই জন যশস্বী ও প্রতিভাশালী বাঙালীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করিবার জন্য এখানে আমরা মিলিত হইয়াছি। ১২৮৩ সালের ৩১শে ভাদ্র, এই দেবানন্দপুর[২] গ্রামে শরৎচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেন। প্রায় ছয় বৎসর পূর্বে, তাঁহার জন্ম-দিবসের এক উৎসব-সভায় তিনি বলিয়াছিলেন, “এই ৩১শে ভাদ্র বছরে বছরে ফিরে আসবে, কিন্তু একদিন আমি আর আসবো না।...কেবল প্রার্থনা করি, সেদিনও যেন এমনিধারা স্নেহের আয়োজন থেমে না যায়।” এ প্রার্থনা শরৎচন্দ্রের সরলতা ও সহৃদয়তার পরিচায়ক, সন্দেহ নাই। কিন্তু বস্তুতঃ তাঁহার দেশবাসীর প্রতি এ প্রার্থনার কোনও প্রয়োজন ছিল না। বঙ্গসাহিত্যের ভাণ্ডারে শরৎচন্দ্র যে রত্নরাজি দান করিয়া গিয়াছেন, তাহা অমূল্য। বাঙালী বিস্মৃতিপ্রবণ হইলেও যতকাল বঙ্গভাষা জীবিত থাকিবে, ততকাল তাঁহার উদ্দেশে শ্রদ্ধার আয়োজন থামিবে না—থামিবার নহে।
তবে মর্মান্তিক দঃখের বিষয় এই যে, সেই ৩১শে ভাদ্র—যে দিন তিনি আর আমাদের মধ্যে আসিবেন না বলিয়াছিলেন, সেই শোচনীয় দুর্দিন যে এত শীঘ্র[৩] আসিয়া তাঁহার কথা আজ আমাদিগকে ব্যথার সহিত স্মরণ করাইবে, এ কথা স্বপ্নেও কেহ মনে করেন নাই। বাঙলার দুর্ভাগ্য যে, তাঁহার অসমাপ্ত যাত্রাপথের মাঝখানে নিষ্ঠুর কাল আসিয়া অকস্মাৎ তাঁহাকে আমাদের নিকট হইতে কাড়িয়া লইয়া গেল। তিনি যাহা দিবেন মনে করিয়াছিলেন, তাহা দিতে পারিলেন না—বঙ্গসাহিত্য তাঁহার শুভ-সংকল্পিত সম্পদ্ হইতে বঞ্চিত হইয়া রহিল।
বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যকে যাঁহারা অভূতপূর্ব শ্রীসম্পদে ভূষিত করিয়াছেন, শরৎচন্দ্র তাঁহাদের অন্যতম। চিত্রাঙ্কন-চাতুর্যে ও চরিত্রবর্ণনায় তাঁহার সমকক্ষ বা তাঁহার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ শিল্পী, বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের পরে বাঙলায় আর কেহ জন্মিয়াছেন বলিয়া কেহ স্বীকার করিবেন না। সাহিত্যাকাশে শরৎচন্দ্রের উদয় ঘটিবার পূর্বে বাঙালী পাঠক যে সুখপাঠ্য কথা-সাহিত্যের অভাব অনুভব করিতেছিল, এমন নহে। তখনও এমন শক্তিশালী লেখক ছিলেন, যাঁহারা নিত্য নূতন গল্প-উপন্যাসাদি রচনার দ্বারা পাঠক-চিত্ত বিনোদন করিতেছিলেন। সাহিত্যের এই জমকালো আসরে আসিয়া নূতন সুরে নূতন করিয়া গান ধরিয়া আসর জমাইয়া পাঠকের চিত্ত জয় করা যে সহজসাধ্য কাজ ছিল, এ কথা কেহই বলিবেন না। কিন্তু শরৎচন্দ্রের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁহার যশঃসৌরভ দেশময় ছড়াইয়া পড়িল—যেন তাঁহারই জন্য বাঙলার পাঠক-সমাজ শূন্য সিংহাসন লইয়া অপেক্ষা করিয়া বসিয়াছিল। সগৌরবে ও সসম্মানে তিনি সে আসন অধিকার করিলেন।
শরৎচন্দ্র সহানুভূতি ও সমবেদনার উৎস ছিলেন। তিনি নিজেই বলিয়াছেন, “সংসারে যারা শুধু দিলে—পেলে না কিছুই, যারা বঞ্চিত, যারা দুর্বল—উৎপীড়িত, মানুষ হয়েও মানুষে যাদের চোখের জলের কখনও হিসাব নিলে না, নিরুপায় দুঃখময় জীবনে যারা কোন দিন ভেবেই পেলে না—সমস্ত থেকেও কেন তাদের কিছুতেই অধিকার নেই এদের কাছে কি ঋণ আমার কম? এদের বেদনাই দিলে আমার মুখ খুলে, এরাই পাঠালে আমাকে মানুষের কাছে মানুষের নালিশ জানাতে।” শরৎচন্দ্র তাঁহার সাধনার অনুপ্রেরণা কোথা হইতে লাভ করিয়াছিলেন, তাহার পরিচয় এই কয় ছত্রের মধ্যে সুস্পষ্ট দেদীপ্যমান রহিয়াছে। ব্যথিতের জন্য এত অধিক বেদনা-বোধ ছিল বলিয়াই তাঁহার সৃষ্ট সাহিত্যে তিনি মমতার ধারা ঢালিয়া দিতে পারিয়াছিলেন। এই অমৃতধারার আস্বাদন-সুখ যাহারা উপভোগ করিয়াছে, তাহারা শরৎচন্দ্রকে কখনও ভুলিতে পারে না।
শুধু গভীর সমবেদনা ও সহানুভূতি নহে, মানব-চরিত্রে অভিজ্ঞতাও ছিল তাঁহার অসাধারণ। সজীব মানব-চরিত্রেই নাটক-উপন্যাসাদির বাহন। তিনি তাঁহার ঐন্দ্রজালিক ভাষায় মানুষের প্রাণের রূপকে ফুটাইয়া তুলিতে পারিয়াছিলেন। তাঁহার শ্রীকান্ত হইতে আরম্ভ করিয়া তাঁহার শিশু-চরিত্রগুলি পর্যন্ত এই বাক্যেরই সাক্ষ্য প্রদান করিবে।
মানুষ-হিসাবে শরৎচন্দ্রের প্রকৃতি বড়ই মধুর ছিল। তাঁহার সরলতা ও উদারতার পরিচয় নূতন করিয়া দিবার প্রয়োজন নাই। তাঁহার স্নেহপ্রবণ হৃদয় ও অকপট ব্যবহারে লোকে মুগ্ধ হইত এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যে মানুষকে আপন করিয়া লইবার তাঁহার অপূর্ব ক্ষমতা ছিল। একদিকে যেরূপ তিনি স্বল্পভাষী ও কোমল-স্বভাব ছিলেন, অন্যদিকে তাঁহার চিত্ত যথার্থ ভয়শূন্য ছিল। কোনরূপ অন্যায় বা অত্যাচার তিনি সহ্য করতেন না এবং নির্ভীকভাবে আপন মতামত প্রচার করিতেন। বৃহৎ সভা-সমিতিতে তিনি যোগদান করিতে কখনও আগ্রহ প্রকাশ করিতেন না বটে, কিন্তু কোন দেশহিতকর মঙ্গল-কার্যে তাঁহার সহযোগিতা কামনা করিলে নিঃস্বার্থভাবে তিনি উহার সহায়তায় অগ্রসর হইতেন। দেশকে তিনি প্রাণ-মন দিয়া ভালবাসিতেন এবং দেশমাতৃকার সেবার সুযোগ পাইলেই নিজেকে গৌরবান্বিত বোধ করিতেন। বাঙলার দুর্ভাগ্য, তিনি তাঁহার ‘পথের দাবী’র সাহায্যে তাঁহার স্বদেশের যে দাবী জগতের সম্মুখে নির্ভয়ে উপস্থিত করিয়াছিলেন, আজ বাঙলা সরকারের আদেশক্রমে তাঁহার সেই অতুলনীয় গ্রন্থ বাঙালীর পড়িবার অধিকার নাই।
শরৎচন্দ্রের অভু্দ্যয়-কালের প্রায় দেড় শত বৎসর পূর্বে তাঁহারই এই জন্মভূমি দেবানন্দপুরে আর যে একটি মনীষা-সম্পন্ন বাঙালী[৪] এই গ্রামকে ধন্য করিয়াছিলেন, সেই ভারতচন্দ্রের রচনা-রীতি যেমন বহুদিন যাবৎ বঙ্গীয় লেখককুলের আদর্শ ও অনুকরণীয় হইয়াছিল, শরৎচন্দ্রের রচনাও তদ্রূপ হইয়া থাকিবে। ভারতচন্দ্র যেমন পদ্য-সাহিত্যে এক নূতন রূপের প্রবর্তন করিয়াছিলেন, শরৎচন্দ্রও তেমনি গদ্য-সাহিত্যে এক অভিনব রূপ দিয়া গিয়াছেন।
এই সভাক্ষেত্রে ভারতচন্দ্র সম্বন্ধেও কিছু বলিবার অধিকার আমি পাইয়াছি বটে, কিন্তু তাঁহার কৃতিত্ব-প্রসঙ্গে নূতন করিয়া কিছু বলিবার স্পর্ধা আমার নাই। তাহা বলিবার বিশেষ প্রয়োজন আছে, এমনও আমি মনে করি না; কারণ, কালের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ সমালোচক পথিবীতে আর কেহ নাই; সেই কালের বিচারে নির্ণীত হইয়া গিয়াছে যে, ভারতচন্দ্রই প্রাচীন বঙ্গসাহিত্যের শেষ সর্বপ্রধান কবি। বাস্তবিক, ছন্দের পারিপাট্যে, শব্দ-চয়নের চাতুর্যে ও গল্প-সাজাইবার নৈপুণ্যে তিনি যে শক্তির পরিচয় প্রদান করিয়াছিলেন, প্রাচীন বঙ্গসাহিত্যে তাহার তুলনা বিরল। তাঁহার রচনা হইতে যত বেশী বাক্যকে বাঙালী প্রবাদবাক্যরূপে ব্যবহার করিয়া থাকে, তেমন আর কাহারও রচনা হইতে করে না।
দেবানন্দপুর ভারতচন্দ্রের জন্মস্থান না হইলেও ইহার সহিত তাঁহার কর্ম-জীবনের সম্বন্ধ জড়িত হইয়া আছে। ভারতচন্দ্র এই স্থানেই অবস্থান করিয়া পারসী ভাষায় বিদ্যা অর্জন করিয়াছিলেন। এই স্থানেই তাঁহার সাহিত্য-সাধনার সূত্রপাত হয়। ১১৩৪ সালে এই গ্রামে বসিয়াই তিনি তাঁহার প্রথম রচনা সমাপ্ত[৫] করিয়াছিলেন। তাঁহার অমর লেখনীর মধ্যে আছে—“দেবের আনন্দ-ধাম, দেবানন্দপুর নাম।” বতমান কালে দেবানন্দপুর বাঙালীর আনন্দ-ধামে পরিণত হইতে পারিবে কি না, জানি না। কিন্তু কামনা করি—ক্ষুদ্র ও অপ্রসিদ্ধ কাঁটালপাড়া গ্রাম বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মস্থান বলিয়া আজ যেরূপে দেশ-প্রসিদ্ধ ও বাঙালীর তীর্থস্থানে পরিণত হইয়াছে, শরৎচন্দ্র ও ভারতচন্দ্রের পূণ্যস্মৃতির সহিত জড়িত এই দেবানন্দপুরও সেইরূপ বাঙালীর হৃদয় অধিকার করিয়া থাকুক—এখানে প্রতি বৎসর দলে দলে বাঙালী আসিয়া তাঁহাদের স্মৃতি-পূজার অনুষ্ঠানে যোগদান করুক—বার্ষিক উৎসবে ইহা পরিণত হউক।
এক বৎসর অতীত হইল আমরা শরৎচন্দ্রকে হারাইয়াছি। সেই শোচনীয় দিবস স্মরণ করিয়া তাঁহার ও সেই সঙ্গে ভারতচন্দ্রের নামে যাঁহারা এই স্থানে দুইখানি মর্মর-ফলক স্থাপনের ব্যবস্থা করিয়াছেন, তাঁহারা বাঙালীমাত্রেরই ধন্যবাদের পাত্র। আজ যাঁহারা আমাকে এই দুই মনীষীর স্মৃতি-ফলক উন্মোচনের সুযোগ দিয়া তাঁহাদের উদ্দেশে প্রীতি ও শ্রদ্ধার পুষ্পাঞ্জলি-প্রদানের অবসর দিলেন, তাঁহাদিগের নিকট আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিতেছি।
- ↑ ১৩৪৫ বঙ্গাব্দের ১লা মাঘ দেবানন্দপুরে শরৎচন্দ্র ও ভারতচন্দ্রের স্মৃতিফলক স্থাপনার উপলক্ষে সভাপতির অভিভাষণ।
- ↑ দেবানন্দপুর হুগলী জেলার একটি গ্রাম। ই, আই, আর-এর ব্যাণ্ডেল রেল-স্টেশন হইতে তিন মাইল দূরে অবস্থিত, শরৎচন্দ্রের জন্মভূমি। ভারতচন্দ্র এই গ্রামে কিছুকাল বাস করিয়াছিলেন।
- ↑ ১৩৪৪ বঙ্গাব্দের ২রা মাঘ। রবিবার কলিকাতা, পার্ক নার্শিং হোমে মৃত্যু।
- ↑ ভারতচন্দ্র রায় (বঙ্গাব্দ ১১১৯—১১৬৭) বর্ধমান জেলার অন্তঃপাতি ভুরসুট পরগণার মধ্যস্থিত পেঁড়ো গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। অতি অল্পকাল তিনি দেবানন্দপুরে বাস করিয়াছিলেন। সেখানে রামচন্দ্র মুন্সীর আশ্রয়ে থাকিয়া তিনি পারস্য ভাষা অধ্যয়ন করেন এবং সংস্কৃত ও বঙ্গভাষায় কবিতা রচনা করেন।
- ↑ সত্যনারায়ণের ব্রতকথা।