শ্যামাপ্রসাদের কয়েকটি রচনা/শিক্ষা-সম্প্রসারণ
শিক্ষা-সম্প্রসারণ
একের সহিত অন্যকে মিলায়, ইহাই সাহিত্যের ধর্ম। যে অজ্ঞানের অন্ধকার মানুষের দৃষ্টি রুদ্ধ করিয়া তাহাকে পরস্পর হইতে বিচ্ছিন্ন করে, সাহিত্যের স্নিগ্ধ আলোকে সে অন্ধকার দূরীভূত হয়। মানুষের সহিত মানুষের মিলনসাধন করিয়াই সাহিত্য ক্ষান্ত হয় না। জাতির সহিত জাত্যন্তরের, দেশের সহিত দেশান্তরের, অতীতের সহিত বর্তমানের এবং বর্তমানের সহিত ভবিষ্যতের সংযোগ স্থাপন করিয়া সাহিত্য বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন মানবকে ঐক্যের সুনিবিড় বন্ধনে সংবদ্ধ করে। যে জাতির নিজস্ব সাহিত্যের অভাব, সে জাতি বিশ্বের কাছে অপরিচিত, এমন কি নিজের কাছেও। আমরা বাঙালী অশেষবিধ ভাগ্যবিড়ম্বনায় বিড়ম্বিত হইয়াও যে একটি মাত্র ঐশ্বর্য লইয়া গর্ব করিতে পারি, সে আমাদের সাহিত্য। একদিন তো আমাদের সবই ছিল। আমাদের অন্নপূর্ণার পূর্ণপাত্র কত বুভুক্ষুর রিক্তথালি পূর্ণ করিয়াছে, আমাদের মহালক্ষ্মীর রত্নপেটিকা কত ভিক্ষুকের ভিক্ষার ঝুলি মণিমাণিক্যে ভরিয়া দিয়াছে, আমাদের শিল্প-সম্ভার বিশ্বের বিস্ময় উৎপাদন করিয়াছে। অতীত গৌরবের পবিত্র পুরাতন দিনগুলি আজ যে বর্তমানের বাস্তব ক্ষেত্রে রূপান্তর লাভ না করিয়া স্মৃতিলোকের মধ্যেই প্রচ্ছন্ন আছে সেজন্য দুঃখ করিতে হয় করিব, কিন্তু আর নির্লজ্জের মত বারংবার নিজের অদৃষ্টকে ধিক্কার দিব না। কেন গিয়াছে কাহার দোষে গিয়াছে সে কথা আজ আর আমাদের অবিদিত নাই, সুতরাং সে আলোচনা নিষ্ফল। কেমন করিয়া হারানো জিনিস আবার ফিরিয়া পাইব তাহার আলোচনাও আজিকার ক্ষেত্রে অবান্তর। কিন্তু এই প্রশ্ন স্বভাবতই মনে উদিত হয়, বহু শতাব্দীর বিবিধ ভাগ্যবিপর্যয়ের দ্বারা বিপর্যস্ত হইয়াও আমরা প্রাণশক্তি হারাইয়া ফেলি নাই কেন? রোগ-শোক-দুঃখ-দারিদ্র্য, সর্বোপরি দীর্ঘদিনের পরাধীনতার মনুষ্যত্বনাশী গ্লানিভার বহন করিয়াও প্রাত্যহিকের ঊর্ধ্বে মস্তক উত্তোলন করিবার সামর্থ্য পাই কোথা হইতে? পুঞ্জীভূত অপমানের বল্মীকস্তুপে আচ্ছন্ন থাকিয়াও মোহধ্বংসী সূর্যালোকের আভাস দেখিতে পাই কাহার শক্তিতে?—তাহার একমাত্র উত্তর সাহিত্য। জাতির জীবনের মূলে রসধারা জোগাইয়া সাহিত্যই তাহার প্রাণশক্তি অব্যাহত রাখিয়াছে।
বাঙলা-সাহিত্যের ইতিহাস সুদীর্ঘ কালের ইতিহাস। কত রাজবংশের উত্থান-পতন, কত ধর্মমতের উদয়-বিলয়, কত রীতিনীতির আরম্ভ-পরিণতি, কত চিন্তাধারার আদি-অন্ত লক্ষ্য করিতে করিতে আমাদের এই সাহিত্য আজ প্রায় সহস্রাধিক বর্ষ ধরিয়া জাতীয় সংস্কৃতির বিচিত্র পরিচয় বহন করিয়া আসিতেছে। এই সাহিত্যের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়া আমরা পিতৃপিতামহের সহিত সচেতন এবং সজীব মানসিক যোগ রক্ষা করিয়া আসিতেছি। নানা কারণে সে যোগ সম্পূর্ণ অক্ষর নাই। অর্থহীন প্রথা, যুক্তিহীন আচার, অমার্জনীয় মূঢ়তা শৈবালদামের মত দল বাঁধিয়া কখনো কখনো স্রোতপথ রুদ্ধ করিয়াছে। আমাদের চৈতন্য জাগরিত হইলে ঐ বাধা অপসারিত করা হয়তো কঠিন হইবে না। কিন্তু একথা স্বীকার না করিয়া উপায় নাই যে, যেটুকু যোগ আছে তাহা কেবল সাহিত্যের দ্বারাই সম্ভব হইয়াছে।
জাতীয় জীবনে জাতীয় সাহিত্যের প্রভাব সম্বন্ধে আমরা কিছু কাল বড় উদাসীন ছিলাম। এদেশে ইংরেজী শিক্ষার প্রথম যুগে ইংরেজী শিক্ষিত সম্প্রদায়ে সেই ঔদাসীন্যটা এক রকম বিরুদ্ধতার ভাবই ধারণ করিয়া বসিল। বঙ্কিমচন্দ্র এই সম্প্রদায়কে কশাঘাত করিয়া একদিন বলিয়াছিলেন, “যাঁহারা বাক্যে অজেয়, পরভাষাপারদর্শী, মাতৃভাষাবিরোধী তাঁহারাই বাবু। মহারাজ! এমন অনেক মহাবুদ্ধিসম্পন্ন বাবু জন্মিবেন যে, তাঁহারা মাতৃভাষায় বাক্যালাপে অসমর্থ হইবেন।” বঙ্কিমচন্দ্রের এই বিদ্রূপ অত্যন্ত রূঢ় হইলেও ইহার মধ্যে অত্যুক্তি ছিল না। ইংরেজ রাজত্বের প্রথম যুগে বঙ্গদেশে ইংরেজী ভাষাকেই শিক্ষার মাধ্যম রূপে কি ভাবে গ্রহণ করা হইল তাহার বিস্তারিত ইতিহাস লিপিবদ্ধ করিতে চাহি না, কিন্তু তদানীন্তন শিক্ষিত সমাজের মনোবৃত্তি কিরূপ ছিল এই প্রসঙ্গে তাহা স্বভাবতই মনে পড়ে। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ মাতৃভাষার নানাভিমুখী অনুশীলন হইতেছে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নিম্নতম শ্রেণী হইতে উচ্চতম শ্রেণী পর্যন্ত মাতৃভাষার মাধ্যমে অধ্যয়ন অধ্যাপন চলিতেছে। ইণ্টারমিডিয়েট এবং বি.এ পরীক্ষায় বঙ্গভাষা ও সাহিত্যের পূর্ণতর অনুশীলনের সুব্যবস্থা হইয়াছে। কেবল বাঙলাভাষা ও সাহিত্য অধ্যয়ন করিয়া ছাত্রছাত্রীগণ সর্বোচ্চ উপাধি গ্রহণ করিতেছেন। মাতৃভাষার প্রতি এই মর্যাদা দিয়া কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যে আদর্শ স্থাপন করিতে সমর্থ হইয়াছেন, ভারতবর্ষের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে তাহা অল্পবিস্তর অনুসৃত হইতেছে। আশা করি এমন একদিন আসিবে যেদিন ভারতের প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিম্নতম পাঠ হইতে উচ্চতম গবেষণা পর্যন্ত মাতৃভাষার বাহকতায় সম্পন্ন হইতে পারিবে। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যে সিদ্ধিলাভ করিতে সমর্থ হইয়াছেন তাহার গুরত্ব আমরা সব সময় অনুভব করিতে পারি না। কি প্রচণ্ড বিরুদ্ধতার বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম করিয়া আমরা এই যে ফললাভ করিয়াছি, তাহা আমরা বিস্মৃত হই। যাঁহারা প্রতিকূল আত্মীয়ের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করিয়া নিজদেহে অস্ত্রাঘাত সহ্য করিয়াও বিমাতার অঙ্গনে মাতৃভাষাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করিয়া গিয়াছেন, এখানে সেই পুণ্যশ্লোক ঋষিকল্প পূর্বজগণের নাম স্মরণ করিতেছি।
রাজনৈতিক কারণে যদিও দেশের মধ্যে একটা দলাদলির বিষাক্ত আবহাওয়ার উদ্ভব হইয়াছে, তথাপি অতি বড় নিন্দুকেও বাঙালী জাতিকে অনৌদার্যের অপবাদ দিতে পারিবে না। আমরা সাহিত্যকে জাতিগঠনের সর্বশ্রেষ্ঠ উপাদান বলিয়া গণ্য করি। সাহিত্য যেমন জাতির অঙ্গে সঞ্জীবন-রসের সঞ্চার করিয়া জাতিকে সজ্ঞান সচেতন এবং সবল করিয়া তুলে, জাতির সমুদ্বোধিত চৈতন্য, সুগঠিত চিন্তাধারা এবং সুনিয়ত বিচারবুদ্ধি তেমনি মহত্তর সাহিত্য প্রণয়নে সহায়তা করে। বঙ্গদেশের শিক্ষাচার্যগণ এই তত্ত্বটি উপলব্ধি করিয়া তাহা কার্যতঃ প্রয়োগ করিয়াছিলেন। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যবিধির সহিত যাঁহাদের কিছুমাত্র পরিচয় আছে তাঁহারা সকলেই সে কথা জানেন। বাঙলাভাষা ও সাহিত্যচর্চার ব্যবস্থা করাই যে কালে আপত্তির কারণ হইত অন্য ভাষার পঠন-পাঠনের আয়োজন করা সেকালে প্রায় অসম্ভবই ছিল। আজ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা হইতে এম.এ. পর্যন্ত সকল শ্রেণীতেই বিভিন্ন প্রাদেশিক ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যয়ন অধ্যাপনার সুযোগ আমরা লাভ করিতেছি। এই ব্যবস্থার প্রবর্তনের জন্যও পিতৃদেবকে কম প্রতিকূলতা সহ্য করিতে হয় নাই, কিন্তু দেশকে প্রদেশের গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ রাখার মত মনোবৃত্তি তাঁহার ছিল না। তিনি ভাবিয়াছিলেন নিজের ভাষা এবং নিজের সাহিত্যের অনুশীলন করিয়া বাঙালী যে কল্যাণ লাভ করিবে, অন্য জাতি সুযোগের অভাবে সে কল্যাণ হইতে বঞ্চিত হইলে, ক্ষতি শুধু, সেই বিশেষ জাতিরই নয়, সে ক্ষতি সমগ্র ভারতবর্ষের। তিনি বুঝিয়াছিলেন সর্ব অঙ্গের সুস্থতার উপর সমগ্র দেহের স্বাস্থ্য নির্ভর করে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিধিতে হিন্দী, মারাঠী, গুজরাটী, ওড়িয়া, আসামী, মৈথিলী ইত্যাদির সঙ্গে সঙ্গে সুদূর দক্ষিণ-ভারতের তামিল, তেলুগু, প্রভৃতিকেও স্থান দিয়াছিলেন। যে ভাষা আপন প্রদেশে অনাদৃত, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাহাকেও সমগ্র জাতির মুখে চাহিয়া অনাদর করেন নাই। বাঙলা দেশ তাহার বাণীপীঠ হইতে যে আদর্শ প্রচার করিয়াছে, যেদিন সমগ্র ভারতবর্ষ সেই মহাদর্শে অনুপ্রাণিত হইবে, গভীর ঔৎসুক্যের সহিত সেই শুভদিনের প্রতীক্ষা করিতেছি।
সাহিত্যের সহিত ভাষার যোগ অত্যন্ত নিবিড়। আত্মার সহিত দেহের যে সম্বন্ধ সাহিত্যের সহিত ভাষার সেই সম্বন্ধ। যাহাকে ভালবাসি তাহার দেহটাকে বাদ দিয়া শুধু, আত্মাটির কথা তো আমরা কল্পনা করিতে পারি না। বস্তুতঃ দেহটাকে লইয়াই আমাদের যত কারবার। যে আপনার ভাষাকে ভালবাসে আপনার সাহিত্যের প্রতিও তাহার মমত্ববোধ সহজেই জাগ্রত হয়। আবার উচ্চতর সাহিত্যে রসের উপলব্ধি ঘটিলে তখন ভাষা ও সাহিত্যের প্রাদেশিক গণ্ডি হইতে মন সহজেই মুক্তি লাভ করে। তখন অন্যের ভাষা নিজে পড়িতে এবং নিজের ভাষা অন্যকে পড়াইতে ইচ্ছা হয়। যে কোনো দেশে যে কোনো কালে এই অবস্থা সকলেরই কাম্য। কিন্তু যদি কেহ শিক্ষাদানের মত পূণ্যেকর্মকে রাজনৈতিক অথবা অন্য কোনো কুটিল উদ্দেশ্যে নিয়োজিত করে, তবে তাহা নিন্দনীয় সন্দেহ নাই। অনেক প্রদেশের প্রান্তসীমায় প্রায়ই এই ধরনের অভিযোগ শুনিতে পাওয়া যায়। একজন বাঙালী যদি বাঙলা শিখিয়া তদুপরি হিন্দী ওড়িয়া অথবা তামিল তেলুগু, শিখে, তাহা তো আনন্দের কথা। কিন্তু যদি এমন হয় যে, অন্য প্রদেশের কোনো একটা ভাষা হয়তো শিখিল, কিন্তু মাতৃভাষাটাই শেখা হইল না, তবে তাহার মত দুর্ভাগ্য আর কি হইতে পারে? দেশকে প্রদেশে বিভক্ত করিবার স্বাভাবিক উপায় হইল ভাষাবিচার, —ধর্মভেদে প্রদেশ ভেদের যে সাম্প্রতিক চেষ্টা আরম্ভ হইয়াছে, তাহা পৃথিবীর কোনো সভ্য জাতির অননুমোদিত নহে। সূতরাং এক প্রদেশের অজ্ঞ নিরক্ষর দরিদ্র মানুষকে সামান্য কিছু প্রলোভন দেখাইয়া যদি তাহাকে অন্য ভাষায় দীক্ষিত করা হয় এবং বারংবার শুনাইয়া শুনাইয়া তাহার মনে যদি এই বিশ্বাস বদ্ধমূল করিয়া দেওয়া যায় যে, ঐ অন্য ভাষাই তাহার মাতৃভাষা, তবে এই প্রদেশের আপত্তি করিবার সংগত কারণ থাকিতে পারে। শিক্ষাদানের মত মহৎ কর্তব্য আর কি আছে? যাঁহারা শিক্ষাদানের ব্রত গ্রহণ করিয়াছেন তাঁহারা জাতির নমস্য। কিন্তু তাঁহারাও যদি এক প্রদেশীয়কে অন্য প্রদেশীয় বলিয়া প্রমাণ করিবার জন্যই শিক্ষাদান করেন, তাঁহাদের উদ্দেশ্যকে সাধু বলিব না। বাঙলা দেশের তরফ হইতে আমরা কি করিতে পারি তাহা দেখিতে হইবে। অন্যে আসিয়া যদি আমার নিরক্ষর ভ্রাতা-ভগিনীকে তাহারই অক্ষর শিখাইতে থাকে, তাহাকে বাধা দিবার কোনো সংগত কারণ নাই। কিন্তু আমার কর্তব্যটা তাহার পূর্বে পালন করিয়া লইতে হইবে। আমার ভাষা তাহাকে আগে শিখাইয়া দিতে হইবে। সে কে, তাহার পূর্বপুরুষের পরিচয় কি, আমার সহিত তাহার এবং তাহার সহিত সমগ্র দেশের সম্বন্ধ কিরূপ-ইহা যদি একবার তাহার অন্তরে প্রবিষ্ট করাইয়া দিতে পারি, তাহা হইলে পৃথিবীর সকল ভাষার এক এক দল প্রতিনিধি আসিয়া গ্রামে গ্রামে ভাষা শিক্ষার পাঠশালা খুলিয়া দিলেও কোনো ক্ষতি হইবে না, বরং কিছু উপরি লাভ হইবে।
যে কর্তব্যের উল্লেখ করিলাম, তাহা একজন দুইজনের কাজ নয় দেশের শিক্ষিত সমাজকে এই কাজের ভার লইতে হইবে। দেশের মধ্যে বয়স্ক শিক্ষার সুব্যবস্থা করিতে হইবে। যে দেশের লোক অধিকাংশই নিরক্ষর তাহাদের শিক্ষিত করিবার পণ গ্রহণ করিতে পারে তরুণ ছাত্রসম্প্রদায়ের মধ্যে এমন উৎসাহী কর্মীর অভাব হইবে না, সে ভরসা আমি দিতে পারি। কিছুকাল আগে কলিকাতা ইউনিভার্সিটি ইনষ্টিট্যুটের উদ্যোগে বয়স্ক শিক্ষাদানের যে ব্যবস্থা হইয়াছিল, তাহা নিষ্ফল হয় নাই। আহ্বানমাত্র ছাত্রগণ দলেদলে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিলেন এবং উপযুক্ত শিক্ষকের নিকট শিক্ষাদান পদ্ধতি শিখিয়া লইয়া দীর্ঘ অবকাশে আপনআপন গ্রামে গিয়া বয়স্ক নিরক্ষরদিগকে শিক্ষা দিয়াছিলেন। সমগ্র দেশে ব্যাপকভাবে এই শিক্ষাদান-কার্য চালাইতে হইলে একটি প্রতিষ্ঠানের শক্তিই যথেষ্ট হইতে পারে না। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাহিত্য-সমিতি, গ্রন্থাগার-সমিতি প্রভৃতি এই কাজে সহযোগিতা করিলে আমাদেরই অশিক্ষিত ভ্রাতা-ভগিনীরা, যাহারা আজ সমাজের ভারস্বরূপ, তাহারাই সমাজের সুযোগ্য সভ্য বলিয়া গণ্য হইবে। বাঙলাদেশে দুই হাজারের কাছাকাছি মাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে। এই সকল বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ উচ্চতর শ্রেণীর ছাত্রদের সহায়তায় নিরক্ষর দেশবাসীকে মাতৃভাষা শিক্ষা দিবার উদ্দেশ্যে যদি অবসর সময়ের কিয়দংশ ব্যয় করিতে প্রস্তুত হন, তাহা হইলে দেশমাতার প্রকৃত সেবা করা হইবে। অর্থের প্রয়োজন সব কাজেই আছে, তাহা আমি বিস্মৃত হই নাই। কিন্তু আমার বিশ্বাস বর্তমানে দেশে জাতীয়তাবোধ যে ভাবে জাগ্রত হইতেছে, তাহাতে কোনো মহৎকার্যই অর্থের অভাবে আটকাইয়া যাইবে না। কাজ আরম্ভ করিলে দেশবাসীর সহানুভূতি ও সহযোগিতা দুর্লভ হইবে না।
প্রশ্ন উঠিতে পারে, বাঙলা ভাষার মাধ্যমে জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষা প্রসারের জন্য কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান—যথা, বিশ্বভারতীর অন্তর্গত লোকশিক্ষা-সংসদ, শান্তিপুর পুরাণ-পরিষদ এবং প্রবাসী - বঙ্গসাহিত্যসম্মেলনের অন্তর্গত পরীক্ষা-পরিষদ-ইতিপূর্বেই এ কাজে হাত দিয়াছেন। কয়েক বৎসর যাবৎ তাঁহারা আপনআপন কার্যে ব্রতী আছেন, কিন্তু আশানুরূপ ফললাভ হইয়াছে কি? বস্তুতঃ কি আশা লইয়া উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানসমূহের কর্তৃপক্ষ কর্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন এবং তাঁহাদের আশা কতটা সাফল্য লাভ করিয়াছে, তাহা তাঁহারাই বলিতে পারেন। এ স্থলে আমি সবিনয়ে এই কথা বলিতে চাই যে, কেবলমাত্র পরীক্ষাগ্রহণ দ্বারাই প্রকৃত শিক্ষাদান সম্ভব নহে।
লোকশিক্ষা-সংসদ এবং পরীক্ষা-পরিষদের নিয়মাবলী আমি যত্নপূর্বক দেখিয়াছি। বিদ্যালয়ে পাঠ করিবার সুযোগ যাঁহাদের ঘটে না বাঙলাদেশের সেই সব নরনারীর মধ্যে বাঙলার মাধ্যমে জ্ঞানবিস্তার করিবার উদ্দেশ্যে বিশ্বভারতী লোকশিক্ষা-সংসদ প্রতিষ্ঠা করেন। রবীন্দ্রনাথের এক পত্র হইতে তাঁহার অভিপ্রায় কি ছিল জানিতে পারি। তিনি লিখিয়াছিলেন: “দেশের যে সকল পুরুষ ও স্ত্রীলোক নানা কারণে বিদ্যালয়ে শিক্ষালাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত, তাঁদের জন্য ছোটো বড়ো প্রাদেশিক সহরগুলিতে যদি পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করা যায়, তবে অনেকেই অবসরমতো ঘরে ব’সে নিজেকে শিক্ষিত করতে উৎসাহিত হবেন। নিম্নতন থেকে উচ্চতন পর্ব পর্যন্ত তাঁদের পাঠ্যবিষয় নির্দিষ্ট ক’রে, তাঁদের পাঠ্যপুস্তক বেঁধে দিলে, সবিহিত ভাবে তাঁদের শিক্ষা নিয়ন্ত্রিত হ’তে পারবে। এই পরীক্ষার যোগে যে-সকল উপাধির অধিকার পাওয়া যাবে সমাজের দিক থেকে তার প্রয়োজনীয়তার মূল্য আছে।” শেষোক্ত প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য—“(ক) প্রাচীন ও আধুনিক বঙ্গসাহিত্যের পরিচয়। (খ) বঙ্গভাষার আভিজাত্য সংরক্ষণ।” এবং তাঁহাদের মতে এই উদ্দেশ্যসাধনের উপায় “প্রবাসী বঙ্গ-সাহিত্য সম্মেলন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত পরীক্ষা-পরিষদ দ্বারা নির্দিষ্ট কেন্দ্রে আপাতত বৎসরে একবার মাত্র প্রবেশিকা এবং উপাধি পরীক্ষা গ্রহণ করা।”
উভয় প্রতিষ্ঠানের অভিপ্রায় একরূপ অভিন্ন। উপায়ও প্রায় সমান। তবে পাঠ্যক্রম প্রভৃতি সম্বন্ধে কিছু কিছু পার্থক্য আছে। উভয় প্রতিষ্ঠানকে সম্মিলিত হইতে হইলে এই পার্থক্য দূর করিতে হইবে। তাহা না হইলে পাঠ্যতালিকার ভেদে কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি নাই। যে উদ্দেশ্যে এই সকল প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হইয়াছে তাহা সিদ্ধ হইলে সর্বতোভাবে জাতির পক্ষে কল্যাণজনক হইবে, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু এই পরীক্ষা-গ্রহণের সহিত নিরক্ষর দেশবাসীকে অ আ ক খ হইতে আরম্ভ করিয়া বাঙলা লেখাপড়া শিখাইবার কোনো সম্বন্ধ নাই। তাহার জন্য স্বতন্ত্র ব্যবস্থা আবশ্যক। সে ব্যবস্থা প্রণয়নে ইঁহাদের সাহায্যই সর্বাগ্রে প্রয়োজন হইবে।
মাতৃভূমিকে আমরা যদি দেবী বলিয়া স্বর্গাদপি গরীয়সী বলিয়া জ্ঞান করি, তবে মাতৃভাষাকেও পরমারাধ্যা বলিয়া জ্ঞান করিব। সৌভাগ্যের কথা, অন্ধভক্তির বশবর্তী হইয়া আমাদের ভাষাকে আরাধনা করিবার প্রয়োজন হইবে না। বাঙলা ভাষা আজ নিজের ঐশ্বর্যবলে জগতের শ্রেষ্ঠ ভাষাসমূহের অন্যতম বলিয়া গণ্য হইয়াছে। হিন্দুস্থানীর ন্যায় তাহাকে যদি গণভাষারূপে ব্যবহার করিতে জনসাধারণ অসমর্থ হয়, তবে তাহা লইয়া আক্ষেপ করিব কেন? ভাষার উন্নতি এবং প্রসারের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা আমাদের কর্তব্য এবং সে কর্তব্য আমরা ঐকান্তিকভাবে নিষ্ঠার সহিত পালন করিব। আমাদের ভাষালক্ষ্মীর মর্যাদা তাহাতেই সমধিক রক্ষিত হইবে। কত লোকে এক একটা ভাষাকে মাতৃভাষারূপে ব্যবহার করে তাহার হিসাব করিয়া দেখিলেও পৃথিবীর মধ্যে বাঙলার স্থান সপ্তম এবং ভারতের মধ্যে প্রথম। ইহা বিশেষজ্ঞের মত। আর যদি আদমসুমারির হিসাবের উপর নির্ভর করা যায়, তবে বাঙলার পৃথিবীর মধ্যে অষ্টম এবং ভারতের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান। তাহাও বড় কম গৌরবের কথা নহে। ১৯৪১-এর আদমসুমারিতে ভাষার হিসাব বাদ দেওয়া হইয়াছে, তাহা হয়তো আপনারা লক্ষ্য করিয়া থাকিবেন। ১৯৪১-এ বাঙলার অধিবাসীর মোট সংখ্যা ছয় কোটি চৌদ্দ লক্ষ ষাট হাজার তিন শ সাতাত্তর। ১৯৩১-এ মোট অধিবাসীর শতকরা ৯২ জনের ভাষা বাঙলা ধরা হইয়াছিল। সেই হিসাবে এবারে বঙ্গভাষাভাষী বাঙালীর সংখ্যা হওয়া উচিত পাঁচ কোটি পঁয়ষট্টি লক্ষ তেতাল্লিশ হাজার পাঁচশ সাতচল্লিশ (৫৬৫,৪৩,৫৪৭)। ইহা ছাড়া বাঙলার বাহিরে আসাম উড়িষ্যা এবং বিহার ও অন্যান্য প্রদেশের অধিবাসী অনেক বাঙালী আছেন, যাঁহারা আজও মাতৃভাষারূপে বাঙলার ব্যবহার করিয়া থাকেন। সুতরাং দেখা যাইতেছে, বঙ্গভাষাভাষী ভারতীয়ের সংখ্যা কমপক্ষে ছয় কোটি। এই সংখ্যা উত্তরোত্তর বর্ধিত হউক, ইহাই আমাদের কামনা। অন্তত এটুকু আমাদের দেখিতে হইবে, বাঙালীর মধ্যে, তিনি বর্তমানে যে প্রদেশেরই অধিবাসী হউন না কেন, একজনও যেন বাঙলা ভাষায় অজ্ঞ না থাকেন।
পরম আনন্দের বিষয় যে জামসেদপুর শিক্ষাপ্রচার-সমিতির উদ্যোগে অশিক্ষিত জনসাধারণকে বাঙলা ভাষা শিক্ষা দেওয়া হইতেছে। ধূম্রধুলির ঘূর্ণিবাত্যার ঊর্ধ্বেও যাঁহারা জ্ঞানের পবিত্র বহ্নিশিখাটি প্রজ্বলিত রাখিবার চেষ্টা করিতেছেন, তাঁহারা দেশবাসীর কৃতজ্ঞতার পাত্র। সবর্ণপ্রদীপের সংস্থান না হইয়া থাকে না হইল, তাহার জন্য আক্ষেপের কোন কারণ নাই। তাঁহাদের অদম্য উৎসাহ এবং অক্লান্ত অধ্যবসায়ের সংস্পর্শে পিতলের প্রদীপই সোনা হইয়া উঠিবে। সমিতির শিক্ষাদান কার্য সম্ভবত বালকবালিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রাখিয়া বয়স্কদিগের মধ্যেও পরিব্যাপ্ত করা হইয়াছে। যদি এখনও না হইয়া থাকে, তবে অবিলম্বেই তাহা করা প্রয়োজন। কেবল শিশু, অথবা কেবল বয়স্কের মধ্যে শিক্ষাদান আবদ্ধ রাখিলে সমিতির মূখ্য উদ্দেশ্য সার্থকতা লাভ করিবে না।
সময়ের মূল্য বর্তমান যুগে অত্যন্ত অধিক। দীর্ঘকাল ধরিয়া পঠনপাঠনের সময় কেহ পাইবে না। যে সম্প্রদায়ের পাঠার্থী লইয়া সমিতির কাজ, তাহাদের অবসর অতি অল্প। এই অল্প সময়ের উপযুক্ত ব্যবহার হইতেছে কি না, তাহা বিশেষ ভাবে লক্ষ্য করিতে হইবে। ছয় মাস বা এক বৎসর শিক্ষা পাইয়া একজন নিরক্ষর লোক সর্বশাস্ত্রে সুপণ্ডিত হইবে, এমন আশা করা সঙ্গত হইবে না। কিন্তু মাতৃভাষায় অন্তত এতটা অধিকার অর্জন করা আবশ্যক, যাহাতে সংবাদপত্রটা পড়িয়া মানে বুঝিতে পারে এবং নিজের চিঠিটা অন্যকে দিয়া লিখাইতে বাধ্য না হয়। ইহার সঙ্গে সঙ্গে কিছু সাধারণ জ্ঞানও শিক্ষা দেওয়া আবশ্যক। যে জগতে সে বাস করে, তাহার সম্বন্ধে যেন একেবারে অন্ধ না থাকে। বয়স্ক এবং অল্পবয়স্ক পাঠার্থীর পাঠক্রম এবং শিক্ষা-ব্যবস্থা একরূপ হইলে চলিবে না। কারণ উভয়ের গ্রহণশক্তি ও ধারণাশক্তি একরূপ নয়। তাহা ছাড়া একটি ছয় বৎসরের শিশুর কাছে যে পাঠ মনোজ্ঞ হইবে, একজন মধ্যবয়সী শ্রমিকের পক্ষে সেই পাঠ হৃদয়গ্রাহী হইবার সম্ভাবনা অল্প। এদিকে চিন্তা করিয়া পাঠ্যনির্ণয় ও পাঠক্রম স্থির করিতে হইবে। বর্তমান আয়োজন অল্প বলিয়া হতাশ হইবার কারণ নাই। ক্ষুদ্র অঙ্কুরের মধ্যেই বৃহতের সম্ভাবনা প্রচ্ছন্ন থাকে।
ভারতবর্ষে শিক্ষা, সভ্যতা এবং স্বাদেশিকতা প্রচারে বাঙালীর দান অসামান্য। বঙ্গের বাহিরে বাঙালীরা যে প্রদেশেই গিয়াছেন, সেই প্রদেশকেই স্বদেশ বলিয়া তাহার উন্নতিবিধানে আত্মনিয়োগ করিয়াছেন। মাদ্রাজ, মহীশূর, পঞ্জাব, যুক্তপ্রদেশ, উড়িষ্যা এবং ভারতের অন্যান্য স্থানে তাহার প্রচুর নিদর্শন আছে। নিঃস্বার্থ সেবাপরায়ণতা বাঙালীর জাতীয় ধর্ম, সংকীর্ণ প্রাদেশিকতার ক্ষুদ্রতর স্বার্থের মোহ কখনো তাঁহাদিগকে অখণ্ড ভারতের মহত্তর আদর্শের পথ হইতে বিচলিত করিতে পারে নাই। তাই তাঁহারা সকলের বিশ্বাসভাজন এবং শ্রদ্ধার পাত্র হইয়াছিলেন। রাজনীতির ক্ষেত্রেও বাঙালীরা চিরকাল ভারতের কথাই চিন্তা করিয়াছেন, প্রদেশের সুখ-সুবিধার ঊর্ধ্বে দেশের স্বাধীনতাকেই তাঁহারা স্থান দিয়াছেন। বিদ্যা বিতরণের ক্ষেত্রে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদার সর্বজনীন নীতির উল্লেখ পূর্বেই করিয়াছি।
যে কোনো অবস্থাতেই হউক না কেন, ঐক্য ও অখণ্ডতার সেই বৃহৎ আদর্শ হইতে আমরা কখনোই বিচ্যুত হইব না। সাময়িক স্বার্থের প্রলোভনে চিরন্তন মঙ্গলের পথ রুদ্ধ হইতে দিব না। আমাদের জাতীয় ভাষা ও সাহিত্য সম্বন্ধে এই কথা বিশেষভাবে প্রযোজ্য। কুটিল রাজনীতি জনসাধারণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করিবার জন্য সর্বত্রই একবার করিয়া ঘা মারিয়া যাইতেছে। দুর্বল স্থানে তাহা বেশ জোরেই লাগিতেছে। হিন্দীকে বিকৃত করিবার যে অপচেষ্টা চলিতেছে এবং অল্-ইণ্ডিয়া রেডিওর সাহায্যে তাহা যে ক্রমশ ব্যাপক এবং বর্ধিত করা হইতেছে, তাহা আপনারা অবগত আছেন। এদিকে লেখ্য হিন্দী ভাষায় উর্দু হরফের ব্যবহার কংগ্রেসের সমর্থন পাওয়ায়, ঐ অপচেষ্টার ক্ষেত্র আরও উর্বর হইল। আমরা কি নিশ্চেষ্ট নিরুত্তরে এই অত্যাচার সহ্য করিয়া লইব? বাঙলা ভাষালক্ষ্মীর অঙ্গনেও ভেদনীতির অঙ্কুর বপনের কাজ আরম্ভ হইয়াছে। অবিলম্বে তাহাকে উৎপাটন করিয়া না ফেলিলে বিষবৃক্ষ ডালপালা মেলিয়া সমগ্র দেশকে আবৃত আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিবে। বাঙলার এই দূরবস্থা দেখিয়া রবীন্দ্রনাথ আক্ষেপ করিয়া বলিয়াছিলেন, “আজ হিন্দ-ুমুসলমানে যে একটা লজ্জাজনক আড়াআড়ি দেশকে আত্মঘাতে প্রবৃত্ত করছে তার মূলেও আছে সর্বদেশব্যাপী অবুদ্ধি। অলক্ষ্মী সেই অশিক্ষিত অবুদ্ধির সাহায্যেই আমাদের ভাগ্যের ভিত্তি ভাঙবার কাজে চর লাগিয়েছে, আত্মীয়কে তুলছে শত্রু করে, বিধাতাকে করছে আমাদের বিপক্ষ। শেষকালে নিজের সর্বনাশ করবার জেদ এতদূর পর্যন্ত আজ এগোল যে, বাঙালী হয়ে বাঙলা ভাষার মধ্যেও ফাটল ধরাবার চেষ্টা আজ সম্ভবপর হয়েছে; শিক্ষার ও সাহিত্যের যে উদার ক্ষেত্রে সকল মতভেদ সত্ত্বেও একরাষ্ট্রীয় মানুষের মেলবার জায়গা, সেখানেও স্বহস্তে কাঁটাগাছ রোপণ করবার উৎসাহ ব্যথা পেল না, লজ্জা পেল না।”
যে অশিক্ষিত অবুদ্ধি আমাদের ভাগ্যের ভিত্তি ভাঙিবার চেষ্টায় রত, তাহাকে দূরীভূত করিবার সর্বপ্রধান উপায় দেশব্যাপী শিক্ষার প্রসার। সাহিত্যের মধ্য দিয়াই দেশকে সহজে শিক্ষিত করা সম্ভব। আপন প্রাদেশিক ভাষায় আপন প্রদেশের জনগণকে শিক্ষিত করিয়া জাতীয় সাহিত্যের সর্বোৎকৃষ্ট রত্নগুলি তাহাদের সম্মুখে ধরিতে হইবে। স্ব-দেশকে, স্ব-জাতিকে, আপনার সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে জানিবার এবং শ্রদ্ধা করিবার শিক্ষা পাইয়া জনগণ ধন্য হইবে। জাতীয় উন্নতির ইহাই প্রথম ও প্রধান সোপান।
সাহিত্যের প্রচার শুধু প্রদেশের মধ্যে আবদ্ধ রাখিলেই চলিবে না, সর্বভারতীয় ভিত্তিতে ভারতীয় সাহিত্যের প্রকাশ ও প্রচারের ব্যবস্থা করিতে হইবে। এক ভাষার গ্রন্থ অন্যভাষী পাঠকের পঠনযোগ্য করিয়া তুলিতে হইবে। পরস্পরকে চিনিবার জন্য, পরস্পরের চিন্তাধারার সহিত পরিচিত হইয়া আপনআপন মত গঠন, বর্জন অথবা সংশোধন করিবার জন্য ইহা অপেক্ষা যোগ্যতর উপায়ের কথা তো আমি ভাবিয়া পাই না।
এইখানে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠিবে, এক ভাষার গ্রন্থ অন্যভাষীর পঠনযোগ্য করা কি ভাবে সম্ভব হইবে? এক উপায় আছে অনুবাদ এবং সে উপায় বহু বৎসর পূর্ব হইতেই অবলম্বিত হইয়াছে। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র প্রমুখ বহু বাঙালী সাহিত্যিকের রচনাসমূহ ভারতের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হইয়াছে। বাঙলা ভাষাতেও অন্যান্য ভাষার অনেক গ্রন্থের অনুবাদ প্রকাশিত হইয়াছে। অনেকে শুনিয়া কৌতূহল বোধ করিবেন যে, বিদ্যাসাগর মহাশয়ের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ হিন্দী “বেতাল পচিসী”র অনুবাদ। প্রাচীন কাল হইতেই বাঙলা ভাষায় অন্য প্রদেশীয় গ্রন্থের অনুবাদ আরম্ভ হইয়াছে। সপ্তদশ শতাব্দীর বাঙালী কবি আলাওলের রচিত পদ্মাবতী নামক কাব্যখানির নাম বঙ্গসাহিত্যের ইতিহাসে বিখ্যাত। এই কাব্যখানি মালিক মুহম্মদ জৈসীর হিন্দী কাব্য “পদুমাবৎ” অবলম্বনে রচিত হইয়াছিল। এই অনুবাদের ধারা, কখনও বা আক্ষরিক অনুবাদ কখনও বা ভাবানুবাদ, আজ পর্যন্ত চলিয়া আসিয়াছে। কিন্তু অনুবাদগ্রন্থ নানা কারণে যথেষ্ট পরিমাণে প্রকাশিত হওয়া সম্ভব হয় না। উপযুক্ত অনুবাদকের অভাব তাহার অন্যতম। অনুবাদ করিতে গেলে উভয় ভাষায় সমান জ্ঞান থাকা আবশ্যক। ভাষান্তর করিতে গেলে অনেক সময় শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকের পক্ষেও মূলের ভাব এবং রস অব্যাহত রাখা কঠিন হয়। এই সমস্ত অন্তরায় থাকা সত্ত্বেও অনুবাদ গ্রন্থের আবশ্যক আছে। ইংরেজী এবং অন্যান্য বিদেশীয় সাহিত্যের জ্ঞানভাণ্ডারের দ্বার অনুবাদের সাহায্যেই ভারতবাসীর সম্মুখে উন্মুক্ত করিতে হইবে। কিন্তু ভারতীয় সাহিত্যের জন্য আমি একটি অপেক্ষাকৃত অনায়াসসাধ্য উপায় অবলম্বনের প্রস্তাব করি। আমি বলি ভারতীয় সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থসমূহ ভাষা অটুট রাখিয়া শুধু বিভিন্ন লিপিতে মুদ্রিত করা হউক। আমার বিশ্বাস এইরূপে পুস্তক বিভিন্ন প্রদেশে পঠিত হইয়া আন্তঃ-প্রাদেশিক মিলনের পথ প্রস্তুত করিবে। আমার প্রস্তাবের পক্ষে কয়েকটি যুক্তি প্রদর্শন করিতেছি:
১। ভারতবর্ষের বিভিন্ন ভাষার বর্ণক্রমে কোনো ভেদ নাই বলিলেই চলে, কেবল লিপির আকৃতি স্বতন্ত্র। অর্থাৎ, ‘অ আ ই ঈ’ ‘ক খ গ ঘ’ রূপে যে ভাবে আমাদের বর্ণমালা সজ্জিত আছে, ভারতের সকল প্রদেশেই সেইরূপ। এমন কি দক্ষিণ-ভারতেও। প্রাচীন ব্রাহ্মী লিপি হইতে সকল লিপিরই উৎপত্তি। সেইজন্য বর্ণবিন্যাসে এই অভিন্নতা। (উর্দু, হরফের কথা স্বতন্ত্র। তাহার সহিত ভারতীয় অন্য কোনো লিপির মিল নাই।) এই অভিন্নতার ফলে এক ভাষাভাষী পাঠক অন্য ভাষার বই কেবলমাত্র লিপ্যন্তর করিলেই পড়িতে পারিবেন। এই কথা শুধু অক্ষর সম্বন্ধে নয়, ১ ২ ৩ ৪ প্রভৃতি অঙ্ক সম্বন্ধেও প্রযোজ্য।
২। ভারতীয় আর্যভাষাসমূহের—অর্থাৎ তামিল, তেলুগু, প্রভৃতি দ্রাবিড়ী এবং কোল, মুণ্ডা প্রভৃতি আর কয়েকটি অনার্য ভাষা ব্যতীত, আর সকল ভাষার উৎপত্তি সেই বৈদিক সংস্কৃত হইতে। সব আর্য ভাষারই ইতিহাস একরূপ। প্রাকৃত এবং অপভ্রংশ অবস্থা অতিক্রম করিয়া সকলেই বর্তমানরূপে আসিয়া পৌঁছিয়াছে। সুতরাং আধুনিক ভাষাসমূহের মধ্যে অনেক মিল আছে। শব্দাবলীতে এই মিল অত্যন্ত অধিক। এক ভাষা অন্য ভাষীর কাছে যতটা দুর্বোধ্য বলিয়া আমরা ধারণা করি, কার্যত তাহা সত্য নয়। অপরিচিত লিপিই আমাদের ভয়ের কারণ হয়। বাঙলা হরফে হিন্দী বই প্রকাশিত হইলে তাহা বাঙালীর পক্ষে পড়া কঠিন হইবে না। ভারতের অনেকখানি জুড়িয়া নাগরী লিপির প্রচলন। হিন্দী ছাড়াও বহু ভাষার পুস্তক নাগরীতে মুদ্রিত হয়। সুতরাং বাঙলা ভাষার বই নাগরী লিপিতে প্রকাশিত হইলে ভারতের বহু প্রদেশের সহিত আমাদের বৌদ্ধিক এবং সাংস্কৃতিক যোগ সাধিত হইবে। ভারতীয় সকল ভাষা এবং লিপি সম্বন্ধেই এই কথা বলা চলে। তবে প্রথমে প্রধান প্রধান ভাষা এবং লিপি লইয়া পরীক্ষা আরম্ভকরাই ভাল।
৩। আমার সর্বাপেক্ষা বড় যুক্তি আমার নিজের এবং অন্যপ্রদেশীয় কয়েকজন বন্ধুর ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা। বস্তুতঃ যে ভাষার সহিত পরিচয় অল্প, নিজের হরফে লিখিত সেই ভাষার রচনা পড়িয়া দেখিলেই আমার কথার তাৎপর্য সকলেই হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিবেন।
বাঙলা হরফে এ ধরনের কাজ কিছু কিছু হইয়াছে। কাঁথি নীহার প্রেস হইতে প্রকাশিত বাঙলা হরফে মুদ্রিত ওড়িয়া পুস্তকসমূহের নাম এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। নাগরী লিপিতে মুদ্রিত একটি কবিতা-সংকলন গ্রন্থে ভারতের বিভিন্ন ভাষার লোক-সংগীত, কবিতা এবং ছড়া সংগৃহীত হইয়াছে। উহার ভূমিকা, গ্রন্থ-পরিচয়, টীকা-টিপ্পনী ইত্যাদি হিন্দীতে লিখিত। কিন্তু কবিতাসমূহ যে ভাবে সংগৃহীত হইয়াছে সেইভাবেই মুদ্রিত হইয়াছে। তাহাদের ভাষা কিছুমাত পরিবর্তন করা হয় নাই, কেবল নাগরী লিপিতে ছাপানো হইয়াছে এই মাত্র।
লিপির প্রসঙ্গে স্বভাবতই রোমান লিপির কথা উঠিতে পারে; সেই-জন্য এ সম্বন্ধে দুই একটি কথা আগেই বলিয়া রাখা আবশ্যক বোধ করি। এক রোমান লিপির দ্বারা ভারতের সকল ভাষা লেখার ব্যবস্থা করা সম্ভব হইলে সুবিধা অনেক হইত সন্দেহ নাই, কিন্তু দেখা গিয়াছে দেশ তাহা গ্রহণ করিবার জন্য এখনও প্রস্তুত হয় নাই। লিপি ভাষার বাহ্য চিহ্নমাত্র। এক চিহ্নের কাজ অন্য চিহ্নের দ্বারা যদি সহজে চলে, তবে চিহ্ন পরিবর্তনে আপত্তি করিবার কোনো কারণ নাই। যুক্তির দ্বারা তাহা বুঝিতে পারি কিন্তু যুক্তির দ্বারা তাহা বুঝাইতে পারি না। কারণ, যুক্তি যতই শাণিত হউক না কেন, সংস্কারের গায়ে সে সহসা দাগ বসাইতে পারে না। ইহা লইয়া তর্ক করা বৃথা। সুতরাং ভারতীয় লিপি দিয়াই কার্যারম্ভ হউক।
আমরা যদি একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতি স্থির করিয়া এই কার্যে আত্মনিয়োগ করি, তাহা হইলে অভীষ্ট ফললাভে বিলম্ব হইবে না। আমি কল্পনা-নয়নে সেই শুভদিন প্রত্যক্ষ করিতেছি, যেদিন বিবিধ ভাষার বিচিত্র লিপির শতদলপদ্মে অধ্যাসীনা হইয়া ভারতের সমগ্রা-রূপিণী সরস্বতী ভারত-ভাগ্যবিধাতার জয়োচ্চারণ করিয়া বলিতেছেন:
“জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে ভারত-ভাগ্যবিধাতা।”