শ্যামাপ্রসাদের কয়েকটি রচনা/স্বামী প্রণবানন্দজী
স্বামী প্রণবানন্দজী
বর্তমান সময়ে বাঙলার ও বাঙালীর নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ভারত-সেবাশ্রম-সংঘ হিন্দুধর্মের পুনরুজ্জীবন এবং মৃতপ্রায় হিন্দুজাতির দেহে শক্তি-সঞ্চার কার্যে অগ্রণী হইয়া ভবিষ্যতের জ্যোতির্ময় ভারতের ভিত্তি পত্তন করিতেছেন। আমাদের কষ্টলব্ধ স্বাধীনতা রক্ষা করিতে হইলে আমাদের প্রকৃত জাতীয়তাকে রক্ষা করিতে হইবে। অর্থাৎ ভারতের নিজস্ব ধর্ম, নীতি, সংস্কৃতি ও সভ্যতা হিন্দুধর্মের স্বর্ণ-পেটিকার মধ্যে সুরক্ষিত আছে, তাহার পুনঃ প্রচার করিতে হইবে। আচার্য’ স্বামী প্রণবানন্দজী-প্রতিষ্ঠিত ভারত-সেবাশ্রম-সংঘ সেই হিন্দু-ধর্মের পুনঃ প্রচারের পবিত্রকার্যে প্রবৃত্ত রহিয়াছেন। হিন্দুধর্মের যে দিকটা কেবল মনন ও নিয়ম পালন লইয়াই ব্যাপ্ত, ঘটনাচক্রে এবং অদৃষ্টদোষে বর্তমান হিন্দুসমাজের সমস্ত উদ্যম সেই দিকেই ব্যয়িত হইতেছিল। কিন্তু আমরা ভুলিয়া গিয়াছিলাম যে, যুগ-পরিবর্তনের ফলে প্রত্যেক হিন্দুকেই ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের সম্মিলিত কর্তব্য পালন করিতে হইবে। হিন্দুধর্মের অন্তর্গত অবশ্য পালনীয় বীরব্রতের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করিয়া আচার্য প্রণবানন্দ স্বামীজী প্রচলিত অংগহীন হিন্দুধর্মকে পূর্ণাংগ করিবার চেষ্টা করিয়াছেন-হিন্দুজাতিকে যুগোচিত মুক্তিমন্ত্রে দীক্ষা দিয়াছেন।
স্বামীজী মহারাজের সহিত বহুবার আমার আলাপের সুযোগ ঘটিয়াছিল। কয়েকবার আমি তাঁহার আহ্বানে বালিগঞ্জে অনুষ্ঠিত কয়েকটি সম্মেলনে জন্মাষ্টমী ও শিবরাত্রির সময় বক্তৃতা ও সভাপতিত্ব করিয়াছি। আমি মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করিতেছি যে, তিনি আমার প্রথম রাজনৈতিক জীবনে বিশেষ প্রেরণা ও শক্তি সঞ্চার করিয়াছিলেন। আজিও আমি শ্রদ্ধার সহিত স্মরণ করি এই বিরাট পুরুষের সুমহান্ ব্যক্তিত্ব, গভীর অন্তর্দৃষ্টি, তেজোব্যঞ্জক পৌরুষ ও আধ্যাত্মিক শক্তির কথা। তাঁহারই দূরদৃষ্টি, বহু বর্ষ পূর্বে হিন্দু-সমাজের রক্ষা ও সংগঠন কল্পে ‘মিলন-মন্দির ও রক্ষিদল’ গঠন আন্দোলন প্রবর্তন করিয়াছিল। তাঁহারই শিক্ষা ও অনুপ্রেরণার ফলে শক্তি-সমন্বিত এই ভারত-সেবাশ্রম-সংঘ ‘নিজ বাসভূমে পরবাসী’ সম দুর্বল ও লাঞ্ছিত হিন্দুকে বিপদে উন্নতশির হইতে শিক্ষা দিতেছেন, ছিন্নভিন্ন ও আত্মকলহপরায়ণ হিন্দু-সমাজকে সংগঠিত একতাবদ্ধ হইবার পথ দেখাইতেছেন, দুঃস্থ ও বিপন্ন হিন্দুকে সান্ত্বনা ও সাহায্য দান করিতেছেন। কেবল তাহাই নহে, স্বদেশে বিস্মৃতিমগ্ন হিন্দুকে তাহার ধর্মের ও সভ্যতার গৌরবগথা স্মরণ করাইয়া দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বামীজীর উপদেশ ও অনুজ্ঞা অনুসারে তাঁহার বাণী বহনকারী ভারত-সেবাশ্রম-সংঘ পৃথিবীর দূর-দূরান্তে অবস্থিত স্থানসমূহে হিন্দুধর্ম প্রচারে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। ভারতের অভ্যন্তরে গয়া প্রভৃতি তীর্থস্থানে সংঘ জাতির সেবাকার্যে যেমন তৎপরতা ও ঐকান্তিকতা দেখাইয়াছেন, সুদূর দক্ষিণ আমেরিকার ত্রিনিদাদ প্রভৃতি অঞ্চলে এবং পূর্ব আফ্রিকাতেও তেমনি হিন্দুধর্মের মঙ্গলশঙ্খ নিনাদিত করিতে সক্ষম হইয়াছেন। পৃথিবীর যে সমস্ত অনগ্রসর ও অনাদৃত অঞ্চল হিন্দুধর্মের নাম পর্যন্ত শুনে নাই, হিন্দু-সন্ন্যাসীর পবিত্র গৈরিক বসন চক্ষে দেখে নাই, আজ সেখানকার জনগণ শাশ্বত সনাতন বেদবাণী শ্রবণ ও নির্মল আধ্যাত্মিক চিহ্ন প্রত্যক্ষ করিয়া ধন্য হইয়াছে। আমার মনে হয়, ভারত-সেবাশ্রম-সংঘের সন্ন্যাসীরা সেই ভবিষ্যৎ যুগের অগ্রদূত, যে যুগে হিন্দুধর্ম ও হিন্দুর সভ্যতা আবার শান্তিপূর্ণ অভিযানে বিশ্ববিজয় করিতে সমর্থ হইবে এবং সেই গৌরবময় যুগের চিত্র দেখিয়াছিলেন আচার্য স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজ সেই দর্শনকে বাস্তবে পরিণত করার জন্য দেশকে ও জাতিকে মন্ত্রদীক্ষা দিয়া গিয়াছেন তিনিই। ভবিষ্যতের জ্যোতির্ময় ভারতের দিব্য দ্রষ্টা সেই মহাপুরুষের উদ্দেশ্যে আমি আজ শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করিতেছি।