শ্রীশ্রীহরি লীলামৃত/আদি খণ্ড/চতুর্থ তরঙ্গ/৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন



শ্রীমৎব্রজনাথ পাগলোপাখ্যান

পয়ার

সুধারস আশ্চর্য লীলার বিবরণ।
ব্রজনাথ উপাখ্যান শুন সর্বজন।।
ব্রজনাথ নামে এক প্রভুর ভকত।
বাল্য হ’তে গুরু সেবা করে অবিরত।।
গুরুপদে ছিল আর্তি দৃঢ় ভক্তি তার।
গুরুকার্য বিনে তার কার্য নাহি আর।।
জ্ঞানকাণ্ড কর্মকাণ্ড কিছু না মানিত।
জ্ঞানশূন্য ভক্তি অঙ্গ প্রেমে পুলকিত।।
সর্বদা উন্মাদ দশা চিন্তা জাগরণ।
ভাবনা জড়িমা কৃতি প্রলাপ বচন।।
গুরুপত্নী আজ্ঞা দিল কার্যান্তরে যেতে।
ব্রজ রহে জ্ঞানশূন্য গুরু আরোপেতে।।
ব্রজ তাহা নাহি জানে নাহি বাহ্যস্মৃতি।
ঠাকুরানী কহিলেন ঠাকুরে সম্প্রতি।।
আমি যাহা কহি তাহা নাহি কর গ্রাহ্য।
এ শিষ্য রাখিয়া তব হ’বে কোন কার্য।।
গৃহস্থের বাড়ী থাকে নাহি জ্ঞান বাহ্য।
মিছা এরে খেতে দেওয়া শীঘ্র কর ত্যজ্য।।
পাগলা স্বভাব ব্রজ নৈষ্ঠিক আচারে।
ঠাকুরানী সেই ভাব বুঝিতে না পারে।।
ঠাকুরানী কথা শুনি ঠাকুর ভুলিল।
ব্রজনাথে বলে যেতে ব্রজ না উঠিল।।
ব্রজভাবে মত্ত ব্রজ অঙ্গভঙ্গী করে।
নির্বোধ ভাবিল, ব্রজ ব্যঙ্গ করে মোরে।।
ক্রোধভরে ব্রজোপরে রুষিল ঠাকুর।
পাদুকা ধরিয়া দণ্ড করিল প্রচুর।।
হেন কালে ব্রজের হইল স্মৃতি জ্ঞান।
গুরু কেন দণ্ড করে না বুঝি সন্ধান।।
পায়ের খড়ম ধরি করেন প্রহার।
ব্রজ বলে কি স্বার্থক জনম আমার।।
হইয়াছে গুরু সেবা যে ত্রুটি আমার।
প্রতিশোধে করে গুরু পাদুকা প্রহার।।
দণ্ড পরিমাণে তার বেদনা যে কম।
প্রহারে ভাঙ্গিল তার হাতের খড়ম।।
ব্রজ কহে শিষ্য নহে আমি দুষ্ট ভণ্ড।
নৈলে কেন গুরু হেন করে গুরুদণ্ড।।
আমাকে মারিয়া গুরু হাতে পেল ব্যথা।
বুঝিতে না পারি আমি অপরাধ কোথা।।
কি বুঝিয়া গুরু মোরে এতেক বৈমুখ।
সে ব্রজনাথের মনে হৈল বড় দুঃখ।।
গুরু অপরাধী তার জীবনে কি ফল।
জীবন ত্যজিতে ব্রজ হইল চঞ্চল।।
মনোদুঃখে ধারা চক্ষে কাতর অন্তরে।
ধীরে ধীরে যায় ব্রজ চকের ভিতরে।।
সেই চকে আছে এক হিজলীকা বৃক্ষ।
জনরব আছে গাছে থাকে এক যক্ষ।।
একাকী পাইলে কারে করয় সংহার।
রাত্রে কেহ নাহি যায় দিনে লাগে ডর।।
আরো সেই গ্রামে ছিল শার্দূলের ভয়।
দুরন্ত সদন্ত বরা চকেতে ভ্রময়।।
হিজলীকা বৃক্ষমূলে ব্রজ বসে রয়।
নিশাকালে ব্যাঘ্র ডাকে ব্রজ ডাকে আয়।।
শার্দূল আসিয়া ব্রজনাথকে ধরিল।
অঙ্গ ঘ্রাণ ল’য়ে ব্যাঘ্র ফিরিয়া চলিল।।
দাঁতাল বরাহ আসে গণ গণ করি।
ব্রজ ডাকে আয় আয় বলে হরি হরি।।
শার্দূল না মারে মোরে তুই মোরে মার।
গুরু ত্যাগী দেহে মোর নাহি দরকার।।
শার্দূল বরাহ এসে তরাসে পালায়।
ব্রজ ভাবে খাক্ ওরা তারা নাহি খায়।।
হিংস্রক শার্দূল বরা হিংসা নাহি করে।
আশ্চর্য গণিয়া ব্রজ ভেবেছে অন্তরে।।
এবে বুঝি মৃত্যু নাই মৃত্যু আছে পাছে।
না জানি আমাতে গুরুর কোন কার্য আছে।।
তবে কেন মৃত্যু ইচ্ছা এ বড় প্রমাদ।
গুরু ঈশ্বরের কার্য কেন করি বাদ।।
আমাতে কি কার্য আছে তার মনে আছে।
বাঁচিবার চেষ্টা করি উঠি গিয়া গাছে।।
মারে কি বাঁচায় তার মনে যাহা লয়।
শ্রীগুরুর দেহ কেন আমি করি লয়।।
বৃক্ষোপরে উঠিল সে ভক্ত ব্রজনাথ।
দেখে এক মহামূর্তি হইল সাক্ষাৎ।।
বলে ব্রজা আলি কেন এই বৃক্ষপর।
আমি কাল এই বৃক্ষে মম অধিকার।।
ব্রজ বলে যেই মার সেই মোর কাল।
যাহা ইচ্ছা তাহা কর শ্রীনন্দ দুলাল।।
সে মহাপুরুষ কহে নাহি তোর কষ্ট।
আমি তোর কৃষ্ণ হই আমি তোর ইষ্ট।।
যশোদা দুলাল আমি ভকত বৎসল।
তোর জন্য বাছা আমি হ’য়েছি পাগল।।
গুরুমন্ত্র লয় জীবে মোরে পাইবারে।
এই আমি পশিলাম তোমার শরীরে।।
গুরুনিষ্ঠা লোক হয় আমার পরাণ।
তুই মোর প্রাণ বাছা আমি তোর প্রাণ।।
দুষ্ট দুশ্চারিণী তোর গুরুর রমণী।
গুরুদণ্ড করিল তোমারে যাদুমণি।।
গুরুপাট নিকটেতে আর নাহি যেও।
হরি বলে ঘরে ঘরে ভিক্ষা করে খেও।।
এবে আমি হইয়াছি যশোমন্ত সুত।
তোমার দেহেতে হইলাম আবির্ভূত।।
মুখডোবা ছিনু বাসুদেব মূর্তি ধরে।
যশোমন্ত সুত হইনু রামকান্ত বরে।।
পরশুরামের দেহে বিষ্ণুতেজ ছিল।
রামের দেহেতে তেজ যেমন মিশিল।।
যশোমন্ত সুত দেখা যেখানে পাইব।
আমি গিয়া সেই দেহে মেশামেশি হ’ব।।
তোমা হেন ভক্ত ছেড়ে না যা’ব কখনে।
আমি তোর তুই মোর জীবনে মরণে।।
এত শুনি ব্রজনাথ ভ্রমিয়া বেড়ায়।
কখন বা বৃক্ষতলা কখন আলয়।।
মনে চিন্তা যশোমন্ত সুত কোন জন।
কবে তার শ্রীঅঙ্গ করিব দরশন।।
এদিকেতে সফলানগরে প্রভু বাস।
ব্রজনাথ মিলনেতে মনে হ’ল আশ।।
উত্তরাভিমুখে প্রভু একদিন চলে।
ডাকে প্রভু আহারে ব্রজারে কোথা বলে।।
এমন সময় উপস্থিত ব্রজনাথ।
বসাইল প্রভু তারে হাতে ধ’রে হাত।।
নাটু আর বিশ্বনাথ সঙ্গে দুইজন।
দোঁহে দেখে দু’জনার অপূর্ব মিলন।।
বার তের বৎসর বয়স এক ছেলে।
পরিধান পীতাম্বর বনমালা গলে।।
রতন বলয় হাতে চরণে নুপুর।
নবঘনশ্যাম বর্ণ মুরতি মধুর।।
শিরে শোভে শিখিপাখা করে শোভে বাঁশী।
বিধুমুখে মধুমাখা মৃদু মৃদু হাসি।।
ব্রজনাথ অঙ্গ হ’তে উঠে এক জ্যোতি।
সেই জ্যোতি হ’তে এই মধুর মুরতি।।
ত্রিভঙ্গ ভঙ্গিম বাঁকা হাসি কথা কয়।
হরিচাঁদ শ্রীঅঙ্গেতে সে অঙ্গ মিশায়।।
ঠিক যেন ব্রজধামে যমুনা মাঝেতে।
বাসুদেব পড়ে বসুদেব হাত হ’তে।।
সেই দেহে আবির্ভূত গোলোকবিহারী।
বসুদেব সেই পুত্রে নিল কোলে করি।।
যশোদার গর্ভে হয় যমজ সন্তান।
সেই পুত্র এই পুত্র দোঁহে মিশে যান।।
ভাগবতে শ্লোক আছে তাঁহার প্রমাণ।
ব্যাসদেব রচিত শ্লোক শুকদেব গান।।
শ্লোক
বসুদেবগৃহে জাত বাসুদেবখিলাত্মনি।
নীলনন্দসুতে রমা ঘনে সৌদামিনী যথা।।
গর্গোবাচ
সত্যে শ্বেতবর্ণানি চ ত্রেতায়াং রক্তবর্ণানি।
পীতবর্ণ তথা কলৌ ইদানিং কৃষ্ণতাং গতঃ।।
পয়ার
পীতবর্ণ কলিকালে যখনে গৌরাঙ্গ।
দ্বাপরে নারদ কহে লীলার প্রসঙ্গে।।
নারদীয় পুরাণে
কলৌ প্রথমসন্ধ্যায়াং লক্ষ্মীকান্তো ভবিষ্যামি।
সন্ন্যাসঃ গৌরবিগ্রহঃ সান্ত্বায়পুরুষোত্তম।।


পয়ার
স্বয়ং এর কার্যে জন্মে ব্রহ্মা ইন্দ্রে ভ্রম।
কভু নাহি হয় তার গর্ভেতে জনম।।
শচীগর্ভে অবতীর্ণ হইল প্রকাশ।
ভারতীর কাছে যবে লইল সন্ন্যাস।।
হা কৃষ্ণ বলিয়া প্রেমে হইল বিভোর।
ভারতী কপিন দিল আর দিল ডোর।।
কি মন্ত্র দেবেন তাই ভারতী ভেবেছে।
বলেন গৌরাঙ্গ প্রভু ভারতীর কাছে।।
স্বপনে পেয়েছি মন্ত্র গুরু তোমা কই।
ভারতী বলেন সন্ন্যাসের মন্ত্র অই।।
সন্ন্যাস গ্রহণ হ’লে নামান্তর লাগে।
কি নাম রাখিব গুরু ভেবেছেন যোগে।।
হেনকালে শূন্যবাণী কহে থেকে শূন্য।
রাখ নিমাইর নাম শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য।।
সেই কালে নিত্যবস্তু হৈল আবির্ভূত।
নৈলে কেনে দণ্ড ভাঙ্গে নিতাই অবধূত।।
এইভাবে আবির্ভূত মিশামিশি হয়।
অবতারে নিত্যযোগ নাহিক সংশয়।।
নাটু আর বিশ্বনাথ এ লীলা দেখিয়া।
হরি বলি বাহু তুলি উঠিল নাচিয়া।।
ঠাকুর বলেন শুন ওরে ব্রজনাথ।
যাবি না থাকিবি তুই আমাদের সাথ।।
ব্রজনাথ বলে আমি আর কোথা যাব।
প্রাণ থুয়ে কোথা গিয়ে এ দেহ জুড়াব।।
রসনা বাসনা করে ব্রজনাথ সঙ্গ।
ব্রজনাথ শান্তিনাথ দোঁহে এক অঙ্গ।।









শাস্ত্রপ্রচার প্রেস,

৫নং ছিদামমুদির লেন , দর্জ্জিপাড়া হইতে

শ্রীকুলচন্দ্র দে দ্বারা মুদ্রিত।