শ্রীশ্রীহরি লীলামৃত/আদি খণ্ড/দ্বিতীয় তরঙ্গ/৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন



শ্রীহরি ঠাকুরের জন্ম বিবরণ

এবে শুন ঠাকুরের জন্ম বিবরণ ।
যেই রূপে প্রভূ ভবে অবতীর্ণ হন ।।
পূর্ব্বেতে কড়ার ছিল ভক্তগণ সঙ্গে ।
উৎকলেতে দৈববানী ছিল যে প্রসঙ্গে ।।
আর এক বাক্য ছিল শূন্যবাণী সনে ।
শেষ লীলা করিব আমি ঐশান্য কোণে ।।
নীচ হয়ে করিব যে নীচের উদ্ধার ।
অতি নিন্মে না নামিলে কিসে অবতার ।।
কৃষ্ণ প্রেম সুনির্ম্মল উচ্চেতে না র’বে ।
নিম্ন খাদে থাকে বারি দেখ মনে ভেবে ।।
নীচ জন উচ্চ হ’বে বুদ্ধ তপস্যায় ।
বুদ্ধদেব অবতার যে সময় হয় ।।
বুদ্ধের কামনা তাহা পরিপূর্ণ জন্য ।
যশোমন্ত গৃহে হরি হৈল অবতীর্ণ ।।
বুদ্ধদেব বহুদিন তপস্যা করিল ।
তাতে ব্রহ্ম প্রণবাদি শূদ্রেতে পাইল ।।
নীচ জন প্রতি দয়া বুদ্ধদেব করে ।
প্রনবেতে অধিকারী শূদ্র তার পরে ।।
বুদ্ধদেব তপস্যাতে হইয়া সদয় ।
বরং গুরু বলে প্রভু বর দিতে চায় ।।
বুদ্ধ বলে বর যদি দিবে মহাশয় ।
অগ্রভাগে কর প্রভূ শূদ্রের উপায় ।।

প্রভু বলে তব নামে অবতার হ’ব ।
প্রণব ত্রিগুণ নাম শূদ্রেরে বিলা’ব ।।
এক হরি নাম মধ্যে গুণ দিয়া সব ।
নীচজনে করাইব পরম বৈষ্ণব ।।
বুদ্ধ বলে যদি প্রভু হও অবতার ।
এ দেশে থাকেনা যেন জাতির বিচার ।।
আর এক প্রশ্ন তার মধ্যেতে উদয় ।
সংক্ষেপে বলিব যাতে পুথি না বাড়ায় ।।
কুবের নামেতে জোলা জাতি সে যবন ।
পরম বৈষ্ণব রাম মন্ত্রে উপাসন ।
তাহার নন্দন হ’ল নামেতে নকিম ।
নিরবধি কৃষ্ণপ্রেম যাহার অসীম ।।
কুবের আরোপে থেকে কৃষ্ণরূপ দেখে ।
নকীম বুনায় তাঁত হরি বলে মুখে ।।
কুবের আরোপে গাঁথে কুসুমের হার ।
গলে দিবে সাজাইবে শ্যাম নটবর ।।
ভক্তিফুলে মনোসূতে হার গাঁথি নিল ।
সেই মালা ত্রিভঙ্গের গলে তুলে দিল ।।
চূড়ায় ঠেকিয়া হার নাহি পড়ে গলে ।
দিতে হার পুনর্ব্বার চূড়ায় ঠেকিলে ।।
নকীম আরোপে তাঁত বুনা’য়েছে হাতে ।
মুখে হরি বলে কৃষ্ণ দেখে আরোপেতে ।।
বাপের আরোপ দেখি নকীমের সুখ ।
বলে হাত আরো কিছু উপরে উঠুক ।।
দেখহ জোলার এই প্রেমভক্তি গুণ ।
কি করে তাহার কাছে স্বত্ত্বঃ রজঃ গুণ ।।
দারু ব্রহ্ম অবতার হ’ল যে সময় ।
কুবেরের কীর্ত্তি রাখিলেন এ ধরায় ।।
কুবেরের তোড়ানী খাইবে যেইজন ।
তার হ’বে দারু ব্রহ্ম রূপ দরশন ।।
আর এক প্রস্তাব যে আসিল তাহাতে ।
একদা নারদ মুনি গেল বৈকুন্ঠেতে ।।
বিষ্ণুর প্রসাদ মুনি খাইল তথায় ।
কৈলাসেতে আসি মুনি হইল উদয় ।।
শিবেরে বলেন মুনি হরষিত মন ।
অদ্য হৈনু শ্রীনাথের প্রসাদ ভাজন ।।
শিব বলে আমারে ত দিলেনা কিঞ্চিৎ ।
প্রভুর প্রসাদে মোরে করিলে বঞ্চিৎ ।।
নারদের নখাগ্রে প্রসাদ কণা ছিল ।
প্রেমভরে হরের বদনে তুলে দিল ।।
প্রেমে মত্ত হইলেন নারদ শঙ্কর ।
বঞ্চিতা হইয়া গৌরী করে আঙ্গীকার ।।
আমি যদি সাধ্বী নারী হই তব ঘরে ।
এ প্রসাদ বিলাইব বাজারে বাজারে ।।
তপস্যা করিল হরি বর দিতে এল ।
প্রসাদ বাজারে বিকি বর চেয়ে নিল ।।

শ্লোক

কমলা রন্ধনাযুক্তা ভোজনে চ জনার্দ্দনঃ ।
কুক্কুরেণ মুখাদ্‌ভ্রষ্টা দেবানাং দুর্ল্লভামপি ।।

পয়ার

বুদ্ধদেব বাসনা হইয়া গেল পূর্ণ ।
ঘরে ঘরে নীচ শূদ্র সবে হ’ল ধন্য ।।
এই মত দেখ নানা কারণ বশতঃ ।
গোকক বিহারী হ’ল যশোমন্ত সূত ।।
অন্নপূর্ণা ঠাকুরাণী ছিলেন শয়নে ।
কৃষ্ণ দাস পুত্র কোলে আনন্দিত মনে ।।
রাম-কৃষ্ণ মুখে বলে কোলে কৃষ্ণদাস ।
প্রভুর অগ্রজ যিনি ভুবনে প্রকাশ ।।
দ্বাপরেতে সংকর্ষণ যিনি বলরাম ।
আপনি অনন্ত শক্তি সুন্দর সুঠাম ।।
সেই অংশে বিশ্বরূপ গৌরাঙ্গ লীলায় ।
শচী গর্ভে জনমিল এসে নদিয়ায় ।।
গৃহত্যাগী অনুরাগী সন্নাসী হইল ।
পুত্র শোকে শচীমাতা কাঁদিয়া ফিরিল ।।
যদ্যপিও বিষ্ণু অংশে স্বয়ং অবতার ।
কেহ না শোধিতে পারে মাতৃ ঋণ ধার ।।
যখন গৌরাঙ্গ গেল মাকে তেয়াগিয়া ।
কড়ার দিলেন জন্ম লইব আসিয়া ।।
কিছু না বলিয়া বিশ্বরূপ উদাসীন ।
তার জন্য শচীমাতা কাঁদে রাত্রি দিন ।।
সে কারণ মাতৃসেবা অপরাধ ছিল ।
সেই ঋণ শোধিবারে জনম লভিল ।।
স্বয়ং এর অবতার হয় যেই কালে ।
আর আর অবতার তাতে এসে মিলে ।।
যিনি ছিল বিশ্বরূপ গৌরাঙ্গ লীলায় ।
তিনি কৃষ্ণদাস যশোমন্ত পুত্র হয় ।।
একমাত্র পুত্র নববর্ষ কৃষ্ণদাস ।
এক পুত্রে সুখী মাতা নাহি অন্য আস ।।

এ হেন সময় প্রভুর মনে হ’ল আশ ।
অন্নপূর্ণা গর্ভ সিন্ধু ইন্দু পরকাশ ।।
নানারূপ বিভীষিকা দেখে অন্নপূর্ণা ।
শচীমাতা নিদ্রাযুক্তা নহে অচৈতন্যা ।।
জাগরিতা যেন কিছু নিদ্রার আবেশ ।
দেখে যেন জয়ধ্বনি হয় সর্ব্ব দেশ ।।
যশোমন্ত বলে প্রিয়া শুনহ বচন ।
যে রূপ আমার মনে জাগে সর্ব্বক্ষণ ।।
নবীন মেঘের বর্ণ বনমালা গলে ।
ভৃগুপদ চিহ্ন দেখা যায় বক্ষঃস্থলে ।।
পিতাম্বর ধর কোকনদ পদাম্বুজে ।
শঙ্খ চক্র গদা পদ্ম শোভে চতুর্ভুজে ।।
এই রূপ আভা মম হৃদয় পশিয়া ।
সে যে তব কোলে বৈসে দ্বিভুজ হইয়া ।।
ঠাকুরাণী বল নাথ নিশার স্বপন ।
নিশাকালে প্রকাশ না করে বুধজন ।।
কৃষ্ণময় চিত্ত তব কৃষ্ণ প্রতি আর্ত্তি ।
শয়নে স্বপনে দেখ ঈশ্বর শ্রীমূর্ত্তি ।।
ঠাকুর বলেন প্রিয়া নহেত যামিনী ।
উদয় হইল দীপ্তিকর দিনমণি ।।
ঠাকুরাণী বলে এত বাতুল লক্ষণ ।।
কিম্বা দানবের কার্য্য না বুঝি কারণ ।।
ঠাকুর বলেন যদি বাতুল লক্ষণ ।
তবে কেন দেখিলাম মুরলী বদন ।।
ঠাকুরাণী বলে তবে জ্যোতির্ম্ময় রূপ ।
সে রূপ দেখিয়া ভাব দিবার স্বরূপ ।।
শতসূর্য্য সম রশ্মি বায়ুতে মিশিল ।
অন্নপূর্ণা গর্ভে আসি প্রবেশ করিল ।।
এ হেন প্রকারে মাতা হৈল গর্ভাবতী ।
ঈশ্বর ইচ্ছায় হৈল বায়ুগর্ভে স্থিতি ।।
শুভগ্রহ নক্ষত্র শুভ লগ্ন হইল ।
মাহেন্দ্র সুযোগে পুত্র প্রসব করিল ।।
বারশ আঠার সাল শ্রীমহাবারুণী ।
কৃষ্ণপক্ষ ত্রয়োদশী তিথি সে ফাল্গুণী ।।
হরি সাল বলি সাল ভক্তগণে গণে ।
নাহিক বৈদিক ক্রিয়া শ্রীবারুণী বিনে ।।
ধন্য অন্নপূর্ণা হেন পুত্র পেল কোলে ।
দ্বাপরে যশোদা যিনি ছিলেন গোকুলে ।।
দ্বাপরে ছিলেন নন্দ যশোদার কান্ত ।
যশোমতি কান্ত এবে হ’ল যশোমন্ত ।।
ধরা দ্রোণ দুইজন তস্য পূর্ব্বে ছিল ।
নন্দ যশোমতি তেই দ্বাপরে হইল ।।
কলিকালে জগন্নাথ মিশ্র শচীরাণী ।
এবে যশোমন্ত অন্নপূর্ণা ঠাকুরাণী ।।
ধন্য রামকান্ত সাধু ধন্য এ জগতে ।
প্রভু আসি জনমিল যাহার বরেতে ।।
প্রভুর জনমখন্ড সুধা হ’তে সুধা ।
কহিছে রসনা খেলে খন্ডে ভব ক্ষুধা ।।








শাস্ত্রপ্রচার প্রেস,

৫নং ছিদামমুদির লেন , দর্জ্জিপাড়া হইতে

শ্রীকুলচন্দ্র দে দ্বারা মুদ্রিত।