শ্রীশ্রীহরি লীলামৃত/আদি খণ্ড/পঞ্চম তরঙ্গ/৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন



প্রভুর ধর্ম্ম কন্যার বিবরণ

পয়ার

ওলপুর ছিল এক দাসী দুশ্চারিণী।
চৌধুরী বাটীতে সেই ছিল চাকরাণী।।
বাড়ীর কর্তার সঙ্গে বিবাদ করিয়া।
বের হ’ল মোটা মালা তিলক পরিয়া।।
কক্ষে এক ভিক্ষাঝুলি করিয়া ধারণ।
ভিক্ষা করি সেই নারী করয় ভ্রমণ।।
বৈষ্ণবী বেশ ধরি হ’য়ে পরিপাটি।
উপনীত হ’ল গিয়া ঠাকুরের বাটী।।
দণ্ডবৎ করে গিয়া লক্ষ্মীমার পায়।
বলে মাগো কিছুদিন থাকিব হেথায়।।
একা একা কর মাগো সংসারের কার্য।
আমাকে করগো দাসী কর না ত্যজ্য।।
তোমার নিকটে থাকি ঘুচাইব তাপ।
তুমি মম জননী ঠাকুর মম বাপ।।
শুনি লক্ষ্মীমাতা বলে ঠাকুরের ঠাই।
এসেছে মেয়েটি এরে রাখিবারে চাই।।
ঠাকুর বলেন প্রিয়ে! যে ইচ্ছা তোমার।
থাকে থাক যায় যাক যে ইচ্ছা উহার।।
দাসী বলে এসেছিত অবশ্যই থাকিব।
হেন মাতা পিতা আর কোথা গিয়া পা’ব।।
আমার বলিতে আর নাহিক জগতে।
ঠাকুরাণী মাতা মম তুমি মোর পিতে।।
মহাপ্রভু বলে তবে শান্তি দেবী ঠাই।
তোমার ইচ্ছে যেমন মম ইচ্ছা তাই।।
মেয়ে ছেলে আমি তার নাহি ধারি ধার।
রাখ বা না রাখ এরে যে ইচ্ছা তোমার।।
ঠাকুরাণী বলে পিতা বলেছে তোমায়।
আমাকে বলিয়া মাতা লোটাইল পায়।।
তাতে এত বেশী লোক নাহি তব ঘরে।
অবশ্য রাখিতে হয় শরণাগতরে।।
ঠাকুরাণী বলে বাছা তুমি মম মেয়ে।
গৃহে যাও খাও লও কাজ কর গিয়ে।।
অমনি উঠিয়া দাসী গৃহে প্রবেশিল।
কাজ করে খায় পরে কত দিন গেল।।
আপন ভাবিয়া দাসী করে প্রাণপণ।
গৃহকার্য করে যেন আপন আপন।।
এইভাবে দাসী থাকে কিছুদিন যায়।
দাসীর নিকটে মাতা নানা কথা কয়।।
শরীক বিভাগকালে যে টাকা পাইল।
ধর্ম মেয়ে কাছে মাতা সকল বলিল।।
বাহির করিল মাতা মেয়ের সাক্ষাতে।
টাকা তিনশত রাখে পুরিয়া থলিতে।।
বড় এক হাঁড়ি মাঝে টাকা রাখে সেরে।
তাহার মধ্যেতে রাখে ধান্য পূর্ণ করে।।
নীচের হাঁড়িতে টাকা তাতে ধান্য পূর্ণ পুরে।
আর দুই ভাণ্ড রাখে তাহার উপরে।।
কাজ কর্ম করে মাতা কহে নানা কথা।
কন্যার প্রতি মাতার বাড়িল মমতা।।
যে খানেতে তিনশত টাকা সেরে রাখে।
সময় সময় গিয়ে মায় ঝিয়ে দেখে।।
এইভাবে কন্যাকে রাখেন সমাদরে।
নিজের কন্যার মত মা ভাবেন তারে।।
আড়াই প্রহরকালে ভোজন করিয়ে।
বসিলেন প্রভু যত ভক্তবৃন্দ ল’য়ে।।
নামপদ গানে হৃষ্ট ইষ্ট গোষ্ঠ করে।
কন্যা গৃহে রাখি মাতা যান কার্যান্তরে।।
বেলা প্রহরেক আছে এমন সময়।
ধর্মকন্যা দাসী ছিল একা সে আলয়।।
যে হাঁড়িতে ধান্য ছিল তাহা ভূমে ঢালি।
দাসী কন্যা টাকা ঝা’ল লয়ে গেল চলি।।
ঝা’ল কোমরেতে বাঁধে এমন সময়।
লক্ষ্মীমাতা গৃহদ্বারে হ’লেন উদয়।।
মাতা ব’লে ধান্য ঢালি কি করিস ঘরে।
বলিতে বলিতে দাসী চলিল বাহিরে।।
বাহিরিতে গিয়া দাসী দ্রুত গতি ধায়।
দৌড় দিয়া পড়িল সে বাড়ীর নীচায়।।
বৃক্ষ আদি নাহি আর নাহি তৃণ বন।
বসতি বাটীর নীচে ধান্য উপার্জন।।
পালাইতে নাহি পারে বেগে চলি যায়।
দু’চারি পা যায় আর ফিরে ফিরে চায়।।
লক্ষ্মীমাতা বলে এত করিয়া মমতা।
মোরে থুয়ে টাকা ল’য়ে তুই যাস কোথা।।
আরো বেগে ধায় দাসী উত্তর না দেয়।
ঠাকুরাণী গিয়া তাহা ঠাকুরে জানায়।।
আপনি আছেন হেথা দাসী ছিল ঘরে।
আমি গিয়াছিনু মেয়ে রেখে কার্যান্তরে।।
শূন্য ঘর পেয়ে গেল টাকা ল’য়ে চলি।
ধান্যভাণ্ডে টাকা ছিল ধান্য ফেলি ঢালি।।
অই যায় চোরা কন্যা টাকা ল’য়ে যায়।
দ্রুতগতি যায় আর ফিরে ফিরে চায়।।
এই জন্য বুঝি মাতা পিতা ব’লেছিল।
তিনশত টাকা ল’য়ে অই যে চলিল।।
কেহ বলে টাকা নিল চোর ধরে আনি।
ঠাকুর বলেন নাহি বল হেন বাণী।।
পিতার থাকিলে ধন পুত্র কন্যা পায়।
ধন ধান্যে ইহা বই আর কিবা হয়।।
ছিল ধন নিল কন্যা তাতে কিবা ক্ষতি।
দেখি ধন বিনা মোর কিবা হয় গতি।।
নিজ কন্যা হ’তে আরো ধর্মকন্যা ভারি।
কন্যা নিল পিতৃধন কেবা কয় চুরি।।
ধর্ম কন্যা ধর্মে দিল ধর্মে নিল ধন।
ধর্মের নিকটে নাহি অধর্ম কখন।।
ধর্ম করিয়াছে কর্ম অধর্ম এ নয়।
কন্যাকে বলিলে চোর অধর্ম সঞ্চয়।।
আগে কন্যা বলি যারে করিলা বিশ্বাস।
এবে চোরা বলিলে বিশ্বাস ধর্ম নাশ।।
লক্ষ্মীদেবী থাকে সদা ধর্মের আশ্রয়।
ধর্মের সহিত লক্ষ্মী অর্থ সে যোগায়।।
এই ধন ছিল সেই লক্ষ্মীর গোচরে।
সেই লক্ষ্মী এই ধন দেখাইল তারে।।
সর্বান্তর্যামিনী লক্ষ্মী সব জানতে পারে।
যেনে সেই লক্ষ্মী কেন যান স্থানান্তরে।।
যবে টাকা ল’য়ে যায় লক্ষ্মী দৃষ্টি করে।
দেখে কেন সে লক্ষ্মী ধরিল না তারে।।
ধর্ম মাতা পিতা যার লক্ষ্মী নারায়ণ।
সে কেন পাবে না বল এ সামান্য ধন।।
কন্যা নিল টাকা তাত’ পরে লয় নাই।
তব মনে যাহা প্রিয়ে মম মনে তাই।।
ধন উপার্জন করে বসিয়া খাইতে।
দেখি মোরা ধন বিনে পাই কিনা খেতে।।
খেতে কি দেবে না কৃষ্ণ সৃষ্টি করে জীব।
এই ধন বিনা মোরা হব কি গরীব।।
কোথা হতে আসে ধন কোথা চলে যায়।
কেবা দেয় কেবা লয় কে চিনে তাহায়।।
এই ধন ফিরিতেছে সব ঘরে ঘরে।
কোথাকার ধন ইহা কেবা রক্ষা করে।।
ধনেশ কুবের ছিল কনক লঙ্কায়।
ধনচ্যুত করি তাকে রাবণ তাড়ায়।।
রাবণের গৃহে লক্ষ্মী করিত রন্ধন।
ইন্দ্র মালাকার অশ্ব রক্ষক শমন।।
বিষ্ণু অবতার রাম রাজার কুমার।
ভার্যাসহ বনবাসী চৌদ্দ বৎসর।।
কার লঙ্কা কার হ’ল কেবা নিল ধন।
কোথা সে ত্রিলোকজয়ী লঙ্কেশ রাবণ।।
রাজপুত্রবধূ রাজকন্যা সেই সীতা।
বৈকুণ্ঠ-ঈশ্বরী দেবী শ্রীরাম বণিতা।।
কোথা র’ল রাজ্য ধন কোথা র’ল পতি।
আজন্ম বনবাসিনী কতই দুর্গতি।।
যদি বলি ঈশ্বরের লীলা এ সকল।
সত্য কিন্তু কর্ম অনুসারে ফলে ফল।।
একই মানুষ সব একই শহরে।
একই ব্যবসা করে একই বাজারে।।
কেহ দুঃখী কেহ সুখী কেহ পরাধীন।
কেহ লক্ষপতি হয়, কার হয় ঋণ।।
অর্থে কিংবা স্বার্থ শুধু অনর্থের গোল।
কৃষ্ণপদ স্বার্থ ভেবে বল হরি বল।।
একদিন লক্ষ্মীমাতা বাক্যের প্রসঙ্গে।
মধুমাখা বাক্যে ঠাকুরকে বলে রঙ্গে।।
লক্ষ্মীমাতা বলে প্রভু নাহি কর কার্য।
পুত্র কন্যা জন্মিয়াছে নাহি কর গ্রাহ্য।।
ঠাকুরালী কর সদা ল’য়ে ভক্তগণ।
কেমনে চলিবে এদের ভরণ পোষণ।।
ইহাদের কি হইবে নাহি ভাব মনে।
আমি একা কি করিব তব দয়া বিনে।।
ঠাকুর বলেন আমি কি কার্য করিব।
যাহা করে জগবন্ধু গৃহে ব’সে রব।।
জমি ভূমি কৃষিকার্য কিছুই না মানি।
জনমে জনমে মাত্র গরুরাখা জানি।।
জমি জমা চাষ কার্য কিছু না করিব।
এইমত ঠাকুরালী করিয়া ফিরিব।।
দেখি ঈশ্বরের দয়া হয় কিনা হয়।
দেখি প্রভু মোরে খেতে, দেয় কিনা দেয়।।
ইহা বলি মহাপ্রভু ফিরিয়া ঘুরিয়া।
দুই তিন দিন ওঢ়াকাঁদিতে রহিয়া।।
নিজবাটী না আইসে রহে অন্য ঘর।
চারিদিন পরে গেল রাউৎখামার।।
রাউৎখামার রামচাঁদ বাড়ী যান।
রামচাঁদ প্রভুকে করেন হরিজ্ঞান।।
রাউৎখামার প্রভুর বিহার বিরাজ।
রচিল তারকচন্দ্র কবি রসরাজ।।









শাস্ত্রপ্রচার প্রেস,

৫নং ছিদামমুদির লেন , দর্জ্জিপাড়া হইতে

শ্রীকুলচন্দ্র দে দ্বারা মুদ্রিত।