শ্রীশ্রীহরি লীলামৃত/আদি খণ্ড/ষষ্ঠ তরঙ্গ/৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন



রাম কুমারের অঙ্গে কাল সর্পাঘাত



পয়ার

এইভাবে হইতেছে কালের হরণ।
একদিন শুন সবে দৈব নির্বন্ধন।।
প্রভু প্রিয় ভক্ত রামকুমার ভকত।
তার বাড়ী যান প্রভু ভক্ত সঙ্গে কত।।
তৃতীয় প্রহর রাত্রি নাম সংকীর্ত্তন।
কীর্ত্তনান্তে করিলেন গৃহেতে গমন।।
সকল ভকতগণ বিদায় করিয়া।
গৃহে যান প্রভু রামকুমারে লইয়া।।
গোবিন্দ মতুয়া সঙ্গে হইয়া মিলন।
কীর্ত্তনের ভাব অঙ্গে আছে তিন জন।।
গোবিন্দ পিছেতে ধায় মধ্যেতে কুমার।
সকলের অগ্রেতে ঠাকুর অগ্রসর।।
গোবিন্দ নিকটবর্তী প্রভু কিছু দূরে।
হেনকালে সর্পঘাত করিল কুমারে।।
থর থর করি গাত্র কাঁপিতে লাগিল।
বলে প্রভু কাল সাপে আমারে কাটিল।।
প্রভু বলে কি সর্প তা জানিলে কেমনে।
গোক্ষুর কি কাল সাপ দেখেছ নয়নে।।
কুমার বলিল জ্যোৎস্নায় দেখা যায়।
অই সেই সর্প মোরে দংশে চ’লে যায়।।
ঠাকুর বলেন তার বুকে দিয়া কর।
গাত্র যেন কাঁপে তোর বুক ধড়ফড়।।
সর্পের দংশনে তোর কেন হ’ল ভয়।
দেখ সাপ ধরে আনি কেমনে দংশয়।।
দাঁড়া তুই আমি সেই সর্প ধরে আনি।
যার বিষ চুমুকিয়া লবে সেই ফণী।।
কহিছে রামকুমার তাহা না পারিব।
পুনঃ সাপ দেখে শঙ্কায় মরিব।।
ঠাকুর কহিছে তুই আয় মম কাছে।
দেখি তোর কোনখানে সাপে দংশিয়াছে।।
দেখাইয়া দিল ঘা ভকত মহাশয়।
দেখে দংশিয়াছে বাম পায়ের পাতায়।।
দক্ষিণ পদ অঙ্গুলি ঠাকুর তখনে।
সর্পকাটা ঘায় ছোঁয়াইল ততক্ষণে।।
সর্প কোথা বিষ কোথা কেনরে ভাবিস।
সর্পের নিকটে থাকে মানুষের বিষ।।
ব্রহ্মার কুমার দক্ষ মানুষাবতার।
সবে জানে ষাটি কন্যা জন্মিল তাহার।।
মানুষ কশ্যপ মুনি তের কন্যা লয়।
যুগ ধর্ম অষ্ট কন্যা করে পরিণয়।।
একাদশ কন্যা তার রুদ্রে বিয়া করে।
সাতাইশ কন্যা দিল নিশাকর করে।।
নবরূপ প্রজাপতি জাতিতে মানুষ।
তার কন্যা বিয়ে করে অনাদি পুরুষ।।
দক্ষপুরে সতী ত্যাগ করিল জীবন।
শব শিরে করি শিব করিল রোদন।।
নয়ন জলেতে সেই বিষ বাহিরিল।
সমুদ্র মন্থনকালে সে বিষ উঠিল।।
জাতি সর্প অনন্ত বাসুকী যারে কয়।
মানুষ কশ্যপ মুনি তার পিতা হয়।।
বাসুকী বন্ধন দড়ি তখনে হইল।
সমুদ্র মন্থনকালে বিষ উগারিল।।
বিষে বিষ মিশিল খাইল শূলপাণি।
পার্বতীর দুগ্ধপানে নির্বিষ অমনি।।
বিষহরি বিষ হরি নিল সে সময়ে।
জটাচার্ব্ব বংশে জরৎকারু করে বিয়ে।।
সেই পদ্মা বিষকর্ত্রী তার কাছে বিষ।
বিষ মানুষের নারী ভয় কি করিস।।
মহতের কোপে হয় বিষ উপার্জন।
সাপে কি করিতে পারে করিয়া দংশন।।
বিষ খাইয়াছে সর্প তোমাকে দংশিয়া।
মরিবে ও সর্প কল্য দেখিও আসিয়া।।
শেষে গিয়া বসিলেন প্রভুর শ্রীধামে।
যামিনী প্রভাত হ’ল কৃষ্ণকথা প্রেমে।।
প্রাতঃকৃত্য করি হরি কথার আলাপ।
বলে চল দেখে আসি কামড়ানে সাপ।।
ঠাকুরের সঙ্গেতে গিয়ে ভক্ত মহাশয়।
দেখে গিয়া সেইখানে সর্প মরে রয়।।
ঠাকুর বলেন সর্প বিষ খাইয়াছে।
তোর অঙ্গবিষে সর্প মরিয়া রয়েছে।।
যখন করিল কৃষ্ণ কালীয় দমন।
কৃষ্ণ অঙ্গে রাগে নাগে করিল দংশন।।
কালীয়ের ফণা ভাঙ্গি করিল দমন।
শিরে দিল পদচিহ্ন কালীয় দমন।।
সেই হ’তে গরুড়ের ভয় তার গেল।
বিনতানন্দন তারে কিছু না বলিল।।
গরুড়ে আরূঢ় হইতেন ভগবান।
সে গরুড় মুনিপত্নী বিনতাসন্তান।।
কৃষ্ণভক্ত গরুড়ের সহায় সংসারে।
সাপের কামড়ে কোথা কৃষ্ণভক্ত মরে।।
কংস যবে পুতনাকে ব্রজে পাঠাইল।
পুতনা রাক্ষসী স্তনে বিষ মাখাইল।।
কংস দিল আজ্ঞা করে সাপুড়িয়াগণে।
কালকুট বিষ পুতনাকে দেও এনে।।
আজ্ঞা পেয়ে সাপুড়িয়া কালফণী ধরে।
দন্তভেঙ্গে সাপড়িয়া বিষ বের করে।।
যে কালে সর্পের গলা চাপিয়া ধরিল।
এ সময় কালসর্প কাঁদিতে লাগিল।।
তবু দন্ত ভেঙ্গে বিষ করিল বাহির।
কাঁদিয়া সে ফণীবর হইল অস্থির।।
দূত বলে ওরে সর্প কাঁদ কি লাগিয়া।
দন্তভঙ্গ এইটুকু বেদনা পাইয়া।।
রাজকার্য্য তোমা হ’তে সাহায্য হইবে।
ঔষধ লাগায়ে দিলে বেদনা ঘুচিবে।।
সর্প বলে ওরে দূত মনে দেখ ভেবে।
সামান্য বেদনা পেয়ে সর্প কাঁদে কবে।।
তবে যে কেঁদেছি আমি চক্ষে বহে বারি।
এই ব্যাথা হ’তে মম ব্যাথা আছে ভারি।।
এই বিষ পুতনা মাখিয়া যা’বে স্তনে।
বিষমাখা দুগ্ধ খাওয়াবে ভগবানে।।
যে মুখে যশোদা দেয় ক্ষীর-সর-ননী।
সেই মুখে বিষ দিবে কংস নৃপমণি।।
এতদিন বিষ ধরি আমি বিষধর।
এ বিষ করিবে পান হরি বিষহর।।
তাহা বলে নাহি কাঁদি ভাঙ্গিবে দশন।
কৃষ্ণমুখে বিষ দিবে কাঁদি সে কারণ।।
সাধন ভজন কিছু করিবারে নারি।
আরো মম বিষ পান করিবেন হরি।।
এজন্য আমাকে সৃজিলেন জগদীশ।
অমল কমল মুখে দিবি মম বিষ।।
ভাবিয়া দেখিনু মম জনম বিফল।
এই মনোদুঃখে মম চক্ষে পড়ে জল।।
আমারে ধরিলি আমি কোন অপরাধী।
জগদীশ খা’বে বিষ এই দুঃখে কাঁদি।।
সেই সর্প অইদুঃখে করিল বিলাপ।
তোমারে দংশিল এই কোন দেশী সাপ।।
নিজে কৃষ্ণ কষ্ট পেলে কষ্ট নাহি তায়।
ভক্তে কষ্ট পেলে তার কষ্ট অতিশয়।।
ক্রুরজাতি সর্প ওর পাপ উপজিল।
বিনা অপরাধে তোরে দংশি ম’রে গেল।।
সর্পের দংশনে কভু সজ্জন মরেনা।
সজ্জনের কোপ হ’লে সর্পই বাঁচে না।।
যে কালেতে কালীদহে কালীয়ের বিষ।
সেই বিষ উর্দ্ধগামী যোজন পঁচিশ।।
পক্ষী উড়ে কালীদহ পার হ’তে নারে।
কালীয়ের বিষে পুড়ে পক্ষী যেত মরে।।
সেই কালীদহ তীরে কদম্বের বৃক্ষ।
অদ্যপি বাঁচিয়া আছে কে বা তার পক্ষ।।
গরুড় যে কালে স্বর্গে ইন্দ্রজয়ী হয়।
চন্দ্র আসি জননীরে দাসীত্ব ঘুচায়।।
গরুড়ের মুখ হ’তে সুধা বিন্দু পড়ে।
তাহাতে অমর বৃক্ষ এখনো না মরে।।
সুধার গুণেতে বাঁচে কদম্বের দ্রুম।
যাহার শরীরে আছে কৃষ্ণভক্তি প্রেম।।
কৃষ্ণপ্রেম মহারস সুধা যেবা খায়।
সে কেন মরিবে সর্প বিষের জ্বালায়।।
কি ছার সে স্বর্গ সুধা যথা প্রেমসুধা।
প্রেমসুধা খাইলে নিবৃত্তি ভব ক্ষুধা।।
তার নিদর্শন দেখ মরিয়াছে সর্প।
হরি বল দূরে গেল শমনের দর্প।।
শমনের দর্প সর্প মাররে সকলে।
খাণ্ডাও বিষয় বিষ কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলে।।
মুখে খাও কৃষ্ণরস হাতে কর কাজ।
কহিছে তারকচন্দ্র কবি রসরাজ।।









শাস্ত্রপ্রচার প্রেস,

৫নং ছিদামমুদির লেন , দর্জ্জিপাড়া হইতে

শ্রীকুলচন্দ্র দে দ্বারা মুদ্রিত।