শ্রীশ্রীহরি লীলামৃত/আদি খণ্ড/ষষ্ঠ তরঙ্গ/৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন



রাজ মাতার প্রভুমাতার নিকট অনুনয়



পয়ার

ঠাকুরের ঠাকুরালী হ’তেছে প্রকাশ।
তিন ভাই করিছেন ওঢ়াকাঁদি বাস।।
প্রভুমাতা অন্নপূর্ণা মাতা ঠাকুরাণী।
জ্যেষ্ঠপুত্র কৃষ্ণদাস সাধু শিরোমণি।।
তাহার ভক্তিতে বাধ্য হইলেন মাতা।
শ্রীকৃষ্ণদাসের প্রতি হইল মমতা।।
ক্রমে সবে পৃথক হইয়া করে বাস।
অন্নপূর্ণা মাকে সেবা করে কৃষ্ণদাস।।
কৃষ্ণদাস একান্নে র’য়েছে অন্নপূর্ণা।
এ দিকেতে জমিদার ক’রেছে ভাবনা।।
পার্বতীচরণ মফঃস্বলে আসে যায়।
কখন সফলডাঙ্গা কাছারীতে রয়।।
ঠাকুরের ঠাকুরত্ব প্রকাশ জানিয়া।
পার্ব্বতী কহেন সূর্য্যমণি স্থানে গিয়া।।
বড় কর্ত্তা শুন বার্ত্তা কহি মূল সূত্র।
বড় ঠাকুরালী করে যশোমন্ত পুত্র।।
কার্য্য দেখে জ্ঞান হয় স্বয়ং অবতার।
বার কি আশ্রয় নহে লীলা বুঝা ভার।।
মুখের কথায় মহাব্যাধি দূর হয়।
কতলোক সারিতেছে বলা নাহি যায়।।
পালাক্রান্ত রোগাক্রান্ত লোক যত ছিল।
হরিনামে পাপ তাপ রোগ বিনাশিল।।
নন্দসুত মিশ্র পুত্র হ’ল নদীয়ায়।
তেমতি হয়েছে যশোমন্তের তনয়।।
শব্দে শুনি রামকান্ত দিয়াছিল বর।
যশোমন্ত পুত্র হ’বে বাসুদেবেশ্বর।।
অনুরাগী সাধু রামকান্ত মহাভাগ।
শালগ্রামে প্রণমিলে হ’ত অষ্টভাগ।।
কার্য্য দেখে বিশ্বাস হ’তেছে মোর তাই।
করেছি অধর্ম্ম দাদা আর রক্ষা নাই।।
ওঢ়াকাঁদি বসতি ক’রেছে তিন ভাই।
শ্রীচৈতন্য নিত্যানন্দ অদ্ধৈত গোঁসাই।।
দাদাগো এমন প্রজা গিয়াছে ছাড়িয়া।
অপযশ হইয়াছে জগৎ জুড়িয়া।।
অধর্ম হ’য়েছে বড় নষ্ট পরকাল।
পাপের নাহিক সীমা ভেঙ্গেছে কপাল।।
সময় সময় প্রাণ কাঁদে তাই ভেবে।
আমাদের জমিদারী বুঝি না থাকিবে।।
দুই ভাই এইরূপ কথোপকথন।
এই কথা রাজমাতা করিল শ্রবণ।।
বৃদ্ধা ঠাকুরাণী কহে কি কহ কি কহ।
বিস্তারিয়া সব কথা আমাকে বলহ।।
বিশেষ বৃত্তান্ত তবে শুনি ঠাকুরাণী।
কহিলেন কি ক’রেছ ওরে সূর্য্যমণি।।
মহৎ হউক কিংবা হউক দরিদ্র।
কিংবা সে ঠাকুর হো’ক কিংবা হো’ক ক্ষুদ্র।।
রাজা হ’য়ে প্রজার করিলে অত্যাচার।
প্রজাদ্রোহী রাজার যে রাজ্য রাখা ভার।।
তোমরা থাকহ বাপ আমি একা যাই।
বলিব সে কৃষ্ণদাস হরিদাস ঠাই।।
আমি ব্রাহ্মণের কন্যা যাইব তথায়।
তারা যদি না শুনে বলিব তার মায়।।
এত বলি ঠাকুরাণী করিল গমন।
পথে যেতে ঠাকুরাণী ভাবে মনে মন।।
ধরিয়া প্রজার ধার শোধ নাহি দেয়।
এই অপরাধ করে মম পুত্রদ্বয়।।
প্রজা হ’য়ে রাজার করিল অপমান।
এই অপরাধে তারা ত্যাজে বাসস্থান।।
কহিব এ সব কথা ঠাকুর গোচরে।
দেখি অপরাধ ক্ষমা করে কি না করে।।
ঠাকুরাণী উত্তরিল এসে ওঢ়াকাঁদি।
মহাপ্রভু সে দিন ছিলেন মল্লকাঁদি।।
যথোচিত বলিলেন কৃষ্ণদাস ঠাই।
পূর্ব ভদ্রাসনে চল এই ভিক্ষা চাই।।
কৃষ্ণদাস ব্রাহ্মণীর চরণ ধরিয়া।
কহিলেন বহুমত বিনয় করিয়া।।
না গো মাতা পূর্ব্ববাটী আমরা যাব না।
কি দোষে ছাড়িব ভিটা ভাবিয়া দেখনা।।
পুণ্যাত্মা মহান্‌ বাবু রামরত্ন রায়।
ভালবাসি দিয়াছেন মোদের আশ্রয়।।
দুই ভাই করিয়াছে পদ্মবিলা ঘর।
আমরা এখানে আছি তিন সহোদর।।
এখনে এ ঘর বাড়ী ত্যাজিব কেমনে।
কেমনে যাইব মোরা পূর্ব ভদ্রাসনে।।
ব’লনা এমন বাণী করি তাই মানা।
তোমার এ বাক্য রাখা কিছুতে হ’বেনা।।
এত শুনি ঠাকুরাণী ছাড়ি দীর্ঘশ্বাস।
উপস্থিতা হৈলা মাতা অন্নপূর্ণা পাশ।।
কহিছে ব্রাহ্মণ কন্যা অন্নপূর্ণা ঠাঁই।
শুনগো মা তব ঠাঁই এই ভিক্ষা চাই।।
অপরাধ করিয়াছে মম পুত্রদ্বয়।
দোষ ক্ষমা করি মাগো চল নিজালয়।।
মাতা অন্নপূর্ণা বলে কি কথা বলহ।
এ কথা বলিলে হয় অনর্থ কলহ।।
দ্বিজকন্যা কহে অতি মিনতি করিয়া।
তব পুত্রগণ আসে বসতি ছাড়িয়া।।
তব পুত্রে মম পুত্র করে অপমান।
সেই রাগে তাদের ছাড়া’ল বাসস্থান।।
ধারিয়া প্রজার ধার নাহি করে শোধ।
পুত্র অপরাধী তাই করি অনুরোধ।।
এই তুচ্ছ অপরাধ মোরে কর ক্ষমা।
তব নিজ আশ্রমে এখনে চলগো মা।।
কহিছেন প্রভুমাতা হ’য়ে অসন্তোষ।
তোমার পুত্রের এইভাব, তুচ্ছ দোষ।।
এ হ’তে কি বড় দোষ আছে এ ধরায়।
এ দোষ ধরিতে ধরা স্বীকার না হয়।।
বিশ্বাস ঘাতকী দোষ শাস্ত্রে আছে দেখি।
মহাপাপী যেইজন বিশ্বাস ঘাতকী।।
অত্যাচারে ভিটাছাড়ি মনে হ’য়ে দুঃখী।
শেষে ঋণ শোধ দিলে পাপ হ’ত নাকি।।
কহিলেন দ্বিজকন্যা কটু না বলিও।
কর বা না কর ক্ষমা যা ইচ্ছা করিও।।
জন্মিয়াছি ব্রহ্মবংশে ব্রাহ্মণের কন্যে।
করিলাম অনুরোধ নিন্দহ কি জন্যে।।
বাক্য যদি নাহি মান আমি ফিরে যাই।
আমি মন্যু করিলে তাতে কি ভয় নাই।।
কহিছেন প্রভু মাতা মন্যু আর কিসে।
রাজকোপে দেশ ছাড়া কত কষ্ট শেষে।।
এক্ষণেতে মন্যু কর কিংবা দেও শাপ।
তাতে কোন তাপ নাই করি নাই পাপ।।
যে হউক সে হউক তবে আমি বলি এই।
তুমি বা কি শাপ দিবে আমি শাপ দেই।।
যেমন আমার পুত্র হ’ল দেশান্তরী।
হউক তোমার পুত্র কড়ার ভিখারী।।
মম পুত্রগণে পায় দেশ ছেড়ে ক্লেশ।
তেমন তোমার পুত্র ছাড়া হো’ক দেশ।।
এতশুনি রাজমাতা গেলেন ফিরিয়া।
অশ্রুপূর্ণা নেত্র দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়িয়া।।
কালক্রমে সেই শাপ আসিয়া ফলিল।
সেই ঠাকুরাণীর দুই পৌত্র যে ছিল।।
দু’জনার নাম হ’ল বিনোদ বিহারী।
ঋণদায়ী হইয়া গেল সে জমিদারী।।
ঘৃতকাঁদি আসিলেন হ’য়ে দেশান্তরী।
একাকী আছেন মাত্র সব গেছে মরি।।
অবশ্য মহৎ বাক্য নহে ব্যভিচারী।
অধর্ম্মের প্রাদুর্ভাব দিন দুই চারি।।
যথা ধর্ম্ম তথা জয় চরাচরে ব্যাপ্ত।
অতলে ভূতলে আর আছে স্বর্গ সপ্ত।।
অধর্ম কারণে রাজপুত্র দুই জন।
রাজ্যভ্রষ্ট তাহাও দেখিল সর্ব্বজন।।
কালক্রমে ধর্ম্মাধর্ম্মে ফলে ফলাফল।
কহিছে তারকচন্দ্র হরি হরি বল।।









শাস্ত্রপ্রচার প্রেস,

৫নং ছিদামমুদির লেন , দর্জ্জিপাড়া হইতে

শ্রীকুলচন্দ্র দে দ্বারা মুদ্রিত।