শ্রীশ্রীহরি লীলামৃত/আদি খণ্ড/সপ্তম তরঙ্গ/৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন



রাম লোচনের বাটী মহোৎসব ও চৈতন্যবালার দর্প চূর্ণ

পয়ার

রামলোচনের বাটী স্বজাতি ভোজন।
গ্রামবাসী সবে আসি করে আয়োজন।।
বামাগণে আসে সবে পাক করিবারে।
চৈতন্য প্রধান জ্ঞানী গ্রামের উপরে।।
সকলে রাখিল ভার তাহার উপর।
যাহাতে হইবে এই কার্য্যের সুসার।।
রামচাঁদ আর রামলোচন বিশ্বাস।
শ্রীনবদ্বীপেতে যেন রামাই শ্রীবাস।।
ভাই ভাই ঠিক যেন তেমতি মিলন।
সেই দিন সেই বাটী প্রভু আগমন।।
মহা সমারোহে হবে স্বজাতি ভোজন।
পাকশালে পাক করে যত বামাগণ।।
এমন সময় প্রভু ভক্তগণ সঙ্গে।
রামলোচনের বাটী উত্তরিল রঙ্গে।।
শ্রীরামলোচন হয় কার্য্যকরণালা।
কার্য্যদক্ষ কর্ত্তৃপক্ষ শ্রীচৈতন্য বালা।।
হুকুম ক’রেছে কার্য্য করিবার তরে।
যাকে যাহা ব’লেছেন সেই তাহা করে।।
প্রাণপণে খাটিতেছে নাহিক বিরাম।
বাটীর ভিতর হইতেছে ধুমধাম।।
কোন নারী কক্ষে কুম্ভ আনিতেছে বারি।
কেহ ঝাল বাটে কেহ কাটে তরকারি।।
কেহ ভারে ভারে ধৌত করিছে তণ্ডুল।
কেহ দেয় কেহ লয় ধুতেছে ডাউল।।
ঠাকুর আসিল জয় হরিবোল বলে।
ভক্তগণ সংকীর্ত্তন করে কুতূহলে।।
বাটীতে কাজের লোক যেখানে যে ছিল।
চতুর্দ্দিকে হরি হরি বলিতে লাগিল।।
সিংহনাদে ভক্তগণ বলে হরি হরি।
চতুর্দ্দিকে ঘাটে পথে হরি হরি হরি।।
অগণনা বামাগণে দিল হুলুধ্বনি।
স্বর্গ মর্ত্ত্য ভেদ করি ওঠে জয়ধ্বনি।।
ঠাকুর গেলেন রামলোচনের ঘরে।
নাম গান পদ হয় গৃহে বহির্দ্বারে।।
মেয়েরা যতেক সবে ছিল পাকশালে।
শুনে ধ্বনি সব ধনী ভাসে অশ্রুজলে।।
কিসের রান্নাবান্না কিসের হলুদবাটা।
নয়নজলে ভেসে যায় হলুদবাটা পাটা।।
কুলবধু ধাইতেছে হইয়া আকুল।
বাল্য বৃদ্ধ ধাইতেছে সব সমতুল।।
ঠাকুরে দেখিব বলে সকলের মন।
পাকশালে মেয়ে লোক নাহি একজন।।
সকলে বলেছে গিয়ে চৈতন্য বালায়।
অদ্য বুঝি জাতি কুল না থাকে বজায়।।
নিমন্ত্রিত লোক যত সব এল এল।
পাকশালে লোক নাই উপায় কি বল।।
তাহা শুনি ক্রোধ করি বালা মহাশয়।
তর্জ্জন গর্জ্জন করি মেয়েদের কয়।।
ঠাকুরে দেখিয়া কারু নাহি স্মৃতি বাক।
পাকশালে লোক নাই কে করিবে পাক।।
বালাজী করেন রাগ কেহ নাহি মানে।
তর্জ্জন গর্জ্জন করে শুনেও না শুনে।।
কেহ বলে শুন বলি বালা মহাশয়।
জাতি গেল মান গেল কই হবে উপায়।।
সামাজিক লোক সব হ’য়ে একত্তর।
সভা করি বসিলেন বাটীর ভিতর।।
তার মধ্যে সর্ব্ব শ্রেষ্ঠ বালা মহাশয়।
সবে মিলে পরামিশে করিলেন সায়।।
ঠাকুরের কাছে গিয়া করহ বারণ।
চুপ করে থাক, কেন করে সংকীর্ত্তন।।
কিসের বা হরিধ্বনি কিসের কীর্ত্তন।
চুপ করে না থাকেত তাড়াও এখন।।
সবে বলে কে বলিবে ঠাকুরের ঠাঁই।
নিজে যান বালাজী অন্যের সাধ্য নাই।।
ঠাকুরের নিকটেতে যায় বলিবারে।
বলিব বলিব ভাবে বলিতে না পারে।।
এক এক বার যায় ক্রোধ করি মনে।
এবার তাড়া’ব গিয়া হরিবোলাগণে।।
ধেয়ে ধেয়ে যায় বালা অতি ক্রোধ ভরে।
যেই ঠাকুরের মুখচন্দ্র দৃষ্টি করে।।
আর নাহি থাকে ক্রোধ হয় মহাশান্ত।
মৌণ হয়ে বসে যেন নৈষ্ঠিক মোহান্ত।।
সভাসৎ লোক যত দেখিয়া বিস্ময়।
বলে একি হ’ল বল বালা মহাশয়।।
বড় ক্রোধ করি যাও তাড়াবার তরে।
চুপ করে ফিরে এস বাক্য নাহি সরে।।
দুই তিন বার গেলে হ’য়ে ক্রোধমন।
বলিতে না পার কিছু কিসের কারণ।।
বাণীসূত তুল্য বক্তা বাক্‌যুদ্ধে জয়।
কেন নাহি বাক্য আস্ফালন বা কোথায়।।
বালা মহাশয় বলে তাই ভাবি মনে।
বলা কথা কেন যেন বলিতে পারিনে।।
আমাকে ভুলায় হেন নাহিক ভুবনে।
নিশ্চয় ঠাকুর কি মোহিনী মন্ত্র জানে।।
তাহা শুনি সব লোকে হাসিয়া উঠিল।
কেহ বলে মাতুব্বরের মাতুব্বরি গেল।।
যে মত শ্রীকৃষ্ণ যায় হিত বুঝাইতে।
দুর্য্যোধনে বলে যুধিষ্ঠিরে ভাগ দিতে।।
দুর্য্যোধন নাহি মানে কৃষ্ণ ফিরে যায়।
তার বাড়ী পঞ্চাশ ব্যঞ্জন নাহি খায়।।
একত্রিত শত ভাই দুষ্ট দুর্য্যোধন।
রজ্জু পাকাইল কৃষ্ণে করিতে বন্ধন।।
ভগবান বিশ্বরূপ ধারণ করিল।
কে করে বন্ধন সবে মোহপ্রাপ্ত হ’ল।।
পরে কৃষ্ণ চলিলেন বিদুরের ঘরে।
বিদুরের পুরাতন ক্ষুদ সেবা করে।।
চৈতন্য পাইয়া বলে রাজা দুর্য্যোধন।
কি মোহিনী মন্ত্র জানে দেবকী নন্দন।।
সেই দিন অপমান হ’ল শত ভাই।
কেহ বলে বালাজীর কি হইয়াছে তাই।।
কেহ বলে বালাজী হইয়াছে পাগল।
কেহ বলে বালাজীকে দুর্য্যোধনই বল।।
রামচাঁদ উপনীত ঠাকুরের ঠাঁই।
দণ্ডবৎ করি বলে কি হবে গোঁসাই।।
যত বামা দেখে তোমা না হইল রান্না।
ঠাকুর বলেন পাকঘরে অন্নপূর্ণা।।
ঘর ছাড়ি মহাপ্রভু এসে বাহিরেতে।
মেয়েদের বলিলেন পাকঘরে যেতে।।
দয়ার নিধান হরি প্রাঙ্গণে আসিল।
ভক্তগণ ল’য়ে সভা করিয়া বসিল।।
সভায় বসিয়া হরি ডাকদিয়া কয়।
কোনজন শ্রীচৈতন্য বালা মহাশয়।।
এ গ্রামেতে এতদিন আমি আসি যাই।
এগ্রামের কে কর্তা ব্যক্তি চেনা শুনা নাই।।
সবে বলে অই ব’সে শ্রীচৈতন্য বালা।
প্রভু বলে আবশ্যক দুটা কথা বলা।।
সবে দেখাইয়া দিল বসিয়া সভায়।
অই সেই শ্রীচৈতন্য বালা মহাশয়।।
প্রভু বলে মহাশয় কহ দেখি শুনি।
বলিয়াছ আমি কি মোহিনী মন্ত্র জানি।।
তুমি হও বড় জ্ঞানী সুধাই তোমারে।
শুনেছ মোহিনী মন্ত্র মন্ত্র বলে কারে।।
শুনিয়া কহিছে বাণী বালা মহাশয়।
মুখেতে সরল ভাষা ক্রোধিত হৃদয়।।
আমি এই পরগণে সবে যাহা বলি।
মোর কাছে সবে থাকে হ’য়ে কৃতাঞ্জলি।।
আমি যাই ক্রোধভরে তাড়াইয়া দিতে।
শ্রীমুখ দেখিয়া কিছু না পারি বলিতে।।
সভামধ্যে কথা বলি লক্ষজন মাঝে।
রাজ দরবারে কিংবা স্বজাতি সমাজে।।
কাহার নিকট কিছু শঙ্কা নাহি করি।
আপনার কাছে কিছু বলিতে না পারি।।
তাহাতে এমন আমি মনে অনুমানি।
আপনার যেন জানা আছে কি মোহিনী।।
বাণীনাথ কহে বাণী মৃদু মৃদু হাসি।
মোহিনী হইতে চাহে বৈষ্ণবের দাসী।।
হরিবোলা সাধুদের ভক্তি অকামনা।
তন্ত্র মন্ত্র নাহি জানে ব্রজ উপাসনা।।
বিশুদ্ধ চরিত্র প্রেমে হরি হরি বলে।
অন্য তন্ত্র মন্ত্র এরা বাম পদে ঠেলে।।
শুদ্ধাচার কৃষ্ণমন্ত্র ভক্তে জপ করে।
অন্য মন্ত্র জপ, তপ, পাপ গণ্য করে।।
মোহিনী গণিকা কামবিলাসী পৈশাচী।
তার মন্ত্র হরিভক্তে স্পর্শিলে অশুচি।।
হিংসাবুদ্ধি যারা তারা মিথ্যাভাষী সবে।
সব সভা, জিনে এই মন্ত্রের প্রভাবে।।
পরগণা মধ্যে তুমি বালা মহাশয়।
কোটি জনে কথা মানে তুমি একা জয়।।
ভক্তিশূন্য রসশূন্য ভাষ অপভাষ।
তথাপি সভার মধ্যে পাও বড় যশ।।
অপকথা কও তবু লোকে মানে কেন।
নিশ্চয় মোহিনী মন্ত্র তোমরাই জান।।
ক্রোধ ভরে তুমি কিছু বলিতে নারিলে।
বলিতে পারিবে কেন বলিতে না দিলে।।
দূর হ’তে কতলোক করে আস্ফালন।
আসিলে তোমার ঠাঁই না স্ফুরে বচন।।
তা হ’লে মোহিনী মন্ত্রে তুমি কিসে কম।
আমি জানি মোহিনী এ তব মতিভ্রম।।
সমুদ্র মন্থনকালে যে হ’ল মোহিনী।
দেব দৈত্য ভুলাইল ভুলে শূলপাণি।।
তার মন যে ভুলায় গাঢ় অনুরাগে।
তার ঠাঁই তোমার এ মোহিনী কি লাগে।।
অন্ধকারে জোনাকির আলো হয় বনে।
সে জ্যোতি থাকিবে কেন সুধাংশু কিরণে।।
নিশাকর করে কর তারাগণ ঘিরে।
সবাকার অন্ধকার দিবাকর হরে।।
সেই দিবাকর যার নখরে উদয়।
সেই পাদপদ্ম সদা যাহার হৃদয়।।
দিবাকর নিশাকর এসে তার ঠাঁই।
করজোড়ে স্তব করে বলিয়া গোঁসাই।।
তার সাক্ষী হনুমান রামভক্তি জোরে।
রামকার্য্যে সূর্যদেবে রাখে কর্ণে ভরে।।
ছাড় সব ধাঁধাঁ বাজী কাজে কাজী হও।
হরিপদ ভাবি কাল সুখেতে কাটাও।।
কি দোষ করেছি আমি মেতে হরিপ্রেমে।
বল তব কি ক্ষতি হয়েছে হরিনামে।।
মেয়েরা করে না পাক ক্ষতি কি তাহাতে।
বসাইয়া দেও লোক পায় কি না খেতে।।
এই অবকাশে লক্ষ্মীকান্ত কৃপাযোগে।
এদিকেতে রান্না হইয়াছে দশ ভাগে।।
বালা বলে সবলোক বসাইয়া দিব।
অন্নে না কুলালে ঠাকুরালী দেখাইব।।
অল্প অন্ন অল্প অল্প ডাল তরকারী।
কেহ বাদ না থাকিও বৈস সারি সারি।।
শীঘ্র শীঘ্র ডেকে সব লোক বসাইল।
অবলীলাক্রমে পরিবেষণ হইল।।
খেয়ে সব লোকে বলে অদ্য কিবা রান্না।
জ্ঞান হয় রেঁধেছে কমলা অন্নপূর্ণা।।
অল্প অন্ন বহুলোক হ’বে নাকি জানি।
ত্রিলোক ফুরাতে নারে এবে ইহা মানি।।
জ্ঞানশূন্য শ্রীচৈতন্য বালা মহাশয়।
মজুত অযুত লোক মানিল বিস্ময়।।
বালা মহাশয় কিংবা যত ছিল আর।
মহাপ্রভু পদে সবে করে পরিহার।।
কেহ বলে হরিরূপে হরি অবতীর্ণ।
কেহ বলে নমঃশূদ্র বংশ হ’ল ধন্য।।
শ্রীহরি চরিত্র সুধা যেই করে পান।
কর্মক্ষুধা পাপে তাপে সেই পরিত্রাণ।।
আকাশ ভেদিয়া উঠে হরিনাম ধ্বনি।
হরি হরি ময় ময় আর নাহি শুনি।।
পিও সাধু নাম মধু রসনা আশয়।
দিনান্তে যাবে দুরন্ত কৃতান্ত ভয়।।
তারক রসনা কহে হরিচাঁদ লীলে।
হরিচাঁদ প্রীতে ডাক হরি হরি বলে।।









শাস্ত্রপ্রচার প্রেস,

৫নং ছিদামমুদির লেন , দর্জ্জিপাড়া হইতে

শ্রীকুলচন্দ্র দে দ্বারা মুদ্রিত।