শ্রীশ্রীহরি লীলামৃত/আদি খণ্ড/সপ্তম তরঙ্গ/৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন



গোস্বামী গোলোক চাঁদের বংশাখ্যান

পয়ার

যে ভাবেতে উদাসীন হইল গোলোক।
গোলোক চরিত্র কিছু শুন সর্ব্বলোক।।
সাহাপুর পরগণা তাহার অধীনে।
নারিকেলবাড়ী গ্রাম জানে সর্বজনে।।
এই বংশে যত জন সবে মহোদয়।
বংশ অনুরাগ হরিভক্ত অতিশয়।।
মহৎ পুরুষ ছিল কেনাই মণ্ডল।
কৃষ্ণভক্ত চূড়ামণি প্রেমেতে বিহ্বল।।
কেনাইর চারিপুত্র সবে গুণাকর।
প্রথম অযোধ্যা রাম প্রেমের সাগর।।
দ্বিতীয় নন্দন হ’ল হরেকৃষ্ণ নাম।
তৃতীয়তঃ সৃষ্টিধর সাধু অনুপম।।
নয়ন মণ্ডল সর্ব্বানুজ হন তিনি।
করিতেন হরিনাম দিবস রজনী।।
সকলেই কৃষ্ণভক্ত সাধুসেবা মতি।
নয়নের অতি ভক্তি অতিথির প্রতি।।
মধ্যম হরেকৃষ্ণের দুইটি নন্দন।
রামনিধি জ্যেষ্ঠ হয় কনিষ্ঠ বদন।।
জ্যেষ্ঠ অযোধ্যারামের তিনটি নন্দন।
ঠাকুর দাস জ্যেষ্ঠ হয় অতি সুলক্ষণ।।
মধ্যম শ্রীজয়কৃষ্ণ নামে প্রেমে মত্ত।
হরিপ্রেমে মত্ত হ’য়ে করিতেন নৃত্য।।
সবার কনিষ্ঠ হয় চন্দ্রকান্ত নাম।
তিন ভাই হরিভক্ত বলে জয় রাম।।
ঠাকুর দাসের তিন পুত্র গুণাকর।
জ্যেষ্ঠ রাম কুমার মধ্যম বংশীধর।।
কনিষ্ঠ গোলোকচন্দ্র ভক্ত চূড়ামণি।
যার ঘোর হুহুঙ্কারে কম্পিতা মেদিনী।।
শ্রীরামকুমার সংসারের মধ্যে কর্ত্তা।
সত্যবাদী জিতেন্দ্রীয় মিষ্টভাষী বক্তা।।
গায় কৃষ্ণ বলে কৃষ্ণ করে মহাজনী।
বাণিজ্য করেন আর নৌকার চালানী।।
বংশীধর বংশধর অতি শিষ্টাচারী।
সত্যবাদী জিতেন্দ্রীয় ধর্ম্ম অধিকারী।।
কভু নাই অনাচার সংসারে সংসারী।
সবে মানে রাজাস্থানে সত্য দরবারী।।
সদা পরহিতে রত গৃহকার্য্য করে।
রাজা ডাকে রাত্রে যান রাজ দরবারে।।
কনিষ্ঠ গোলোকচন্দ্র হইল গোঁসাই।
গৃহকার্য্যে রত ছিল এই তিন ভাই।।
গোলোক উন্মত্ত চিত্ত ঠাকুর ভাবিয়া।
উপাধি হইল শেষে পাগল বলিয়া।।
কৃষিকার্য্য করিতেন গোস্বামী গোলোক।
ধান্যক্ষেত্র কার্য্যে ছিল বড়ই পারক।।
হলধর দিয়া চাষে আইলে বসিয়া।
নির্জ্জনে বসিয়া জমি দেখিত চাহিয়া।।
জমিমধ্যে কোন স্থান নিম্ন যদি রয়।
উচ্চস্থান মাটি এনে সে নিম্ন পুরায়।।
উঁচু নিচু না রাখিত জমির মাঝেতে।
সমতল ধান্যক্ষেত্র করিত স্বহস্তে।।
যে জমির ধান্য কাটে আঠার কিষাণে।
তিনি তাই কাটিতেন একা একদিনে।।
বিষয় কার্যেতে ছিল এমত নিযুক্ত।
এবে শুন যেভাবে হইল প্রভুভক্ত।।
কণ্ঠদেশ ফুলিয়া ক্রমশঃ হ’ল ভারী।
শয্যাগত রহিলেন হ’য়ে অনাহারী।।
নাসারন্ধ্রে ঘনশ্বাস বাক্য নাহি সরে।
দুগ্ধ পান আদি বন্ধ হ’ল একেবারে।।
রাউৎখামার রামচাঁদ মহাশয়।
ভক্তশ্রেষ্ঠ ঠাকুর নিকটে আসে যায়।।
রোগযুক্ত রোগী যত রামচাঁদে ধরে।
ঠাকুরের নামেতে রাখিয়া রোগ সারে।।
গোলোকের জ্যেষ্ঠ রামকুমার বিশ্বাস।
দশরথ নিকটেতে করিল প্রকাশ।।
গোস্বামীর খুল্লতাত জয়কৃষ্ণ নাম।
তার পুত্র সহস্রলোচন গুণধাম।।
সাধুসঙ্গ সদামতি হৃদয় আনন্দ।
তাহার কুমার দশরথ মহানন্দ।।
শ্রীরামকুমার কহে দশরথ ঠাঁই।
চল বাপ রামচাঁদে আনিবারে যাই।।
গোলোকে দেখিয়া আর স্থির নহে মন।
ঠিক যেন গোলোকের নিকট মরণ।।
শুনেছি রামচাঁদের অপার মহিমে।
রোগ সারে হরিচাঁদ ঠাকুরের নামে।।
বড় বড় রোগে রোগী তার কাছে যায়।
যাওয়া মাত্র রোগমুক্ত যদি দয়া হয়।।
দশরথ দিল মত চল তবে যাই।
খুল্লতাত রোগ সারে এই ভিক্ষা চাই।।
ত্বরা যায় রামচাঁদ ঠাকুরে আনিতে।
উপনীত ত্বরান্বিত রাউৎখামারেতে।।
বালাবাড়ী গেলে মাত্র সর্ব্বজনে কয়।
হেথা বৈস সে ঠাকুর আসিবে হেথায়।।
গিরিধর বালা আছে জ্বরে অচেতন।
রামচাঁদে আনিবারে যাইব এখন।।
পরিশ্রম করি কেন তোমরা যাইবা।
আমরা আনিলে হেথা বসিয়া পাইবা।।
বলিতে বলিতে লোক আনিবারে গেল।
রামচাঁদ ঠাকুরেকে সত্বরে আনিল।।
রামচাঁদ ঠাঁই রামকুমার বলেছে।
ভাই মোর গোলোক সে আছে কিনা আছে।।
বড় দায় ঠেকে আসিয়াছি দৌড়াদৌড়ি।
দয়া করি যেতে হ’বে নারিকেলবাড়ী।।
তাহা শুনি রামচাঁদ না করিল বাক্।
বাবা হরিচাঁদ বলে ছেড়ে দিল ডাক।।
হরিচাঁদ হরিচাঁদ বলে ডাক ছাড়ে।
হুঙ্কারিয়ে দুই হাতে গিরিধরে ঝাড়ে।।
ডাকে বাবা হরিচাঁদে করি করজোড়।
সজোরে গিরির পৃষ্ঠে মারিল চাপড়।।
মুহূর্ত্তেক মধ্যে ব্যাধি আরোগ্য হইল।
রোগমুক্ত গিরিবালা উঠিয়া বসিল।।
রোগমুক্ত হ’ল যদি গিরিধর বালা।
ঝাড়িতে লাগিল রামকুমারের গলা।।
বাবা হরিচাঁদ বলে ঘন ডাক ছাড়ে।
রামকুমারের গলা রামচাঁদ ঝাড়ে।।
দোহাই ওঢ়াকাঁদির বাবা হরিচাঁদ।
গলা ঝাড়ে ডাক ছাড়ে যেন সিংহনাদ।।
দণ্ডমাত্র রামকুমারের গলা ঝাড়ি।
বলে আমি যাইব না নারিকেলবাড়ী।।
তোমরা গৃহেতে যাও আমি গৃহে যাই।
দেখ গিয়ে গোলোকের গলা ফুলা নাই।।
রামচাঁদ যাহা যাহা বলে দিয়াছিল।
বাটীতে আসিয়া সত্য তাহাই দেখিল।।
সেই সব প্রকাশিল বাটীতে আসিয়া।
গোলোক উন্মত্ত হ’ল সে কথা শুনিয়া।।
প্রভুকে দেখিবো বলে ওঢ়াকাঁদি যায়।
লোটাইয়া পড়ে গিয়ে ঠাকুরের পায়।।
প্রভু বলে এতদিন কেন নাহি আলি।
ব্যাধিযুক্ত হ’য়ে কেন এতকষ্ট পা’লি।।
এতদিন পরে যদি এলি মম ঠাঁই।
যাও বাপ গৃহে যাও আর ভয় নাই।।
শুনিয়া গোলোক প্রেমে কম্পিত হইল।
অনিমিষ নেত্রে রূপ দেখিতে লাগিল।।
শঙ্খ চক্র গদাপদ্ম চতুর্ভুজধারী।
পরিধান পীতাম্বর মুকুন্দমূরারী।।
রূপ দেখি ঝোরে আঁখি ছাড়ে দীর্ঘশ্বাস।
বলে আমি আর না করিব গৃহবাস।।
গোলোক বলেন আমি কার বাড়ী যা’ব।
চরণে নফর হ’য়ে পড়িয়া রহিব।।
প্রভু বলে ঘরে যাও ওরে বাছাধন।
চিরদিন মোরে বলে থাকে যেন মন।।
গোলকে বলেন হরি চিনেছি তোমায়।
চিরদাস বিক্রিত হইনু তব পায়।।
প্রভু বলে বিকাইলি পাইলাম তোরে।
কর গিয়া গৃহকার্য যাব তোর ঘরে।।
গোলোক চলিল ঘরে প্রভুর কথায়।
সময় সময় ওঢ়াকাঁদি আসে যায়।।
মাসান্তর পক্ষান্তর সপ্তাহ অন্তরে।
মাঝে মাঝে যাইত প্রভুকে দেখিবারে।।
দশরথ মহানন্দ মাতিল তাহাতে।
গ্রাম্য লোক প্রমত্ত হইল সেই মতে।।
হরিচাঁদ গোলোকের ভাব প্রেমবশে।
যাতায়াত করে প্রভু গোলোকের বাসে।।
এইভাবে হরিবোলা হইল গোলোক।
হরি হরি বল সাধু কহিছে তারক।।









শাস্ত্রপ্রচার প্রেস,

৫নং ছিদামমুদির লেন , দর্জ্জিপাড়া হইতে

শ্রীকুলচন্দ্র দে দ্বারা মুদ্রিত।