শ্রীশ্রীহরি লীলামৃত/আদি খণ্ড/সপ্তম তরঙ্গ/৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন



বদন ঠাকুরের উপাখ্যান

পয়ার

গোলোক পাগল হ’ল ঠাকুরের ভক্ত।
ভক্তিভাবে আত্মহারা সদাই উন্মত্ত।।
গাঢ় অনুরাগ অষ্ট সাত্ত্বিক বিকার।
নাহি মানে বেদবিধি বীর অবতার।।
বীরেতে বীরত্ব যেন তুল্য হনুমান।
ধীর রসে শ্রীঅদ্বৈত শক্তি অধিষ্ঠান।।
উন্মত্ত স্বভাব সদা নাহি ছুটে কভু।
শয়নে স্বপনে ভাবে হরিচাঁদ বিভু।।
অনুক্ষণ আসে প্রভু গোলোকের ঠাঁই।
ক্রমে প্রেমে ভাবাবিষ্ট বদন গোঁসাই।।
গোলোকের খুল্লতাত ‘গোঁসাই’ বদন।
সেই যে বদন হরেকৃষ্ণের নন্দন।।
হইল অসাধ্য ব্যাধি উদরে বেদনা।
অহরহ বেদনায় বিষম যাতনা।।
আয়ুর্ব্বেদ নিদান মতের চিকিৎসক।
খন্ডজ্ঞানী মুষ্টিযোগী সুমন্ত্র পারক।।
অনেকে দেখিল রোগ আরোগ্য না হয়।
অবশেষে দেখিলেন এক মহাশয়।।
তিনি এসে বলিলেন বেদনা সারিব।
উদরেতে ফোঁটা দিয়া ঘা বান’য়ে দিব।।
গাছড়ার রসদ্বারা দিল ষোল ফোঁটা।
চর্ম ঠোসা পড়ে শেষে ঘা হ’ল ষোলোটা।।
মাসেক পর্য্যন্ত সেই করে মুষ্টিযোগ।
নিদারুণ জ্বালা হ’ল নাহি সারে রোগ।।
একেত’ ঘায়ের ব্যথা ব্যথা পুরাতন।
উভয় ব্যথার জ্বালা নাহি নিবারণ।।
ক্রমে বৃদ্ধি বেদনাতে অস্থিচর্ম্মসার।
অদ্য কিংবা কল্য মৃত্যু এরূপ আকার।।
কেহ বলে চিকিৎসার নাহি প্রয়োজন।
কেহ বলে বৈদ্যনাথ প্রতি দেহ মন।।
কেহ বলে আর কিছু নাহি হরি বল।
কেহ বলে বাঁচ যদি ওঢ়াকাঁদি চল।।
জগত জীবন তিনি জগতের কর্ত্তা।
মরিলে বাঁচাতে পারে সবে কহে বার্ত্তা।।
আত্ম স্বার্থ সমর্পণ করহ তাহায়।
চল যাই ওঢ়াকাঁদি ঠাকুর কি কয়।।
শুনিয়া বদন বড় হরষিত হ’ল।
বলে সবে মোরে ল’য়ে ওঢ়াকাঁদি চল।।
দশরথ বলে আমি লইয়া যাইব।
ব্যাধিমুক্ত হ’লে মোরা তার দাস হ’ব।।
শয্যাগত মৃতবৎ ওষ্ঠাগত প্রাণ।
ক্ষণে ক্ষণে অচেতন ক্ষণেক অজ্ঞান।।
উত্থান শকতি নাই থাকেন শয্যায়।
তরণী সাজিয়া চলে দুই মহাশয়।।
দুই জন তরী বাহে ত্বরান্বিত হ’য়ে।
বদন রহিল সেই নৌকাপরে শুয়ে।।
দুই জন তরী বাহে হরিগুণ গায়।
অশ্রুজলে বদনের বক্ষঃ ভেসে যায়।।
মনে ভাবে যদি কিছু সময় পেতাম।
মনোসাধ মিটায়ে নিতা’ম হরিনাম।।
ভাবিতে ভাবিতে কিছু উপশম পায়।
সকাতরে ধীরে ধীরে হরিনাম লয়।।
ঠাকুরের ঘাটে নৌকা চাপিল যখন।
প্রভু করিলেন অন্তঃপুরে পলায়ন।।
বাহির বাটীতে এসে পড়িল বদন।
ধরায় শয়ন করি ক’রেছে রোদন।।
বদন রোদন করে হইয়া পতন।
দেখা দিয়ে প্রাণ রাখ শ্রীমধুসূদন।।
ক্ষণেক থাকিয়া প্রভু আসিল বাহিরে।
তর্জ্জন গর্জ্জন করে বদনের পরে।।
গালাগালি দিয়া বলে ওঠ বেটা দুষ্ট।
বল দেখি তোর কেন হ’ল এত কষ্ট।।
বেয়েছ বাঁচাড়ি নৌকা পাছা নাচাইয়া।
আড়ঙ্গ করেছ জয় বাহিছ খেলা’য়া।।
দেহ খাটাইয়া লোক ধন উপার্জ্জয়।
সেই ধন কাকেরে বকেরে কে খাওয়ায়।।
এখন সে সোর শব্দ রহিল কোথায়।
একা আসা একা যাওয়া সাথী কেবা হয়।।
বদন বলিছে প্রভু মরিয়াছি আমি।
ভগ্ন তরী ডুবে মরি কর্ণধার তুমি।।
ঠাকুর বলেন চিনে সে কাণ্ডারী ধর।
মরিলি যদ্যপি বেটা ভালো ক’রে মর।।
বদন বলেন মম ডুবু ডুবু তরী।
আর কি চিনিতে যা’ব চিনেছি কাণ্ডারী।।
বদন বলেন তরী সবে যায় বেয়ে।
ডুবাতরী যেই বাহে তারে বলি নেয়ে।।
বদন বলেন হরি পদতরী দেও।
ছাড়িলাম দেহতরী বাও বা না বাও।।
হরি হরি হরি বলি উঠিল বদন।
ধরণী লোটা’য়ে ধরে প্রভুর চরণ।।
সঙ্গে আসিয়াছে যারা রহে জোড় করে।
ঠাকুর বলে তোরা ফিরে যারে ঘরে।।
বাটী গিয়া বল সবে মরেছে বদন।
যে দারুণ পেট ব্যাথা না রবে জীবন।।
কেহ যদি থাকে সে করুক শ্রাদ্ধ আদি।
বল গিয়া বদন মরেছে ওঢ়াকাঁদি।।
মৃতদেহ এনে তোরা রাখিলি এখানে।
এখানে মরিবে ওরে কে ফেলা’বে টেনে।।
ইহা বলি তা সবারে পাঠাইল ঘরে।
পদ দিল বদনের পেটের উপরে।।
জীয়ন্তে কাহার পেটে কে করয় ছিদ্র।
পেটের ঘায়ের পর দিল পাদ পদ্ম।।
অমনি পেটের ঘা শুকাইয়া গেল।
হরি হরি হরি বলি বদন উঠিল।।
ঠাকুর বলেন তোর পেটে ছিল যেই।
দেখ বাছা তোর পেটে আছে কি না সেই।।
বদন বলেন মোর পেটে যেই ছিল।
শ্রীপদ পরশে সেই মুক্তি হয়ে গেল।।
হরি ভিন্ন বদনে বলে না অন্য বোল।
নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে হরি ব’লেছে কেবল।।
বায়ু যবে পশে তার হৃদয় মাঝেতে।
শত হরিনাম করে প্রতি নিঃশ্বাসেতে।।
বায়ু যবে বের হয় তাহার সঙ্গেতে।
পঞ্চাশৎ হরিনাম করে সে কালেতে।।
কেহ যদি কাছে এসে জিজ্ঞাসা করয়।
নাম সঙ্গে কথা কয় নামে করে লয়।।
কোনকালে নাম করা ক্ষান্ত নাহি হয়।
হাতে মুখে চোখে ঈষৎ ইঙ্গিত দেখায়।।
কেহ যদি বলে কিছু খাওরে বদন।
বলে হরি দেও হরি করিব ভোজন।।
ঠাকুর বলেন যদি বাড়ী যেতে বোল।
বলে হরি হে হরি যা’বনা হরিবোল।।
ঠাকুর বলেন তবে মম সঙ্গে আয়।
হরি হরি হরি বলি পিছে পিছে ধায়।।
বাসস্থান পূর্বদিকে ধান্যভূমি ছিল।
তার মধ্যে উচ্চ এক স্থান আছে ভাল।।
সেই স্থানে আছে এক হিজলের গাছ।
পূর্ব মুখ বসিলেন গাছ করি পাছ।।
ঠাকুর বলেন তোর ক্ষুধা লাগে নাই।
বলে হরি বল হরি চল হরি খাই।।
সেখানে দেখিল প্রভু একটি সুড়ঙ্গ।
সুড়ঙ্গ হইতে বের হইল ভুজঙ্গ।।
ঠাকুর বলেন তোর হরিনাম শুনে।
ভুজঙ্গ বাহির হয়ে চলে গেল বনে।।
ভুজঙ্গের মুখে লাল দেখ দৃষ্টি করি।
অবশ্য ভুজঙ্গ কোন ধনের অধিকারী।।
হরি বল হরি বল কহিছে বদন।
বল হরি গর্তে হরি আছে হরিধন।।
ঠাকুর বলেন তবে কররে খনন।
হরি হরি বলি মাটি কাটিল বদন।।
দুই চাপ মাটি ফেলে তাহার তলায়।
পাইল ধনের ঘড়া কালুব্যাধ প্রায়।।
ঠাকুর বলেন ধন আনরে বদন।
এই ধন লয়ে গৃহে করহ গমন।।
বহুদিন বেদনায় ভুগিলি বদন।
করিতে নারিলি বাছা অর্থ উপার্জ্জন।।
সংসারের কার্য্য কিছু করিতে না পার।
এই ধন লয়ে সংসারের কার্য্য কর।।
তোর হরি নামেতে প্রহরী তুষ্ট হ’ল।
নিশ্চয় বুঝিনু ধন তোরে দিয়া গেল।।
বদন বলেন হরি হরি বল মুখে।
আমি কি করেছি ধন দিবে সে আমাকে।।
কেন হরি মোরে হরি দেহ এই ধন।
তুচ্ছ হরি ধন হরি দিয়া বুঝ মন।।
ওরে হরি ধনে হরি নাহি প্রয়োজন।
তুচ্ছ হরি ধনে হরি নাহি লয় মন।।
হরি লক্ষ্মী হরিণাক্ষী দৃষ্টি করে যারে।
হরি বল হরি ধন থাকে তার ঘরে।।
হরি বল বিমলা কমলা যার দাসী।
হরি বল যে পদ সেবিকা দিবানিশি।।
হরি বল যেই ধন বিরিঞ্চি-বাঞ্ছিত।
হরি বল সেই ধনে করনা বঞ্চিত।।
হরি বল সেই ধন করহ অর্পণ।
হরি বল সেই ধন তব শ্রীচরণ।।
হরি বল কত আমি দেখেছি খাটিয়া।
হরি বল দেখিয়াছি ধন উপার্জ্জিয়া।।
হরি বল হেন ঘড়া পূর্ণ ছিল ঘরে।
হরি বল সেই ধন কেবা রক্ষা করে।।
হরি বল কোথা ধন আমি বা কোথায়।
হরি বল খাই নাই মরি বেদনায়।।
হরি বল ক্ষিতি অর্থলোভে কতলোক।
হরি বল খুন করি খাটিছে ফাটক।।
হরি বল হরিবিনে শান্তি নাহি মনে।
হরি বল কিবা হয় ধনে আর জনে।।
হরি বল এ ধনে আমার কার্য্য নাই।
হরি বল ধন হরি চল হরি যাই।
হরি বলে অর্থ যদি অনর্থ কেবল।
হরি ধন হরি লবে চল হরি বল।।
হরিকে ডাকেন হরি আর অজগর।
হরিধন হরিব না মোরা যাই ঘর।।
শুনি অজগর তবে বাহুড়ি আসিল।
ঠাকুরে প্রণাম করি সুড়ঙ্গে পশিল।।
প্রভু সঙ্গে বদন থাকেন একতর।
কভু ঠাকুরের বাড়ী কভু ভক্তঘর।।
কোন কোন লোক যদি হয় ব্যাধিযুক্ত।
ঠাকুরের কাছে আসে হতে ব্যাধিমুক্ত।।
কারু কারু আজ্ঞা দেন মুষ্টিযোগ করে।
কারু বলে লয়ে যাও বদন ঠাকুরে।।
ঠাকুর বলেন তবে বদন ঠাকুরে।
যেই তুমি সেই আমি একই শরীরে।।
মনুষ্য জীবন মৃত্যু একই সমান।
তুইরে বদন মম ধন মন প্রাণ।।
তোর দেহ নিলাম আমার ইচ্ছামতে।
তোর ইচ্ছা যাহা হয় মোর ইচ্ছা তাতে।।
ঠাকুরের আজ্ঞা শুনি বদন উঠিল।
ঘুরে ফিরে নাচে যেন মত্ত মাতোয়াল।।
চরণ চঞ্চল চিত্ত স্থির নাহি রয়।
হরি হরি হরি বলে দৌড়িয়া বেড়ায়।।
হরি বলি যায় চলি নামে করি ভর।
মুখ ফিরে যায় বাম স্কন্ধের উপর।।
মহাবেগে চলে যান সিংহের সমান।
হরিনাম ক্ষান্ত নাই আড়ল পয়ান।।
ক্ষণেক বিপথে যান ক্ষণে পথে আসে।
ভুজঙ্গ গমন যেন বক্রভাবে বিষে।।
অলসেতে চলি প্রভু করিত শয়ন।
ঈষৎ আবেশে নিদ্রা চৈতন্য জীবন।।
ঈষন্নিদ্রাপূর্ণ চৈতন্য করিত বিশ্রাম।
তার মধ্যে হরিনাম নাহিক বিরাম।।
হরি হরি বলে যবে করিত ভোজন।
মন্ত্র ভুলে হরি বলে আত্ম নিবেদন।।
হরি জল খা’ব ব’লে দেও ব’লে ডাকে।
ভুলে ভোজনের দ্রব্য তুলে দেয় মুখে।।
নামের সহিত দ্রব্য দুই হাতে তুলি।
বদন বদনে দিত হরি হরি বলি।।
এইভাবে উদাসীন হইল বদন।
এইভাবে ঠাকুরের সঙ্গেতে মিলন।।
অবিরাম হরিনাম করে অনুক্ষণ।
ইচ্ছামত করিতেন গমনাগমন।।
কক্ষবাদ্য করতালি কখন কখন।
কভু ওঢ়াকাঁদি কভু গৃহেতে গমন।।
কখন বা রাস্তা দিয়া করিতে পয়ান।
কভু পথ বিপথ বা না থাকিত জ্ঞান।।
হরি বলে কখন চলিত বেগভরে।
খান নাল লম্ফ দিয়া যাইতেন পারে।।
জঙ্গল কণ্টক কিম্বা জলমগ্ন স্থান।
আড়ভাবে হরি বলি করিত পয়ান।।
ঘোরাফিরা নাহি ছিল দৌড়াইত সোজা।
এমন মহৎভাব নাহি যেত বুঝা।।
মলমূত্র ত্যাগে হরি নাহিক বিশ্রাম।
নাহি ক্ষান্ত অবিশ্রান্ত করে হরিনাম।।
ব্যাধিযুক্ত কেহ যদি হ’য় নিরুপায়।
কাঁদিয়া ধরিত গিয়া বদনের পায়।।
হরিচাঁদ বলিয়া দিতেন আজ্ঞা ক’রে।
অমনি সারিত ব্যাধি আজ্ঞা অনুসারে।।
বদনের শুভাখ্যান শুনে যেই লোক।
শ্রবণেতে মহাসুখ বিজয়ী ত্রিলোক।।
ওঢ়াকাঁদি শেষ লীলা অলৌকিক কাজ।
ভণে শ্রীতারকচন্দ্র করি রসরাজ।।









শাস্ত্রপ্রচার প্রেস,

৫নং ছিদামমুদির লেন , দর্জ্জিপাড়া হইতে

শ্রীকুলচন্দ্র দে দ্বারা মুদ্রিত।