শ্রীশ্রীহরি লীলামৃত/মধ্য খণ্ড/সপ্তম তরঙ্গ/২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন



পাগলের বানরপ্রধানমূর্ত্তি ধারণ ও গঙ্গা দর্শন

পয়ার

পুনর্বার একদিন গঙ্গাচর্ণা যেতে।
চলিলেন পাগলাই করিতে করিতে।।
অক্রুর বিশ্বাস রামকুমার বিশ্বাস।
দুই জনে মিলে এল পাগলের পাশ।।
পাগল দেখিয়া বড় হৈল মন প্রীত।
উভয় উভয় পক্ষ প্রেমে পুলকিত।।
তিন জন একসঙ্গে যাইবে বলিয়া।
একত্রে হইল পার পাতগাতী গিয়া।।
পাগল নামিতে তীরে দেয় এক লম্ফ।
নদী জল উথলিল যেন ভূমিকম্প।।
কিনারে আসিতে বাকী দশ বার নল।
গভীর ভাগণ কূল স্রোত পাক জল।।
জল হ’তে চারি হাত উর্দ্ধেতে পাহাড়ি।
পাড়ির উপরে পড়ে বায়ু ভরে উড়ি।।
দেখিয়া সকল লোক মানিল বিস্ময়।
নাবিক কহিছে ইনি মনুষ্য’ত নয়।।
গোস্বামী দৌড়িয়া গেল গঙ্গাচর্ণা গ্রামে।
কার্তিকের গৃহেতে মাতিল হরিনামে।।
অক্রুর রামকুমার আইল পশ্চাতে।
শম্ভুনাথ ঘরে বসিলেন একত্রেতে।।
বলে ওহে শম্ভুনাথ পাগল কোথায়।
বার্তা শুনি শম্ভুনাথ অন্বেষণে যায়।।
এদিকে পাগল ভাবিছেন মনে মনে।
ভাল হ’ত কার্ত্তিক আনিলে সে দু’জনে।।
মন জানি ততক্ষণ কার্ত্তিক চলিল।
তাড়াতাড়ি করি দোঁহে ডাকিয়া আনিল।।
তাঁহারা আসিয়া রাইচরণের ঘরে।
প্রেমানন্দে মেতে দোঁহে হরিনাম করে।।
পাগল করিছে নাম তাহা শুনিতেছে।
পাগলের সঙ্গে কার্তিকের ভার্যা আছে।।
মৃদুস্বরে হরি বলে পাগলের সঙ্গে।
কার্ত্তিক ভাসিয়া যায় প্রেমের তরঙ্গে।।
না এল বিশ্বাসদ্বয় পাগল ছুটিল।
গিয়া রাইচরণের ঘরেতে উঠিল।।
দুই বিশ্বাসেরে আনি মদনের ঘরে।
পাগল বাহিরে গিয়া হরিনাম করে।।
(এক শব্দ নাই) দুই পুত্র চাঁদ ধতুরাম।
ধতুরামের পুত্রের ঠাকুরদাস নাম।।
তার পুত্র রামনিধি ভকত সুজন।
অতি শুদ্ধ মতি তার তিনটি নন্দন।।
জ্যেষ্ঠ পুত্র মোহন মধ্যম শ্রীমদন।
সব ছোট বনমালী বৈষ্ণব লক্ষণ।।
মদনের ঘরে বসি আর আর লোক।
গৃহের বাহিরে ঘোরে গোস্বামী গোলোক।।
মদনের ঘরে রাইচরণের ঘরে।
বায়ু বেগে দুই বাড়ী যায় আসে ঘুরে।।
ঘর ঘেরি বাড়ী ঘেরি দেয় ঘন পাক।
চক্রাকারে ঘুরে যেন কুম্ভকার চাক।।
তাহাতে লোকের ভিড় হইল অধিক।
মাঝে মাঝে সঙ্গে সঙ্গে ঘুরেছে কার্ত্তিক।।
কার্তিকের বাড়ী বাল্য বৃদ্ধ যুবা যত।
সব নাম সংকীর্তনে হ’য়েছে উন্মত্ত।।
রাইচরণের বাড়ী যতলোক ছিল।
দিশেহারা মাতোয়ারা কীর্তনে মাতিল।।
রজনী মহিমা বনমালী প্রামাণিক।
বৃন্দাবন নিবারণ প্রেমেতে প্রেমিক।।
রাইচরণের ঘরে মদনের ঘরে।
বহুলোক মেশামেশি ভাসে প্রেমনীরে।।
সবে মিলে পাগলের বিক্রম দেখিয়া।
ভ্রান্তিতে গিয়াছে সবে সংজ্ঞা হারাইয়া।।
সিংহ নাদ সিংহবীর্য গর্জিছে পাগল।
জয় হরি বল মন গৌর হরি বল।।
মদনের ভগিনী মহিমা নাম ধরে।
তার কণ্ঠস্বর যেন অমৃত নিক্ষরে।।
পাগল উন্মত্ত হ’য়ে করে হরিনাম।
বেড়াপাক কীর্তন যেমন ক্ষেত্রধাম।।
দলে দলে মহাপ্রভু নাচিত যেমন।
তেমনি গোলোকচন্দ্র করিছে ভ্রমণ।।
এক এক বার যবে দিতেছেন লম্ফ।
তিন চারি বাড়ী কাঁপে যেন ভূমিকম্প।।
পাগলের প্রতি কার্তিকের বড় আর্তি।
দৈবেতে পাগলের দেখিল কপি মূর্তি।।
লম্ফ দিয়া দশ বার হাত উর্দ্ধ হয়।
লাঙ্গুল ঠেকিল গিয়া কার্তিকের গায়।।
শূন্য মার্গে রাম রাম রাম রাম বলে।
অতি ভীমকায়, লম্বা পুচ্ছ, পিছে ঝুলে।।
অক্রুর রামকুমার ডেকেছে কার্ত্তিক।
কি দেখিনু কি হইল নাহি পাই ঠিক।।
তোমরা জানহ শাস্ত্রগ্রন্থ রামায়ণ।
দেখ এসে পাগলের লক্ষণ কেমন।।
ঘরে থাক কেন সবে বাহিরে এসনা।
একা আমি দেখিলাম তোরা দেখিলি না।।
অক্রুর রামকুমার বাহিরে আসিল।
কপি মূর্তি দেখি তথা মূর্ছিত হইল।।
দেখে মোহপ্রাপ্ত হৈলি কহিছে পাগল।
ধ’রে তুলে বলে তোরা বল হরিবোল।।
শম্ভুনাথে বলে কি দেখিলি শম্ভুনাথ।
শম্ভু কহে লেজ দেখি দশ বার হাত।।
পাগল বলিছে কারু নাহি দিব ফাঁকি।
দেখাইব যাহা আছে দেখাবার বাকী।।
যা গ্রামের শ্যামা রামা সবে ডেকে আন।
সকলে দেখুক আমি বানর প্রধান।।
চূড়ামণি পুত্র রামমোহন সুমতি।
ঠাকুরের প্রিয় ভক্ত মাতা তোলাবতী।।
পাগল কহিছে ডেকে সবে তোরা আয়।
হইয়াছে বেশী বেলা স্নানের সময়।।
চলিল সকল ভক্ত হরিধ্বনি দিয়ে।
পাগলের জয় জয় সকলে বলিয়ে।।
অগ্রে চলিলেন সব মতুয়ারগণ।
আর সব পিছে চলে করি সংকীর্তন।।
পাছের লোকের সঙ্গে চলিল গোঁসাই।
ক্ষণে দেখে সর্ব অগ্রে করে পাগলাই।।
হরিনাম ধ্বনি উঠে গগন মণ্ডলে।
পাগল বলিল সবে নাম গিয়া জলে।।
জলকেলি করিতে সকলে এলি জুটে।
সবে নাম ঘাটে আমি যাইব অঘাটে।।
পাগল পশ্চিম দিকে যায় ঘাট ছাড়ি।
শম্ভুনাথ সাথে সাথে যায় দৌড়াদৌড়ি।।
শম্ভুনাথ দৌড়ে যায় দেখিয়া কার্ত্তিক।
পিছে পিছে দৌড়ে যায় হহিয়া বিদিক।।
অক্রুর রামকুমার তাহা দেখি ধায়।
পাগল মারিল লম্ফ লেজ দেখা যায়।।
লম্ফ দিয়া পাগল জলের মধ্যে পড়ি।
জল ফেলাফেলি করে আছাড়ী পাছাড়ী।।
পূর্বঘাটে সকলে করিছে জলকেলি।
পশ্চিমে পাগল করে জল ফেলাফেলি।।
জল ছিটাছিটি যেন ঘন মেঘ বৃষ্টি।
পাগলের প্রতি কার নাহি চলে দৃষ্টি।।
হেনকালে মধ্যে জলে মকর উঠিল।
পাগল মকর ধরি মাথায় লইল।।
জলের মধ্যেতে দৃষ্টি করে চারিজনে।
পাগল জলের পরে বসি যোগাসনে।।
জল হ’তে উঠে জল বৃষ্টি যেন হয়।
কেবা বরিষণ করে কে জল উঠায়।।
মকর মস্তকে ছিল পড়িল জলেতে।
পাগল বসিল গিয়া মকর পৃষ্ঠেতে।।
দেখে পাগলের নাই পূর্বের আকৃতি।
মকরের পৃষ্ঠে বসে শ্বেত বর্ণা সতী।।
পাগল জল তরঙ্গে ভাসিয়া বেড়ায়।
ভাসিতে ভাসিতে শেষে এল কিনারায়।।
মাত্র এক মকর ভাসিয়া রহে জলে।
বৃষ্টি ধারা অনুক্রমে মকর ডুবিলে।।
দেখিতে দেখিতে পুনঃ মকর ভাসিল।
গঙ্গা এসে মকরের পৃষ্ঠেতে বসিল।।
দেখিয়া পাগলচাঁদ ধাইয়া চলিল।
গঙ্গার চরণ ধরি মস্তকে করিল।।
গঙ্গাদেবী ধরিয়া পাগলে করে কোলে।
সিংহনাদে পাগল ডেকেছে মা মা বলে।।
পাগল বলেন করি পদে জলকেলি।
অপরাধ ক্ষম মাতা নিজ পুত্র বলি।।
গঙ্গা বলে তুমি হরিচাঁদ প্রিয় পাত্র।
আমি তব অঙ্গ স্পর্শে হইনু পবিত্র।।
পূর্বদিকে ঘাটে সব লোকে করে দৃষ্টি।
তারা বলে ওই ঘাটে হ’য়ে গেল বৃষ্টি।।
পাগল সাঁতার দিয়ে উঠিলেন কূলে।
অচেতন চারিজনে ধ’রে ধ’রে তুলে।।
ঘাটের উত্তরে গ্রাম দক্ষিণেতে গোগ।
পাগল করিল তথা গঙ্গাস্নান যোগ।।
তথা স্নানে পূর্ণ হয় সব মনস্কাম।
গঙ্গাতুল্য শুদ্ধ ঘাট ‘বেলে ঘাট নাম’।।
পাগলের যোগে গোগে গঙ্গা বারমাস।
অদ্যাপি সে কাণ্ড লোক মুখেতে প্রকাশ।।
পাগলের জলকেলি দেখা গেল লেজ।
রচিল তারকচন্দ্র কবি রসরাজ।।









শাস্ত্রপ্রচার প্রেস,

৫নং ছিদামমুদির লেন , দর্জ্জিপাড়া হইতে

শ্রীকুলচন্দ্র দে দ্বারা মুদ্রিত।