শ্রীশ্রীহরি লীলামৃত/মধ্য খণ্ড/সপ্তম তরঙ্গ/৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন



পাগলের ওলাউঠার তাড়ান

পয়ার

একবার নারিকেলবাড়ী সে গ্রামেতে।
উপনীত ওলাউঠা ব্যাধি সে স্থানেতে।।
মরিল অনেক লোক ভাব বিপরীত।
তাহাতে অনেক লোক হৈল চমকিত।।
ভয়ভীত হ’য়ে কেহ না পারে চলিতে।
রাত্রি দ্বার বন্ধ, নাহি চলে দিবসেতে।।
মহানন্দ নাগর চলিল ওঢ়াকাঁদি।
কহে সব ঠাকুরের শ্রীচরণ বন্দি।।
নাগর সরিষা নিল বসনেতে বাঁধি।
ওলাউঠা আসিয়াছে কহে কাঁদি কাঁদি।।
ঠাকুর কহেন তাতে তোদের কি ভয়।
যা হবার হউক তোদের নাহি দায়।।
তবু কহে নাগর উপায় কিবা করি।
প্রভু কহে ভয় নাই বল হরি হরি।।
গোস্বামী গোলোক তাহা শুনে দাঁড়াইয়া।
গোপনে নাগরে নিল ইঙ্গিত করিয়া।।
কহিছে তোমরা সবে কর দরবার।
আমি যাইতাম দেশে বাসনা আমার।।
মহাপ্রভু নিকটে নাগর কহিতেছে।
গোলোকে পাঠান যদি তবে ভয় ঘুচে।।
ঠাকুর বলেন কেন গোলোক যাইবে।
হরি বল হ’বে ভাল ভয় নাহি রবে।।
তবু আর বার গিয়া কহিছে নাগর।
জীবনের আশা নাই হয়েছি কাতর।।
ঠাকুর বলেন এত ভয় কি লাগিয়া।
আন দেখি দিব আমি সরিষা পড়িয়া।।
সরিষা পড়া লাগিয়া মনের বিশ্বাস।
ল’য়ে যা সরিষা পড়া ভয় হ’বে নাশ।।
আর বার নাগর করিছে দরবার।
দাদা গেলে ভয় মোরা করিব না আর।।
ঠাকুর বলিল তবে গোলোক নিকট।
যাও বাছা কারু সঙ্গে না করিও হট।।
শুনিয়া গোলোকচন্দ্র যায় দৌড়াদৌড়ি।
সত্বরে উত্তরে গিয়া নারিকেল বাড়ী।।
জয় হরি বল মন গৌর হরি বল।
হুহুঙ্কার করি গিয়া উঠিল পাগল।।
দম্ভ করি গোস্বামী দিলেন এক লম্ফ।
তাহাতে গ্রামেতে যেন হ’ল ভূমিকম্প।।
দুর্গাচরণের বাড়ী নবীনের ঘরে।
কবিরাজ এসেছিল পূজা পাতিবারে।।
পাগল হুঙ্কার করি কবিরাজে কয়।
এই পূজা দিলে যদি কলেরা না যায়।।
যত লোক মরে তার সব দাবী দিবি।
পূজা দিয়া কলেরা কি তাড়াতে পারিবি।।
দুর্গাচরণেরে বলে ছাড় গণ্ডগোল।
ওঢ়াকাঁদি মুখো হ’য়ে হরি হরি বোল।।
তথা হ’তে চলিলেন বাহুলের ঘরে।
তিন মেয়ে ব্যাধিযুক্ত কহে বাহুলেরে।।
মেয়ে যদি মরে আমি সে জবাব দিব।
হরিচাঁদ নামে আমি কলেরা ঘুচাব।।
মেয়ে থাক ঘরে তোরা মোর সঙ্গে চল।
একান্ত মনেতে তোরা হরি হরি বল।।
ওঢ়াকাঁদি প্রভু নামে মান জরিমানা।
কলেরায় মেয়ে তোর মরিতে দিব না।।
বাহুল আইল সঙ্গে চিন্তা নাহি আর।
হরি বলে পাগল ছাড়িয়ে হুহুঙ্কার।।
গ্রামের লোকের শঙ্কা ঘুচিল সকল।
দিবানিশি সমভাব নির্ভয় হইল।।
কবিরাজ যেই রাত্রি পূজা পেতেছিল।
ভয় পেয়ে সেই রাত্রি পালাইয়া গেল।।
পাগল বসিল আসি নাগরের ঘরে।
সেই ঘরে থেকে সবে হরি নাম করে।।
বাটীর ঈশান কোণে এক শব্দ পেয়ে।
সেই কোণে পাগল চলিল ক্রোধে ধেয়ে।।
নাগরে বলিল ডেকে থাক গিয়া ঘরে।
ওঢ়াকাঁদি মুখো হ’য়ে ডাকগে বাবারে।।
নাগর আসিয়া ঘরে নিদ্রা নাহি যায়।
হরিনাম ল’য়ে সেই রজনী পোহায়।।
সে পাগল সিংহের প্রতাপে হরি বলে।
আগে আগে ওলাউঠা দৌড়ে যায় চলে।।
হস্তীর বৃংহতি রব শুনায় যেমন।
কলেরা দৌড়ায় শব্দ হতেছে তেমন।।
চলিল সে ওলাউঠা পূর্বমুখ হ’য়ে।
নির্ভয় গোলোক তারে নিল ধাওয়ায়ে।।
গ্রাম মধ্যে রাত্রি ভরি ভ্রমিছে পাগল।
গ্রাম্য লোক তাহা শুনি বলে হরিবোল।।
কলেরা উঠিল গিয়া খোলের ভিটায়।
তারপর পাগল চলিল নিজালয়।।
পর রাত্রি খালিয়ার ভিটায় চলিল।
প্রভু হরিচাঁদ বলি পাগল ডাকিল।।
সে ভিটা ছাড়িয়া গেল ওড়ার ভিটায়।
তাহা দেখি পাগল চলিল নিজালয়।।
পাগল বলিল মহানন্দ নাগরকে।
নিজড়ায় কলেরা গিয়াছে দায় ঠেকে।।
সেখানে যদিচ থাকে সেও ভাল নয়।
নিজড়া গ্রামেতে যাব আজকে নিশায়।।
মহানন্দ নাগর করিছে তাতে মানা।
সে গ্রামে থাকিলে কোন ক্ষতি হইবে না।।
নিশীথে পাগল গেল নিজড়া গায়।
হরিধব্বনি দিয়া উঠে ওড়ার ভিটায়।।
কলেরা আসিয়া তথা হ’ল মূর্তিমন্ত।
প্রকাণ্ড শরীর তার বড়ই দুরন্ত।।
ভূতভিটা বলি তার আছে পরিচয়।
ভিটার উপর থাকি ডাক দিয়া কয়।।
তোর ভয়ে আমি আসিয়াছি এই গ্রামে।
তুই কেন হেথা আলি দ্বিতীয়ার যমে।।
আলি যদি তবে বেটা আয় এই ঠাই।
পড়িলি আমার হাতে তোর রক্ষা নাই।।
আয় দেখি হ’স তুই কোন কাজে কাজী।
আজকার সংগ্রাম হইবে বোঝাবুঝি।।
পাগল বলেন তুই ভয়ে পলাইলি।
আজ তুই এত বল কোথায় পাইলি।।
আমি হরিচাঁদ বলি ছাড়ি হুহুঙ্কার।
লম্ফ দিয়া পৈল গিয়া ভিটার উপর।।
কলেরা বলেছে বেটা শীঘ্র যারে উঠে।
চিরকাল অধিকার মোর এই ভিটে।।
প্রভু বলে এ ভিটা ছাড়িব কি কারণ।
মরি কিংবা মারি তোরে এই মোর পণ।।
আমি যদি মরি তবে অধিকার তোর।
তোরে যদি মারি তবে অধিকার মোর।।
ভিটা ঘিরি ওলাউঠা ঘুরিয়া বেড়ায়।
পূর্ব মুখ প্রভু বৈসে আনন্দ হৃদয়।।
সম্মুখে আসিল যদি ঘুরে তিন পাক।
পাগল কহিছে তোর ঘুচাইব জাঁক।।
থাক থাক ওরে দুষ্ট আর যাবি কোথা।
একটানে আমি তোর ছিঁড়ে নিব মাথা।।
পাগলের সম্মুখেতে ঝাউবন ছিল।
লম্ফ দিয়া পড়ি তিন গাছ উপাড়িল।।
সেই গাছ ধরি বেগে ধাইয়া চলিল।
ডঙ্কা দেখি শঙ্কা করি ওলাউঠা গেল।।
পাগল বলেন পালাইয়া যাস কোথা।
আমাকে কি বলে যাস বল সেই কথা।।
ওলাউঠা বলে আমি তোমার সাক্ষাতে।
যতদিন আমি আছি এই সংসারেতে।।
ততদিন আসিব না এই অধিকারে।
সত্যতা কড়ার আমি দিলাম তোমারে।।
এ অধ্যায় শুনিলে ঘুচিবে ব্যাধি ভয়।
ধন পুত্র যশ প্রাপ্ত আয়ু বৃদ্ধি হয়।।
হরিচাঁদ পদযুগ্ম যোগে যোগে ভাবি।
রচিল তারকচন্দ্র সরকার কবি।।









শাস্ত্রপ্রচার প্রেস,

৫নং ছিদামমুদির লেন , দর্জ্জিপাড়া হইতে

শ্রীকুলচন্দ্র দে দ্বারা মুদ্রিত।