বিষয়বস্তুতে চলুন

সদ্ভাব কুসুম/অশ্ব ও গাভী

উইকিসংকলন থেকে

অশ্ব ও গাভী।

হরিদত্ত নামে ধনী, নবগ্রামবাসী,
গোশালা ও অশ্বশালা গড়ে পাশাপাশি।
প্রত্যহ সায়াহ্নে সেই ধনীর নন্দন,
অশ্বশালে অশ্ব আনি করিত বন্ধন।
গোশালায় গাভী ছিল পরম যতনে,
বসিয়া থাকিত সাঁঝে, রত রোমন্থনে।
একনিশা দ্বিপ্রহরে অশ্ববর ধীরে,
দুঃখের নিশ্বাস ছাড়ি, কহিছে গাভীরে,―
“শুন গাভী, মম সম দুঃখী কেহ নাই,
কোন্ পাপে অশ্ব হ’য়ে জন্ম, ভাবি তাই।
শতবার দেই আমি অদৃষ্টে ধিক্কার,
লক্ষবার নিন্দি মানবের অবিচার।
ভোরে মোরে জু’ড়ে দেয়, ভারি গাড়ীখানা,
সন্ধ্যায় বিরাম মোর হয় গাড়ী-টানা।

মাঝে মাঝে রাত্রিতেও পাইনে নিস্তার,
অবিরত কষাঘাত শ্রম-পুরস্কার।
শান্তিবশে একটুকু থামি যদি কভু,
কঠিন প্রহার করে নিরদয় প্রভু।
পিঠ ফেটে রক্ত ব’য়ে যায় কত বার,
তবু কষাঘাত করে, কে করে বিচার?
বদনেতে রশ্মি দিয়া টানে এত জোরে,
জিহ্বা কে’টে যায়, তবু টানে তাই ধ’রে।
তথাপি উদর পূ’রে খাইতে না পাই,
পেটে খে’লে পিঠে সয়, তাও মোর নাই।
আমার সহিস প্রভু, মোর ছোলা থেকে,
অর্দ্ধেক সরান, প্রাণ ফেটে যায় দেখে।
আমাদের কথা যদি বুঝিত মানব,
হ’তে পারিত না এত নিঠুর দানব
মাঝে মাঝে কণ্ঠাগত হ’য়ে আসে প্রাণ,
ভাবি, বাঁচি অশ্বলীল। হ’লে অবসান।

তুমি, গাভী, কত সুখে জীবন কাটাও,
বিনাশ্রমে, মহা যত্নে ব’সে ব’সে খাও।
প্রহারের পরিবর্ত্তে পাও মহাদর,
তোমারে দেবতা জ্ঞানে পূজা করে নর।
কত ভক্তি ভরে, প্রভু করে তব সেবা,
পশু মধ্যে তবসম সুখী আছে কেবা?”
শুনি দুঃখে হাসি, গাভী করিছে উত্তর,
“আমার বেদনা শুধু জানেন ঈশ্বর।
তুমি কাঁদিতেছ অশ্ব প্রহার-ব্যথায়,
চিত্তে যদি সুখ থাকে, মা’র সহা যায়।
অনাহার, প্রহার বা অতি পরিশ্রম,
এ হ’তে আমার দুঃখ, দারুণ বিষম!
ঐ দেখ, অশ্ববর, আমারি কুটীরে,
বাঁধিয়া রেখেছে মোর শিশু বৎসটীরে।
আমি আছি তিন হাত মাত্র দূরে বাঁধা,
দিবস যামিনী মোর সার সুধু কাঁদা।

ক্ষুধায় আকুল বাছা, জিজ্ঞাসে না কেহ,
বাঁট-ভরা দুধ মোর, বুক ভরা স্নেহ।
সারা রাত্রি বাছা মোর ‘মা মা’ ব’লে ডাকে,
ক্ষুধায় দুর্ব্বল হয়ে ভূমে প’ড়ে থাকে।
দুজনায় দুজনার মুখ পানে চাই,
বিফল রোদনে অশ্ব, যামিনী পোহাই।
প্রত্যহ প্রভাতে পাই প্রভুর দর্শন,
সে দৃষ্টি এ প্রাণে করে গরল বর্ষণ।
দক্ষিণে দোহন পাত্র, বাম হাতে কেঁ’ড়ে,
আসিয়া বাছারে দেয় একবার ছে’ড়ে।
ক্ষুধায় তৃষ্ণায় বস পাগল হইয়া,
দুধ খে’তে আসে মোর বাঁটে মুখ দিয়া।
দুটী মাত্র টান দিতে, সে পাষাণ প্রাণে
নাহি সহে, বাছার বদন ধ’রে টানে।
তখনি সরায়ে নিয়া, ধ’রে রাখে কাছে,
তা’ দে’খে কি অভাগিনী মার প্রাণ বাঁচে?

সব দুধটুকু মোর টানিয়া দোহায়,
ভাবি, হায় কেন কাল যামিনী পোহায়?
কাছে দাঁড়াইয়া বাছা, ‘হায় হায়’ করে,
‘মা মা’ বলে ডাকে, আর আঁখি জল ঝরে।
নিঠুর যখন দেখে দুধ নাই বাঁটে,
ছেড়ে দেয় তারে, বাছা শুষ্ক বাঁট চাটে
সব চলে যায়, মোরা দুই জনে কাঁদি,
নীরবে সকলি সহি, বিধি প্রতিবাদী।
পূর্ব্বজন্মে কার মাকে দিয়েছিনু ক্লেশ,
তারি এ কঠোর শাস্তি, জেনেছি বিশেষ।”