বিষয়বস্তুতে চলুন

সদ্ভাব কুসুম/ঠাকুরদাদা ও নাতি

উইকিসংকলন থেকে

ঠাকুরদাদা ও নাতি।

প্রবল-প্রতাপ রাজা ছত্রধর রায়,
ছিলনা দয়ার লেশ,
কৃপণের একশেষ,
কেঁদে মরে দুঃখী প্রজা, বিচার না পায়।
গিরি-উচ্চ অট্টালিকা, শত পুষ্পোদ্যান;
সুনির্ম্মল সরোবর,
শোভিতেছে মনোহর,
চতুর্দ্দিকে স্তরে স্তরে প্রস্তর সোপান।
নৃপতির বৃদ্ধ পিতা হতভাগ্য অতি;
রাজার প্রাসাদে তার,
নাহি ছিল অধিকার,
কুটীরে সরসী-তীরে, করিত বসতি।

রাজ্যপেয়ে, রাজা তারে করে নির্ব্বাসিত;
একটী প্রস্তর-পাত্র,
তারে দিয়াছিল মাত্র,
সেই এক বাটি চাল রোজ তারে দিত।
পেট না ভরিত, বৃদ্ধ কাঁদিত প্রত্যহ;
নীরবে, নির্জ্জনে, একা,
ভাবিত ‘বিধির লেখা,’
কহিতনা কারো কাছে যাতনা দুঃসহ।
রাজার কুমার ছিল নবম বর্ষীয়,
মাঝে মাঝে সে কুটীরে,
আসিয়া বসিত ধীরে,
সুন্দর, তেজস্বী শিশু, পিতামহ প্রিয়।
বসিয়া বৃদ্ধের কোলে, একদা কুমার,
জিজ্ঞাসিল সকৌতুকে,
“বল দাদা, কোন্ দুখে,
কুঁড়ে ঘরে থাক? কেন এ দশা তোমার?

তুমি তো পিতার পিতা, শুনি সবে কয়;
সুন্দর দালানে, খাটে,
আমাদের রাত কাটে,
তোমার ও ছেঁড়া কাঁথা, শুয়ে ঘুম হয়?
দই, দুধ, ক্ষীর, ছানা, মিষ্টান্ন, মিঠাই,
মোরা খাই পেট ভ’রে,
কি হেতু তোমার তরে,
আসেনা সে সব? দাদা, কহ মোর ঠাঁই।”
বৃদ্ধের নয়ন-জল নাহি মানে বাঁধ,
বালকেরে ধরি’ বুকে,
চুমা খায় কচি মুখে,
বলে“রে দয়াল শিশু। করি আশীর্ব্বাদ।
আমার দুঃখের কথা শুধায়োনা ভাই,
নিরদয় পিতা তোর,
এদশা ক’রেছে মোর,
একদিন পেট ভ’রে খাইতে না পাই।

এই পাথরের বাটি দিয়েছে আমায়,
রোজ এই বাটি ভ’রে,
মেপে আধ পোয়া ক’রে,
চাল দেয়, তাতে পেটের ক্ষুধা যায়?
কত পাপ করেছিনু, তারি শাস্তি পাই,
হইয়া রাজার বাপ,
হায়! এত মনস্তাপ,
ভাবি, এত লোক মরে, মোর মৃত্যু নাই?”
শুনিয়া বালক-চিত্ত গলিল দয়ায়;
বৃদ্ধেরে ধরিয়া গলে,
ভাসে নয়নের জলে,
বলে, “দাদা, তোর দুঃখ দেখা নাহি যায়।
আমি ঘুচাইব তোর সকল বেদনা;
কুঁড়ে তোর ঘু’চে যাবে,
পেট ভরে ভাত পাবে,
কথা রাখ, দাদা, আর কখনো কেঁদনা।

আমি আর পিতা, আজ সন্ধ্যার সময়,
এই পুকুরের তীরে,
বেড়াইব ধীরে ধীরে,
বাঁধা ঘাটে তোর সনে যেন দেখা হয়।
পাথরের বাটি হাতে, ব’সে থে’কো তথা
হঠাৎ মোদের দে’খে,
ফে’লে দিও হাত থে’কে,
বাটি যেন ভেঙ্গে যায়, রে’খো মোর কথা।”
বৃদ্ধ বলে, “শিশুবুদ্ধি কত হবে আর?
আমি যদি ভাঙ্গি বাটি,
নিশ্চয় এ মুণ্ড কাটি
ফেলিবে পুকুরে, তোর পিতা দুরাচার।”
শিশু কহে, “না না দাদা, কিছু ভয় নাই;
কিছু না বলিবে কেহ,
হও তুমি নিঃসন্দেহ,
পায়ে ধরি, বালকের কথা রাখ ভাই।”

বলিয়া বালক ত্বরা প্রবেশে প্রাসাদে;
বৃদ্ধ ভাবে, ‘একি দায়,
শিশুর বুদ্ধিতে, হায়,
না জানি, পড়িব কোন্ দারুণ প্রমাদে।’
বহুচিন্তা করি, শেষে স্থির করে মন,
সন্ধ্যায় সোপানোপরি,
বসে ইষ্টদেবে স্মরি,
হাতে পাথরের বাটি, মনে দৃঢ় পণ।
ভ্রমিতেছে পিতাপুত্র, আনন্দ অপার;
যেমন এসেছে কাছে,
আর কি বিলম্ব আছে?
ফে’লে দিল বাটি, ভেঙ্গে হ’ল চূরমার।
হেরি’, ক্রোধে অগ্নিশর্ম্মা হ’ল ছত্রধর;
বলে, “জুড়ে দেরে বাটি,
নতুবা মারিব লাঠি,
পাজি, হতভাগা,—নাই মরণের ডর?

ভে’বেছিস্, ‘ওই বাটি ভাঙ্গা যদি যায়,
বড় বাটি জু’টে যাবে,
পেঠ ভ’রে ভাত খাবে?
ভাল চা’স, ভাঙ্গা বাটি জু’ড়ে নিয়ে আয়।”
হা নিঠুর কর্ম্মফল! হায়রে কপাল!
শুনি’ যার অনুরোধ,
ছিল না কর্ত্তব্য বোধ,
সে শিশুও মারিবারে ধায়, পাড়ে গাল!
রোষে শিশু কহে, “বুড়ো, বাটি জুড়ে আন্;
কাঁদিলে কি হবে আর?
জানিস্, ও বাটি কার?
নিমক্হারাম, পাজি, ধূর্ত্ত, সয়তান!
বুঝিস্‌নি ক’রেছিস্ কত বড় ক্ষতি;
বৃদ্ধ হ’লে মোর বাপ,
কি দিয়ে হইবে মাপ
তার আহারের চা’ল? পাষণ্ড দুর্ম্মতি!

তোর মত তা’রেও ত রাখিব কুটীরে;
ঐ বাটি মাপা চা’ল,
সেও পাবে চিরকাল,
তুই কেন ভে’ঙ্গে দিলি সেই বাটিটিরে?”
শুনি’ শিহরিল দেহ, পাষণ্ড রাজার;
‘বালক বুঝেছে তথ্য,
নির্ভীক, বলেছে সত্য,
বার্দ্ধক্যে আমিও পাব এই ব্যবহার!’
সেইদিন হ’তে রাজ-অট্টালিকা ’পরে
হইল বৃদ্ধের স্থান,
কত সমাদর, মান,
শিশু কোলে লয়ে, বৃদ্ধ ডাকেন ঈশ্বরে;
বিমল আনন্দ-অশ্রু ঝর ঝর ঝরে!